‘দামে কম মানে ভালো কাকলী ফার্নিচার’ মাত্র ছয় শব্দের এই বাক্য গত কিছুদিন বাংলাভাষীদের ফেইসবুক তথা ইন্টারনেট দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে। মোবাইল ক্যামেরায় অতি সস্তায় বানানো এক বিজ্ঞাপনে দেখা যায় দুটি বাচ্চা মেয়ে এই একই কথা টানা নয়বার রিপিট করে এবং পুরো ব্যাপারটা মারাত্মক বিরক্তির হলেও, সেটা রীতিমতো মাথায় গেঁথে যায়। ফেইসবুকে গত ৯ এপ্রিল ভিডিওটা পাবলিশ হলেও মে মাসের ১৫ তারিখের দিকে সেটা দুয়েকজন জনপ্রিয় ইউটিবারের চোখে পড়ে এবং তাদের কল্যাণে দ্রুত ভাইরাল হয়ে ওঠে। অনেকেই হাস্যরস করে বলেন, বাচ্চা দুটোর বিরক্তির একঘেয়ে সংলাপটা স্ট্যানলি কুবরিকের বিখ্যাত সিনেমা ‘দি শাইনিং’-এর ঘোস্ট টুইনের দৃশ্যের সঙ্গে মিল আছে কিংবা তারচেয়েও ভয়ংকর। ব্যস! হুড়মুড় করে ভিডিওটা শেয়ার হতে থাকে এবং ইন্টারনেটের ট্রেন্ড অনুসারে এই ভিডিওর সঙ্গে নানারকম টেক্সট, অন্যান্য ভিডিওর জোড়াতালি বা জুক্সটাপজেশন, নানারকম ঐতিহাসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ঘটনা ও ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মিলিয়ে হাজারে হাজারে কন্টেক্সট তৈরি হতে থাকে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অখ্যাত ভিডিওটা পশ্চিমবঙ্গেও ব্যাপক আলোড়ন ফেলে, এমনকি সেখানকার ইন্টারনেট জগৎ ছাপিয়ে সংবাদপত্র ও অন্যান্য মিডিয়াতেও সেটা আলোচনার জন্ম দেয়। চলতে থাকে মস্করা, খোঁচাখুঁচি।
তবে, এই যে অখ্যাত, রীতিমতো বিরক্তিকর, নেটিজেনদের ভাষায় চরম ‘ক্রিঞ্জ’ একটা জিনিস ম্যাস হিস্টেরিয়ার জন্ম দিল, ব্যাপারটা কেবলই হাসিঠাট্টার বিষয় নয়; এই বিষয়টা সমাজতাত্ত্বিক, নৃতাত্ত্বিক, রাজনৈতিকসহ হিউম্যান স্টাডিজের নানান শাস্ত্রে বিশদ আলোচনার দাবি রাখে। জনগণ ও সমাজের নানা ‘ট্রেন্ড’ আর ‘ইন্টারটেক্সট’ বুঝতে ইন্টারনেটের যুগে মিম পর্যালোচনা এবং ভাইরাল কন্টেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই যে ভিডিওটা ভাইরাসের মতো অতি দ্রুত সবদিকে ছড়িয়ে গেল, এই ব্যাপারটাকেই বলে ‘ভাইরাল’, আর এর থেকে যে হাজারে হাজারে নতুন কন্টেন্ট জন্ম নিচ্ছে সেগুলোকে বলে ‘মিম’। মিম শব্দটা এসেছে গ্রিক শব্দ ‘মিমেমা’ থেকে, যার অর্থ এমন কিছু যাকে অনুকরণ করা হয়। চার্লস ডারউইন এর সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে নাম দেন ‘জিন’। আর ডারউইনের বহুকাল পরে ১৯৭৬ সালে আরেক বিজ্ঞানী রিচার্ড ডকিন্স তার ‘সেলফিশ জিন’ বইয়ে প্রথম ‘মিম’ শব্দটার উল্লেখ করেন। এর মাধ্যেমে তিনি বলেন মিম হচ্ছে এমন একটি ধারণা, আচরণ, অথবা শৈলী যা অনুকরণের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ছড়িয়ে পড়াতে সামাজিক রীতিনীতি, পরিবেশ, ঐতিহ্য ইত্যাদি ভূমিকা রাখে। আর, যেসব মিম উপযুক্ত পরিবেশ পায় তারাই ছড়িয়ে পড়ে ও টিকে থাকে। অর্থাৎ, ডকিন্স জীবের যে সামাজিক বা সাংস্কৃতিক বিবর্তন হয় সেটির ব্যাখ্যা দিতে মিম শব্দটি ব্যবহার করেন। তবে, কয়েক দশক পরেই মিম বিষয়টা ইন্টারনেটের আচরণ বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান হয়ে ওঠে। কারণ ইন্টারনেট মিমের বিবর্তন, টিকে থাকা ও প্রসারের জন্য আদর্শ মাধ্যম।
ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যাক। ইন্টারনেট, বিশেষত ফেইসবুকের মতো মাধ্যমে একইসঙ্গে ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক। এখানে ব্যক্তি নিজেকে নানাভাবে প্রকাশ করার জন্য একটা একান্ত স্থান পান, যেটা তিনি নিজেই নিয়ন্ত্রণ করেন আবার একইসঙ্গে তিনি বাকি নেটিজেনদের সঙ্গেও যুক্ত হতে চান। একজন ব্যক্তি একইসঙ্গে নিজের সৃষ্টিশীলতা দেখাতে চান আবার চান গোটা নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকতে। যেমনটা সমাজবিজ্ঞানী রোজারিও কন্টে বলেন যে, ব্যক্তি কেবল তার সংস্কৃতির ধারক হয়েই থাকতে চান না, এতে তিনি সক্রিয় ভূমিকাও রাখতে চান। ‘মিমস ইন ডিজিটাল কালচার’ বইয়ের লেখিকা লিমোর শিফম্যান বলেন যে, ‘ইন্টারনেট মিমগুলোকে (উত্তর) আধুনিক যুগের লোকগাথা হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায়, যাতে ফটোশপ, ভিডিও এডিটিংসহ নানা বিষয়ের মাধ্যমে সমষ্টিগত বিশ্বাস, অবিশ্বাস, মূল্যবোধ ইত্যাদি ছড়িয়ে দেওয়া হয়।’ প্রথাগতভাবে কৌতুক, বাগধারা ইত্যাদির মাধ্যমে এই কাজটা করা হতো। লঘুভাবে বলার ফলে অন্তর্গত বার্তাটা সহজবোধ্যে হয়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘস্থায়ী হয়। নোয়াম চমস্কির ভাষায় আধুনিক যুগে মিডিয়ায় ‘কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচার’-এর জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে, তবে সেখানেও এই ধরনের লঘু কৌতুক, চটুল স্লোগান ইত্যাদি বড় ভূমিকা রাখে। সবসময় যে চটুল হতে হবে তাও না। যেমন ধরা যাক, ‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা’এই লাইনটার সঙ্গে আরও নানা বিষাদময় ব্যাপার যুক্ত হয়ে দমবন্ধ হওয়া শহুরে জীবন, অসহ্য হয়ে ওঠা সমাজ, সাম্প্রদায়িক হয়ে ওঠা মানসিকতা কিংবা নৈতিকতা বিবর্জিত ক্লেদাক্ত সমাজ থেকে মুক্তির আকুতি ফুটে ওঠে শহরের দেয়ালে দেয়ালে, পরিবহনের গায়ে কিংবা রাস্তার ফুটপাতে। আঁকা হয় কত-শত গ্রাফিতি। এগুলোকে ‘অফলাইন মিম’ বলা যেতেই পারে। মোদ্দা কথা, একই সঙ্গে ব্যক্তির প্রকাশ ও সমষ্টির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার যে বাসনা, এর ফলাফল হচ্ছে মিম। একটা বিষয় বোঝা জরুরি যে, কার্টুন আঁকা বা গান গাওয়ার চেয়ে মিম তৈরি করা সহজ। মিম তৈরি করতে সেই অর্থে স্কিল লাগে না। ফলে, মিম জিনিসটা একান্তই একটা ‘গণ’ ব্যাপার। ইন্টারনেট মিমের ক্ষেত্রে আরেকটা জরুরি ব্যাপার হচ্ছে ‘অ্যাটেনশন ইকোনমিকস’। ফেইসবুক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মে ‘লাইক’ পাওয়ার মতো ব্যাপারগুলো একটা পর্যায়ে আর্থিক লাভালাভেও রূপান্তর করে ফেলা সম্ভব। তবে, আর্থিক লাভালাভের ব্যাপারটা বাদ দিলেও নিজের আশপাশের বাকিদের চমকে দেওয়া, খুশি করা কিংবা সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে প্রশংসিত হওয়ার আকাক্সক্ষা মানুষের চিরন্তন। ফলে একে ‘অ্যাটেনশন সাইকোলজি’ বা ‘অ্যাটেনশন সোশ্যালজি’ দিয়েও ব্যাখ্যা করা সম্ভব।
সংক্ষেপে মিমের সংজ্ঞা ও বিকাশ আলোচনার পর দেখা যাক ভাইরাল হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারগুলো কী কী। মিম নিয়ে কাজ করা অ্যাকাডেমিকরা নানারকম উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ছয়টি শব্দকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করেন যে শব্দগুলোর আদ্যক্ষর ‘পি’। এগুলো হলো পার্টিসিপেশন, পজিটিভিটি, প্রভোকেশন, প্যাকেজিং, প্রেস্টিজ ও পজিশনিং। প্রথমত, পার্টিসিপেশন। লাখো লাখো মিম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, আমজনতার তৈরি করা কন্টেন্টগুলো, পরিকল্পনা করে, দামি সেট সাজিয়ে করা শ্যুটিং থেকে বেশিরকম সাড়া পায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ব্যাপারটা আসে ইন্টারনেটকে মূলত একটি কমিউনিটি বা পিআর কানেকশনের জায়গা হিসেবে বিবেচনা করার ফলে। এখনকার দিনে ভার্চুয়াল স্পেস প্রথাগত সামাজিকীকরণের স্থান নিয়ে নেওয়াই এর কারণ। আর ইন্টারনেট ব্যাপারটা সংজ্ঞানুসারে গ্লোবাল হলেও, এর মধ্যে অদ্ভুতভাবে এই আলাদা আলাদা কমিউনিটি বা বাবল তৈরি হয়। পজিটিভিটি বিষয়টার সঙ্গে হিউমার জুড়ে দেওয়া জরুরি। মানুষের জীবনে রসিকতা ও খেলাধুলা অত্যন্ত জরুরি। ক্রীড়া-নৃতত্ত্বের অন্যতম সেরা বই ‘হোমো লুডেনস’-এ জোহান হুইজিংগা বলেন যে, খেলা হচ্ছে একটি মুক্ত-প্রান্তীয় কার্যক্রম, যাতে মানুষ বাস্তব জগতের বাইরে এসে ‘সাময়িক এক জগতে নিজেকে আত্মীকরণ করে নেয়। হুইজিংগার এই আলাপ ইন্টারনেট জগৎ সম্বন্ধেও ভীষণভাবে খাটে। আর হাস্যরস থাকলে মিম জনপ্রিয় হয় এটা একেবারেই স্বতঃসিদ্ধ। কিন্তু, কেবল হাস্যরস থাকলেই হয় না, সহজবোধ্যতা আরেকটি জরুরি বিষয়। সেটাকে সহজেই পুনরাবৃত্তি করতে পারাও জরুরি। আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো বিষয়বস্তুটাকে উদ্ভট হতে হবে।
শুরুতে কাকলী ফার্নিচারের আলাপ দিয়ে শুরু করেছিলাম। এযাবৎকালে সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হওয়া ভিডিও ‘গ্যাংনাম স্টাইলের’ কথা মনে পড়ে? এর থেকে তৈরি হওয়া অসংখ্য মিম? এই ব্যাপারটাকে শিফম্যান বলেন ‘খারাপ’ টেক্সট ‘ভালো’ মিম উৎপাদন করে। অসম্পূর্ণ, নন্দনের অভাব, অপেশাদার দেখতে এবং উদ্ভট ভিডিওগুলো এক অর্থে মানুষকে আমন্ত্রণ দেয় একে পূর্ণ করার জন্য, আর এটা সুযোগ করে দেয় অরিজিনাল কন্টেন্টের নির্মাতাকে টিটকারি দেওয়ার। এই ‘অপূর্ণতাগুলো’ থাকে বলেই কন্টেন্টগুলো ‘আমজনতা’ নিজের মতো পূর্ণ করে নেন। তৈরি হয় ভাইরাল মিম। একইসঙ্গে নিজেকে প্রকাশ করার এবং অপরের চেয়ে উচ্চতর অবস্থানে রাখার যে চিরন্তন বাসনা মানুষের থাকে সেটারই প্রকাশ হয় মিমের সফলতায়। মিমের প্রকারভেদের অন্ত নেই, তবে একটা বিশেষ প্রকারের কথা না বললেই না। সেটি হচ্ছে ‘মিসহার্ড লিরিক’। অন্য ভাষার কোনো একটা গানকে আরেক ভাষায় ফোনেটিকের মতো উচ্চারণ করে উদ্ভট লিরিকের জন্ম দেওয়া হয়। একে অনেক সময় ‘বাফালাক্স’ বলা হয় কারণ এই নামের একজন ইউটিবার ২০০৭ সালে তামিল শিল্পী প্রভু দেবা এবং জয়া শীলের ‘কাল্লুরি ভানিল’কে ফোনেটিক্যালি ‘বেনি লাভা’ নামে সাবটাইটেল করেন। ‘মাই লুনি বান ইজ ফাইন, বেনি লাভা! হ্যাভ ইউ বিন হাই টুডে? আই সি দ্য নানস আর গে।’ এইরকম উদ্ভট সব বাক্যের জন্ম দেয়। বাংলাদেশেও বাটফ্লিক্স নামক ইউটিউবের এক চ্যানেলে ‘আবে ও শুন মিনা’ নামে দারুণ মজার এক ভিডিও পাওয়া যায় এক আরবি গানের ট্রানসলিটারেশনে। কদ্দিন আগে এক জর্জিয়ান গানের মিসহার্ড লিরিকে ‘হারা গালে ডালিম তার গালে’ নামে এক ভাইরাল ভিডিওর জন্ম হয়।
কিন্তু মিম কি আসলেই ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেওয়ার বস্তু? একদমই না। রুশ অ্যাকাডেমিক আনাসতাসিয়া দেনিসোভা তার ‘ইন্টারনেট মিমস অ্যান্ড সোসাইটি’ বইতে উল্লেখ করেন কীভাবে প্রবল পরাক্রমশালী ভ্লাদিমির পুতিনের শাসনামলে মিম হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অসন্তোষ ও প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। একই ব্যাপার চীনের বেলাতেও খাটে। এমনকি মার্কিন মুলুকেও। বলা হয় যে, অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট আন্দোলনে একটা বড় ভূমিকা ছিল মিমের। ‘উই আর নাইনটি নাইন পার্সেন্ট’ মন্ত্রে দীক্ষিতরা মিমে মিমে আন্দোলনের জনসংযোগ করেন। শুধু তাই না, ওদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যাওয়া হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট, কর্র্তৃত্ববাদীরাও ‘উই আর ফিফটি থ্রি পার্সেন্ট’ বলে পাল্টা মিমযুদ্ধ শুরু করে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে মাত করা, হাজারে হাজারে মিম পালটা মিম দেখা গেছে। মার্কিন নির্বাচনেও মিমের দারুণ ভূমিকা ছিল। সামনের দিনে মিমের গুরুত্ব আরও বাড়বে। বিশেষত যেসব জায়গায় বাকস্বাধীনতা সীমিত, সেখানে মিমের বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার আরও বাড়বে। একই সঙ্গে ক্রমশ মেরুকরণ হতে থাকা, লোকরঞ্জনবাদের দুনিয়ায়, শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা, ঘৃণাবাদীরাও মিমের ব্যবহার করবে। মিম তাই কেবলই ঠাট্টার বিষয় না, গভীর গবেষণারও বিষয়। মিম জিনিসটা দামে কম মানে ভালো।
লেখক সাংবাদিক ও অনুবাদক