পানির ধর্ম ওপর থেকে নিচে গড়িয়ে যাওয়া। আর নদী হলো পানির প্রবাহের নাম। উজান থেকে ভাটিতে অবিরাম বয়ে যাওয়া নদীর ধর্ম। এই ধর্ম প্রাকৃতিক এবং এই নিয়ম প্রাকৃতিক নিয়ম। নদী ও পানির এই প্রাকৃতিক ধর্মকে কাজে লাগিয়ে মানুষ তার জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি পানির প্রবাহকে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে যুগ যুগ ধরে। পানির প্রবাহকে নিজেদের গোত্রের, অঞ্চলের, দেশের নিয়ন্ত্রণে রাখতে কত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, অমানবিক ব্যবহার আর অযৌক্তিক কাজ যে হয়েছে ইতিহাস তার কিছুটা সাক্ষ্য দেয়। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পাশাপাশি প্রশ্ন উঠেছে, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের নীতি কী হবে এবং প্রাকৃতিক নিয়ম কতটুকু মেনে চলতে হবে অথবা কতটা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে? কোনো বিরোধ সৃষ্টি হলে তার সমাধান কি গায়ের জোরে হবে, নাকি যুক্তি মেনে সমাধান আসবে এই প্রশ্নে সবাই বলেছে যে যুক্তিতেই সমাধান। সে কারণেই প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল নদী-সংক্রান্ত নীতিমালার। দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেমন চুক্তি এবং সমঝোতা তৈরি হয়েছে, তেমনি জাতিসংঘের উদ্যোগে নানা উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ সত্ত্বেও বিশ্বের দেশে দেশে পানিবণ্টন নিয়ে উজান আর ভাটির দেশের সমস্যা বেড়েই চলেছে। এর প্রধান কারণ শক্তির ভারসাম্যহীনতা। অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা হলো, এই যে শক্তিমানরা নিয়মের তোয়াক্কা করে না।
সবলের শুধু বল বেশি তা নয়, তার দুষ্টবুদ্ধিও বেশি। মিথ্যাকে সত্যের মতো করে বলা, যা বলছে তা মানতে বাধ্য করা এবং নির্লজ্জভাবে মিথ্যাচার করার অভ্যাস বা ক্ষমতা তো শক্তিশালীদের বেশি। সেই ছোটবেলায় শেখা গল্প শুধু ছোটবেলার জন্য নয়, তা যেন সারা জীবন মেনে চলার শিক্ষা। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার পানিতে তৃষ্ণা মেটাচ্ছিল এক মেষশাবক। তার নধর কান্তি দেহ দেখে খেয়ে ফেলার ইচ্ছা হলো এক নেকড়ের। কিন্তু খাওয়ার ইচ্ছাকে যুক্তিসংগত করতে হলে তো কিছু যুক্তি করতে হবে। তাই সে বলল, বেত্তমিজ, তুই আমার পানি ঘোলা করছিস কেন? মেষশাবক ভয় পেলেও যুক্তি হারায়নি। তাই সে উত্তর দিল, আপনি উজানে আমি ভাটিতে, আমি আপনার পানি ঘোলা করলাম কীভাবে? যুক্তিতে না পেরে নেকড়ে তখন ক্ষেপে গিয়ে বলল, তুই করিসনি এটা ঠিক, তবে তোর বাবা করেছিল নিশ্চয়ই। তার খেসারত তোকে দিতেই হবে। এরপরে মেষশাবকের পরিণতি কী হয়েছিল তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হয়নি। পানি উপর থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ার নিয়ম মানলেও দুর্বলকে গ্রাস করার নিয়ম যে অনেক শক্তিশালী, তা গুঁড়িয়ে দিতে পারে সব যুক্তি সে তো আমরা দেখছি সব সময়। নেকড়ের শক্তির কাছে মেষশাবকের যুক্তি যে অসহায় হয়ে পড়ে । কিন্তু প্রশ্ন হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের বা রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক নির্ধারণ বা চর্চা কি এই নীতিতে পরিচালিত হবে? তাহলে কি সমাজটা বা বিশ্বটা নেকড়ের বিশ্ব হিসেবে বিবেচিত হবে? সামাজিক প্রয়োজন আর বৈজ্ঞানিক যুক্তি দ্বারা পরিচালিত না হলে জঙ্গলের নিয়মের সঙ্গে কি পার্থক্য থাকবে মানুষের সমাজের?
বাংলাদেশ প্রাকৃতিকভাবে নদী, পানি ও পলির দেশ। আজ থেকে ছয় কোটি বছর আগে সাগরে ভাসতে ভাসতে দুই ভূখণ্ডের ধাক্কা লেগে যে হিমালয়ের সৃষ্টি, সেখান থেকে পরে কতসহস্র ঝরনার উৎপত্তি হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনাধারা একত্র হয়ে নদীতে পরিণত হয়। নদী বয়ে চলে সমুদ্রের পানে। চলার পথে পাহাড় থেকে নিয়ে আসা পাথর পরিণত হয় নুড়িতে, নুড়ি স্রোতের টানে আর পরস্পরের ঘর্ষণে পরিণত হয় পলিতে। এই পলি জমে তৈরি হয় ভূখণ্ড, ব-দ্বীপ। মানুষ যার সীমানা টেনে বানিয়ে নিয়েছে রাষ্ট্র। বাংলাদেশ এই রকম একটি ব-দ্বীপ, যা জীবন্ত এবং ক্রমবর্ধমান। বাংলাদেশ উত্তর থেকে দক্ষিণে ঢালু এক প্রায় সমতল ভূমি। সবচেয়ে উঁচু অংশ রাজশাহী অঞ্চল, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২৫ ফুট ওপরে আর নোয়াখালী অঞ্চল সবচেয়ে নিচু, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৬-১০ ফুট উঁচু। লাখো বছর ধরে পলি জমতে জমতে এই ভূখণ্ডের সৃষ্টি। যখন মানুষ বসতি স্থাপন করেনি, তখনো এই ভূখণ্ড ছিল, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ বসবাস করতে না পারলেও এই ভূখণ্ড থাকবে, হয়তো ভিন্নরূপে থাকবে। যেমন ৫০ হাজার বছর আগে এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য এখনকার মতো ছিল না। বেশিদিন আগের কথা নয়, আজ থেকে ৩০০ বছর আগেও এখন যেখানে যমুনা নদী, তখন তা এই দিক দিয়ে প্রবাহিত হতো না। এক ভয়াবহ ভূমিকম্প পুরনো ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পাল্টে দিয়ে বর্তমান যমুনার প্রবাহ সৃষ্টি করেছে। এমনি প্রায় ১২০০ নদী বিভিন্ন নামে, শাখা-প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে জালের মতো জড়িয়েই শুধু রাখেনি, মায়ের মতো বুকের ধারায় প্রাণরক্ষা ও পুষ্ট করে তুলেছে বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডটিকে। প্রতি বছর প্রায় ২০০ কোটি টন পলি বয়ে আনে এই নদীগুলো, যা গড়ে সাড়ে ১২ বর্গকিলোমিটার করে বাংলাদেশকে বড় করে তুলেছে এবং এখনো তুলছে প্রতি বছর। এই পলি নদীর দুপাশে ভূমির ওপর পড়ে জমির উর্বরতা বাড়ায় আর মোহনায় গিয়ে সমুদ্রে পড়ে দেশের আয়তন বাড়ায়। এটাই হয়ে আসছিল শত শত বছর ধরে।
পানিবাহিত পলি দিয়ে যেমন গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ, তেমনি পানির প্রবাহ বাঁচিয়ে রেখেছে আমাদের প্রাণ। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা, তিস্তা, সুরমা, কুশিয়ারাসহ ৫৪টি নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ভারত থেকে আর মিয়ানমার থেকে আসা নাফ, মাতামুহুরি ও সাঙ্গু এই ৫৭টি নদীকেই প্রধানত আন্তর্জাতিক নদী বলা হয়। পদ্মা রাজশাহী জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং ব্রহ্মপুত্র কুড়িগ্রাম জেলা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তিস্তা প্রবেশ করেছে লালমনিরহাট জেলা দিয়ে। তিস্তা ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে যমুনা নামে প্রবাহিত হয়েছে এবং পদ্মা যমুনা গোয়ালন্দে মিলিত হয় এবং এই মিলিত প্রবাহ পদ্মা নামে অভিহিত। অন্যদিকে, সুরমা কুশিয়ারা বাংলাদেশে প্রবেশ করে হবিগঞ্জের সীমান্তে মারকুলিতে একত্র হয়ে কালনি নামে প্রবাহিত হয়েছে। তারপর ভৈরবে পুরনো ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে মিলিত হয়ে মেঘনা নাম নিয়েছে। এরপর চাঁদপুরের কাছে পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়ে মিলিত ধারাটি মেঘনা নামে প্রবাহিত হয়ে সমুদ্রে পড়েছে। চীন, নেপাল, ভারত, বাংলাদেশ মিলে গঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র প্রবাহিত হয়েছে। বাংলাদেশের মোট পানি প্রবাহের প্রায় ৯২ শতাংশই ২৪ হাজার বর্গকিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীগুলো দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানি খাওয়াসহ গৃহস্থালি কাজ, কৃষি, শিল্পের জন্য প্রতিদিন ভূগর্ভের পানি তুলতে হয়। বর্ষার বৃষ্টি এবং নদী দিয়ে আসা পানি ভূগর্ভের সেই পানির স্তর পূর্ণ করে। একে পুনর্ভরণ বলে। কিন্তু এখন তা আর পুরোপুরি পুনর্ভরণ হতে পারছে না। কারণ ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসা ৫৪টি নদীর মধ্যে ৫১টিতেই বাঁধ দিয়েছে ভারত। সব আন্তর্জাতিক নিয়মকানুনকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে দেওয়া বাঁধের কারণে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ভূগর্ভের পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে প্রতি বছর। এর সঙ্গে আছে ক্ষমতাসীনদের নদী ভরাট, দখল, অবৈজ্ঞানিকভাবে নদীর বালু উত্তোলন এবং নদীর দূষণ। ব্যক্তির মুনাফার লোভে নদীর মৃত্যু ঘটানো হচ্ছে। একদিকে ভারতের বাঁধ আর দেশের অভ্যন্তরে নদী দখল দূষণ। এই যৌথ আক্রমণ বিপন্ন করছে নদী ও প্রকৃতিকে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীর অস্তিত্ব আজ বিপন্ন।
এই নদীর প্রবাহ যদি শুকিয়ে যায়, পানির প্রবাহ যদি কেড়ে নেওয়া হয়, নদীগুলো যদি দখল আর দূষণের কবলে পড়ে তাহলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়বে। কৃষিকাজের জন্য, শিল্পের জন্য, নৌপরিবহনের জন্য তো বটেই এমনকি খাওয়ার পানি ও গৃহস্থালি কাজের পানি পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়বে। সুজলা সুফলা সোনার বাংলা পরিণত হবে মরুময় বাংলাদেশে। ভারত কর্তৃক পদ্মার উজানে ফারাক্কা, মেঘনার উজানে টিপাই মুখ, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সরিয়ে নেওয়া আর তিস্তার উজানে গজল ডোবায় ব্যারাজ নির্মাণ আজ বাংলাদেশের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত ছিল এক অবিস্মরণীয় সেøাগান, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা-মেঘনা-যমুনা। ফারাক্কার কারণে পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তায় বাঁধের কারণে যমুনা এবং টিপাইয়ের কারণে সুরমা, কুশিয়ারা পানি না পেলে মেঘনা কি বাঁচবে?
ইতিমধ্যে ভারত ঘোষণা দিয়েছে যে আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের নামে ব্রহ্মপুত্রের পানি ৩০টি খাল খনন করে সরিয়ে নেবে। তাহলে বাংলাদেশের পানিপ্রবাহ প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে। এই প্রকল্পের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইতিমধ্যে ‘কেন-বেতয়া’ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। একটি বিষয়, বিশেষ করে খেয়াল করার মতো, তা হলো বাংলাদেশের সব কটি বড় নদী প্রবেশ করেছে উত্তরবঙ্গ দিয়ে। কৃষিপ্রধান উত্তরবঙ্গ যদি পানির সংকটে পড়ে তাহলে শুধু উত্তরবঙ্গ নয়, পুরো দেশেই খাদ্য এবং মানবিক বিপর্যয় দেখা দেবে। পানির সংকট বাঙালির প্রধান খাদ্য ভাতের সংকট সৃষ্টি করবে। নদী মরলে আমরা কি ভাতে মরার আশঙ্কায় পড়ব না?
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট