কিমাশ্চর্য! কিম কিম! ঋণ করার এমন বিজ্ঞাপনী মোহন বাণীর জন্ম হয়েছিল এই ভারতে সেই আদি যুগেরও অনাদিকালে! জান ভরে ঘি খেয়ে যান, যাবজ্জীবন সুখে কাটান; লাগলে ধার-কর্জ নিন নিঃসংকোচে। “ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ/যাবৎ জীবেৎ সুখং জীবেৎ।” নাস্তিকপন্থি চার্বাক দর্শনের এ-কথাটাই এখনকার অতীব আস্তিক সভ্য (!) যুগের ভোগবাদী বিশ্বে জীবনাদর্শ হয়ে উঠেছে। করপোরেটওয়ালারা নিত্যনতুন ভোগের পণ্য হাজির করছে চারপাশে, আর ভোগ নগদায়নে ঋণ-সুবিধার হাতছানি দিয়ে ভোগের লালসা বাড়িয়ে চলেছে। নতুন করে জানতে পারলাম এই বুড়ো বয়সে (হতে চাইনি, বানিয়ে দিয়েছে এজি অফিস আমার পেনশন-বহিতে অবসরের কারণ ‘বার্ধক্য জনিত’ লিখে!), খোদ ঋণই নাকি প্রডাক্ট, অ্যাসেট তাদের কাছে।
কোনো বেলই অভোগ্য অভক্ষ্য থাকবে না আপনার, যদি কিনা দাঁতে আর চোয়ালে জোর থাকে! অর্থাৎ কিনা, ঋণপ্রাপ্তির সক্ষমতাটা থাকে। অর্থাভাব নয়, পরিশোধ না করার স্বভাবটাই ঋণপ্রাপ্তির সক্ষমতা এখন এদেশে। ঋণ নিয়ে একবার হজম করতে পারলেই অক্টোপাসের মতো নল গজাবে চতুর্দিকে, ঋণ পাওয়ার এবং গ্রাস করবার সক্ষমতা বাড়তে থাকবে গ্রহীতার। আর, তার কাছে আদায়ের অক্ষমতা বাড়তে থাকবে ঋণদাতার। ‘যাবৎ জীবেৎ ঋণং কৃত্বা, ঘৃতং পিবেৎ’ চলে এসব ঋণ-গ্রহীতার। আবার, মওকামতো প্রণোদনার বায়না ধরে সেটাও নগদায়ন করে ছাড়ে। ঋণের সাগরে সুখের পাল তুলে গুষ্টিসুদ্ধ পগার পার তাদের। তাদের বেলায় প্রাচীন ভারতের মৌর্য সাম্রাজ্যের উপদেষ্টা কৌটিল্য ওরফে চাণক্য পণ্ডিত (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩) ঘোরতর আস্তিকের “ঋণকর্তা পিতা শত্রুর্মাতা চ ব্যভিচারিণী। ভার্যা রূপবতী শত্রুঃ পুত্রঃ শত্রুর্পণ্ডিতঃ।” (সংসারে চার শত্রু ঋণী পিতা, অসতি মাতা, অতি সুন্দরী স্ত্রী, আর মূর্খ-নির্বোধ পুত্র।) বাণী একেবারেই মিছে।
তাদের মতন স্বভাব সক্ষমতা ছাড়া নিতান্ত অভাবে ‘ঋণং কৃত্বা’ ধরলে আর ‘ঘৃতং পিবেৎ’ হবে না, কিস্তির ঘানি টানতে ঘর্ম ছুটে কর্ম কাবার হবে। ‘যাবৎ জীবেৎ’ টের পাবেন চার্বাক দর্শনের মজা আর চাণক্য বাণীর মাজেজা! ব্যাসদেব তো সাধে বলেননি, “জগতে দুটি লোক নরাধমযে পয়সা না থাকলেও কামনা করে, আর যার কর্র্তৃত্ব নেই তবু রাগ করে।” এই দুই কিসিমেরই লোক আমি নিজে। কর্র্তৃত্ব ছিল না কোনো কালেই কিন্তু, রাগে চাঁদি টনটন বরাবরই। ঝাড়ার নিরাপদ পাত্র না পেয়ে তাই চিরকেলে মাইগ্রেন-রোগী। ভোগের কামনা বাসনাও ছিল কিছু, নগদায়ন যাতনায় ভুগি।
সহকারী জজ হিসেবে চাকরির প্রথম দিকে বিব্রতকর অবস্থা গেছে দু-রকমের। ১৯৮৮-তে আমাদের ঢোকার মাত্র এক বছর আগে ‘মুন্সেফ’ বদলিয়ে এই নতুন নামকরণ হয়। পুরাতন পদের নতুন নাম তখনো অপরিচিত বেশির ভাগ মানুষের কাছেই। সহকারী জজ শুনে অনেকে ভাব দেখান আমি বুঝি-বা জজের কোনো সহকারী। আবার, দু-চারজনে প্রশ্ন ছুড়তেন, “তা বাবা, কয়টা ফাঁসি দিলে!” কারও কারও এ-কথায় নিছক অজ্ঞতাপ্রসূত কৌতূহলের বদলে বিজ্ঞজনের সচেতন উপহাসের হুল থাকলেও থাকতে পারে! আমাদের কিন্তু ফাঁসি লাগানো কলমটা পেতে চলে যায় বিশটা বছর। এদেশের লোক ম্যাজিস্ট্রেট চেনেন বরাবরই হাড়ে হাড়ে! সেকালে মুন্সেফও ছিল চেনা-জানার মধ্যে। সরকারি অন্যসব বিভাগের সঙ্গে তাল মেলাতে ‘মুন্সেফ’ পাল্টিয়ে ‘সহকারী জজ’ করায় কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের মতো বেকার অবস্থা ছাড়া বিচার বিভাগে কোনো মোক্ষ নগদায়ন হয়েছে তার গবেষণাকর্ম এ-গবেটের সাধ্য নয়, করবেন নগদায়নকারী কেউ থাকলে।
সেকালে জেলা-মহকুমা শহরে, দু-চারটি চৌকি (থানা) এলাকায়ও অফিস-সময়ের শুরু ও শেষে মাথায় টিনের ছোট বাক্সওয়ালা একজনের আগে আগে নিজে নিজের মাথায় ছাতা ধরে হেঁটে হেঁটে আসতে যেতে হররোজ দেখা যেত যে ভদ্রলোকটিকে তার মুখটি না দেখেই সবাই নিশ্চিত জানতেন তিনি মুন্সেফ, আর পেছনে তার আর্দালির মাথার বাক্সে মামলার নথিপত্র। সেই অবস্থা নিয়েই আমাদের জজিয়তি শুরু উপজেলায়। উপজেলা পরিষদের জিপটি ছিল চেয়ারম্যান আর ইউএনও সাহেবদের সেবায়। বাকি অফিসারদের অনেকের সরকারি, কারও-বা নিজস্ব মোটরসাইকেল। সহকারী জজের তখনো ছিল সেই মুন্সেফি শ্রীচরণ ভরসা। এই ১৯৭৮ সালের আগেও সরকারি মোটরগাড়ি নগদায়ন হয়নি জেলা জজদেরও, কোর্ট-বাসা করার ‘চড়নসেবা’ নগদায়ন করতেন ডিসি পুলের গাড়ির দয়াতে। সর্বপ্রথম ১৯৭৮-এ বিভাগীয় ৪টি জেলাসহ ৫টি জেলার জেলা জজরা সরকারি মোটরগাড়ি পান বিশেষ বিবেচনায়। ১৯৮২-তে সার্বক্ষণিক মোটরগাড়ির প্রাধিকার তালিকায় জেলা জজদের ঠাঁই হয় এনাম কমিটির রিপোর্টের জোরে, সব জেলা জজের সরকারি মোটরগাড়ি জুটল প্রথমবারের মতো। সেটাই ছিল বিচার বিভাগের ‘সবেধন মোটরগাড়ি’। তবে গাড়ি যেটা দেওয়া হতো তার চেয়ে হালকা-পলকা ছোট সাইজ আর কারও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। সেটাতে অন্য জজদের প্রাধিকার বিশেষ ছিল না।
সেই আশির দশকেই অন্যসব জজদের কোর্ট-বাসা করার দুঃখ ঘোচে প্রথমে ঢাকা আর চট্টগ্রামে, বিশেষ বিবেচনায় মাইক্রোবাস এসেছিল জেলা জজ আদালত দুটিতে। উপজেলা থেকে আদালত সদরে উঠিয়ে আনা হয় ১৯৯২-৯৩ সালে। তারপরে ১৯৯৪ সালে সদাশয় সরকার বাকি জেলাগুলোর অন্যসব জজদের কোর্ট-বাসা করার দুঃখ ঘোচাতে একটি করে মাইক্রোবাস দেওয়া শুরু করে ধাপে ধাপে; বিভাগীয় জেলার পরে পুরাতন জেলা, তারপরে নতুন জেলা, সেটা আবার উপজেলার সংখ্যাধিক্যের মাপে। সেইসব ধাপের মাপে আদালতে মাইক্রোবাসের প্রথম দেখা পাই ১৯৯৭-এ বদলির পদায়নে সাতক্ষীরায় এসে। ১৪-১৫ সিটের মাইক্রোবাস কিন্তু, ‘চড়নসেবা’টা নগদায়ন করা যায়নি। জেলা জজের কাছে দরবার নিয়ে গিয়ে জানলাম আমার বাসার রাস্তায় মাইক্রোবাসটা ঘুরানো যায় না বলে ড্রাইভারের সরেজমিন পরিদর্শন রিপোর্টে আমার নগদায়ন আটকে গেছে। সেই বাসায় আমার মালামাল নামিয়ে ট্রাকটা কিন্তু ঘুরে চলে গেছে। সংসারে কিছু ‘ঘৃতং পিবেৎ’ নগদায়ন করার পয়সা বাঁচাতে সরকারি কোয়ার্টারে বাসা না নিয়ে ভাড়া নিয়েছিলাম বেসরকারিতে। অতিরিক্ত জেলা জজসহ কয়েকজন জজও এই ‘ঘৃতং পিবেৎ’ নিয়তে থাকতেন বেসরকারিতে, তবে মাইক্রোবাসে তাদের ‘চড়নসেবা’ নগদায়নে বাগড়া পড়েনি ড্রাইভারের সরেজমিন পরিদর্শন রিপোর্টে। ড্রাইভার জেলা জজের, নাচার আমি সিনিয়র সহকারী জজ!
তখন বেসরকারি দুয়েকটি ব্যাংক মোটরগাড়ি, মোটরবাইক কেনায় ঋণসুবিধার প্রডাক্ট ছেড়েছে। একদিকে জেলা জজের ড্রাইভারের রিপোর্ট-কাঁটা, আরেকদিকে ব্যাংকের এই ‘ঋণং কৃত্বা’ প্রডাক্টে একেবারে নগদায়নের হাতছানি! অঙ্ক কষে দেখলাম, সরকারি কোয়ার্টারে থাকলে বাড়িভাড়া ভাতার পুরো টাকাই সরকার কেটে নিত, তার চেয়ে কমই কাটে বেসরকারি। বাড়িভাড়া ভাতার যে টাকাটা বাঁচে তার সঙ্গে সংসারের অন্যদিকের কিছু ‘ঘৃতং পিবেৎ’ কমিয়ে জোড়া দিলে অন্তত মোটরবাইকের ‘ঋণং কৃত্বা’র কিস্তি টানা যায় কষ্টেসৃষ্টে। তাহলে নাস্তিক্য চার্বাক দর্শনই সই! আস্তিকতা রক্ষা হলো ইসলামী ব্যাংকে। আমার আবার বাই উঠল ভেসপার। ঢাকে বাড়ি দিয়ে আমার সেরেস্তা সহকারী জানাল ভেসপা ভালো পাওয়া যায় সাতক্ষীরার চেয়ে খুলনায়। গেলাম তাকে নিয়ে খুলনায়। দোকান ঘুরে মনে ধরল রুপালি (সিলভার) রঙের একখানা পিয়াজিও ভেসপা, ইতালিয়ান পিয়াজিও (চরধমমরড়) কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ভারতীয় এলএমএল (লোহিও মেশিনারি লিমিটেড) মোটরস্-এর তৈরি। ছাপান্ন হাজার টাকার চার ভাগের এক ভাগে চৌদ্দ হাজার টাকা ডাউন পেমেন্ট নিজ গাঁটের আর দু-বছরের মাসিক কিস্তিতে বাকি টাকা ইসলামী ব্যাংক থেকে নিয়ে কিনে আনি সেই ভেসপা ব্যাংকে বন্ধক রেখে।
ঋণের ভেসপায় ‘চড়নসেবা’ নগদায়ন হলো বটে। কিস্তি টানতে ঘর্ম ছুটে নাভিশ্বাস ওঠে। আমারও ‘ঋণং কৃত্বা’ হলো আর বাজারওয়ালারা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম দিল চড়িয়ে। সংসারের কোনো ঘৃতং আর কমানো যায়! নাজিরের ক্যাশে ধার ধেরেও মাসের তিরিশটা দিন ফুরায় না! নাস্তিক্য চার্বাক দর্শনের ভোগ মজা টের পেয়েছিলাম ভুগে ভুগে। চাণক্য বাণীই স্মরণ হলো অবশেষে যখন ছুটির দিনে নাজিরের ক্যাশের নাগাল না পেয়ে মেয়ের মাটির ব্যাংক ভেঙে খুচরো পয়সা গুনে একশ টাকাও না মেলে। পরের বছর ১৯৯৮-এ চাকরির দশ বছর পূর্তিতে সিলেকশন গ্রেডটা পেয়ে শেষ বছরের কিস্তি শোধ করে হাঁফ ছেড়ে বাঁচি। সেই ভেসপার গরমে সরকারি মাইক্রোবাসের ‘চড়নসেবা’ নগদায়ন করিনি আরও কয়েকটা জেলায়। (শেষ অংশ আগামী কিস্তিতে)
লেখক প্রবন্ধকার ও আইনগ্রন্থকার, অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক