ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়

আপডেট : ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩৭ পিএম

জনগণের জন্য আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে ভীতিকর অঙ্গটি হচ্ছে পুলিশ বাহিনী। এ দেশের পুলিশ বাহিনীও ব্রিটিশেরই সৃষ্টি। জনগণকে রক্ষা করার কথা বলা হলেও তাদের আসল দায়িত্ব ছিল জনগণকে দমন করা। লাল পাগড়ি দেখলে লোকে পড়ি তো মরি করে দৌড় দিত। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রের স্বৈরাচার, বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর নিপীড়ন ও জনজুলুমের প্রত্যক্ষ প্রতিচ্ছবি ছিল পুলিশের দুরাচার। একাত্তর সালে রাষ্ট্র ভাঙার যে যুদ্ধ তাতে পুলিশ বাহিনী অংশ নিয়েছে, অনেকে প্রাণ দিয়েছেন; কিন্তু নতুন রাষ্ট্র পুলিশ বাহিনীকেই আবার ডেকে এনে দায়িত্ব দিয়েছে তারা আগে যা করত তাই করতে। রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক হয়নি; স্বদেশিদের দ্বারা পরিচালিত হলেও এ রাষ্ট্র জনগণের স্বার্থ দেখে না, দেখে শাসকশ্রেণির স্বার্থ; আগে যেমনটা দেখত। শাসকশ্রেণি নিজেদেরটা গুছিয়ে নিতে অতিশয় ব্যস্ত থেকেছে, পুলিশ বাহিনীও সেই সুযোগে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে এবং এখন তাদের সদস্যদের কেউ কেউ রীতিমতো বেপরোয়া আচরণ করে থাকে যেমনটি আগে ভাবাও যেত না।

একটা পরিচিত দৃষ্টান্ত, কক্সবাজারের থানা কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাসের তৎপরতা। এই লোক নিজের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বসেছিলেন; এবং এতদূর ক্ষমতাধর হয়ে উঠেছিলেন যে সেনাবাহিনীর একজন সাবেক মেজরকে কেবল হত্যাই করেননি, গলায় বুটের চাপা দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছেন। তারপর নিহত ব্যক্তিটিকেই আক্রমণকারী দুর্বৃত্ত বলে দায়ী করে মামলা সাজানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। পুলিশের লোকটি একা ছিলেন না, তার সঙ্গে তার ওপরে ও নিচে অন্য সহকর্মীরাও ছিলেন। তা থাকেন। দশে মিলেই কাজ করা হয়। ঢাকার কাছে সোনারগাঁ এলাকার এক বাজারে একজন পুলিশ সদস্য নিয়মিত চাঁদা তুলতেন। না দিলে আটক ও মামলার ভয় দেখাতেন। দুটিই ভয়ংকর জিনিস। আটক হলে নির্যাতন হয়, নির্যাতনে মৃত্যুও ঘটতে পারে। আর মামলা দেওয়া তো খুবই সহজ ব্যাপার। পকেটে ইয়াবার কিছু বড়ি গুঁজে দিলে বাধা দেয় কে? তা ওই বাজারের দোকানদাররা একবার অত্যন্ত অতিষ্ঠ ও নিতান্ত মরিয়া হয়ে পুলিশের ওই লোককে আটক করে ফেলে ও গণধোলাই দেয়। তখন লোকটি যা বলেছে তাকে মিথ্যা মনে করার কোনো অজুহাত নেই। তিনি বলেছেন, ‘আমার একার দোষ কি! আমি যা তুলি তা থেকে অন্য সহকর্মীদের ভাগ দিই।’ তাই তো! তা না হলে জোরটা আসে কোথা থেকে?

পুলিশ ঘুষ নেবে এটা সেই সূচনাকাল থেকেই অবধারিত। এখন এর মাত্রা ও প্রকারে বেশ বৈচিত্র্য এসেছে। আর নতুন যা যুক্ত হয়েছে তা হলো অপহরণ ও যৌন নির্যাতন। সড়কপথে চট্টগ্রাম থেকে সোনার চাকতি (বার) নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন এক স্বর্ণকার। পথিমধ্যে ডিবির ওসিসহ পাঁচজন পুলিশ (ভুয়া নয় খাঁটি সোনার চেয়েও খাঁটি) স্বর্ণকারকে আটক করে, সোনার ১৫টি বার, যার দাম ১ কোটি টাকা লুট করে নেয়। স্বর্ণকার ভদ্রলোক বেশ সাহসী বলতে হবে, তিনি ফেনী মডেল থানায় ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ভাগ্য ভালো, থানা মামলাটি নিয়েছে। আদালত ডিবির ওই সদস্যদের চার দিনের রিমান্ডও মঞ্জুর করেছে। পুলিশই রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশকে। এমনটা তো ঘটে না। ঘটার কথাও নয়। রিমান্ডে নিলে পুলিশের জন্য ভিন্ন ব্যবস্থা কি না তা অবশ্য জানা যাবে না। তবে পুলিশের স্বর্ণ ডাকাতির ওই ঘটনাটা যে খুব একটা ব্যতিক্রম এমন নয়। ডেইলি ট্রিবিউন খবর দিচ্ছে বিভিন্ন সময়ে ২৩ জন পুলিশের বিরুদ্ধে স্বর্ণ-সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। (১৩-০৮-২১)। আর দৈনিক ইত্তেফাক জানাচ্ছে যে, নানা রকমের অপরাধে বছরে এখন দুই হাজার পুলিশ চাকরি হারাচ্ছে (১২.০৮.২১)। এর মধ্যে টাকা বিনিময়কারীদের (মানি এক্সচেঞ্জার) জিম্মি রেখে টাকা আদায়ের অপরাধও রয়েছে। কয়েক দিন পর ওই একই পত্রিকার খবর (১৭-০৮-২১), ‘শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ : যেমন, চাঁদাবাজি, ঘুষ ও ধর্ষণ।’ পত্রিকাটির আরও খবর, পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। বিশেষজ্ঞরা আশা করি বলবেন, পুরনো জিনিস নতুন বোতলে ঢালাঢালিতে সময় ও শ্রম নষ্ট হবে, কাজের কাজ কিছুই হবে না।

অপহরণও সমানে চলছে। হঠাৎ হঠাৎ মানুষ গুম হয়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ প্রতি বছর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ওপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। এ বছরও করেছে। তাদের সেই রিপোর্ট অনুযায়ী ২০০৯-১৯-এর ভেতর বাংলাদেশে ৮৩০ জন মানুষ গুম হয়েছে। বাংলাদেশের ওই সময়টাকে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ অভিহিত করেছে ‘গুমের দশক’ বলে। অপহৃতদের মধ্যে কাউকে মৃত পাওয়া গেছে, কেউ কেউ জীবিত ফেরতও এসেছে, কিন্তু তারা এমনই ভয় পেয়েছে যে নিখোঁজকালীন অভিজ্ঞতার বিষয়ে তাদের মুখ থেকে একটি শব্দও বের হয়নি। ৮১ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। (ডেইলি স্টার, ১৭-০৮-২১) অপহরণ কারা করেছে জানা যায় না, পুলিশ বলে এসব বেআইনি কাজ তারা করে না; কিন্তু পুলিশের তো দায়িত্ব এদের উদ্ধার করে আনা। পুলিশ তা করে না। বাংলাদেশের পুলিশ অদক্ষ এমন অভিযোগ কেউ করতে পারবে না। এই লেখাটা লিখতে লিখতেই তো খবর এলো সিআইডির তিনজন সদস্য একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্টের নেতৃত্বে রংপুর থেকে ভাড়া-করা একটি মাইক্রোবাসে চেপে দিনাজপুরে গিয়ে রাতের বেলা এক বাড়িতে হানা দেয়, এবং সেখান থেকে একজন মহিলা ও তার পুত্রকে তুলে নিয়ে যায়। পরে মুঠোফোনে এই পরিবারটিকে তারা জানায় যে ১৫ লাখ টাকা দিতে হবে, নইলে অপহৃতদের মুক্তি নেই। দর-কষাকষি করে মুক্তিপণ ৮ লাখে নামানো সম্ভব হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে অবশ্য থানায় জানানো হয়েছিল। টাকা নিতে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে এক জায়গায় এলে সিআইডির ওই সদস্যরা স্থানীয় থানার পুলিশের লোকদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাইক্রোবাস নিয়ে চম্পট দেয়। দশ কিলোমিটার ধাওয়া করে পুলিশ, শেষ পর্যন্ত নিজেদের সহকর্মী-বহনকারী ওই মাইক্রোবাসটিকে পাকড়াও করতে সমর্থ হয়। সিআইডির লোকরা এখন নাকি কারাগারে আছে। আদালতের আদেশে।

পুলিশ রিমান্ডে নেয়, হেফাজতেও নেয়। হেফাজতে নিলে আর রক্ষা থাকে না। অপরাধের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য কত কী যে করে জানে শুধু ভুক্তভোগী। এ ব্যাপারে ১৪টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তাদের নিজেদের উপায়ে তদন্ত করেছে এবং তারা জানতে পেরেছে যে, বাংলাদেশে পুলিশ ও র‌্যাবের হেফাজতে যা ঘটে তা নিষ্ঠুরতার চরম। হেফাজত বিষয়ে আইন আছে, কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা করা অত্যন্ত কঠিন কর্ম। বাদীর ভয় থাকে। সাক্ষী পাওয়া যায় না। ভুক্তভোগী ও সাক্ষী কেউই নিরাপদে থাকবে বলে ভরসা পায় না। ওই ১৪টি সংস্থা একসঙ্গে একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, হেফাজতে নির্যাতন ও নিষ্ঠুর আচরণের অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে তাদের ধারণা। কর্তৃপক্ষ যদি উপযুক্ত পদক্ষেপ না নেয় তাহলে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি ওই সংস্থাগুলোর পক্ষে একটা আহ্বানও জানানো হয়েছে ওই বিবৃতিতে। সেটা হলো, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনীতে এমন কাউকে যেন নেওয়া না হয় যিনি ওই নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত। (প্রথম আলো, ২০-০৬-২১)। কড়া কথা নিশ্চয়ই। সরকারের বক্তব্য অবশ্য সব সময়ই অত্যন্ত পরিষ্কার। তারা কাউকে গুম করে না, লোকগুলো হয়তো ইচ্ছা করেই নিখোঁজ হয়, বা অন্য কোনো ঘটনাও হতে পারে। তবে নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া এবং কেউ হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে বের করা যে সরকারের দায়িত্ব সে প্রশ্নে সরকার জবাব দেওয়ার কোনো দায়িত্ব বোধ করে না। প্রশ্ন করার লোকেরও অবশ্য অভাব দেখা যাচ্ছে।

পুলিশের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ শোনা যাবে এটা একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তারা একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রীয় বাহিনী, মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়াই তাদের কর্তব্য। কিন্তু যৌন নির্যাতনের অভিযোগও আছে। পরাধীনতার আমলে আমরা ভীষণ কষ্টে ছিলাম কিন্তু তখনো পুলিশ ধর্ষণ করেছে এমন অভিযোগ শোনা যায়নি। কিন্তু এখন শুনতে হচ্ছে। এ নিয়ে আগেও আমরা লিখেছি; এই তো কদিন আগে শুনলাম একজন মহিলা পুলিশ ইন্সপেক্টর ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করেছেন তারই সহকর্মী এক পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে। তদন্তের জন্য মামলা গৃহীতও হয়েছে। (ডেইলি স্টার, ১৩-০৮-২১), আরেকটি খবর : চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার এক নারী কনস্টেবল থানায় কর্তব্যরত অবস্থাতেই এবং থানার ভেতরই ধর্ষিত হয়েছেন বলে লিখিত অভিযোগ করেছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই থানারই একজন পুরুষ কনস্টেবল। (আজকের পত্রিকা, ০৪-০৯-২১), ওদিকে তিন কলম জুড়ে হেডিং দিয়ে একটি দৈনিক খবর দিচ্ছে ‘ভয়ংকর অপরাধে জড়াচ্ছে পুলিশ’। (যায়যায়দিন, ১৫-০৮-২১)। পুলিশ বাহিনীতে সৎলোক নেই এটা কে বলবে? বরং সত্য এই যে অধিকাংশই সৎলোক। কিন্তু অন্যত্র যেমন এখানেও তেমনি, সত্য এটাও যে মন্দের জোর বেশি ভালোর তুলনায়। তা ছাড়া এটাও তো সঠিক যে রোগই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়।

লেখক ইমেরিটাস অধ্যাপক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত