ঔপনিবেশিক এবং স্বাধীন বাঙালি কেরানি

আপডেট : ১৮ নভেম্বর ২০২২, ১১:১৭ পিএম

(১০ নভেম্বর দ্বিতীয় পর্বের পর)

কলকাতা ছাড়িয়ে ঢাকায় পা দিলেই আমরা দেখতে পাই কেরানিদের অন্যরূপ। ঢাকার কমলাপুরে কেরানিবহনের জন্য মিনিটে মিনিটে রেল পরিষেবা নেই। মেট্রো আগামী দিনের স্বপ্ন। ঢাকায় রয়েছে পিঁপড়ের ঝাঁকের মতো নানা মডেলের বাস পরিষেবা। অফিস শুরু আর শেষ বেলায় পরিবহনের কারণে রাস্তাঘাটের মাটির তল খুঁজে পাওয়া যায় না। হর্ন বাজার বিচিত্র শব্দে আকাশ চির ধরে। শব্দদূষণের এ যেন ভিন্ন দুনিয়া। মফস্বল থেকে নগরীতে প্রবেশ মুখে দেখা যায় যানজটে পড়া বাস নয় তো হাজার-লক্ষ হিংস্র ক্ষুধার্ত অরণ্যচারীরা ঘিরে আছে আস্তো নগর। এই নগর প্রবেশকারীরা কারা? কেবল কি সাধারণ যাত্রী? শ্রমিক? এদের একটা অংশ সরকারি কর্মীবাহিনী, বেসরকারি অফিসের কলম আর কম্পিউটার টেপা কেরানি। কোথা থেকে নগরে প্রবেশ করে ওরা? অদূরবর্তী মিরপুর-দূরবর্তী ডেমরা, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, উত্তরা, টঙ্গী, গাজীপুর, রূপগঞ্জ, কালীগঞ্জ ইত্যাদি স্থানে ওদের ঘর-গেরস্থালি। এদের একটা অংশ দূর জেলার স্থায়ী বাসিন্দা। মূল শহর তাদের স্বপ্ন মাত্র। তাই ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে সস্তায় বাড়িভাড়া কিংবা দু-চার কাঠা জমি-জিরেত কিনে ওরা আধাপাকা ঘর তোলে। যেন উইপোকার জীবন। দিন যায়। রাত নামে।

কলকাতার নিত্যযাত্রী অফিসকর্মী বা কেরানিদের জীবন বড় বিচিত্র। মগজের ভেতর কিলবিল করে ঈশ্বরের দান একটি চাকরি এবং স্বপ্নের সংসার। চাকরির প্রতীক্ষায় হারাতে বসে যৌবন। অবসাদ-বিষণ্নতায় ঘটে আত্মহত্যা। মাত্র একটা চাকরি। ভাগ্যের চাকা ঘুরলে চাকরি হয়। তখন চলে দেবতার কাছে মানতের ঋণশোধ। চাকরি হলেই স্বপ্নে জাগে একটি নারী, স্ত্রী পদবির নারী আর অনাগত সন্তানের কল্পনা। অপার সুখ, অন্তহীন শান্তি ছায়ার মতো ঘুরে বেড়ায় মনের ভেতর। এখানে বৈবাহিক জীবনের সঙ্গে চাকরিপ্রাপ্তির এক জটিল খেলা চলে। স্ত্রী নামক নারীর সঙ্গে একজন দীর্ঘ বেকার জীবনের যন্ত্রণা ভোগা যুবকের সংযোগ ঘটলেই চিরদিনের বাবা-মায়ের সংসার আর বাবা-মা, ভাই-বোন নামের প্রিয় মানুষ আর সম্পর্কগুলোতে ভাঙনের প্রতিধ্বনি ওঠে। সমাজ আর রাষ্ট্রের বলে দেওয়া ‘মাইক্রো ফ্যামিলি’ হাতছানি দেয়। সেই মাইক্রো ফ্যামিলির অধীশ্বরী স্ত্রী রাত তিনটের ঘুম ভেঙে তৈরি করে ভাত, তরকারি, সবজি এবং অতিরিক্ত প্রোটিনের জন্য সেদ্ধ ডিমের অর্ধেক টিফিন ক্যারিয়ারে ঢুকিয়ে দিয়ে পুনরায় ঘুমোতে যায়। ভোর পৌনে পাঁচটার লোকালে চেপে শহর কলকাতা যাবে বলে ছুটতে থাকে স্টেশনের উদ্দেশ্যে। যেতে হবে ধর্মতলা কিংবা নবাব রফী আহমেদ কিদোয়াই রোড। দিনান্তের ট্রেনে চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে ঘরে ফেরে কেরানি। শরীর না-তো লাশ। সার্ট-প্যান্টে ঘামের গন্ধ নয় তো মর্গের লাশের গন্ধ।

ঢাকাইয়া কেরানির অন্দরমহল কেমন? ওরা নিত্যযাত্রী নয়। তাদের সদ্যবিবাহিত স্ত্রীদের স্বামীর সঙ্গে একটা সেদ্ধ ডিমকে আধাআধি ভাগ করে ভালোবাসার সাম্যবাদকে চর্চা করতে হয় না। বরং ওরা যতীন্দ্রমোহন বাগচির ‘অন্ধবধূ’ কবিতার অন্ধবধূর মতো। অন্ধবধূর স্বামী দীর্ঘ প্রবাসী। স্বামীর ঘরে ফেরার প্রতীক্ষায় মাসের পর মাস যায়। বর্ষায় ভরা দিঘির জল কমতে থাকলে ননদিনীর হাত ধরে পায়ের তলার সিঁড়ি গুণে অন্ধবধূ বুঝতে পারে সময় কত গড়িয়েছে। জল আনতে গেলে পায়ের তলায় বকুল ফুল পড়লে বুঝতে পারে বসন্ত এসেছে। ননদিনীর প্রতি তার আর্ত জিজ্ঞাসা, ‘একি ঝরা বকুল নয়?’

কেন এমন হলো? ঢাকাইয়া কেরানির তো এলেম নেই শহরের ভাড়া ঘরে বউ নিয়ে থাকার। সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা মাসে একবার তাই তো ছুটে যেতে হয় মফস্বল কিংবা গ্রামের বাড়ি। সঙ্গে গুলিস্তানের ফুটপাথের সস্তা জামাকাপড়, শাড়ি, বোরকা, স্নো-পাউডার। রোজার মাসে সঙ্গে যাবে বায়তুল মোকাররম থেকে কেনা জায়নামাজ কিংবা কিতাব-কোরআনের রেহেল। শহর থেকে একজন গাঁয়ে ফেরা কেরানির সঙ্গী হয় প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ আর ক্ষমতা। অন্যদিকে বৃদ্ধ-বাবার সন্তানের কাছে প্রাপ্তি তো জায়নামাজ কিংবা পবিত্র গ্রন্থ। আর... আর ওই যে চিরকালের পারিবারিক সম্পর্ক।

বিশ্ব বাঙালি কেরানিকুলের ভেতর একমাত্র বাংলাদেশের কেরানিরাই মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ দিয়েছে। দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তারা সরাসরি অংশগ্রহণ করেছে। এভাবে নিজেদের রাজনৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করেছে। পরিবেশ এবং ভৌগোলিক কারণও রয়েছে। মতিঝিল, গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, তোপখানা রোড, নীলক্ষেত, বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার মতো স্থানকে ঘিরেই বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে। মিটিং, মিছিল, লড়াইয়ের ঐতিহ্যবাহী এসব এলাকা। অন্যদিকে সচিবালয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বাণিজ্যিক নানা অফিস, রাজনৈতিক দলের প্রধান কার্যালয়ও এসব এলাকা ঘিরে। এসব পরিবেশ, ঘটনাবলি অফিস কেরানিদের মনে প্রভাব ফেলেছে। একঘেয়ে জীবনকেও নাড়া দিয়ে গেছে। ভেতর থেকে বদলের তাগিদও অনুভব করেছে কেউ কেউ।

স্বাধীনতার পূর্বকাল থেকেই কেরানিরা ঢাকা শহরে বসবাসের অধিকার পায় পরিবারসমেত। কমলাপুর, মতিঝিল, পল্টন, মিরপুর সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রেণির কর্মীবাহিনীর জন্যও গৃহ নির্মাণ শুরু হয়। এর ফলে গ্রামে জন্ম নেওয়া কেরানিরাও শহরে বসবাসের সুযোগ পায় সামান্য অর্থের বিনিময়ে। সামাজিক অনগ্রসরতার কারণে বহুসংখ্যক কেরানি বধূই গ্রাম ছেড়ে শহরে বসবাসের অধিকার পায়নি। তা ছাড়া এই যে কেরানি সমাজ, রাষ্ট্র যে কীভাবে তাদের শ্রেণি নির্ধারণ করে দেয় তার জলজ্যান্ত প্রমাণ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণি নাম নির্ধারণ করা কেরানিদের জন্য নির্মাণ করা আবাসন। কবরের গর্তও এর চেয়ে সুখপ্রদ। কত টাইপের যে কোয়ার্টার। এ থেকে জেড টাইপ!

কেরানি বা নিম্ন আয়ের শ্রমজীবীদের জীবনের গতির বাঁক বদল ঘটায় ইউরোপে বাইসাইকেল আবিষ্কার। শিল্পবিপ্লবের সময় পায়ে চালানোর এই চক্রযানটি কাজের জায়গায় যাতায়াতের শ্রম আর সময় দুটিই কমিয়ে দেয়। উপমহাদেশে ইংরেজ শাসন টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে বাইসাইলের একটা ভূমিকা ছিল। গ্রামগঞ্জে পুলিশি শাসন কায়েম থেকে শুরু করে, খাজনা আদায়, নীল চাষ আর ইংরেজি শিক্ষার প্রসারে বাইসাইকেলের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। কলকাতার কেরানিরা অফিসের শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তার কাছ থেকে বাইসাইকেল চালানো শেখে। এর ফলে কর্মদিবস যেমনি রক্ষা পায়, তেমনি বেঁচে যায় ট্রামভাড়া। স্বাধীনতা-পূর্বে ঢাকা শহরে বাইসাইকেলের বেশ প্রভাব ছিল। ঢাকা শহরে এবং শহরতলিতে বসবাস করা কেরানিদের মূল বাহনই ছিল বাইসাইকেল। তা ছাড়া সমাজে বাইসাইকেল এতটাই মর্যাদার ছিল যে মেয়ের বিয়ে বাবাকে যৌতুক হিসেবে বাইসাইকেল দান জামাইয়ের মনগলানোর অন্যতম কৌশল ছিল।

প্রযুক্তি বদল বা কম্পিউটার যখন অফিসপাড়ায় ঢুকে যায় তখন আচমকাই সনাতনী কর্মসংস্কৃতির ভিত ভেঙে পড়ে। ঔপনিবেশিক যুগে ফারসির বদলে ইংরেজি সরকারি দাপ্তরিক ভাষা প্রচলিত হলে বেকায়দায় পড়েছিল ফারসি জানা হিন্দু কেরানিরা। ঢাকার কেরানিরাও একই ফ্যাসাদে পড়েছিল। বাধ্য হয় তারা প্রযুক্তিটি রপ্ত করতে। দেখতে দেখতে অফিসের মান্ধাতার আমলের চেয়ার-টেবিল-লেজার বুকও বদলে যায়। কলমপেশা কেরানিরা কি-বোর্ড টেপা কেরানি বনে যায়। এই কর্মসংস্কৃতি আমূল পাল্টে গেলেও কেরানিকুলের প্রতি সমাজের মনোভাব পাল্টায়নি। প্রযুক্তির আগমনে কর্মসংস্কৃতি বদলালেও কেরানির জায়গায় পড়ে থাকে কেরানি, মর্যাদা অর্জন করে ওঠে দাঁড়িয়ে ইতিহাসে স্থান পায়নি আজও তারা।

সামন্ত সংস্কৃতি থেকে ওঠে আসা একটি বচন বাঙালিরা দীর্ঘ বছর কপচে গেছে। ‘অন্যের গোলামি’। জমিদার পরিবারের উচ্চবর্ণের ইংরেজি জানা ভদ্রলোকরা ইংরেজের অধীনে কেরানির চাকরিতে অবজ্ঞা করতেন। তারা ইংরেজ অধীন বাঙালি কেরানিদের দুর্দশার কথা জানতেন। তবে এর অর্থ এই নয় যে এরা ভীষণ রকম জাতীয়তাবাদী ছিলেন। উপনিবেশবাদীরা বাঙালি হিন্দু-মুসলমান অভিজাততন্ত্রের এই মনোভাব জানত। সুকৌশলে নিজেদের তৈরি কেরানি সমাজকে অবজ্ঞা করতে তাদের শিখিয়েছিল। কেরানিদের কোনো শ্রেণি-পরিচয়ও দেয়নি তারা। বিষয়টি অনেকটা ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুদের বর্ণ পরিচয়ের বাইরে ঠেলে দেওয়া অন্ত্যজ সমাজের মতো।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব পরিবেশ এই ‘শ্রেণিহীন’ শ্রেণিটির ভেতর আলোড়ন তুলেছিল বটে, কিন্তু অধস্তন সমাজটিকে ‘মাছিমারা কেরানি’ অপবাদ থেকে মুক্ত হতে দেয়নি। ঔপনিবেশিক প্রভুদের মতো আজও উচ্চপদের অফিস কর্তারা তাদের দেখতে চায় মাথানত, অনুগত, আদেশ নির্দেশ পালনকারী কলম-কম্পিউটার টেপা মানুষ হিসেবে। উপনিবেশ আনুগত্যের ঐতিহ্যবাহী এই কেরানিরা আজও বসের পাদুকার শব্দে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রের কর্মচারী সমাজে আজও তারা হীনজন বর্ণবহির্ভূত পতিত হয়েই রইল। পেশাজীবী সমাজের এই নিম্নবর্গ শ্রেণিটি সামাজিক স্বীকৃতির লড়াইয়ের পরিবর্তে প্রমোশন পেয়ে উচ্চবর্গের একেবারে শেষ প্রান্তে স্থান পাওয়ার জন্য প্রাণান্ত চেষ্টায় রত। কেরানিদের প্রতি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি পরিবর্তনের সংগ্রামে ওরা আগ্রহী নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন সমষ্টিগত মানুষের পাশাপাশি তাদেরও স্বাধীন মর্যাদাশীল মানুষে বিবর্তিত করতে পারল না। বসকে তোয়াজ করার মানস থেকে দিল না মুক্তি।

এই অবহেলিত, মর্যাদাশূন্য কেরানিরাই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে। রক্ত সঞ্চালন করে ধমনিতে। সরকারের সব কার্যক্রম ওরাই চালনা করে। সামান্য মাস-মাইনের সঙ্গে যৎকিঞ্চিৎ ঈদ বোনাসেই তৃপ্তির হাসিটা হাসতে হয় তাদের। অবসর-পরবর্তী পেনশনের স্বপ্ন দেখতে দেখতেই জীবনাবসান ঘটে তাদের। উপনিবেশবাদের সৃষ্টি কেরানিকুল ঐতিহাসিক কার্য-কারণের ভেতর দিয়ে টিকে আছে, টিকে থাকবেও। অথচ নীরবে বয়ে চলবে উত্তর উপনিবেশের সময়-স্রোত। স্বাধীনতার ভেতর ঔপনিবেশিক পরাধীনতার আশ্চর্য বিস্ময়। রাজনৈতিক স্বাধীনতা কি তাদের টেবিলে রাখা নথিপত্রের স্তূপে নুয়ে পড়া মাথাকে মুক্তি এনে দিতে পারল?

(সমাপ্ত)

লেখক: কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত