সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আত্মহত্যা করছে। বাংলাদেশে ইনস্টিটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদপত্রে আমরা প্রায় সময়ই বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হতে দেখেছি। ‘মরার দেশে’ এরকম কয়েকজন শ্রমিকের, তাও নারী শ্রমিক, মৃত্যুর সংবাদ আমাদের চোখে খুব একটা ধরা পড়ে না। এদেশে কতভাবেই তো মানুষ মরছে। সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মারা যাচ্ছে মানুষ। সন্ত্রাসীর গুলিতে মারা যায়। ম্যানহোলের গর্তে কিংবা নালা-নর্দমায় পা-পিছলে পড়ে ‘নাই’ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে ইদানীং। করোনায় মারা যাচ্ছে। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। বিনা-চিকিৎসায় কিংবা ভুল চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে। রোগে-শোকে, পানিতে ডুবে, সাপের কাপড়ে, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব সংঘাতে, কিংবা বিভিন্ন অপরাধের সূত্র ধরে নানানভাবে মানুষের মৃত্যু ঘটে। পত্রিকার কোণে পড়ে থাকা দুয়েকটা মৃত্যুর সংবাদ, তাও বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের মৃত্যু, আমাদের মধ্যবিত্ত সংবেদনশীলতায় খুব একটা পাত্তা পায় না। সমাজের উচ্চবিত্তের কাছে সাধারণভাবে নজরযোগ্য ইস্যু হিসেবে মানুষের মৃত্যু খুব একটা জায়গা পায় না বলে আমার ধারণা। আর নিম্নবিত্ত তো নিজেই সংবাদের ‘আইটেম’। যখন-তখন যেখানে-সেখানে ‘নাই’ হয়ে যেতে পারে। ফলে, মধ্যবিত্তের এখনো বিদ্যমান সমাজ-মনস্কতা ও সংবেদনশীলতার কারণেই এসব নিম্নবর্গের মৃত্যু সংবাদও দৃষ্টির অগোচরে থাকে না। কেননা, সমাজের বিদ্যমান হা-হুতাশের উৎপাদন এবং পুনরুৎপাদন ঘটে সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংবেদনশীলতার সূত্র ধরেই। তাই, বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের আত্মহত্যার প্রবণতা নতুন করে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। তাই প্রশ্ন জাগে। গবেষণা হয়। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়। কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা কমে না। বরং দিন দিন সংখ্যার পরিবৃদ্ধি ঘটে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে বিদেশফেরত নারী শ্রমিকরা কেন আত্মহত্যা করছে?
সেপ্টেম্বরের ২৮ তারিখ ডয়েচে ভেলে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে বলা হয়েছে ‘বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের প্রায় ৮৫ শতাংশ হতাশায় ভুগছে’। গাজীপুরের কালিয়াকৈরের একজন বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের উদ্ধৃতি প্রকাশ করে নারী শ্রমিকের হতাশার একটা চিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে। উদ্ধৃতিটি এরকম, ‘এক লাখ ৩০ হাজার টাকা দিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলাম। ১১ মাসের মাথায় ফিরে আসতে হয়েছে। ওরা কাজ করায় কিন্তু টাকা দেয় না। কোনো টাকা নিয়ে আসতে পারিনি। যার কাছে থেকে এ টাকা নিয়েছিলাম, তাকে ফেরত দিতে পারিনি। তিনি এখন হুমকি দিচ্ছেন। মামলা করবেন। স্বামীও ছেড়ে চলে গেছে। চার মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি।’ গাজীপুরের এ শ্রমিকের বক্তব্য থেকেই বিদেশফেরত নারী শ্রমিকদের বিদ্যমান এবং বর্ধমান হতাশার মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায়। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের গবেষণায়ও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী বিদেশে যাওয়ার আগে এসব নারী শ্রমিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা যা ছিল, বিদেশ থেকে ফেরত আসার পর সবক্ষেত্রেই অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। অনেকে ধার-কর্জ করে বিদেশে গেছে। কিন্তু বাড়তি রোজগার তো দূরের কথা, ধার-কর্জ করা টাকাও শোধ করতে পারছে না। আবার পারিবারিকভাবেও ক্রমাগত হেয়প্রতিপন্ন হচ্ছে অনেকে। এসব বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের অনেকেরই বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে পারিবারিক সম্মতি ছিল না। কিন্তু ব্যক্তিগত উদ্যম, নিজের ‘কপাল’ পরিবর্তনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ও আত্মবিশ্বাস, চরম দারিদ্র্যাবস্থা থেকে মুক্তি এবং নিজের ও সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্নকে পুঁজি করে এসব নারী শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমায়। কিন্তু শূন্য হাতে ফিরে আজ অনেকে রীতিমতো ‘পথে’ বসে আছে। ফলে, অনেকের স্বামী তাদের ত্যাগ করেছে। এ কারণে তাদের পারিবারিক সংকট আরও বেড়েছে। সামাজিকভাবেও প্রায় সর্বত্র নানান অপবাদের শিকার হচ্ছে অনেকে। কেননা, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নারী শ্রমিকের কাজ করাটাকে সমাজ ‘তাদের ইজ্জত ও সম্ভ্রমের প্রশ্নের’ সঙ্গে জড়িয়ে বিবেচনা করে। সমাজে বিদ্যমান ‘নারীত্বের ডিসকোর্স’র হিসাব-নিকাশে এদের অনেকে ‘খারাপ কাজের’ শিকার হয়েছে বলে একটা ‘রটনা’ সমাজে জারি আছে। তাই, এসব বিদেশফেরত নারী শ্রমিক রাস্তাঘাটে নানানভাবে ইভটিজিং-এর শিকারও হচ্ছে। এরকম একটি সামাজিক অবস্থায় যেখানে পরিবারের কাছ থেকে সান্ত¡না পাওয়ার কথা, সেখানে পরিবার থেকে জুটছে নানান রকম কটূক্তি ও ভর্ৎসনা। অনেকে স্বামী পরিত্যক্তা হয়ে আত্মীয় স্বজনের বাসায় উঠছে কিন্তু সেখানেও জুটছে নানান ধরনের নেতিবাচক ‘কথাবার্তা’। বিদেশফেরত নারী শ্রমিকের চরিত্র নিয়ে বিদ্যমান এসব ‘কথাবার্তা’ খুবই অপমানজনক, অসম্মানজনক এবং অস্বস্তিকর। আর বিদেশফেরত এসব শ্রমিকের ছেলে-মেয়েদের নানানভাবে সামাজিক লজ্জা ও হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে। এসব কারণেই এসব শ্রমিকের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। তবে, তাদের কেউ কেউ বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলোতে তৈরি পোশাক কারখানায় এবং বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজকর্মে নিজেদের সম্পৃক্ত করে নিজেদের এরকম একটি সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংকট থেকে বের করে আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে সেখানেও একটা সংকট বিরাজ করছে। তাও যে কয়জন এর মধ্যেই একটা কাজ জোগাড় করতে পেরেছে, তাদের অবস্থা খানিকটা ভালো হলেও একটা বিপুল সংখ্যক বিদেশফেরত নারী শ্রমিক গ্রামে নানান ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পারিবারিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিনযাপন করছে।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজারের মতো নারী শ্রমিক কাজ করছে। তবে, তারমধ্যে কতজন নারী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছে তার কোনো সঠিক তথ্য নেই। অথচ সেটা থাকা জরুরি। বিদেশফেরত এসব নারী শ্রমিকের অধিকাংশই বিদেশে একটি প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধ করে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং অসুস্থ। রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতায় এদের যথাযথ দেখভাল ও পুনর্বাসন একান্ত প্রয়োজন। অনেকে নানানভাবে যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন ও কারাভোগের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কঠিন দিন পার করে বাংলাদেশে ফেরত এসেছে। তাই, বিদেশফেরত এসব নারী শ্রমিকের সামাজিক নিরাপত্তা, যথাযথ চিকিৎসা এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামাজিক ও নৈতিক পুনর্বাসন জরুরি। এখানে মনে রাখা জরুরি যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি যে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে দেশে বহুবিধ উন্নয়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি বিশ্বব্যাপী একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় অর্থনীতি হিসেবে সবার নজর কাড়ছে এবং সমীহ অর্জন করছে তার পেছনে অন্যতম অবদান হচ্ছে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স। আজ বাংলাদেশ প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে, তাতে একটা বড় অবদান হচ্ছে রেমিট্যান্স। ফলে, যারা আজ নানান সংকটের মুখে পড়ে দেশে ফিরে আসছে, তাদের প্রতি নজর দেওয়া, তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে বলে আমি মনে করি। বিদেশফেরত এসব নারী শ্রমিকের মধ্যে যে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে এর মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে সমাজের দায়িত্বজ্ঞানহীনতাই প্রতিভাত হচ্ছে। তাই, এ জায়গায় যত দ্রুত কার্যকর নজর দেওয়া যায়, ততই দেশ ও জাতির মঙ্গল। কেননা, মানুষের জান-মালের হেফাজত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়