আসামের অধিবাসীরা প্রধানত দুই পৃথক অঞ্চলে শতাব্দীর অধিককাল ধরে বসবাস করে আসছে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় অসমীয়রা একক সংখ্যাগরিষ্ঠ, পাশাপাশি বাঙালিও সেখানে রয়েছে লক্ষাধিক। অপরদিকে বরাক উপত্যকা জুড়ে রয়েছে কেবল বাংলাভাষী বাঙালিরা। তবে কিছু মণিপুরিও সেখানে আছে। ব্রহ্মপুত্র এবং বরাক উপত্যকায় অসমীয় এবং বাঙালি দুই জাতির প্রাধান্যে অসমীয়দের বাঙালি বিদ্বেষী মনোভাব বহু আগে থেকেই সৃষ্টি হয়েছিল। আসাম অসমীয়দের একক অঞ্চল অতীতেও ছিল না। আজও নয়। আসামের বাঙালিরা কংগ্রেস দলের সমর্থকরূপে কংগ্রেসের ছায়াতলে ছিল। কংগ্রেসও আসামের ভোটব্যাংক বাঙালিদের পাশে থাকলেও রাজনৈতিক স্বার্থে অসমীয় জাত্যাভিমানকে রাজনৈতিক স্বার্থের পক্ষে পেতে ইতিহাসখ্যাত মারাত্মক অন্যায়টি করে ১৯৬১ সালে; বাংলা ভাষার দাবিতে আন্দোলনকারীদের সশস্ত্র পন্থায় দমন করে। আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ১১ জন বাঙালি প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিল। ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ভুল বুঝতে পেরে দ্রুত নিজেদের শুধরে নিলেও আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলনে ১১জন আত্মদানকারীর স্মৃতি বাঙালিদের মানস এবং ভারতের ভাষাভিত্তিক সংগ্রামের ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। আজও ওই দিনটিকে বাংলাভাষীরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করে।
আসামের রাজনীতিতে অসমীয়দের ভাষিক ও সাম্প্রদায়িকতার ইন্ধনে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি কংগ্রেসকে হটিয়ে আসামের ক্ষমতা লাভ করে। ক্ষমতা গ্রহণের পর অসমীয় এবং বাংলাভাষীদের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বের ফায়দা হাসিলে জাতি-বিদ্বেষী চক্রান্ত অব্যাহত রেখেছে। অসমীয়দের বিদেশি হটাও আন্দোলনে রাজ্যের বিজেপি সরকার হিন্দু বাঙালিদের সুবিধায় রেখে বাংলাভাষী মুসলমান বিদ্বেষী করার নানা চক্রান্ত করে আসছে। সাম্প্রতিক শারদীয় উৎসবের ঘটনাকে পুঁজি করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সূত্রপাত ঘটিয়েছে। ভাষিক সংঘাতকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত করে আসামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে তুলেছে। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ভোটের রাজনীতিতে বাংলাভাষী হিন্দুদের ভোটের আশায় বাংলাভাষী মুসলমানদের অধিকার হরণের আয়োজন অব্যাহত রেখেছে। রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের অজুহাতে আইন করে দুই সন্তানের অধিক পিতা-মাতাদের স্থানীয় স্বশাসিত পর্ষদের ভোটে দাঁড়ানোর অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। দুয়ের অধিক সন্তানের পিতা-মাতারা ব্রাত্যরূপে পরিগণিত হয়েছে। এতে সবচেয়ে বিপদের মুখে পড়েছে বাংলাভাষী মুসলিম সম্প্রদায়। কেননা তাদের প্রত্যেকের সংসারে দুয়ের অধিক সন্তান থাকায় তারা শিক্ষা, চাকরি, পদোন্নতিসহ বিবিধ অধিকার-সুযোগ হারিয়েছে। রাজ্যের নাগরিকত্ব প্রদানে বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে নাগরিকত্ব হরণের অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে। মুসলিম বাঙালিদের নাগরিকত্ব প্রদান না করে তাদের বিতাড়নের আয়োজনও সমান তালে চলছে। ইতিমধ্যে তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। অতীতের ভাষিক সংঘাতকে বিজেপি এখন সাম্প্রদায়িক বিভাজনে প্রত্যক্ষ মদদ দিয়ে চলেছে। এতে আসামে ‘বাঙালি খেদাও’ আন্দোলন এখন ‘মুসলমান বাঙালি খেদাও’ আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।
ব্রিটিশ শাসনাধীনে আসাম ছিল স্বতন্ত্র এক প্রদেশ। বাংলাদেশের বর্তমান বৃহত্তর সিলেট জেলা ছিল আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গে পূর্ববাংলা ও আসামকে একীভূত করে ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল’ নামক পৃথক প্রদেশ সৃষ্টি করা হয়েছিল রাজনৈতিক অভিপ্রায়ে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বঙ্গভঙ্গ রদ হওয়ার ফলে আসাম আবার আগের অবস্থায় স্বতন্ত্র প্রদেশে পরিণত হয়। অখ- বাংলা প্রদেশ থেকে বিহার, উড়িষ্যা এবং ছোট নাগপুরকে বিচ্যুত করে বাংলা প্রদেশকে সংকুচিত করা হয়। এমনকি ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানী কলকাতা থেকে রাজধানী স্থানান্তরিত হয় দিল্লিতে। বাংলা প্রদেশের ওপর ব্রিটিশদের বিদ্বেষের মূলে ছিল বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলন। পাশাপাশি শিক্ষা, সংস্কৃতি, রাজনীতি সচেতন বাঙালি জাতির অগ্রসর চেতনা। যেটি ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়াতে সক্ষম বিবেচনায় লর্ড কার্জন বাংলা ভাগের গর্হিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগে সিলেট জেলার অনেক অংশ আসাম প্রদেশের অনুকূলে থেকে যায়। সেখানকার সব মানুষের ভাষাই ছিল বাংলা। পশ্চিম পাকিস্তানের ভূখ- বৃদ্ধিতে দেশভাগে পাকিস্তানি নেতারা পূর্ব বাংলাকে সংকুচিত করার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। যে কারণে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বহরমপুরসহ খোদ যশোর রোড ধরে কলকাতা পূর্ববঙ্গে যুক্ত হতে পারেনি। অর্থাৎ পূর্ববাংলাকে দুর্বল অংশে পরিণত করার সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত দেশভাগে সম্পন্ন করেছিল অবাঙালি পাকিস্তানিরা। আজ আসামে যাদের বহিরাগত বাঙালি বলা হচ্ছে, বৃহত্তর সিলেট-খ-নে ভারতীয় অংশে তারা তো বংশ পরম্পরায় নিজ মাতৃভূমিতেই রয়েছে। কেবল ভাষা ও জাতীয়তার বিদ্বেষে তাদের মেনে নিতে অতীতেও পারেনি আজও পারছে না অসমীয়রা। আর এই জাতি বিদ্বেষকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে রূপান্তরে বিষ সিঞ্চন করে চলেছে রাজ্যের ক্ষমতাসীন বিজেপি এবং ভারতের শাসকশ্রেণি।
ভারতবর্ষে অসমীয়রা পৃথক ভাষা-সংস্কৃতির স্বতন্ত্র জাতি। তাদের ভাষা-বর্ণমালাও স্বতন্ত্র। অতীতে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা মৌর্য, গুপ্ত, মুসলিম শাসনাধীনে কখনো ছিল না। ১৮২৬ সালের আগে ব্রিটিশরাও আসামে প্রবেশ করতে পারেনি। ১৮২৬ সালে কাছাড়ের দিক দিয়ে বর্মী-মগদের আগ্রাসনের মুখে অহোম রাজ্য উদ্ধারে অসমীয়দের আমন্ত্রণে ইংরেজরা আসামে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল। বর্মী-মগদের বিতাড়নে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ ভূমিকায় সহজে আসাম ব্রিটিশ শাসনাধীনে চলে আসে। ১৮৩২ সালে আগেকার অহোম রাজ্যের রাজসিংহাসনে ব্রিটিশরা অধিষ্ঠিত করে রাজবংশের এক প্রতিনিধিকে। কিন্তু এর মাত্র চার বছর পরই ইংরেজ শাসকরা রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করে আসাম রাজ্যকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। অহোম রাজ্যের একমাত্র ভাষা ছিল অসমীয়া। সে ভাষায় সাহিত্য-সংস্কৃতির ছিল উন্নত পরিম-ল। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য-ইতিহাস ছিল। ভারতবর্ষের মৌর্য, গুপ্ত, মুসলিম, ব্রিটিশ শাসনের যুগের সঙ্গে যার কোনো সাদৃশ্য ছিল না। সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ১৮৩৬ সালের আগে অসমীয়া ভাষায় তিাদের ইতিহাস রচিত হয়েছিল। কিন্তু ১৮৩৬ সালেই ব্রিটিশ কর্তৃক অসমীয়া ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষা আসামের সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে। শিক্ষাঙ্গনে, আদালতে সর্বত্রে অসমীয়া ভাষা পরিত্যক্ত হয়ে বাংলা ভাষা সরকারি ভাষার মর্যাদা লাভ করে। এই কাজে ব্রিটিশদের ইন্ধন জুগিয়েছিল ব্রিটিশরাজের অধীন বাঙালি রাজকর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ব্রিটিশদের বোঝানো হয়েছিল অসমীয়া ভাষা বাংলা ভাষারই একটি উপভাষা। অসমীয়া কোনো স্বতন্ত্র ভাষা নয়।
বাঙালি রাজকর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরামর্শেই ব্রিটিশরা অসমীয়া ভাষার পরিবর্তে বাংলা ভাষাকে সরকারি একমাত্র ভাষার স্বীকৃতি দিয়েছিল। ১৮১৭ সালে শ্রীরামপুরের খ্রিস্টান মিশনারি কর্তৃপক্ষ অসমীয়া ভাষায় অনূদিত বাইবেল বাংলা ভাষায় প্রকাশ করে। এতে প্রমাণ করাও সহজ হয় বাংলা বর্ণমালাই অসমীয়া বর্ণমালা। একমাত্র ‘র’ ব্যতীত অসমীয়া বর্ণমালায় আর কোনো পৃথক বৈশিষ্ট্য নেই। অসমীয়া ভাষা বাংলা ভাষার উপভাষার অমর্যাদায় কোণঠাসা হয়ে পড়ে। উড়িষ্যাতেও বাঙালি রাজ-কর্মচারীরা উড়িয়া ভাষার ক্ষেত্রে একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। অবশ্য উড়িষ্যায় বসবাসকারী সচেতন বাঙালিদের হস্তক্ষেপে উড়িয়া ভাষা জীবন ফিরে পেয়েছিল। আসামে অসমীয়া ভাষা সরকারি ভাষার মর্যাদা হারানোর পর সংগত কারণে অসমীয়রা প্রবল বাংলাভাষা ও বাঙালি বিদ্বেষী হয়ে পড়ে। ব্রিটিশদের আসাম রাজ্য দখলদারিত্বে অসমীয়রা একাধারে পরাজিত হলো ইংরেজদের দ্বারা, বাঙালিদের দ্বারাও। অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমেরিকান মিশনারিরা দীর্ঘকাল আন্দোলন করে। অসমীয়া ভাষায় অসংখ্য গ্রন্থ লিখে ও প্রকাশ করে তারা প্রমাণ করে যে অসমীয়া একটি পূর্ণাঙ্গ স্বতন্ত্র ভাষা। বাংলা ভাষার উপভাষা নয়। কলকাতার হিন্দু কলেজ থেকে শিক্ষাপ্রাপ্ত আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন এই ভাষা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন। অবশেষে ব্রিটিশ শাসকরা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে অসমীয় অধ্যুষিত অঞ্চলসমূহে অসমীয়া ভাষাকে সরকারি ভাষার মর্যাদা প্রদান করে। তবে সামান্য হের-ফেরে প্রবর্তিত অসমীয়া ভাষার বর্ণমালা বাংলাই থেকে যায়। ভাষা এবং বর্ণমালার ওপর অন্যায় হস্তক্ষেপে অসমীয় মাত্রই বাঙালি বিদ্বেষী হয়ে পড়ে। অসমীয় জাতিসত্তার ওপর এমন হস্তক্ষেপ অন্যায় বলেই গণ্য করা যায়।
ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার পশ্চিমাঞ্চল কামরূপ কেন্দ্রানুগ না হয়েও বাংলা প্রদেশের সঙ্গে নানাভাবে যুক্ত ছিল। কোচবিহারকেও কামরূপ বলা হতো। অসমীয়া ভাষার কবি-সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষক ছিল কোচ নৃপতি। বার্মার শান রাজ্য থেকে পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা ডিঙিয়ে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় প্রবেশ করেছিল অহোমদের আদি জাতি। এরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল না। ছিল প্রবল হিন্দুবিরোধী। বংশ পরম্পরায় এদের চিন্তা-চেতনা, নীতি-নৈতিকতার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এরা ক্রমেই হিন্দু ধর্ম গ্রহণ করে এবং নিজেদের স্থানীয় আদিবাসীরূপে ভাবতে শেখে। তিন-চারশ বছরের ব্যবধানে এরা পার্শ্ববর্তী ভারতীয় লোকাচার-সংস্কৃতি অনুসরণ করে স্বতন্ত্র ভাষা-সংস্কৃতির আচার গড়ে তোলে। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই অসম রাজ্যে অসমীয়দের প্রাধান্য থাকবে। বিশেষ করে যে সব অঞ্চলে তাদের সর্বাধিক বসবাস। সে সব অঞ্চলে তাদের ভাষার অবাধ প্রচলন থাকবে, এটা খুবই স্বাভাবিক। তবে বরাক উপত্যকায় সুদীর্ঘকালের বসবাসকারী বাংলাভাষীদের ওপর জোরপূর্বক অসমীয়া ভাষা চাপিয়ে দেওয়া, তাদের উচ্ছেদ-উৎপীড়ন করাকে নিশ্চই সমর্থন করা যায় না। অসমীয়দের ভয় দুই বাংলার জনসংখ্যার প্রভাবে তাদের না সংখ্যালঘুতে পরিণত হতে হয়! তাদের দশা ত্রিপুরা ও কাছাড়ের আদিবাসীদের অনুরূপ হয় কি-না এই আতঙ্ক অসমীয়দের মধ্যে আজও ক্রিয়াশীল।
লেখক নির্বাহী সম্পাদক
নতুন দিগন্ত
