‘আমি জজ ম্যাজিস্টরকে গ্রাজ্য করি না’

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২২, ১১:১৮ পিএম

পুলিশের কথামতো কাজ না করলে খুন, ধর্ষণ, কিংবা ড্রাগের মামলায় ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করা যায় না। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সিরিয়াল মামলা হতেই থাকবে। কলিকাতার পুলিশ সেখানে ভিন্ন ধরনের এক কল্পিত অপরাধের আশ্রয় গ্রহণ করত ব্যাটা বড্ড বেড়ে গেছে, সাহেব মারার মামলায় ফাঁসিয়ে দে। সাহেব মানে সাদা চামড়ার সাহেব। সাহেব মারা গুরুতর অপরাধ। সরকারি ডাক্তার হরগোবিন্দ চট্টোপাধ্যায়কে পুরোদস্তুর একজন বাঙালি দারোগা (সাব ইন্সপেক্টরএসআই, দারোগার নিজের ভাষায় এছাই) সাহেব মারার মামলায় সাক্ষ্য দিতে বললে তিনি চটে গেলেন। মিথ্যে সাক্ষ্য তিনি কেন দেবেন?

দারোগারও একটা যুক্তি থাকতে পারেইংরেজ সাহেব মারা যে অপরাধ এটা তো অস্বীকার করা যায় নানিজের হাতে আইন নেবে কেন? কিন্তু পুলিশ যাদের ধরেছে, তারাই যে কাজটা করেছে এটা তো সাক্ষ্যে প্রমাণিত হতে হবে। দারোগা ধরেই নেয় সরকারি চাকরি করবে, বেতন নেবে আর সরকারের পক্ষে দাঁড়াবে না হরগোবিন্দ নিজেকে কী মনে করেন? হরগোবিন্দ যে তলে তলে একজন স্বদেশি। এ অনাচার তার পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। তিনি দারোগাকে রীতিমতো ‘গেটআউট’ করে দিলেন।

হরগোবিন্দের মতো মানুষ দারোগাকে অমান্য করেন! একি কলিকাল! দারোগা মিথ্যে মামলা দিয়ে হরগোবিন্দের দুই পুত্রকে জেলে পাঠায়। হরগোবিন্দ তাকে রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা দিয়েছেন এবং লাঞ্ছিত করেছেন এই আবেদন আদালতে পেশ করে খানা-তল্লাশির অনুমতি নিয়ে আসেন।

হরগোবিন্দ তার মেয়েদের রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দারোগার নজর থেকে দূরে রাখতে পাহারা দিচ্ছিলেন। তল্লাশির সময় ব্র্যান্ডি ভেবে দারোগা বোতল থেকে তরল ঢেলে পান করেন, সে রাতেই তার অবস্থা মর মর হয়ে যায়। দারোগার স্ত্রী স্বামীর প্রাণ বাঁচাতে ডাক্তার হরগোবিন্দের শরণাপন্ন হলে তিনি চিকিৎসকের নৈতিক দায়িত্ব পালন করেন। বিশিষ্ট এই দারোগা থানা তল্লাশির আদেশ পেতে আদালতে যে আর্জি পেশ করেছেন বানান অক্ষত রেখে তা হুবহু উপস্থাপন করা হলো :

‘বিচারপতী

হুজুরের হুকুম মোতাবেক সাহেব মারার মোকর্দ্দমার তদন্ত করিতে করিতে আরও দুই আসামীর নাম প্রাপ্ত হওয়া গিয়াছে অজয়চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শুসীলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ইহাদের পীতা সরকারী ডাক্তার হরগোবীন্দ চট্টোপাধ্যায় হয়। অজয়চন্দ্র অতী দুর্দ্দান্ত বেক্তী কলিকাতার সুরেন্দ্রবাবুর কলেজে অধ্যায়ন করে প্রকাশ তাহারাই হুকুম সূত্রে অন্যান্য আসামীগণ শাহেবকে মাইরপীট করিয়াছে দুইজনকে ৫৪ ধারা অনুসারে অদ্যই ধৃত করিবার বন্দোবস্ত করিয়াছী।

২। বিসেস তদন্তে আরও জানিয়াছী উক্ত অজয়চন্দ্র কলিকাতা বীভিন স্কোয়ার হাঙ্গামাতে লীপ্ত ছিল সে এখানে আসিয়া একটি লাঠীখেলা সমিতী স্থাপন করিয়াছে তাহাতে স্থানীয় অনেক লোক চাঁদা দেয় ডাক্তারের ছোট পুত্র শুসীলচন্দ্র অল্প বস্ক হইলেও অত্যন্ত দুষ্ট সে এখানে অনেক বালক লইয়া একটি ঢীল ছোঁড়া সমিতী স্থাপন করিয়াছে উদ্দেশ্য সাহেব মেম দেখিলেই ঢীল ছুঁড়িবে।

৩। গোপন অনুসন্ধানে জানিলাম উক্ত ডাক্তারের বাসায় সাহেব মারা রক্তাক্ত লাঠী প্রভিতী লুক্কাইত আছে লাঠীখেলা সমিতির চাঁদার খাতা মেম্বরের তালিকা দৃষ্টে অনেক আসামী আস্কারা হইতে পারে বিধায় প্রার্থনা ফৌঃ কাঃ বিঃ ৯৬ ধারা অনুসারে উক্ত হরগোবীন্দ ডাক্তারের বাটী খানাতল্লাসী করিতে ছার্চ্চওয়ারেন্ট দিয়া শুবিচার করিতে আগ্যা হয়।

আগ্যাধীন

শ্রী বদনচন্দ্র ঘোষ

এছাই

(এন আবেদনের সঙ্গে দু’টি পুনশ্চঃ সংযুক্ত আছে)

দফা প্রকাশ থাকে যে উক্ত হরগোবীন্দ ডাক্তার সদেসীয় বিসেস স্বপক্ষ দেশী চিনী ও করকচ নবন সর্ব্বদা আহার করে স্ত্রির বেনামীতে ভারত কটন মীলে ৫ শত্ত টাকার সেয়ার খরিদ করিয়াছে তাহাতে পুত্রগণ আসামী কদাচ সত্য কথা বলিবে না এ মতে তাহাকে সাক্ষী করিয়া পাটাইতে সাহস করি না।

দফা আরো প্রকাশ থাকে পরম্পরায় সুনিলাম উক্ত হরগোবীন্দ বলিয়াছে আমি জজ ম্যাজিস্টরকে গ্রাহ্য করি না।’

দারোগা শ্রীবদনচন্দ্র ঘোষের পুরোটাই উদ্ধৃত হলো। ফৌজদারি কার্যবিধি ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তারের পূর্ণ ক্ষমতা দারোগার রয়েছে, তবে বিধান অনুযায়ী গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি, যার পরিচিতি তখন আসামি, তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ করতে হবে। বিজ্ঞ আদালত মামলার মেরিট বুঝে আসামিকে অব্যাহতি দিতে পারেন, জামিন দিতে পারেন, একালে অবশ্য রিমান্ড চালু হয়ে গেছে। রিমান্ডে এনে যা কিছু স্বীকার করিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

স্ট্যালিনের ঘড়ি হারানোর গল্পটা এসেই যায়। অবিভক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাপ্রতাপশালী কর্ণধার জোসেফ স্ট্যালিন হাত ঘড়িটা পাচ্ছিলেন না। কেজিবি প্রধান ২৪ ঘণ্টা সময় চাইলেন। কুড়ি ঘণ্টার পর স্ট্যালিনকে অগ্রগতির রিপোর্ট দিলেন : এ পর্যন্ত ১৬ জন সন্দেহভাজন ঘড়ি চোর গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের মধ্যে ১৫ জনই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। আশা করা যাচ্ছে ষোড়শ ব্যক্তিও স্বীকারোক্তি দেবেন। ততক্ষণে স্ট্যালিন দেখলেন তার ঘড়িটা বেডরুমে তার বালিশেরই নিচে রয়েছে। বালিশটা সরালে আগেই ঘড়িটা চোখে পড়ত, এতগুলো মানুষের স্বীকারোক্তি আদায়ের প্রয়োজন হতো না।

দারোগা শ্রীবদনচন্দ্র ঘোষের আমলে রিমান্ডে নিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের প্রক্রিয়াটি চালু থাকলে হয়তো বলা হতো ডাক্তার হরগোবিন্দ চট্টোপাধ্যায়ই তার দুই পুত্রের সাহায্য নিয়ে ইংরেজ সাহেবকে এমন মার দিয়েছেন যে তার দম যায় যায় অবস্থা।

বদনচন্দ্র ও হরগোবিন্দের কাহিনীটি প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের স্বল্পখ্যাত গল্প ‘হাতে হাতে ফল’ থেকে তুলে আনা হয়েছে। বুদ্ধিমান শ্রীবদনচন্দ্র জানেন হরগোবিন্দকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হলে একালের গুম পদ্ধতি অনুসরণ না করে বরং জজ সাহেবকে আসামির বিরুদ্ধে চটিয়ে দিতে পারলে বেশি লাভ। প্রথমত, জজ ম্যাজিস্ট্রেটকে গ্রাহ্য না করার মতো দম্ভোক্তি করা আদালত অবমাননার তুল্য। দ্বিতীয়ত, বিচারককে তাচ্ছিল্য করলে বিচারকের ‘ইগো’-ও প্ররোচিত হতে পারেতিনিও তো রক্তমাংসের মানুষ। সুতরাং পুনশ্চ-তে হয় দফায় দারোগা শ্রীবদনচন্দ্র ঘোষ এই উসকানিটিই দেন, দারোগা নিজ কানে হরগোবিন্দকে বলতে শোনেননি, ‘প্রকাশ থাকে পরম্পরায় সুনিলাম উক্ত হরগোবীন্দ বলিয়াছে আমি জজ ম্যাজিস্টরকে গ্রাহ্য করি না’। ডাক্তার হরগোবিন্দ দারোগার কথা না শোনায় সেকালে যথেষ্ট ভুগেছেন। একালেও হরগোবিন্দ ও তার সন্তানদের ভোগান্তি কমেনি।

৯০ বছর আগে, ৫ এপ্রিল ১৯৩২ প্রভাতকুমার প্রয়াত হয়েছেন। আমাদের কৈশোরে তার দুটি গল্প (ফুলের মূল্য ও আদরিণী) স্কুলের পাঠ্য বইয়ে অন্তর্ভুক্ত থাকায় ষাট ও সত্তরের দশকের স্কুলশিক্ষার্থীদের কাছে তিনি অপরিচিত নন। তারও আগে নবম-দশম শ্রেণির ‘কথা-বিচিত্রা’ গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত ছিল তার ‘মাস্টার মহাশয়’ নামের একটি বহুল আলোচিত গল্প, ১৩২৬ বঙ্গাব্দের আশি^ন-এ প্রকাশিত।

প্রতিদ্বন্দ্বী দুই গ্রাম গোঁসাইগঞ্জ ও নন্দীপুর। প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবকিছুতেইএমনকি কাদের গ্রামের স্কুলের শিক্ষক ইংরেজি বেশি জানেন তা নিয়েও। দুই গ্রামের সীমান্তে ইংরেজিযুদ্ধে অবতীর্ণ নন্দীপুরের হারান মাস্টার ও গোঁসাইগঞ্জের ব্রজ মাস্টার। মোড়ল বীরু দত্ত তার ছড়ি ঘুরিয়ে শূন্যে ছুড়ে দিলেন, যখন ছড়ি ভূপাতিত হলো দেখা গেল ছড়ির মাথা নন্দীপুরের দিকে হেলে আছে। এটাই টস। টসে জিতে হারান মাস্টার প্রথম প্রশ্ন করলেন : ‘হর্নস অব এ্যা ডিলেমা’ মানে কি? বুদ্ধিমান ব্রজ মাস্টার বললেন, উভয় সঙ্কট। উত্তর সঠিক, সুতরাং গোঁসাইগঞ্জ আনন্দে ফেটে পড়ল। অতঃপর ব্রজমাস্টার একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণে হারান মাস্টারকে বললেন, দুই গ্রামে আমরা দুজন ছাড়া ইংরেজি জ্ঞানসম্পন্ন একটি প্রাণীও নেই। কাজেই যা বলবে বুঝেশুনে জোর গলায় উত্তর দেবে। তাহলে বলো, ‘আই ডন্ট নো’ কথাটার মানে কি? হারান মাস্টার হেঁকে উত্তর দিলেন, ‘আমি জানি না’।

অমনি নন্দীপুরের মুখ কালো হয়ে গেল, গোঁসাইগঞ্জের কোলাহল ও বাদ্যবাদনে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে উঠল, নন্দীগ্রাম পারে না। তারা জিতেছে। তারা জিতেছে। পরাজিত নন্দীগ্রামবাসীর মাথা হেঁট হয়ে গেল। যে হারান মাস্টারকে নিয়ে তারা আশায় বুক বেঁধেছিল, তিনি তাদের ডুবিয়ে দিলেন। অগত্যা পরদিন প্রত্যুষে হারান মাস্টার নীরবে গ্রাম ত্যাগ করলেন। আর স্কুলটিও বন্ধ হয়ে গেল।

***

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়এই দুই বটবৃক্ষের অন্তর্বর্তীকালে বাংলা কথাসাহিত্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন প্রভাতকুমার সাহিত্যগুণে এবং জনপ্রিয়তার পরিমাপে এত সম্মান সেকালে কম লেখকেরই জুটেছে। তার প্রিয় পাঠকদের একজন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শ্রীমতি রাধামণি দেবী নাম নিয়ে গল্প লিখে রবীন্দ্রনাথ সম্পাদিত পত্রিকায় পরপর দু’বার মুদ্রিত হলেন প্রশংসাও পেলেন। প্রথম কুম্ভনীল সাহিত্য পুরস্কারটিও রাধামণি দেবীর। কিন্তু অন্তরালের মানুষটি আবিষ্কৃত হয়ে গেলে কুন্তনীল কর্তৃপক্ষ স্বনামে আবির্ভূত হতে লেখকদের আহ্বান জানালেন। প্রমথ চৌধুরী প্রভাতকুমারকে বললেন বাংলা ছোটগল্পের মোঁপাসা। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখলেন বিখ্যাত ফরাসি লেখকদের গল্পের চেয়ে প্রভাত কুমারের গল্প কোনো অংশে হীন নয়।

রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন তার গল্পের রস। সুকুমার সেন লিখেছেন, ‘সমসাময়িক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় আন্দোলনও প্রভাতকুমারের গল্পে ঢেউ তুলিয়াছে। বিধবা-বিবাহ, অসবর্ণ বিবাহ, স্বদেশি আন্দোলন, বোমা, ডাকাতি, নন-কোঅপারেশন সবই তাহার গল্পের রস ও রসদ জোগাইয়াছে।’ প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় ১২টি গল্পগ্রন্থ এবং ১৪টি উপন্যাস রেখে গেছেন। তার জন্ম ৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৭৩ বর্ধমানে। বিএ পাস করে কেরানির কাজই শুরু করেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির সরলা দেবীর সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তার অবস্থান উত্তরণের প্রয়োজন দেখা দেয়। ঠাকুরদের অর্থেই বিলেত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে ফেরেন, কিন্তু সরলা দেবীর সঙ্গে বিয়ে আর হয়নি। সরলা দেবীও লেখালেখিতে স্মরণীয় নাম, রবীন্দ্রনাথের বোন স্বর্ণকুমারী দেবীর কন্যা। দেবতায় সন্তুষ্টির জন্যই তো ফুল দিয়ে পূজা করা হয়কিন্তু প্রভাত কুমারের গল্পের সাধুবাবা এই উত্তর উড়িয়ে দিয়ে বললেন, ‘ভুল। দেবতা নির্বিকার। ফুলের গন্ধে তাহার প্রীতি হইবে কি করিয়া? না, ফুল দেবতার জন্য নহেপূজকের প্রীতির জন্য। ফুলের গন্ধে পূজকের মনে আনন্দের ভাব হইবে বলিয়া।’

একালে শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নেমে মার খেয়েও কনস্টেবল ও দারোগাদের হাতে ফুল তুলে দিতে দেখি। যাতে তাদের মনে আনন্দের ভাব জাগে, ন্যায়বোধ জাগে। নতুবা প্রভাতকুমারের দারোগা শ্রীবদনচন্দ্র ঘোষের মতো কান্ড ঘটিয়ে দিতে পারে।

লেখক কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত