দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবী থেকে যুদ্ধ চিরতরে বিদায় হবে এরকম একটা ধারণা অতি আশাবাদীরা করলেও পশ্চিমা পুঁজিবাদী ও ধনবাদী দেশগুলোর সাম্রাজ্য বিস্তার ও আধিপত্য বিস্তারের রাষ্ট্রীয় তরিকা নতুন নতুন যুদ্ধের জন্ম দেবে এটা মোটামুটি অনিবার্য ছিল। ফলে, ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন নতুন যুদ্ধের ডামাডোল বাজতে শুনেছি আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সম্প্রদায় বলতে আমরা যাদের বুঝি তারা বিভিন্ন সময় নানান দৌড়ঝাঁপ করেছে বটে কিন্তু কাজের কাজ খুব একটা বেশি কিছু করতে পারেনি।
যুদ্ধবাজরা নিয়মিতভাবে এবং নিয়মিত বিরতিতে যুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দেশে। কখনো গণতন্ত্র উদ্ধারের নামে, কখনো সন্ত্রাস দমনের নামে, কখনো বা মানবাধিকার রক্ষার নামে কিংবা কোনো কোনো সময় জনগণকে রক্ষার নামে নানান অজুহাত তৈরি করে নিয়মিত বিরতিতে আমরা যুদ্ধের মহড়া দেখেছি পৃথিবীর নানান দেশে দেশে। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী এবং আধিপত্যবাদী যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রগুলো কোনো কোনো ফরমেটে এসব যুদ্ধের প্রধান শরিক হয়ে ওঠে এবং যুদ্ধ লাগিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে মানুষকে রক্ষার কীর্তন রচনা করে। অস্ত্র কারখানার মুনাফা নিশ্চিত করা, রিকস্ট্রাকশন ফার্মগুলোকে টিকিয়ে রাখা এবং নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের নীলনকশা বাস্তবায়নের জন্য এসব যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এখানে মনে রাখা জরুরি যে, পৃথিবীর যে কোনো জায়গায় একটা বোমা ফাটানোর অর্থ হচ্ছে একটা বোমার চাহিদা তৈরি হওয়া। একটা ট্যাংক ধ্বংস হওয়ার মানে হচ্ছে আরেকটা যুদ্ধ ট্যাংকের চাহিদা তৈরি হওয়া। সুতরাং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যুদ্ধ বাধিয়ে এবং যুদ্ধ জিইয়ে রেখে মূলত বিশ্বব্যাপী অস্ত্র কারখানাগুলোর বাণিজ্য সচল রাখাও এসব যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আরও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, এসব যুদ্ধ বন্ধে এবং এসব যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে একটা শক্ত অবস্থান নেওয়ার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্যের তিনটিই (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স) হচ্ছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদী এবং আধিপত্যবাদী রাষ্ট্র। আর বাদবাকি দুই সদস্য রাশিয়া ও চীন এসব যুদ্ধের বহুমাত্রিক পরোক্ষ সুবিধাভোগী। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে একটা নৈতিক এবং মানবিক অবস্থান না-নিয়ে প্রায় সময়ই নিজের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নিয়ে নিজের অবস্থান গ্রহণ করে।
এরকম একটি বিশ্বব্যবস্থায় যখনই যুদ্ধ লাগে তখনই সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ে সংশ্লিষ্ট দেশের সাধারণ মানুষ তথা সিভিলিয়ান। যেহেতু বোমা, গোলা ও বারুদ কোনো হিসাব-নিকাশ বোঝে না, সেহেতু এসবের আঘাতে নির্বিচারে প্রাণ যায় আমজনতার তথা সাধারণ মানুষের। ফলে, তারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে পার্শ¦বর্তী দেশে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে মানবেতর জীবনযাপন করে শরণার্থী পরিচয়ে। অন্য দেশে আশ্রয়প্রার্থী এবং শরণার্থী হিসেবে বাস করবার অভিজ্ঞতা প্রায় সময়ই সম্মানজনক নয়। তথাপি মানুষ প্রাণের মায়ায় যুদ্ধাবস্থা থেকে নিজের জীবনকে বাঁচাতে অন্য দেশে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হচ্ছে, প্রতিটা যুদ্ধ কোনো না কোনোভাবে লাখ লাখ শরণার্থীর জন্ম দেয়।
আজ বিশ্বে প্রায় ৮ কোটি ২৪ লাখের অধিক মানুষ নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত; তার মধ্যে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ হচ্ছে শরণার্থী। আর এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ শরণার্থী হয়েছে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দেশে যুদ্ধের কারণে। বাকিরা শরণার্থী হয়েছে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নির্যাতনের কারণে। যুদ্ধের কারণে শরণার্থী হওয়া মানুষের কাতারে নতুন করে যুক্ত হলো প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থী যারা ইতিমধ্যে পোল্যান্ড এবং হাঙ্গেরিসহ ইউক্রেনের পার্শ¦বর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নেওয়ার জন্য সীমান্তে অপেক্ষা করছে।
রাশিয়া ইউক্রেনে কেন হামলা করেছে তা নিয়ে নানান বিচার ও বিশ্লেষণ চলছে। এ আলোচনা চলবে আরও অনেকদিন। রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ সঠিক নাকি বেঠিক এসব নিয়ে আছে নানান মত এবং ভিন্নমত। ন্যাটোর সম্প্রসারণ রাশিয়া মানবে কেন? ইউক্রেন নিজেকে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। এটা ইউক্রেনের উচিত হয়েছে কি না? কেন ইউক্রেনকে ন্যাটেভুক্ত রাষ্ট্র হতে হবে? ইউক্রেন পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে উঠলে রাশিয়ার অসুবিধা কোথায়? সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর রাশিয়া সাবেক সোভিয়েতভুক্ত দেশগুলোতে আধিপত্য বিস্তারের এবং কর্তৃত্ব স্থাপনের যে মনোবৃত্তি সবসময় পোষণ করে সেটা কতটা উচিত কিংবা গণতান্ত্রিক? আমেরিকা কেন কেবল লিপ-সার্ভিস দিয়েই রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের প্রতিবাদ করছে? কেন জো বাইডেন কোনো সক্রিয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? ব্রিটিশ, জার্মানি, ফ্রান্স, চীন কিংবা ভারত কেন এ যুদ্ধের বিরুদ্ধে কোনো শক্ত অবস্থান নিচ্ছে না? কেন রাশিয়াকে সবাই সমীহ করে চলছে?
আবার ইউক্রেনের পাশে যে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সক্রিয়ভাবে পাশে থাকার কথা সেভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি না কেন? ইত্যাকার নানান প্রশ্ন নিয়ে নানান আলোচনা ও সমালোচনা, নানান তর্ক ও বিতর্ক, নানান মত ও দ্বিমত, নানান পক্ষ ও প্রতিপক্ষ এবং নানান বুদ্ধিজীবীতা আমরা দেখছি এবং দেখব আরও কিছুদিন। কিন্তু ইতিমধ্যে ৬ লাখের অধিক ইউক্রেনীয় যে শরণার্থীতে পরিণত হয়েছে এবং একটা অনিশ্চিত জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে, সেদিকে আমাদের কারও নজর নেই!
বিশ্ব মিডিয়া বোমার শব্দ, বোমা ফাটার কুন্ডলি এবং আগুনের ফুলকি দেখাতে যতটা তৎপর এবং কাবিল, সাধারণ ইউক্রেনীয়দের জান নিয়ে পালানো এবং প্রাণ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা মিডিয়ায় ততটা নেই। বেসামরিক ইউক্রেনীয়দের ঘর ছেড়ে পালানো, জীবন নিয়ে দৌড়াদৌড়ি, সীমান্তে ঠেলাঠেলি করে দিন গুজার করার অমানবিক কষ্ট এবং পার্শ্ববর্তী দেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়ের আকুল আবেদন ও তীব্র ব্যাকুলতা আমরা যুদ্ধের ডামাডোলে বেমালুম ভুলে গেছি।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার তথ্য মতে, ইউক্রেনে রুশ হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ইউক্রেনীয় শরণার্থী হিসেবে পার্শ্ববর্তী দেশে ঢোকার চেষ্টা করছে এবং ঢোকার জন্য অপেক্ষা করছে। এদের অনেকে ইতিমধ্যে পোল্যান্ড ও হাঙ্গেরিতে ঢুকে পড়েছে। এরকম পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কমিশনার ইলভা জোহানসন বলেছেন, ‘লাখ লাখ ইউক্রেনীয় সীমান্তে অপেক্ষা করছে শরণার্থী হিসেবে পার্শ¦বর্তী দেশে আশ্রয় নেওয়ার জন্য। এরকম বাস্তবতায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নকে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোকে তৈরি থাকতে হচ্ছে বাস্তুচ্যুত লাখ লাখ ইউক্রেনীয়কে আশ্রয় দেওয়ার জন্য।’
যে কোনো যুদ্ধের সবচেয়ে অনিবার্য প্রতিফল হচ্ছে লাখ লাখ মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া এবং অন্য কোনো দেশে গিয়ে আশ্রয় নিয়ে শরণার্থীর জীবনযাপন করা। ইউক্রেনে রুশ হামলার কিংবা রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের নগদ প্রতিফল হচ্ছে বিশ্বের শরণার্থী মানচিত্রের ইউক্রেনীয় নামের একটি নতুন নাম সংযুক্ত হওয়া। প্রায় সাড়ে ৬ লাখ ইউক্রেনীয় অর্থাৎ সাধারণ মানুষ কোনো অপরাধ না-করেও যুদ্ধের অনিবার্য প্রতিফলের মারাত্মক ভুক্তভোগী।
আফগান শরণার্থী, তামিল শরণার্থী, সিরীয় শরণার্থী, সোমালীয় শরণার্থী, রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং মেক্সিকো ও ভেনেজুয়েলার শরণার্থীদের পাশাপাশি এখন থেকে উচ্চারিত হবে ইউক্রেনীয় শরণার্থীদের কথা।
একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা একটি নিষ্ঠুর নাটকের মঞ্চায়ন দেখছি যেখানে ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ করে, অকাতরে গরিব মরে।’ এটা বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত লজ্জার!!
লেখক নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
