ফুটবল কেবল ৯০ মিনিটের খেলা নয়, মাঝে মাঝে এটি এমন এক জীবন-আখ্যান, যা মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে ছুঁয়ে যায় মানুষের গভীরতম মনস্তত্ত্বকে। শৈশবে যুদ্ধবিধ্বস্ত আইভরি কোস্টের ভয়াবহতা দেখে মায়ের হাত ধরে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছিলেন ইসমায়েল কোনে। সেই উদ্বাস্তু ছেলেই আজ বিশ্বমঞ্চের সমাদৃত তারকা। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, বিশ্বকাপে তার জন্মভূমির ম্যাচের কয়েকঘণ্টা আগেই পায়ে মারাত্মক চোট নিয়ে হাসপাতালে লড়ছেন ইসমায়েল। আর টরন্টোর বিএমও ফিল্ডের সবুজ গালিচায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবেগ বুকে নিয়ে বুটজোড়া বাঁধছেন জার্মান ডিফেন্ডার জোনাথন তাহ। জার্মানিতে বড় হলেও তাহের ধমনিতে বইছে আইভরি কোস্টের রক্ত। আজ বিশ্বমঞ্চের হাইভোল্টেজ ম্যাচে নিজের বাবার দেশের বিপক্ষেই রক্ষণ সামলানোর এক অদ্ভুত ও আবেগঘন এক পরীক্ষা তার সামনে।
মাত্র ১৭ বছর বয়সে আইভরি কোস্ট ফুটবল ফেডারেশন জোনাথন তাহ-কে নিজেদের দলে খেলার প্রস্তাব দিলেও, তিনি জার্মানিকেই বেছে নেন। বাবার দেশের মুখোমুখি হওয়া নিয়ে বিশ্বকাপের আগে জার্মান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাহ বলেছিলেন, ‘আমি যখন ১৭ বছরের ছিলাম তখন আইভরি কোস্ট ফেডারেশন জানতে চেয়েছিল তাদের হয়ে খেলব কি না। কিন্তু আমি জার্মানিতে বড় হয়েছি এবং এখানকার যুব দলেই খেলেছি। তাই ওদের হয়ে খেলা আমার জন্য কখনোই কোনো বিকল্প ছিল না। তবে তাদের সঙ্গে আমার আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে এবং এটি আমার কাছে খুব বিশেষ কিছু।’
শেকড়ের প্রতি এই টান তাহের দৈনন্দিন জীবনেও বড় প্রভাব ফেলে। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে এই বায়ার্ন মিউনিখ তারকা আরও বলেন, ‘সেই যোগাযোগ আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইভরি কোস্ট আমার জীবনে এবং প্রতিদিনের পথচলায় খুব বেশি জড়িয়ে আছে। এই শেকড় আমার একটা অংশ। আমার বাবা কোথা থেকে এসেছেন এবং জার্মানিতে আসার পর তাকে কী কী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তিনি আমাকে সব বলেছেন, যা জীবনের বাস্তবতাকে বুঝতে আমাকে দারুণ সাহায্য করেছে। ফুটবলে যখন আমি কোনো কঠিন সময় পার করি, তখন মনে হয় বাবার লড়াইয়ের তুলনায় এটি কিছুই না। ফুটবলের বাইরেও জীবনের এই দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে না ফেলাটা জরুরি।’
মাঠের লড়াইয়ে আবেগের এই আবহের পাশাপাশি বর্তমান জার্মান স্কোয়াডের আন্তোনিও রুডিগার, লেরয় সানে ও জামাল মুসিয়ালার মতো মোট আটজন ফুটবলারের শেকড় জড়িয়ে আছে আফ্রিকায়। তবে প্রথম ম্যাচে কুরাসাওকে ৭-১ গোলে উড়িয়ে দেওয়া হুলিয়ান নাগেলসম্যানের জার্মানির জন্য আজই আসল পরীক্ষা, আইভোরিয়ানদের বিপক্ষে যারা ইকুয়েডরকে ১-০ ব্যবধানে হারিয়েছে তাদের প্রথম ম্যাচে।
জার্মান শিবিরের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চিন্তার নাম ১৯ বছর বয়সী আইভরি কোস্ট উইঙ্গার ইয়ান দিওমান্দে। আরবি লাইপজিগের হয়ে বুন্দেসলিগায় সদ্য সমাপ্ত মৌসুমে ১২টি গোল ও ৮টি অ্যাসিস্ট করে ‘রুকি অব দ্য সিজন’ হওয়া এই তরুণকে রুখতে মরিয়া জার্মানি। জার্মান অধিনায়ক জশুয়া কিমিখ প্রতিপক্ষের এই তরুণ তুর্কিকে নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘এক বছর আগেও ওকে কেউ চিনত না, কিন্তু এখন ওর অবিশ্বাস্য উন্নতি হয়েছে। ওর ড্রিবলিং এবং গতি এককথায় অসাধারণ।’
একই সুরে ডিফেন্ডার রুডিগারও আইভোরিয়ানদের আক্রমণভাগকে ‘এক্সপ্রেস ট্রেন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘দিওমান্দে ছাড়াও নিকোলাস পেপে কিংবা আমাদ দিয়ালোদের মতো গতিশীল খেলোয়াড়দের রুখতে আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে।’
প্রথম ম্যাচে বড় জয় পেলেও রক্ষণভাগের ফাঁকফোকর নিয়ে চিন্তিত জার্মান কোচ নাগেলসম্যান। আইভরি কোস্টের মারাত্মক কাউন্টার অ্যাটাক ঠেকাতে আজ কিমিখ কিংবা নাথানিয়েল ব্রাউনের মতো ফুল-ব্যাকদের আক্রমণাত্মক হওয়ার পাশাপাশি রক্ষণাত্মক ভারসাম্য ধরে রাখার কৌশল নিচ্ছেন তিনি। একাদশে লেরয় সানের জায়গায় প্রথম ম্যাচে বদলি নেমে এক গোল ও দুই অ্যাসিস্ট করা দেনিজ উন্দাভকে শুরু থেকেই দেখা যেতে পারে।
বিপরীতে, আইভরি কোস্টের কোচ এমার্স ফায়ে তার দলের রক্ষণাত্মক দৃঢ়তা বজায় রেখে মাঝমাঠের ফ্রাঙ্ক কেসি ও ইব্রাহিমা সাঙ্গারের ওপর ভরসা রাখছেন জার্মানির বল পজেশন নসাৎ করতে। ইনজুরির কারণে তাদের ডিফেন্ডার ইভান এনডিকার খেলা নিয়ে সংশয় থাকলেও, প্রথম ম্যাচে বদলি নেমে জয়সূচক গোল করা ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের উইঙ্গার আমাদ দিয়ালো আজ শুরু থেকেই মাঠে নামতে পারেন।
সর্বশেষ ২০০৯ সালে এই দুই দলের একমাত্র দেখায় ম্যাচটি ২-২ গোলে ড্র হয়েছিল। দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিশ্বমঞ্চের এই গ্রিপিং দাবা খেলায় নকআউট পর্বের টিকিট সবার আগে নিশ্চিত করতে দুই দলই আজ কোনো ভুল করতে রাজি নয়।