রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারকে ঘিরে বিতর্ক নতুন নয়। এবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভেতরে ঢুকে দুই শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনায় তাকে নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠেছে সারা দেশে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্র বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের হাত ধরে উত্থান ঘটা আম্মার গত ২ বছরে অসংখ্য অঘটনের জন্ম দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন। তার কর্মকাণ্ডে বিব্রত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, শিক্ষক, এমনকি রাকসু নেতারাও। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ২ বছরে যতগুলো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রায় সবকটিতেই কোনো না কোনোভাবে জড়িত ছিলেন আম্মার।
তবে বহু অঘটনের জন্ম দিয়েও আম্মার বীরদর্পে টিকে আছেন। কোনো সমালোচনাই তাকে যেন থামাতে পারছে না। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কখনো কখনো তাকে নিয়ে বিব্রত হওয়ার কথা বললেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ছাত্রশিবিরের নেতারাও তাকে নিয়ে অস্বস্তির কথা স্বীকার করছেন। তবে যখনই আম্মার বিপদে পড়েছেন, তখনই তার পাশে দাঁড়িয়েছেন শিবিরের নেতাকর্মীরা। পাশাপাশি সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় অংশ সামাজিক মাধ্যমে তার পক্ষে প্রচার চালাচ্ছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দাপুটে ভূমিকায় অবতীর্ণ হন জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সালাহউদ্দিন আম্মার। এরপর থেকে চলছে তিনি যেন ‘অপ্রতিরোধ্য’। বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে আম্মারের ডাকে মধ্যরাতেও হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী হল থেকে বের হয়ে রাস্তায় বিক্ষোভে অংশ নেন। দাবি আদায়ের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ আম্মারের সমর্থক হয়ে ওঠে। তবে এই সময়ে শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণসহ নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। কথায় কথায় উগ্র আচরণ অনেককে বিব্রত ও বিস্মিত করে চলেছে।
প্রায় ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠিত রাকসু নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদক পদে জয় পান আম্মার। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই পদে দায়িত্ব নেওয়ার পরও তার চালচলনে তেমন পরিবর্তন আসেনি। এমন প্রেক্ষাপটে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে আম্মারকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলেও দাবি করা হয়। ব্যঙ্গাত্মক কর্মসূচি পালন করে তার মানসিক চিকিৎসার দাবি জানান ছাত্রদল নেতারা।
সামাজিক মাধ্যমে সালাহউদ্দিন আম্মারের শব্দচয়ন নিয়েও অনেক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ঘোর আপত্তি রয়েছে। এ নিয়ে রাকসু ভবনের ভেতরে একটি ছাত্র সংগঠনের নেতার সঙ্গে রাবি ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী হাসান মারুফের বাকবিতণ্ডাও হয়।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অনেক শিক্ষকের সঙ্গে আম্মারের আচরণ নিয়েও ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। তবে কোনো কিছুই পাত্তা দিতে চান না আম্মার। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো আলোচিত বা বিতর্কিত ঘটনা ঘটলেই আলোচনায় সবার আগে উঠে আসে একটি নাম সালাহউদ্দিন আম্মার। কখনো উপ-উপাচার্যের সঙ্গে মারামারির অভিযোগ, কখনো লাঠি হাতে মাদকবিরোধী অভিযান, কখনো ছয় ডিনকে পদত্যাগের আলটিমেটাম বা প্রশাসনিক দপ্তরে তালা, কখনো বা জিয়া পরিষদের ব্যানার খুলে ফেলার ঘটনা এবং সবশেষ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে ঢুকে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগ।
ছয় ডিনকে পদত্যাগের আলটিমেটাম : আম্মারকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক তৈরি হয় ছয়জন ডিনকে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনায়। ২০২৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ডিন নির্বাচনে ছয়টি পদে আওয়ামী লীগপন্থি প্যানেলের প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। পরের বছর ১৭ ডিসেম্বর তাদের মেয়াদ শেষ হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার নির্দেশ দেন উপাচার্য।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর আওয়ামীপন্থি ডিনদের পদত্যাগ এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের অপসারণের দাবি জানান রাকসু জিএস আম্মার। একই সঙ্গে আওয়ামীপন্থি ডিনদের পদত্যাগের জন্য সময়সীমাও বেঁধে দেন তিনি। এরপর ২১ ডিসেম্বর সকালে ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন ‘আজ সকাল সাড়ে ১০টা থেকে একে একে ছয় আওয়ামীপন্থি ডিনের কাছে পদত্যাগপত্র নিয়ে যাব। আমি বিশ্বাস করি, শান্তিপূর্ণভাবে তারা স্বাক্ষর দিয়ে দেবেন।’
এরপর তিনি নিজেই পদত্যাগপত্র লিখে নিয়ে ডিনস কমপ্লেক্সে যান। সেখানে গিয়ে ছয় ডিনকে না পেয়ে একে একে সবাইকে ফোন করেন। পরে একই দাবিতে ডিনদের চেম্বার, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, প্রক্টর, রেজিস্ট্রারসহ প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। দিনভর উত্তেজনার পর সন্ধ্যায় ডিনদের সঙ্গে বৈঠক করে তাদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয় প্রশাসন।
উপ-উপাচার্যের সঙ্গে ধস্তাধস্তি : গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে পোষ্য কোটা ইস্যুতে আন্দোলনের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের সঙ্গে আম্মারের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। ওই সময় তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া এবং শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটিতে সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম সামনে আসে এবং বিষয়টি ক্যাম্পাসজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।
অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দীনের সঙ্গে হাতাহাতি ও লাঞ্ছনার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছিল। তবে প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ওই কমিটির প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের নামের তালিকা : গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের একটি অনুষ্ঠানে ‘আওয়ামীপন্থী ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে ১৬১ জন শিক্ষকের নাম ঘোষণা করেন আম্মার। ঘটনাটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয় এবং বিতর্ক সৃষ্টি করে। পরে তালিকাটি তিনি উপাচার্যের কাছেও জমা দেন।
লাঠি হাতে মাদকবিরোধী অভিযান : বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কনসার্ট উপলক্ষে লাঠি হাতে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করেন আম্মারসহ রাকসুর অন্যান্য নেতা। অভিযানের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদকের এমন ভূমিকা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছিল।
শিক্ষক ও প্রশাসনের সঙ্গে উত্তেজনা : বিভিন্ন সময় শিক্ষক ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও প্রকাশ্য বাকবিতণ্ডায় জড়াতে দেখা গেছে আম্মারকে। বিশেষ করে গত বছরের নভেম্বর মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদের সঙ্গে তার উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে।
লাইব্রেরিতে ঢুকে শিক্ষার্থী মারধরের অভিযোগ : সবশেষ গত সোমবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে বেলচা হাতে ঢুকে দুই শিক্ষার্থীকে বেদম মারধর করেন আম্মার ও তার সহযোগীরা। প্রক্টর অফিসে প্রথম দফায় মারধরের পর লাইব্রেরিতে ঢুকেও এই দুই শিক্ষার্থী রেহাই পাননি। আহত অবস্থায় তাদের অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়েও দেওয়া হয় আরেক দফা পিটুনি। শেষ পর্যন্ত তাদের ছাত্রলীগ কর্মী পরিচয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
একের পর এক ঘটনায় সমালোচিত হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা পুলিশ প্রশাসন কেউই আম্মারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং আম্মারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আহত দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
এ ঘটনায় ছাত্রদল প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা লাইব্রেরিতে ঢুকে মারধরের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কও এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছে।
সূত্র বলছে, নিজেদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে আম্মারের বিরুদ্ধে কেউ জোরালোভাবে সোচ্চার হন না। সোমবারের ঘটনার পরও ক্যাম্পাসে আম্মারবিরোধী প্রকাশ্য অবস্থান তেমন দেখা যায়নি। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এ বিষয়ে অনেকটা নীরব। ঘটনার প্রতিবাদে বুধবার সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে ছাত্রদল একটি মানববন্ধন করে। তবে সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল হাতেগোনা।
ক্যাম্পাসের একাধিক সূত্র বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন যেমন আম্মারকে মেনে চলেছে, বর্তমান প্রশাসনও এ বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবিরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সমর্থন আম্মারের প্রতি রয়েছে। এমনকি ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থীকে হারিয়ে স্বতন্ত্রভাবে রাকসুর জিএস নির্বাচিত হওয়ায় শিবিরও তাকে সমীহ করে চলছে।
আম্মারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আব্দুল আলিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবসময় শিক্ষার্থীদের হয়েই কাজ করি। তবে একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সাবেক উপ-উপাচার্যের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাসহ আরও কয়েকটি ঘটনায় তিনি নিয়ম ভঙ্গ করেছেন।’
আরেক উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুনুর রশীদ বলেন, ‘সোমবারের ঘটনার তদন্ত চলছে। সেদিন যে তিনটি স্থানে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর সবই তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
