বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে ১০৬টি। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত ছয়টি আর্মি মেডিকেল কলেজ হিসেবে ধরলে সে সংখ্যা দাঁড়ায় ১১২-তে। বেসরকারি ৭০টি বাদ দিলেও সরকারি মেডিকেলের সংখ্যা নেহাত কম নয়। মোট ৩৬টি। বিভাগীয় এবং সিটি করপোরেশন শহর ছাড়াও দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ শহরেই সরকারি মেডিকেল কলেজ রয়েছে।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত কিংবা দরিদ্র মানুষের চিকিৎসাসেবা যখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ফিরে আসে, তখন তাদের চিকিৎসার শেষ ভরসার জায়গা কিন্তু এ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয়ই। ক্ষেত্রবিশেষে, ধনীদেরও বড় আশার জায়গা হয়ে ওঠে। সেটা আমরা এই কভিড পরিস্থিতিতেও দেখতে পাচ্ছি। সরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগীরা ননস্টপ সেবা পেয়ে থাকেন। রোগীর চাপ অনুযায়ী হাসপাতালগুলোর নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। রয়েছে চিকিৎসক, নার্স থেকে সবকিছুর সংকট। এটা সত্য, আমাদের দেশের জনগণের অর্ধেকও এখনো চিকিৎসাসেবার আওতায় আসেনি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি দশ হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ৩.০৫ জন এবং নার্স রয়েছেন ১.০৭ জন। নেই কোনো স্বাস্থ্য বীমা। তবু এত প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও চিকিৎসকরা যেভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর এবং তাদের সে অবদান অনস্বীকার্য।
একটা প্রবাদ মুখে মুখে প্রচলিত আছে, ‘সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার পাওন যায় না, আবার যেকোনো সময়ে রাত-বিরাতে গেলেও ডাক্তার পাওন যায়।’ এ প্রবাদটার ব্যাখ্যা দেওয়াও খানিকটা ইন্টারেস্টিং। সরকারি হাসপাতালগুলোর সিস্টেমগুলো তথাকথিত প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর মতো না। এখানে রোগীর সেবা গ্রহণেও আপনাকে কিছু প্রসেস বা নিয়মের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। যখনই কেউ এসব নিয়মের ব্যত্যয় ঘটাবেন এবং আশা করবেন যে তার সামনের অধিক সিরিয়াস রোগীকে রেখে ডাক্তার তাকে চিকিৎসা দেবেন, তখন ডাক্তারকে গালমন্দ করে অভিযোগ জানাবেন, সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার পাওন যায় না। আবার উল্টোদিকে, মারামারি বা সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে রাত দুটা বা তিনটা নাগাদও সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যখন যাবেন, তখনো দেখবেন কিছু ডাক্তার এসে তাকে রিসিভ করে জরুরি সেবা দিচ্ছেন। কাটা-সেলাই লাগলে সেটাও করে দিচ্ছেন। তখন আবার রোগীই বলবেন, ‘সরকারি হাসপাতালে মাইঝ রাইতে আইলেও ডাক্তার পাওন যায়।’
এবার প্রসঙ্গে ফেরা যাক। শুরুতে জিজ্ঞেস করি, এই মাইঝ রাইতেও যে ডাক্তাররা সেবা দেন, তারা আসলে কে বা কারা? সহজ বাংলায় তাদের পরিচয়, তারা ইন্টার্ন ডাক্তার বা শিক্ষানবিশ চিকিৎসক। কাগজে-কলমে নিয়ম হচ্ছে, এমবিবিএস পাস করা সদ্য ডাক্তাররা বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সঙ্গে থেকে থেকে শিখবেন এবং তাদের সহযোগিতা করবেন। কিন্তু বাস্তবিকতাই তাদের সামনে থেকেই চিকিৎসা দিতে হয়, রাত-বিরাতে মাঝ রাতে জরুরি বিভাগে রোগীকে দেখে সেবা দিতে হয়। বলাবাহুল্য, এসব সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর প্রাণভোমরা হচ্ছে এসব ইন্টার্ন চিকিৎসক। তাদের আবার হাসপাতালের মেরুদণ্ডও বলা হয়ে থাকে। কারণ একটি হাসপাতালে আপনি ২৪ ঘণ্টাই হাতের কাছে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পাবেন এমন নিশ্চয়তা নেই, তবে যেকোনো মুহূর্তেই হাতের নাগালে ইন্টার্ন চিকিৎসক পাবেন, এটা নিশ্চিত।
এবার আসি হতাশার গল্পে। বহুকাল পর বোধহয় এবার ইন্টার্ন চিকিৎসক সংকটে পড়তে যাচ্ছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো। কারণটাও খুব পরিষ্কার। এ মুহূর্তে দেশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোয় যারা ইন্টার্ন করছেন তাদের ইন্টার্নশিপ বাকি এক থেকে দেড় মাস। নিয়মানুযায়ী তাদের যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আরেক ব্যাচ নতুন পাস করা ডাক্তার যোগ দিতেন ইন্টার্নশিপে। কিন্তু তা এবার হচ্ছে না। এ মুহূর্তে যারা ইন্টার্নশিপ করছেন, তাদের উত্তরসূরি ব্যাচের চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল গত বছরের নভেম্বরে। করোনা পরিস্থিতির কারণে সেটির পরবর্তী রুটিন নির্ধারণ হয় এপ্রিল থেকে। কিন্তু হঠাৎ করে ঘোষিত লকডাউনে পরীক্ষা শুরু হওয়ার আগেই পড়ে যায় অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিতের কবলে। মেডিকেল কলেজের পেশাগত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হয় চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেডিকেল কলেজ হচ্ছে আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে, যেটি কি না একযোগে লিখিত পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল ৪ এপ্রিল থেকে। হঠাৎ করে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় এ পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। এক চোখে দেখলে, এ কারণটি অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু আপনি যখন অন্য চোখ দিয়েও দেখবেন, আবার আপনাকে দূরদর্শীও হতে হবে তখন এ যুক্তি কিন্তু আর খাটে না। কেন খাটে না, সেটাও পরিষ্কার করছি। কিছুদিন আগেই যখন করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল, তখন পিএসসি ৪১তম বিসিএসের প্রিলি আয়োজন করে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থীর সমাগম করেছিল। এমনকি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার আয়োজন করে সোয়া এক লাখ শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকসহ আরও আড়াই-তিন লাখ মানুষের জনসমাগম, যেখানে স্বাস্থ্যবিধি মানার ন্যূনতম কোনো বালাই ছিল না। অথচ এ পরীক্ষাগুলো যদি আরও দুই মাস পরেও নিত, তাহলে তেমন কোনো ক্ষতি বা সমস্যা ছিল না।
উল্টো এদিকে সবচেয়ে এখন যেটির প্রয়োজন বেশি সেদিকে কোনো সুনজর পড়ল না। যে ব্যাচটি ডাক্তার হওয়ার অপেক্ষায় এবং ইন্টার্নশিপে যোগ দিয়ে করোনার সম্মুখভাগে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে নামতে প্রস্তুত, তাদের লিখিত পরীক্ষা স্থগিত করে দেওয়া হলো। অথচ এই ব্যাচটির ভাইভা এবং ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল ঈদেরও অনেক পরে। হাতে সময় ছিল দুই মাসের মতো। এর আগে শুধু লিখিত পরীক্ষাগুলো অনুষ্ঠিত হতো নিজ নিজ মেডিকেল কলেজে। যেখানে চাইলে অনায়াসেই এসব পরীক্ষা নেওয়া যেত বলে মনে করেন স্বয়ং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও। সেটিকে গুরুত্ব না দিয়ে, কম গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাবলিক পরীক্ষা দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে নেওয়া হলো স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই। ১ম, ২য়, ৩য় পেশাগত পরীক্ষাও নেওয়া হয়েছে। এমনকি এই লকডাউনেও চলছে ১ম এবং ২য় পেশাগত পরীক্ষার্থীদের ভাইভা। কিন্তু সেখানে চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার্থীদের লিখিত পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছে লকডাউনের কারণে।
এমনকি স্থগিত হওয়া মেডিকেলের চূড়ান্ত পেশাগত পরীক্ষার পরীক্ষার্থীরা বেশির ভাগই মেডিকেল কলেজের হলগুলোয় অবস্থান করছে। এমন পরিবেশে জৈব সুরক্ষা নিশ্চিত করে লিখিত পরীক্ষা নেওয়াটা খুব কঠিন কিছু ছিল না। এমতাবস্থায় পরীক্ষা স্থগিত করে এ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা হওয়া এবং ইন্টার্নশিপে যোগদানে কালক্ষেপণ হচ্ছে তা নিশ্চিত। উল্টোদিকে যে ব্যাচটি এখন ইন্টার্নশিপ করছে, তাদেরও শেষের সময় ঘনিয়ে আসছে। ফলে শিগগিরই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোই হতে যাচ্ছে ইন্টার্ন চিকিৎসকবিহীন।
অথচ কভিডের কারণে পৃথিবীর কোথাও কোনো পরীক্ষা বন্ধ নেই। এক বছরেও রাষ্ট্র এর বিকল্প কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি, উল্টো যাদের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি এখন, তাদের আগমনী দুয়ারেই তালা মেরে দেওয়া হয়েছে। এক কভিডেই চিকিৎসাসেবা যেভাবে ভেঙে পড়েছে, তাতে যদি এবার ইন্টার্ন চিকিৎসক সংকটেও ভুগতে হয়। তার ওপর আবার কভিডে দায়িত্বরতদের আইসোলেশন এবং কোয়ারেন্টাইন নীতি তো আছেই। সব মিলিয়ে কেমন যেন হ-য-ব-র-ল অবস্থা। তবে ইন্টার্ন সংকটে যে পড়তে যাচ্ছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলো, তাতে সরকার আসলে কী ভাবছে?
লেখক : ইয়ুথ লিডার