ঈদ উৎসব এবং বাঙালির জীবন-সৌন্দর্য

আপডেট : ১২ মে ২০২১, ০১:০০ এএম

বাঙালি মুসলমানের কাছে ঈদের নানামুখী তাৎপর্য রয়েছে। ধনী-দরিদ্র সবার কাছেই ঈদ অনাবিল আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে। একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিকাশের প্রেরণাও রয়েছে ঈদ আনন্দের মধ্যে। তবে বিগত দেড় বছর ধরে করোনা ব্যবচ্ছেদ করে দিচ্ছে ঈদের আনন্দ। ঈদ এলে বাঙালির শেকড়ের টান বোঝা যায়। ঈদযাত্রায় হাজার দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে হলেও গ্রামে-মফস্বলে স্বজনদের কাছে ফিরে যাওয়া চাই। এক্ষেত্রে যেন কোনো আপস নেই। কখনো কখনো আমরা আত্মঘাতী হতেও দ্বিধা করি না।

এবার কভিডের দ্বিতীয় ঢেউ মারাত্মক আকার ধারণ করায় সরকারিভাবে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে শহর না ছাড়ার জন্য। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে যার যার অবস্থানে থেকে ঈদ উদযাপনের অনুরোধ রাখছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু কে শোনে কার কথা। লাখ লাখ মানুষ ছুটছে শেকড়ের দিকে। স্বাস্থ্যবিধিকে কোনোরকম তোয়াক্কা না করে। রমজানের এই শেষপ্রান্তে এসে ঈদের কেনাকাটা করতে ক্রেতারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছে দোকানপাট-শপিংমলে। করোনা ভীতি যাই থাক, প্রিয়জনদের জন্য ঈদ উপহার না কিনে ঈদকে মাটি করতে চান না এসব আমুদে বাঙালি মুসলমান। অবস্থা দেখে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা হায় হায় করছেন। বাস্তব অবস্থায় দাঁড়িয়ে এখন ঈশ^রের কাছে দয়া ভিক্ষা করা ছাড়া কোনো পথ দেখছি না যেন আমরা। তবে আমরা এ বিশ^াস তো রাখতেই পারি যে, ভয়াবহতা সাময়িক ছন্দ্যোচ্ছেদ। আবার আমরা মুক্ত পৃথিবী ফিরে পাব। চিরায়ত ঈদ উৎসবে মাতোয়ারা হবে মুসলমান নির্বিশেষে সব বাঙালি।

ঈদ এলে বাঙালি মুসলমান উদ্্যাপনের জন্য এতটা মরিয়া হয়ে যায় কেন! কারণ ঈদ উৎসব বাঙালির সাংস্কৃতিক জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া একটি শক্তিশালী ফল্গুধারা। সংস্কৃতির একটি আলাদা শক্তি আছে। একে জীবন বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া কঠিন। কখনো বাধাগ্রস্ত হলে বাঁধভাঙা জোয়ারের সৃষ্টি করতে পারে। আমরা স্মরণ করতে পারি রমনার বটমূলে বোমা হামলার কথা। মৌলবাদী শক্তি মনে করেছিল এভাবে রক্ত ঝরিয়ে, ভীতি ছড়িয়ে বাঙালি সংস্কৃতির ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দুর্বল করে দেবে তারা। কিন্তু ফল উল্টো হয়েছে। পরের বছর থেকে পহেলা বৈশাখ পালন আরও জমজমাট হয়েছে। শুধু ঢাকা নয় সারা দেশে উৎসবের জোয়ার হয়েছে আরও প্রাণবন্ত। 

মোবাইলের যুগে অনেক হিন্দু বন্ধু দুর্গাপূজার সময় মুসলমান বন্ধুকে আজকাল এসএমএস করে ‘শুভ বিজয়া’ জানায়। একইভাবে উত্তর পাঠায় মুসলমান বন্ধু। ঈদ উপলক্ষে মুসলমান বন্ধু হিন্দু বন্ধুকেও ‘ঈদ মুবারক’ জানায়। ওরাও ‘ঈদ মুবারক’ জানিয়ে এসএমএস করে। ঈদ, পূজা, বড়দিন বা বুদ্ধপূর্ণিমা যে কোনো পার্বণ উপলক্ষে আমরা যদি এভাবে ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে পরস্পরের জন্য শুভ কামনা করতে পারি তবে তো জয় হবে মানবতারই। আর পিছু হটবে সাম্প্রদায়িক শক্তি। দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দুদের মধ্যে দৃশ্যমান যূথবদ্ধ আনন্দ করার সুযোগ রয়েছে। মন্ডপে মন্ডপে দলবেঁধে সবাই যাচ্ছে, এক সঙ্গে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিচ্ছে। ঈদের উচ্ছ্বাসটা ঠিক ওইরকম নয়। বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়ের আনন্দ যার যার সামাজিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা থেকেই হয়ে থাকে। মুসলমানদের ঈদ আনন্দ তাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিতেই জড়িয়ে আছে। এখানে কোনো প্রতীকী স্থাপনা নেই। ফলে পার্থিব ও অপার্থিব আনন্দ ফল্গুধারার মতো ছড়িয়ে থাকে। তবুও অধুনা ঈদ আনন্দে অনেক রূপান্তর ঘটেছে। বিশেষ করে নাগরিক জীবনে। উৎসবের আনন্দ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে একই নৈকট্যে অনুভব করে দুই সম্প্রদায়ের মানুষ।

উনিশ শতকের ঢাকার ঈদ উৎসব এখনো টিকে থাকলে পূজা উৎসবের পাশাপাশি দুই উৎসবের তুলনামূলক আলোচনায় উপস্থাপন করা যেত। সে যুগে অনেক আনন্দঘন ঈদ উৎসব পালন করত ঢাকাবাসী। ঈদের দিন জমকালো আনন্দ মিছিল বের হতো। অবশ্য কয়েক বছর ধরে করোনাকালের আগে ঢাকায় ঈদ আনন্দ মিছিল হয়েছে হবেও। উনিশ শতকে আরমানিটোলা, ধূপখোলা বা রমনার মাঠে ঈদ উৎসবের অংশ হিসেবে কত্থক নাচের আয়োজন হতো। কোথাও হতো হিজড়া নাচ। ঘুড়ি ওড়ানো আর নৌকা বাইচের আয়োজন হতো। আর এসব অনুষ্ঠানে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও আনন্দ ভাগ করে নিত। আমাদের ছেলেবেলার কথা স্মরণে আনতে পারি; নারায়ণগঞ্জের বন্দরে অনেক হিন্দু পরিবারের বাস ছিল। তাদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ভারত চলে গেছেন। এসব বাড়িতে আমার বোনদের বান্ধবী অনেক দিদি ছিলেন। আদর-স্নেহ পেয়ে তাদের দূরসম্পর্কের মনে হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো আমরা ছোটরা যেমন কর গুনে ঈদের অপেক্ষা করতাম, একইভাবে দুর্গাপূজা, লক্ষ্মীপূজা আর স্বরস্বতী পূজার জন্যও দিন গুনতাম। মন্ডপে মন্ডপে ঘুরে প্রতিমা দেখা, ঢাকির জাদুকরী হাতে মনমাতানো ঢাকের বাদ্যে মাতোয়ারা হওয়া আর প্রসাদ খাওয়ার লোভ তো ছিলই।

শুধু ঈদ নয়, মহররমের মিছিলেও ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার অংশগ্রহণ ছিল। ইরাক-ইরানসহ অনেক আরব দেশে শিয়া-সুন্নির মধ্যকার দ্বন্দ্ব হানাহানির পর্যায়ে চলে যায়। এদিক থেকে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আঠারো শতক থেকে ঢাকায় মহররম পালিত হচ্ছে। শিয়াদের তাজিয়া মিছিলে সুন্নি মুসলমানের অংশগ্রহণ এদেশে স্বাভাবিকই ছিল। আঠারো-উনিশ শতকের নথিতে দেখা যায় একটি সাংস্কৃতিক প্রণোদনা নিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেও শরিক হতো মহররমের মিছিলে। কারবালার স্মৃতিতে দুলদুলের প্রতীক দুলদুল ঘোড়ার পায়ে অনেক হিন্দু রমণী দুধ ঢেলে নানা মানত করত।

মুসলমান পীরের  সমাধিতে হিন্দুর যাওয়া, প্রার্থনা করা এদেশে একটি সাধারণ চিত্র। গ্রাম-গঞ্জের নানা জায়গায় এখনো ভাদ্রের শেষ বৃহস্পতিবার নদীতে কলার ভেলায় রঙিন কাগজের ঘর বানিয়ে প্রদীপ জ্বালিয়ে ভাসানো হয়। এই ‘ভেলা ভাসানো’ উৎসবে হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকে। সুন্দরবনের সঙ্গে জীবিকা জড়িয়ে আছে এমন মুসলমান বাওয়ালি, কাঠুরে বা জেলেরা বনের রক্ষাকর্ত্রী পীর কল্পনায় বনবিবি আর ব্যাঘ্র পীর গাজীর নাম জপ করে। অন্যদিকে হিন্দু বাওয়ালি, কাঠুরে ও জেলে একই অধিকর্ত্রী দেবী হিসেবে বনদুর্গা আর ব্যাঘ্র দেবতা হিসেবে দক্ষিণ রায়ের পূজা দেয়।

এসব বাস্তবতা এদেশের দীর্ঘকাল ধরে লালিত সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথাই প্রকাশ করছে। সমাজ ইতিহাস ও পুরাতত্ত্বের ছাত্র হিসেবে আমি আমার লেখায় বহুবার বলার চেষ্টা করেছি যে, ইতিহাস-ঐতিহ্যের বাস্তবতাই বলে দিচ্ছে এদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার অপচ্ছায়া খুব স্বচ্ছন্দে ডানা মেলতে পারবে না। এদেশের সাধারণ মানুষের মানসিক গড়ন সাম্প্রদায়িকতার ভেদবুদ্ধিকে সমর্থন করে না। তারপরও এ সত্য মানতে হবে যে, অন্ধকারের জীবÑ যারা ধর্মকে আধ্যাত্মিকতার গাম্ভীর্য আর সৌন্দর্যে না দেখে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়, তারা সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানোর চেষ্টা করে। আরেক দল অতটা বুঝে নয়, বরং সাংস্কৃতিক অনগ্রসরতা ও কূপম-ূকতার কারণে ধার্মিক না হয়ে ধর্মান্ধ হয়ে যায়। ধর্মচর্চার মধ্যদিয়ে ধর্মীয় বাণীর মর্মার্থ অনুধাবন না করে অনালোকিত এবং সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ধর্মনেতার বয়ান শুনে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দেয়। প্রথম শ্রেণির ধর্ম-বণিকদের চেনা যায়, ফলে এদের প্রতিহত করাও সম্ভব। কিন্তু অতি ধীরে হলেও দ্বিতীয় শ্রেণির সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন মানুষদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রমের চেষ্টা করতে হয় জানার জগৎ শাণিত করে।

আমি গবেষণার কাজে বেশ কিছুকাল কলকাতায় ছিলাম। লক্ষ করেছি, পশ্চিমবঙ্গের মানুষের ধর্ম, সমাজ ও সাহিত্যের খোঁজ আমরা যতটা রাখি ওপারের মানুষ আমাদের সম্পর্কে তেমনটা রাখতে পারে না। এর অনেক কারণ আছে। কলকাতায় কোনো বই বা জার্নাল প্রকাশিত হলে কলেজ স্ট্রিটের দোকানে আসার আগেই বাংলাদেশের বুক স্টলে চলে আসে। কালেভদ্রে বাংলাদেশের বইয়ের দেখা মেলে কলকাতার বইয়ের দোকানে। কলকাতার সব টিভি চ্যানেল আমাদের ড্রইং রুমে। আমাদের কোনো চ্যানেল দেখার সুযোগ নেই পশ্চিমবঙ্গে। আমার এক সংস্কৃতিকর্মী ছাত্র যথার্থই মন্তব্য করল সেদিন, রোজা আর ঈদ নিয়ে কলকাতার কোনো টিভি চ্যানেল তেমন কোনো অনুষ্ঠান করার প্রয়োজন মনে করে না। অথচ আমাদের প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া দুর্গাপূজার বোধন থেকে বিসর্জন পর্যন্ত খবরে ও অনুষ্ঠানে মাতিয়ে রাখে। অর্থাৎ, এদেশের মানুষ দুই সম্প্রদায়ের অধিকার অভিন্ন ভাবতে অভ্যস্ত বলেই আমাদের মধ্যে এই স্বতঃস্ফূর্ততা রয়েছে। মানবতাকে রক্ষা করার জন্য এই সামাজিক-সাংস্কৃতিক বোধকে বাঁচিয়ে রাখা জরুরি।

ঈদ আসন্ন। এবার করোনাকালে আমরা হয়তো তেমন স্বতঃস্ফূর্ত হতে পারব না। করোনামুক্ত পরিবেশ নিশ্চয়ই একদিন ফিরে পাব। আমরা আবার মুক্তধারায় উৎসবে মাতোয়ারা হব। আমরা মনে করি ঈদ শুধু মুসলমানের ধর্মীয় উৎসবই নয়। ঈদ-আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের শক্তি। একে ধারণ করে ঈদ উৎসবকে অর্থবহ করে তুলতে পারলে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ তার আপন সৌন্দর্য সমুন্নত রাখতে পারবে। দুর্যোগে আমরা নিশ্চয়ই সতর্ক থাকব। অন্তরে হলেও ঈদ উৎসব ম্লান হবে না। বরঞ্চ ঈদের মধ্যে জড়িয়ে থাকা মানবতার শক্তিকে ধারণ করে অপশক্তির বিরুদ্ধে যূথবদ্ধ হওয়া যাবে।

আমার বরাবরই মনে হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ ধরে রাখতে পারলে এদেশের ধর্ম-বণিক রাজনীতিকদের অপতৎপরতা আর জঙ্গিবাদ কখনো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে না। এ জন্য অনালোকিত জনগোষ্ঠীকে আলোতে আনতে হবে আবহমান বাঙালির অসাম্প্রদায়িক জীবনবোধ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিয়ে। ধর্মচর্চা এবং বাঙালির হাজার বছরের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে বিজ্ঞানমনস্কভাবে উপস্থাপন করতে হবে। আর এই ঐতিহ্যের সৌন্দর্য সাধারণ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে বিশেষ করে তথ্য মাধ্যমকে। আলোর প্রক্ষেপণই অন্ধকার দূরীভূত করে! আমরা ঈদ উৎসবটাকে অকারণে মাটি করে ফেলতে চাই না। তবে করোনা দুর্যোগকে আমলে রেখে সর্বাধিক সতর্কতার সাথে।

লেখক অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত