সেচভিত্তিক চাষাবাদ ও তিস্তা চুক্তি

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২১, ১১:৫০ পিএম

দেশে ৫৪টি নদীর উৎসস্থল হচ্ছে উজানের দেশ ভারত, নেপাল ও চীন। বিশেষ করে পদ্মা, তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র উজান থেকে বেয়ে এসে বাংলাদেশের রাজশাহী, নীলফামারী ও কুড়িগ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। যদিও এক সময়ের প্রমত্তা নদী পদ্মা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্রের সেই চিরাচরিত যৌবন এখন আর নেই। পানির অভাবে নদীগুলো শুকিয়ে এখন সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে সুবিশাল চর আর চর। এখন মানুষ শুষ্ক মৌসুমে পায়ে হেঁটেই এসব নদী নির্বিঘেœ পাড়ি দিচ্ছে। এমনকি নদী শুকিয়ে যাওয়ায় নদীর বুকে নদীচাষিরা নানা জাতের ফসলও উৎপাদন করছে। অর্থাৎ নদী অববাহিকায় বসবাসরত মানুষের জীবন-জীবিকার চিরাচরিত চিত্র পাল্টে গেছে। এক সময় পাল তোলা নৌকায় মানুষের পারাপার এখন আর চোখে পড়ে না। নদীতে মাঝিমাল্লার জীবন-জীবিকার চিত্রও পাল্টে গেছে। নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে গোষ্ঠীরও এখন মাছ ধরার সে চিত্র আর নেই। অর্থাৎ নদীতে পানির বড়ই সংকট। মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারত উজানের অংশে বাঁধ নির্মাণ করে একতরফাভাবে পানি আটকে দেওয়ায় ভাটির দেশের নদ-নদীগুলো এখন তীব্র পানির সংকটে পড়েছে।

উত্তারাঞ্চলের তিস্তা সেচ প্রকল্পটি দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প। এ প্রকল্পটি নীলফামারী, রংপুর ও দিনাজপুর জেলায় ৫ লাখ ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদানের লক্ষ্যে ১৯৭৯ সালে কাজ শুরু করে। এক সময় বৃহত্তর রংপুরে মানুষের তীব্র খাদ্য সংকট ছিল। বিশেষ করে কুড়িগ্রামকে বলা হতো মঙ্গাপীড়িত জেলা। একমাত্র সেচভিত্তিক চাষাবাদের বদৌলতে সে দিনের অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। তবে এখন পানির অভাবে সেচকার্য বিঘিœত হচ্ছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত তিস্তা ব্যারেজের সীমানা থেকে ৬০ কিলোমিটার উজানে গজলডোবায় ব্যারেজ নির্মাণ করে আন্তর্জাতিক আইন লংঘন করে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় তিস্তা ব্যারেজের ভাটিতে এখন শুধইু ধু ধু বালুচর। ফলে সেচভিত্তিক চাষাবাদে পানির সংকট দিনে দিনে তীব্র হচ্ছে। অথচ খাদ্যশস্য উৎপাদনে অমিত সম্ভাবনার তিস্তা সেচ প্রকল্প এ অঞ্চলের মানুষের জন্য আশীর্বাদ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে আমরা যুগের পর যুগ ধরে বঞ্চিত। শুধু আশ্বাস ছাড়া কার্যত কোনো সুফল আমরা অর্জন করতে পারছি না। অতিসম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠানে দু’দিনের সফরে বাংলাদেশে এসে ৫টি সমঝোতা স্মারক সই করলেও তিস্তা চুক্তি নিয়ে অচলাবস্থার কোনো অবসান হয়নি।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং দুদিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন। ওই সফরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে বাংলাদেশ সংলগ্ন পাঁচটি ভারতীয় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের আসার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ঢাকায় আসেননি। এমনকি ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রীও ওই সফরে আসেননি। কিন্তু আমরা আশা করেছিলাম, ওই সফরে তিস্তার পানিচুক্তি সম্পন্ন হবে। শেষ পর্যন্ত আর ওই দফায় তিস্তার পানিচুক্তি হয়নি। বহু বছর পর নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরেও কাক্সিক্ষত তিস্তাচুক্তি অধরাই থেকে গেল। বাস্তবতা হচ্ছে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তার পানির চুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখালেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী যে তিস্তা চুক্তির ঘোরবিরোধী তা তিনি নিজেই বহুবার বক্তৃতায় বলেছেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক কারণেই তিস্তাচুক্তিকে মমতা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের স্বার্থ ক্ষুণœ করে আমরা বাংলাদেশকে জল দিতে পারি না। কিন্তু দিদি হয়তো ভুলেই গেছেন যে, তিস্তার জল ভারতের একতরফাভাবে আটকে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লংঘন। আর তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আমাদের কাছে করুণা নয় বরং অধিকার। এ অধিকার থেকে আমাদের আর কতদিন বঞ্চিত রাখবেন?

সেচভিত্তিক চাষাবাদের কোনো বিকল্প আমাদের নেই। কিন্তু নদী-খাল-বিলে পানি না থাকায় সেচকাজে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার প্রতিনিয়তই বাড়ছে। আর ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় পানির স্তরও হু হু করে নিচে নেমে যাচ্ছে। এভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার বাড়তে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে ভূ-গর্ভস্থ পানির দেখা আর মিলবে না। আর শুধু সেচই তো নয়, মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম নিয়ামক পানি। পানি ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। সেই খাবার পানিও দিনে দিনে আর্সেনিকে ভরে যাচ্ছে। আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করায় দেশের অনেক স্থানে আর্সেনিক আক্রান্ত রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। এ অবস্থায় উজানের পানির আশায় না থেকে আমাদের যত দ্রুত সম্ভব পানি সংরক্ষণের বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে। সে জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে দেশের শুকিয়ে যাওয়া নদীগুলোকে খনন করতে হবে। এমনকি শাখা নালা-নদীতে বৃষ্টি ও বন্যার পানি সারা বছরের জন্য ধরে রেখে সেচকাজ চালাতে হবে। বিশেষ করে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য মেগা প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। কারণ উজানের একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং ভূ-গর্ভস্থ পানির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে উত্তরাঞ্চল এখন মরুকরণের দিকেই এগিয়ে চলছে।

তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল প্রতি বছরই তিস্তা নদীর মুখ পর্র্যন্ত লংমার্চ করে আসছে। দেশের অন্য সংগঠনগুলোও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যার আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে। গত ২৪ মার্চ তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে বেলা ১১টা থেকে ১১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত তিস্তা মহাপরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন ও তিস্তাচুক্তি সই করাসহ ছয় দফা দাবিতে নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদীবেষ্টিত ২৩০ কিলোমিটারব্যাপী তিস্তা নদীর দুই পাড়ে প্রায় তিন শতাধিক হাটবাজারে ১০ মিনিট ‘স্তব্ধ কর্মসূচি’ নামে মৌন প্রতিবাদ পালন করা হয়।

অন্যদিকে, গত ১৩ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘তিস্তার তো অলরেডি ১০ বছর আগেই চুক্তি হয়ে গেছে। বাস্তবায়ন হয়নি।’ মনে হয়, ভারতও তিস্তাচুক্তি হয়ে গেছে, এ কথা বলবে না। অথচ আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কীসের ভিত্তিতে বললেন তিস্তাচুক্তি হয়ে গেছে, তা আমাদের কাছে একেবারেই দুর্বোধ্য! বাস্তবে ক্ষমতাসীনদের কোনো কোনো মন্ত্রী কখনো কখনো এমন সব কথা বলেন, যা ভাবতেও অবাক লাগে। সত্যিই যদি ১০ বছর আগে তিস্তাচুক্তি হয়ে থাকে, তাহলে কেন তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না, এর ব্যাখ্যা কিন্তু তিনি দেননি। এখন তাহলে সরকারের উচিত চুক্তির শর্ত পূরণ না হওয়ায় আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া। এমন দায়সারা কথাবার্তা না বলে সরকারের উচিত তিস্তাসহ অভিন্ন ৫৪ নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ে সচেষ্ট হওয়াএটাই দেশের মানুষের প্রত্যাশা।

লেখক : কৃষিবিষয়ক লেখক

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত