সদা শ্যামল

আপডেট : ০৭ মে ২০২১, ০২:৫৩ এএম

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জীবন একেবারে কবিদের মতো আকর্ষণীয়। কবিদের মতন কথাটা মোটামুটি হিসেব করে লেখা। কথাসাহিত্যিকদের জীবন অতটা আকর্ষণীয়, অর্থাৎ গল্পগাছার অংশ সাধারণত হয় না। একটু উদাহরণ দিয়ে খোলাসা করা যাক। বঙ্কিমচন্দ্র ও মধুসূদন, দুজনই বাংলা ভাষার গুরুত্বপূর্ণ লেখক, কিন্তু তাদের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে সাধারণের কিংবা সাহিত্যিক মহলের যে আকর্ষণ, তা বঙ্কিমের চেয়ে মধুসূদন সম্পর্কে ঢের বেশি। তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণের জীবনের বিপরীতে যেমন জীবনানন্দ সম্পর্কে আমাদের আকর্ষণ। যেমন, সমরেশ বসু-মাহমুদুল হকের তুলনায় শক্তি চট্টোপাধ্যায়-আবুল হাসানের। তাই ওই কথাটা লেখা।

এই আকর্ষণের মূল কারণ শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই যেমন, তার লেখাও। তার কয়েকটি বিখ্যাত গল্প-উপন্যাসের কাহিনীর প্রধান চরিত্র যেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই। সেখানে, প্রচলিত কলকাত্তাইয়া মধ্যবিত্তপনার বিপরীতে যে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ফুটে ওঠেন, সে সব গল্পগাছা তার ব্যক্তিজীবনের ঘটমান কাহিনীর পাশ দিয়েই যায় কখনো কখনো। একটা দুটো তো এখানে বলাই যায়। যেমন, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তখন বেকার। বড় ভাইয়েরা কেউ তার এই বেকারত্ব নিয়ে খোঁটা দিয়েছেন। কারণ বাড়িতে জামাইবাবু এসেছেন, শ্যামলের যদি মুরোদে কুলোয় তো আজ পারলে বাজারটা করুক। তিনি নির্বিকার। একটু পরে খানিক অপমানিত শ্যামল বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। ফিরলেন থলে ভরতি বাজার নিয়ে। সবাই অবাক। পরদিন সেই জামাইবাবু যাওয়ার সময়ে তার নতুন পামশু জোড়া আর খুঁজে পাওয়া গেল না। এবারও নির্বিকার শ্যামল। একবার, আনন্দবাজার পত্রিকার এক কর্তার সঙ্গে লিফটে উঠেছেন তিনি। সে অবস্থায় পাদ দিয়েছেন। কর্তা বললেন, আপনি ওই কাজটি সেরে লিফটে উঠুন। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় বললেন, সেটা সারতে আরও কোথাও যাওয়ার কী দরকার, আপনার পুরো অফিসটাই তো একটা খাটা পায়খানা। এহেন স্পষ্ট কথাবার্তা। আবার রসিকও। সে কথা লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তাদের দুজনের পদবিতে মিল আর তার সমবয়েসি, তাই কফি হাউজে শ্যামল অন্যদের কাছে পরিচয় দিতেন, ওই পদবির মিলটাকে মিলিয়ে, তারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সমকালীন ঔপন্যাসিক) আমাদের ঠাকুর্দা, উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় (বিচিত্রা-সম্পাদক ও ছদ্মবেশী উপন্যাসের লেখক) আমাদের বাপ, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় আমাদের কাকা আর সুনীল আর আমি (শ্যামল) ভাই। কিংবা, রবীন্দ্রনাথ আমাদের দুই ভাইকে নিয়ে অন্তত একটা গান লিখেছেন, ‘সুনীল সাগরে শ্যামল কিনারে’। তো, রসায়নের ছাত্র শ্যামল ডিসকলেজিয়েট হয়ে যখন অনার্স পরীক্ষা দিতে পারলেন না, কাজ করলেন ইস্পাত কারখানায়, পরে বাংলায় অনার্স। এরপর এমএ ভর্তি হলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের শুরুতে। সেই পরীক্ষার আগে তার কীর্তি, বইপত্তর সব কফি হাউজের বন্ধুদের বিলিয়ে দিলেন। পড়েছেন জানার জন্য, পরীক্ষা দেওয়ার আর কী দরকার।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের শৈশব থেকে প্রাক-তারুণ্য পুরোটা কেটেছে বাংলাদেশে। খুলনা জেলা স্কুলের ছাত্র। কলেজে ওঠার আগে আগে দেশভাগজনিত দেশত্যাগ। কিন্তু শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় খুলনাকে ভুলতে পারেননি, কিংবা লেখার পটভূমিকা কিংবা মানসিকতার বাইরেও রাখেননি কখনো। তার আত্মজীবনী ‘জীবন-রহস্য’ যার অন্য নাম ‘এই জীবনের যত মধুর ভুলগুলি’তে ভৈরব ও রূপসা নদ, খুলনা জেলা স্কুল, কাস্টমস ঘাট, সোনাডাঙ্গা, শিববাড়ির মোড় ইত্যাদি জায়গা একেবারে জীবন্ত। সেই জীবনকে যাপনের অনেকদিন পরে লিখলেও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় দেখছেন যেন একেবারে চোখের সামনে। ‘আলো নেই’ উপন্যাসেও অনেকখানিক জায়গা জুড়ে খুলনা। একটা বিষয়ে তার সমকালীন পশ্চিমবঙ্গের লেখকদের চেয়ে তিনি একেবারেই আলাদা, সেটি সংলাপে খুলনার উপভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে। অন্যদের বেশির ভাগই সংলাপ লিখেছেন প্রায় বানানো, কতকটা ঢাকার, কতকটা বরিশালের মিশ্রণ দিয়ে, সে এক জগাখিচুড়ি, সে ক্ষেত্রে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় যেখানে প্রয়োজন হয়েছে শহর খুলনার উপভাষা একেবারেই ঠিকঠাক ব্যবহার করেছেন। ‘বাঙাল’ সংলাপ মানেই মনের মাধুরী মেশানো আমু-যামু নয়।

শুরুতে যে কথা বলা হয়েছে যে চরিত্রগুলো কখনো কখনো শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় নিজেই। নিজ গৃহ, নিজ গার্হস্থ্য। অন্তত এই মুহূর্তে মনে পড়ছে ‘চন্দনেশ^রের মাচানতলায়’ কিংবা ‘পরী’ অথবা উপন্যাস ‘ঈশ^রীতলার রূপকথা’। আর, তার চাষাবাদের প্রতি আগ্রহ, বাবু ভদ্দর লোকদের জীবনযাপন ছেড়ে তিনি কলকাতার উপকণ্ঠে জমিজায়গা কিনে চাষাবাদ করছেন, চাকরি করছেন, গরু পালছেন। জীবনকে সেই জীবনের কাছে গিয়ে দেখা। এ সবই তার ওই ‘জীবন-রহস্যে’ আছে। কিন্তু সে লেখা কখনো যেন উপন্যাস, কেননা, একেবারে উদাম করে ফেলা হয়েছে সেখানে নিজেকে। সে সব বর্ণনায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় একেবারেই নির্বিকার। একজন শিক্ষকের ফেয়ারওয়েলের টাকা মেরে দিয়ে বেপাড়ায় যাওয়া, কিংবা দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের সময়ে খুলনা শহর ভর্তি আমেরিকার সৈন্য, ফলে কার চেহারা ওই সৈনিকদের মতন, তাও একেবারে অকপটে তিনি বর্ণনা দিয়ে যান। ওদিকে, সেই জীবন থেকে পরিণত বয়েসে তিনি ফিরে যান ‘শাহজাদা দারাশুকোয়’। এই মোগল যুবরাজের প্রতি তার আকর্ষণ চাপা থাকে না। সে বই লিখতে গিয়েও, ওই রাজনৈতিক-সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনযাপনের বর্ণনা দিয়ছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে।

এর বাইরে, তার জীবন যে জন্য আকর্ষণীয়, সেটি দৃষ্টিনন্দন ব্যাকব্রাশ চুলের অমন সুদর্শন চেহারায়, কোনো বন্ধুুর গায়ে সুন্দর জামা দেখে চট্্ করে বলতেন, তোর জামাটা সুন্দর, একদিন পরতে দিস, দিবি তো? অথবা, কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সন্তোষকুমার ঘোষের মতন আনন্দবাজারের ডাকসাইটে সাংবাদিক-প্রধানকে চড় কষাতে পারেন শ্যামল, তার ভাষায় অথবা সেই কলকাতার উপকণ্ঠের লোকজনের ভাষায়, শ্যামল বাঙাল। যদিও খুলনাকে কখনো বাঙাল-দেশ ধরা হয় না, ওটা ঘটি-বাঙালের মাঝখানে। প্রকৃত বাঙালরা নাকি বরিশাল থেকে শুরু, ওদিকে ফরিদপুর ও ঢাকা। কিন্তু শ্যামল গাঙ্গুলির সত্যি বাঙালের রোখই ছিল। হয়তো আদিবাড়ি তার বরিশাল, তাই কখনো কলকাতার মার্জিত ভাব অর্জন করতে পারেননি। যেমন পারেননি বিক্রমপুরের বাঙাল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় শাহজাদা দারাশুকো লেখার সময়ে কন্যার বয়েসি এক নারীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, ইতিহাসের কৃতী ছাত্রী তিনি, এই সম্পর্কে শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের কোনো রাখঢাক ছিল না। নিজেই বলেছেন, ইতি রাজি হলো না বলে তাকে বিয়ে করা হলো না। আনন্দবাজার ছাড়ার পরে ‘অমৃত’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হন। ওই সাহিত্য পত্রিকায় শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় অসংখ্য তরুণ লেখকের আশ্রয় হয়েছিলেন। তাদের অনেকেই এখন গুরুত্বপূর্ণ লেখক। দৈনিকে সম্পাদনা করেছেন কৃষি পাতা, চাষাবাদ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছিল। সেটি না থাকলে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’র মতন উপন্যাস রচনা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের বাজার ব্যবস্থা বুঝতেন অসাধারণ, সঙ্গে তার রন্ধন কৌশলও। নইলে ‘বাজার সফর’ নামের বই লেখা কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ই একমাত্র লেখক, যার অমন একটি বই আছে। যেখানে একই সঙ্গে জুড়ে আছেন গেরস্থ সাংবাদিক লেখক আর সমাজবিশ্লেষক। ‘বাজার সফর’ বাংলা ভাষায় জুড়িহীন।

এর বাইরে ছিলেন অন্য শ্যামল। একেবারেই অন্য। তার কাটাকাটা, একেবারেই ভণিতাহীন, ছেদচিহ্নকে পাত্তা না দেওয়া অনেকটাই নিরাসক্ত শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়কে ওই গদ্যে খুঁজে পাওয়া যায়, বলেছেনও সে কথা, “লেখার উদ্দেশ্য একটিই। তা হলো উন্মোচন। অনুসন্ধানের পথে পথে এই উন্মোচন। বিনা মন্তব্যে সরল বাক্য সাজিয়ে এগিয়ে যাওয়াই আমার পদ্ধতি। আমি বলতে চাই সবচেয়ে কম। আর চাই আমার না-বলাটুকু পাঠকের মনে ক্রমিক পুনঃ সৃষ্টি করে চলুক। সেই পথ খুঁজে পাক। তাই সাধারণত আমার কোনো রচনাতেই জটিল বাক্য থাকে না। কেউ বলেনÑ বড় কাটা কাটা লাগে। আমি এটা ইচ্ছে করেই করি। কেননা, এটাই আমার পদ্ধতি। সেই পদ্ধতিতে আমি ‘টেবিল’ ‘চেয়ারের’ মতোই অনায়াসে উপযুক্ত ইংরাজি কথা ব্যবহার করি। কারণ, জানি এই কথাগুলো আমরা অন্য সময়ে বাংলার মতোই আমাদের বাক্যে ব্যবহার করে থাকি। নজর রাখি, একটা হেভি শব্দের বদলে যেন আটপৌরে শব্দ খুঁজে পাই।” এমন গদ্যের লেখকই যে ব্যক্তি শ্যামল, যিনি জীবনকে একমাত্র ভালোবাসাতেই খুঁজে পেতেন, জীবনে গলাগলি করে বা ধরে বেঁচে থাকা ছাড়া যে আর কিছুই পাওয়ার নেই, তিনি কিন্তু গদ্যের অমন রেয়াত না দেওয়া ভঙ্গিতে কোনোভাবেই যেন ধরা পড়েন না।

যেমন, সমরেশ বসু পুরস্কৃত হয়েছেন। সংবর্ধনা সভা। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যান্ড পার্টি নিয়ে হাজির। সমরেশ বসু উপস্থিত হতেই, তার নির্দেশমতো বেজে উঠল, বোম্বাই সে আয়া মেরা দোস্ত, দোস্তকো সেলাম করো। এমন অবাক করে দেওয়া কান্ড তার পক্ষেই ঘটানো সম্ভব।

আর একটি ঘটনা। বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হয়ে এসেছেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় সাংবাদিক হিসেবে। হয়তো নিজেই বলেছেন, তাকে খুলনায় পাঠালে তিনি আসবেন। তার পর্যবেক্ষণের দায়িত্বও খুলনাতেই। রাষ্ট্রীয় অতিথি তিনি। তবু খুঁজে ফিরলেন ছেলেবেলার সহপাঠীকে। জানা গেল শহরের ওইখানে আছেন একজন। সেই ভদ্রলোক সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। অবসর জীবন যাপন করছেন। তার ফ্ল্যাটের দরজা খুলতে ভদ্রলোক দেখেই শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় তার প্রায় কোলো গিয়ে বসলেন। সঙ্গের সরকারি কর্মকর্তাদের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়ার দশা। কিন্তু বছর পঞ্চাশেক পরে দেখা বন্ধুকে পেয়ে, তিনি তার কোলে বসে ভদ্রলোকের চুলহীন মাথায় তবলা বাজাতে লাগলেন এই বলে, কী রে! তোর মাথায় চুল নেই। দেখ, আমার মাথায় কত চুল! একেবারে স্কুলছাত্রের ভঙ্গি। সেই ভদ্রলোক কী বলবেন, যেন বুঝতেই পারছেন না কী ঘটে চলেছে। এরপর বন্ধুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়। এও তার পক্ষেই সম্ভব!

এই কান্নার রেশ পাওয়া যায় তার দেশভাগের পটভূমিকার যেন বিপরীতে লেখা উইপোকা গল্পে।

লেখক কথাসাহিত্যিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত