সহজপাঠে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট

আপডেট : ১৭ জুন ২০২১, ১০:৩৯ পিএম

ক। শুরুর কথা

আগামী অর্থবছরের বাজেটটি নানাকারণে তুলনামূলকভাবে বেশি আলোচিত/সমালোচিত বলে মনে হতেই পারে। কারণ পরিপ্রেক্ষিত একটু ভিন্ন এবং করোনা মহামারীর বাস্তবতা প্রায় ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বেশ মুনশিয়ানার সঙ্গেই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীকালীন বাজেটটিকে অর্থনীতির শক্ত ভিত কাঠামোর ওপর ইতিবাচকভাবে দাঁড় করিয়েছেন। গেল পঞ্চাশ বছরে জাতির পিতার কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কৃতসংকল্প প্রদর্শিত পথপরিক্রমায় তার সাহসী ও উদ্ভাবনী নেতৃত্ব, বিশ^ময় প্রশংসিত জ্যেষ্ঠ সন্তান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক অর্জনগুলোর ওপর ভর করেই ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটটিকে ২ জুন তারিখে সংসদে উপস্থাপন করেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, এফসিএ এমপি।

১৯৭২ সালের তুলনায় ২০২১ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সামষ্টিক আয় বেড়েছে পঞ্চাশ গুণ; মাথাপিছু আয় (জিএনআই) বেড়েছে সাতাশ গুণ, গড় আয়ু বেড়েছে তেতাল্লিশ (মতান্তরে সাতচল্লিশ) থেকে তিয়াত্তর বছর। শিশুমৃত্যুর হার হাজারে প্রায় দুইশ থেকে হ্রাস পেয়ে এখন ত্রিশের নিচে। ১৯৭২-৭৩ সারে বাজেটের সাইজ বা পরিধি ছিল ছয়শ সাতাশি কোটি টাকা; আটশ ঊনআশি গুণ বেড়ে ২০২১-২২ বাজেটে হয়েছে ছয় লাখ তিন হাজার ছয়শ একাশি কোটি টাকা। এমনকি ২০০৮-০৯ অর্থবছরের তুলনায় আগামী বাজেট হবে ছয় গুণেরও বেশি বড়। সাম্প্রতিককালে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবিসহ বিভিন্ন সূত্রে বাংলাদেশের অর্থনীতির যে প্রবৃদ্ধির হিসাব এসেছে তার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২১-২২ বাজেটের ৭.২ ভাগ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি এবং শতকরা ৫.২ ভাগ মূল্যস্ফীতি আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যই মনে হতে পারে। করোনাকালেও ২০১৯-২০ অর্থবছরের রেমিটেন্স আয়ের বিপুল প্রবৃদ্ধি (কারণ সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে) এবং রপ্তানি আয়ের ঊর্ধ্বগতিসহ সব বিবেচনায়ই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতাই বিরাজিত। সুখের কথা বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রসারণশীল মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে।

১৯৭২ সালে অনুন্নত ফাল্যান্ড-পারকিনসন ‘টেস্ট কেইস’ (অর্থনীতির উন্নয়ন আদৌ হলেও তাতে ২০০ বছর লাগবে) এবং ‘মিসকিন’ বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালে জাতির পিতার চেষ্টায় স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কতিপয় সুবিধা লাভ করে। সাম্প্রতিক অগ্রগতির ধারার পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ উন্নয়ন পলিসি কমিটি (ইউএনসিডিপি) ২০১৮ সালে তিনটি পরীক্ষায় তথা মাথাপিছু জিএনআই, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে একসঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদার সোপানে প্রবেশ করেছে। বর্তমান বছরের মার্চে সেই ফলাফল নিশ্চিত করেছে কমিটি এবং ২০২৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ স্থায়ীভাবে উন্নয়নশীল দেশের আসন পাবে। মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস (এমডিজি) ২০০১-১৫ এর সফল বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যসমূহ (এসডিজি) ২০১৬-২০৩০ বাস্তবায়নে শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও সমতায়নে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের নিরীক্ষা সূচকে গত তিন বছরের স্কোরে বাংলাদেশ ৪৭ থেকে ৬৫-তে নেমে গেলেও এক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষ দেশ। তবে প্রবৃদ্ধিতে সমতা প্রবণতা না থাকলে উন্নয়ন টেকসই হবে না।

খ। বহু প্রশংসার কতিপয় নমুনা

অর্থমন্ত্রীর ভাষায়, ‘শতভাগ ব্যবসাবান্ধব’ ২০২১-২২ বছরের বাজেট শুধু যে সবকটি চেম্বার থেকে ভূয়সী প্রশংসা কুড়িয়েছে তাই নয়, অনেক অর্থনীতিবিদ (ড. জাঈদী সাত্তার : বাজেট এফওয়াই ২২ : এ ভিউ ফ্রম অ্যানাদার লেন্স, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, জুন ০৮, ২০২১), ড. মহিউদ্দিন আলমগীর, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও  ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্স এবং ড. আতিউর রহমান, সাবেক গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংক প্রমুখ বাজেটটিকে ইতিবাচক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

বাজেট : জিডিপি অনুপাতে ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরের শতকরা ১৫.৫ ভাগের তুলনায় ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে শতকরা ১৭.৫ হয়েছে বটে; এখনো প্রমিত সাইজ ২০% এর কম তবে বিনিয়োগ জিডিপিতে ৩৩.১% এর মধ্যে বেসরকারি খাতের অনুমিত শতকরা ২৫ ভাগ অর্জিত হলে খুবই ইতিবাচক অর্জন হবে বলে আমিও মনে করি। দেশের সমৃদ্ধি অর্জনে করপোরেট ব্যক্তি খাত থেকে বরাবরের মতো বলিষ্ঠ অবদান রেখেছে বলে এমসিসিআই সভাপতি নিহাদ কবির, বার এট ল’ এবং এফবিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ জসিমউদ্দিন (সিডিপি ওয়েবিনার, ১২/০৬/২১) জোরদার দাবি জানিয়েছেন। তবে রাজস্ব আদায়ে বিশে^র তলানিতে থাকা বাংলাদেশ তার করপোরেট কর হার কমানোর সাধুবাদের সঙ্গে সঙ্গে সুবিধা জাল আরও বাড়ানোর জন্য অগ্রিম আয়কর রেয়াত ও ব্যাপকতর কর হ্রাসের দাবি জানিয়েছেন তারা। তবে করনীতি ও বাস্তবায়নকে আলাদা করার প্রস্তাব সমর্থনযোগ্য। এ বিষয়ে সমসাময়িককালে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কাতারে যাওয়ার বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত হয়েও রাজস্ব ঘাটতির এই সর্বনাশা করোনাবিদ্ধ সময়টির করপোরেট কর হার হ্রাসের উপযুক্ততা সম্পর্কে সন্দেহ করা যেতেই পারে। তবে মূসকের হার কমানো; ২০১২ সাল থেকে নতুন আইনটির বাস্তবায়ন ব্যর্থতা, মূসক আদায় না হওয়া এবং শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে আদায়কৃত মূসক সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জরিমানা হ্রাস সুফল দেবে কি! সেই ২০১৭-১৮ থেকে বাজেট বক্তৃতায় ইফডি/এসডিসি সংকল্প ঘোষিত হলেও বর্তমান গতিতে এতে আরও এক দশক সময় লেগে যেতে পারে।

বিদগ্ধ অর্থনীতিবিদ শ্রী বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে ২৩ মে তারিখে অনুষ্ঠিত ওয়েবিনারে অর্থনীতির গুরু প্রফেসর রেহমান সোবহান বলেন যে, করোনার অভিঘাতে ল-ভ- হয়ে যাওয়া ক্ষতির চেয়েও অর্থনীতি এবং ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা এবং অনাচার অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। শিরোমণি অর্থনীতিবিদ ‘উন্নয়ন বাংলাদেশ বিস্ময়’-এর ব্যাখ্যাদানকারী প্রফেসর ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ মনে করিয়ে দেন যে, সংস্কার তেতো হলেও এখনই তা শুরু করার উপযুক্ত সময়। বরাবরের মতোই গোছানো বক্তব্যে সিপিডি ১২/০৬/২১ তারিখের ওয়েবিনারে বাজেট ২০২১-২২ বাস্তবায়নে বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ে আরও পিছিয়ে পড়া সময়ে, দুর্লঙ্ঘ বাধার প্রাচীরগুলোর উল্লেখ করেন। প্রতিশ্রুতিশীল কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র (এসএমই) বিষয়ক জোরদার প্রবক্তা জনাব শোভনের সঙ্গে অনেকেই একমত হয়ে বাজেটে এ বিষয়ে তেমন কোনো বাড়তি নজর না থাকায় হতাশা প্রকাশ করেন। স্মর্তব্য যে, যখনই শক্তিহীন ‘ছোট’কে শক্তিমান ‘মাঝারি’র সঙ্গে সংযুক্ত করে দেওয়া হবে তখনই এ ক্ষেত্রের সুবিধাগুলো ‘মাঝারি’ গ্রাস করে ফেলবে। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে (প্যারা ১৪৩, পৃষ্ঠা ৮১) এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের (প্যারা ১৪৩ ইংরেজি সংস্করণ) ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে একসঙ্গে নিয়ে আসা এবং ব্যাংকিং খাতের সৎমাসুলভ আচরণ বিরাজমান। সরকার প্রধান কর্র্তৃক এপ্রিল ২০২০ তারিখ থেকে অসম সাহস ও দরদে ঘোষিত ১২,৬০০০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজে স্থান পেলেও বাস্তবায়নকালে কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র অনেকটাই বঞ্চিত হয়েছে। বর্তমানে এ উপখাতে শতকরা ৩৫ ভাগ কর্মসংস্থান হচ্ছে; যথোপযুক্ত কৌশলী পরিকল্পনা, কাঠামোতে সংস্কার এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় বিপুল ভর্তুকি সুদে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল নিয়োজনে এ খাতের আনুমানিক ২৫ লাখ উদ্যোক্তাকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনা হলে কর্মসংস্থান, আয়-রোজগার বৃদ্ধি, আয়-সম্পদ-সুযোগ বৈষম্য হ্রাস ও দারিদ্র্য নিরসনে বিপুলভাবে ক্রমাগত পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র কিষান-কিষানী, শ্রমজীবী, অসংখ্য ক্ষুদে চা বিক্রেতা, ছোট দোকানদার, রিকশা ও ভ্যানচালক, গৃহকর্ম সহায়তাকারী, দিনমজুর ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরতদের কল্যাণরাষ্ট্রের বিশাল হৃদয়ের লম্বা হাতে রাষ্ট্রীয় আর্থিক আনুকূল্যে আনা জরুরি। বিদেশ থেকে কর্মচ্যুত প্রত্যাবর্তনকারী, নীরবে হলেও তৈরি পোশাক খাত ও অন্যান্য শিল্পে কর্মচ্যুত এবং ভাসমান নিম্নবিত্ত ও বিত্তহীনদের জন্য রাষ্ট্র ও করপোরেট চাকরিদাতাদের যৌথ অর্থায়নে স্বাস্থ্যবীমা ও বেকারকালীন ভাতার প্রচলন এবং সততা ও স্বচ্ছতায় তার বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। অনুরূপভাবেই পরীক্ষামূলকভাবে এখন একটি-দুটি উপজেলায় নয়, বিশেষ করে বোরো প্রধান নিচু জেলাগুলোতে সরকারি অর্থানুকূল্যে সিংহভাগ কিস্তি পরিশোধ করে শস্যবীমা প্রচলনের জোরদার সুপারিশের পুনারাবৃত্তি করা হলো। মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু খাদ্য কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ হয়। এরা এখন আরও তৎপর এবং চাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ ইত্যাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে একদিকে উৎপাদনকারীকে ঠকানো আর অন্যদিকে ক্রেতাদের পকেট কাটার দৌরাত্ম্য থেকে মুক্তির পথনির্দেশ বাজেট ২০২১-২২ এ নেই। নীতি-কৌশল ও বাস্তবায়নের পথে টিসিবির মতো রাষ্ট্রীয় খাত, বাজার তদারকি, সমবায় গঠন ও ছোট ছোট কোম্পানি গঠন করে এ সমস্যার সমাধানের উপায় খুঁজতে হবে।

গ। আরও সমালোচনা

বিকল্প বাজেট প্রস্তাবক সাহসী ও জনদরদি অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত প্রস্তাবিত সতেরো লাখ টাকার বাজেটে বহু জনহিতকর ব্যবস্থা সুপারিশ করেছেন এবং বিপুলভাবে করজাল বিস্তারের সুপারিশ করেছেন।

অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় সম্পর্কে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। ক্রমবর্ধমান আয়-সম্পদ-সুযোগ বৈষম্য নিরসনে প্রশংসনীয়ভাবে শেখ হাসিনা সরকার ২০০৯ সালে যে সামাজিক সুরক্ষা বলয় সৃষ্টি করেছিলেন তা ২০২০-২১ অর্থবছরের তুলনায় প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় বারো হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়ে ১,০৫,৭৬৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। অনেকেই সুপারিশ করেছেন, এখানে পেনশন ধরনের সামাজিক বেষ্টনী থেকে অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা আলাদা করা এবং সেই অংশের বরাদ্দ আরও বিপুলভাবে বৃদ্ধি করার। পঁয়ষট্টি বছর ঊর্ধ্ব নাগরিকদের জন্য একটি শনাক্তকরণ কার্ড ইস্যু করে অর্ধেক মূল্যে যাতায়াত, বীমা ও স্বাস্থ্য সুবিধা দেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। সর্বজনীন বীমাক্ষেত্রের পাইলটের ইতিবাচক ফলাফলগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া এই করোনাকালে অতি জরুরি।

ঘ। পরিশেষ

সরকার মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ও এজেন্ট মাধ্যমে অর্থনৈতিক লেনদেনকে মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিং হিসেবে স্বীকৃতি (বাজেট ২০২১-২২ প্যারা ২১০, পৃষ্ঠা ১১২) দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ দুটো খাতকে ক্রমাগতভাবেই ব্যাংকের মর্যাদা দিয়ে যাচ্ছে (দ্য মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডস মে ২০২১ পৃষ্ঠা রোমান দশ)। এসব খাতে জালিয়াতি, জোচ্চুরি ও লুটপাটের খবর হামেশা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। এরা বিপুল অর্থব্যয়ে চটকদার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। মনিটরিং জোরদার করে এসব কর্মকা-কে সিরাতুল মুসতাকিমে এনে তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া যেতেই পারে। কিন্তু এগুলো যদি ব্যাংকিং হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করা হয়, তাহলে নিয়মিত ব্যাংকিং সেবা মহা অশনি সংকটে পড়বে।

নৈতিকতার নিরিখে অচল কালোটাকাকে নিয়মিত করদাতাদের তুলনায় কম কর হারে অর্থনীতির মূল ধারায় আনার বিষয়টির আরও বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন। জিডিপির শতকরা চল্লিশ ভাগ (হিসাবান্তরে আশি ভাগ) যদি অপ্রদর্শিত ও কালো টাকা হয়, তাহলে ২০২০-২১ অর্থবছরের এ উদ্যোগের ফলাফল একেবারেই অকিঞ্চিৎকর। তবে যদি মুদ্রা পাচার বন্ধ করা যায় (সম্ভব এবং উচিত), আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিং, রপ্তানিতে আন্ডার ইনভয়েসিং রোধ করা যায় এবং বৈদেশিক মুদ্রানীতিকে আরও উদার করে যৌথ নাগরিকত্বে অথবা বিদেশি নাগরিকত্বের বাংলাদেশিদের দেশীয় সম্পদ বৈধভাবে বিদেশে নিতে দেওয়া হয় তাহলে সুফল আসতে পারে।

করজাল বিস্তারে এফবিসিসিআই, এমসিসিআই, আইসিসিআই, ডিসিসিসহ ব্যক্তি খাতের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। জনমিতিক লভ্যাংশ ছাড়াও অন্যান্য সুবিধা অর্জনে কুদরত-ই খুদা কমিশন কর্তৃক সুপারিশকৃত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত মাতৃভাষায় একমুখী শিক্ষায় ইংরেজি মিডিয়াম ও কওমি মাদ্রাসাসহ সব বিদ্যার্থীকে একটি ন্যূনতম বাধ্যতামূলক সিলেবাসে পড়াতে হবে। অতঃপর পাঁচ কোটি ১৫-৩০ বছর বয়সীদের বৃত্তিমূলক শিক্ষায় ক্ষমতায়ন করার সুপারিশ পুনরায় ব্যক্ত করছি। জনমিতিক লভ্যাংশের সময়কাল ২০৩০ সালেই শেষ হয়ে যাবে।

করোনার অভিঘাতে আর্থিক সামর্থ্য, ডিজিটাল ক্ষমতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রের বৈষম্য উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বাজেট বাস্তবায়নের হার শতকরা সত্তর ভাগ এবং প্রবণতা নিম্নমুখী। সরকারপ্রধানের আস্থায় রয়েছেন এমনজনদের সমন্বয়ে একটি সংস্কার কমিশন অথবা উপদষ্টামন্ডলী নিয়োগ করা যেতে পারে। এতে মন্ত্রী বা তেমন পদমর্যাদার বর্তমান ও অতীতের বিশিষ্টজনের নাম বিবেচনা করা যেতে পারে। স্বাস্থ্য খাতে সমালোচনা প্রতিক্রিয়ার বৃত্ত থেকে বের হয়ে তিনটি কোম্পানিকে টিকা বানানোর প্রক্রিয়া শুরু করতে দেওয়া একটি বিশাল ইতিবাচক পদক্ষেপ।

লেখক শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত