আর্জেন্টিনার জয়ই দেখছি

আপডেট : ২২ জুন ২০২৬, ০৭:৩২ এএম

প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে যেভাবে খেলেছে আর্জেন্টিনা, তাতে এই ম্যাচের আগে আমাদের মতো সমর্থকদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। ফুটবল কখনোই কাগজে-কলমে হিসাব মেনে চলে না, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা বিবেচনা করলে আমি মনে করি অস্ট্রিয়া, আর্জেন্টিনার জন্য খুব কঠিন প্রতিপক্ষ নয়। বরং নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারলে আর্জেন্টিনাই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে। আর ফুটবলের বরপুত্র মেসি তো রয়েছেই।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা শুধু জেতেনি, তারা আধিপত্যও দেখিয়েছে। বল দখল, আক্রমণ তৈরি, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, সব জায়গাতেই তারা প্রতিপক্ষকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা, দলটিকে আত্মবিশ্বাসী দেখা গেছে। বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে আত্মবিশ্বাস অনেক বড় বিষয়। প্রথম ম্যাচে জয় পেলে খেলোয়াড়দের মধ্যে বাড়তি উদ্দীপনা কাজ করে, চাপ কমে যায় এবং পরের ম্যাচগুলোতে আরও স্বচ্ছন্দে খেলা যায়।

অস্ট্রিয়াও তাদের প্রথম ম্যাচে জয় পেয়েছে। তাই তাদের হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইউরোপের দলগুলো সাধারণত শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল খেলে। তারা রক্ষণে সংগঠিত থাকে এবং সুযোগ পেলেই দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠে। অস্ট্রিয়ার শক্তিও সম্ভবত সেখানেই। তবে আর্জেন্টিনার মতো সৃজনশীল এবং অভিজ্ঞ দলের বিরুদ্ধে শুধু রক্ষণাত্মক পরিকল্পনা দিয়ে সফল হওয়া কঠিন।

আমার মতে, এই ম্যাচের মূল পার্থক্য গড়ে দিতে পারে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠ। যখন একটি দল ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তখন প্রতিপক্ষকে নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হয় না। আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে অ্যালিস্টার, ফার্নান্দেজ, প্যালাসিওসের মতো এমন কয়েকজন খেলোয়াড় আছেন, যারা বলের দখল ধরে রাখতে পারেন, জায়গা তৈরি করতে পারেন এবং আক্রমণভাগে কার্যকর পাস দিতে পারেন। অস্ট্রিয়া যদি মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করতে না পারে, তাহলে তাদের জন্য ম্যাচটি কঠিন হয়ে যাবে।

তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবশ্যই থাকবেন লিওনেল মেসি। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা এই তারকা যখন মাঠে থাকেন, তখন সব হিসাব-নিকাশ নতুন করে করতে হয়। বয়স বেড়েছে, কিন্তু তার ফুটবল মেধা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং ম্যাচের গতিপথ বদলে দেওয়ার সামর্থ্য এখনো অসাধারণ। বড় ম্যাচে বড় খেলোয়াড়রা নিজেদের উপস্থিতি জানান দেন। মেসি সেই শ্রেণির ফুটবলার, যিনি এক মুহূর্তেই প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে দিতে পারেন।

এবারের বিশ্বকাপে ব্যক্তিগত অর্জনের দিক থেকেও মেসির সামনে বড় লক্ষ্য রয়েছে। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় থাকতে হলে তাকে নিয়মিত গোল করতে হবে। ফরোয়ার্ডদের জন্য গোলই সবচেয়ে বড় মুদ্রা। একজন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় যতই ভালো খেলুন না কেন, গোল না পেলে তার পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মেসিও নিশ্চয়ই জানেন, গোল করতে পারলে শুধু দলই উপকৃত হবে না, ব্যক্তিগতভাবেও তিনি এগিয়ে থাকবেন।

আমি মনে করি, অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও মেসির গোল পাওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্ট উজ্জ্বল। কারণ আর্জেন্টিনা এখন শুধু মেসিনির্ভর দল নয়। আগে দেখা যেত, প্রতিপক্ষের সব মনোযোগ থাকত মেসিকে ঘিরে। এখন পরিস্থিতি ভিন্ন। দলের অন্যান্য খেলোয়াড়ও আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। ফলে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে একাধিক দিক সামলাতে হচ্ছে। এর ফলে মেসি তুলনামূলক বেশি জায়গা পাচ্ছেন এবং সেটাই তার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ।

ফুটবলে একজন তারকার সাফল্যের পেছনে সতীর্থদের অবদান অনেক বড়। মেসির ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। একজন স্ট্রাইকার বা আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় গোল করবেন, কিন্তু তার জন্য বল সরবরাহ করতে হবে মাঝমাঠকে, উইং থেকে তৈরি করতে হবে সুযোগ, রক্ষণভাগকে সামলাতে হবে প্রতিপক্ষের আক্রমণ। আর্জেন্টিনার বর্তমান দলটিতে এই সমন্বয়টি বেশ ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে। তাই মেসির কাছ থেকে উজ্জ্বল পারফরম্যান্স আশা করা অযৌক্তিক নয়।

অস্ট্রিয়ার জার্মান কোচ রাফ র‌্যাংনিক নিশ্চয়ই জানেন, মেসিকে থামাতে না পারলে ম্যাচ জেতা কঠিন হবে। তাই তারা হয়তো ডাবল মার্কিং বা বিশেষ কৌশল ব্যবহার করবে। কিন্তু সমস্যা হলো, মেসির মতো খেলোয়াড়কে পুরো ৯০ মিনিট আটকে রাখা প্রায় অসম্ভব। তিনি কখনো নিচে নেমে বল নেন, কখনো ডান দিকে সরে যান, আবার কখনো হঠাৎ বক্সের সামনে উপস্থিত হন। এই চলাফেরা তাকে আলাদা করে তোলে।

তবে শুধু মেসির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। আর্জেন্টিনার অন্য ফরোয়ার্ডদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। যদি তারা প্রতিপক্ষের রক্ষণে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন, তাহলে মেসির জন্য আরও বেশি জায়গা তৈরি হবে। আধুনিক ফুটবলে দলগত পারফরম্যান্সই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একক নৈপুণ্য ম্যাচের ফল বদলাতে পারে, কিন্তু টুর্নামেন্ট জিততে হলে পুরো দলকে ভালো খেলতে হয়।

আমি আরও একটি বিষয় লক্ষ করেছি। আর্জেন্টিনা যখন এগিয়ে যায়, তখন তারা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে। এটি বড় দলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তারা শুধু গোল করে না, ম্যাচকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষেও যদি শুরুতেই গোল পেয়ে যায়, তাহলে তাদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যাবে এবং ম্যাচটি নিজেদের মতো করে খেলতে পারবে।

অস্ট্রিয়ার অবশ্য কিছু সুযোগ থাকবে। তারা শারীরিক শক্তি ও দ্রুতগতির ফুটবল খেলে থাকে। কর্নার, ফ্রি-কিক কিংবা পাল্টা আক্রমণ থেকে তারা বিপজ্জনক হতে পারে। তাই আর্জেন্টিনাকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে রক্ষণে কোনো ধরনের আত্মতুষ্টি দেখালে বিপদে পড়তে হতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত