দুদকের দরকার কী!

আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৩, ১২:২৪ এএম

প্রথম কিস্তির পর

অবশিষ্ট কারণ ও করণীয়

৭. রেকর্ডপত্র তলবের চিঠি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করে মাসের পর মাস বসে থাকার ব্যুরো আমলের প্র্যাকটিস বাদ দিয়ে সরাসরি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে গিয়ে রেকর্ডপত্র দ্রুত সংগ্রহ করতে হবে; দুদকের আইন-বিধিতেই সে-সুযোগ আছে; অনুসন্ধান-তদন্তকারীকে থানা-পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সমান ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেই ‘নখদন্ত’-এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে হবে;

৮. সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সরাসরি গিয়ে রেকর্ডপত্র দ্রুত সংগ্রহে অনুসন্ধানকারী-তদন্তকারীদের প্রশিক্ষিত ও অভ্যস্ত করে তোলা দরকার এবং তাদের এ কাজে যাতায়াতে যানবাহন সুবিধার ব্যবস্থা করা ও সহযোগী হিসেবে অন্তত একজন করে কর্মচারী দেয়া দরকার;

৯. অনুসন্ধানের প্রাথমিক কাজগুলো গোপনীয়তা বজায় রেখে সম্পন্ন করা গেলে কম সময়ে দ্রুত কাজ করা সম্ভব। অনুসন্ধানের কাজ তদন্ত কাজের মতো করে দীর্ঘকাল চালিয়ে যাওয়ার স্বভাব ছাড়তে হবে; অভিযোগের/ঘটনার প্রাথমিক সত্যতা দ্রুত নিশ্চিত হওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে; তাহলে অনুসন্ধান শেষে তদন্তের শুরুতেই অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও তার অর্থ-সম্পদ ক্রোক-ফ্রিজ করার উপয্ক্তু তথ্য-প্রমাণ ভিত্তিকই সুযোগ তৈরি হবে;

১০. অনুসন্ধান-তদন্তকারীদের দায়িত্ব দেওয়ার সময় সব ক্ষেত্রেই ঢালাওভাবে আইনবিধির নির্ধারিত সম্পূর্ণ সময়সীমা দিয়ে দেওয়া হয়; অর্থাৎ ছোট-বড় সব ক্ষেত্রেই একই সমান সময়সীমা দেওয়া হয়। আর সবগুলোরই সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়, কিন্তু কাজ শেষ হয় না কোনোটারই; আইন-বিধির নির্ধারিত সম্পূর্ণ সময়সীমা সব ক্ষেত্রেই ঢালাওভাবে দেওয়া বাধ্যতামূলক নয় বরং অপরাধের ধরন ও গুরুত্ব ও ঘটনার ব্যাপ্তি বিবেচনায় দায়িত্ব দেওয়ার সময় তাদের কম কম করে সময়সীমা বেঁধে দেওয়াই যৌক্তিক; এমনটা করা হলে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে, এমনকি আগেও অনুসন্ধান-তদন্তকাজ সম্পন্নের হার বাড়ানো যাবে;   

১১. অনুসন্ধান-তদন্তে তদারককারীদের কার্যকর তদারকির যথেষ্ট অভাব; তারা প্রতিনিয়ত সঠিকভাবে তদারকি করলে আইন-বিধির নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এবং সঠিকভাবে অনুসন্ধান-তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব; তদারককারীদের তদারকি কাজের জন্য দায়বদ্ধ করা দরকার;  

১২. চার্জশিটের সঙ্গে আসামির সম্পদের তালিকাও দেওয়ার কথা ‘পিআরবি’র ২৭২ রেগুলেশনে আছে, শুধু পলাতক আসামির ক্ষেত্রে; কিন্তু সেটুকুও দেওয়া হয় না কখনই। প্রকৃতপক্ষে চার্জশিটকৃত সব আসামিরই সম্পদের তালিকা প্রয়োজন; কারণ, বিচার শেষে জরিমানা আদায়ে আসামির সম্পদের তালিকা পাওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়; অপরাধী সরকারি কর্মচারী হলে তার আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ তার দুর্নীতির অপরাধের সমর্থনমূলক প্রমাণ হিসেবে গণ্য করার এবং বিপরীত কিছু প্রমাণ না হলে শুধু ওইটুকু প্রমাণের ভিত্তিতেই সাজা দেওয়ারও বিধান আছে (১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে ৫(৩) ধারায়); সরকারি কর্মচারী নয়, এমন অপরাধীর ক্ষেত্রেও এই যুক্তি খাটাবার সুযোগ নেওয়ার আছে। তা ছাড়া অপরাধীর সম্পদ ক্রোক-ফ্রিজ করার ব্যাপারও তো আছে; তাই চার্জশিটকৃত সব আসামিরই সম্পদের তালিকা দেওয়া তদন্তকারীদের জন্য বাধ্যতামূলক করা দরকার;

১৩. মানিলন্ডারিং অপরাধের মূল বিষয় হলো অপরাধের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দুর্নীতির সব অপরাধেই অপরাধীর অবৈধ অর্থ-সম্পদ অর্জিত হয়ে থাকে; সে হিসেবে আজকের দিনে প্রতিটি দুর্নীতির অপরাধই একই সঙ্গে মানিলন্ডারিং অপরাধও বটে; প্রতিটি অপরাধের অনুসন্ধান-তদন্তে অপরাধলব্ধ অর্থ-সম্পদ চিহ্নিত করা দরকার; তার ফলে যেমন প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত করা নিশ্চিত হবে তেমনি ওই সব অর্থ-সম্পদ ক্রোক-ফ্রিজ করাও সম্ভব হবে; আর তাহলে, অনুসন্ধান-তদন্তে ও মামলায় আসামির অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ‘নখদন্ত’ আর্থিক শক্তিও খর্ব হবে এবং বিচার শেষে জরিমানা আদায় ও বাজেয়াপ্তি কার্যকর সহজ হবে; 

১৪. জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অপরাধ অনুসন্ধান-তদন্ত সুষ্ঠুভাবে হয় না; জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদের আনুমানিক পরিমাণ নির্ধারণ ছাড়াই বিবেচনাহীনভাবে দুদক আইনের ২৬(১) ধারায় সম্পদ বিবরণীর নোটিস (প্রকৃতপক্ষে আদেশ) জারি করা হয়ে থাকে, যা ওই ধারার পরিপন্থী এবং ক্ষমতার অপব্যবহারও বটে; এ কারণে অনুসন্ধান শেষে পরিসমাপ্তির সংখ্যাও বাড়ে।

সম্পদ বিবরণীর নোটিস জারির সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে কমিশনকে এটুকু তো সন্তুষ্ট হতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞাত আয়বহির্ভূত কিছু পরিমাণ অবৈধ সম্পদ আছে; অবৈধ সম্পদ আছে কি না সে সম্পর্কে সন্তুষ্ট হতে গেলে কমিশনকে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্যয় ও সম্পদের মোট আনুমানিক পরিমাণের সঙ্গে তার জ্ঞাত আয়ের আনুমানিক পরিমাণের পার্থক্য বিবেচনা করতে হবে; তাতে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের আনুমানিক একটা পরিমাণও পাওয়া যাবে, তখনই সেই সন্তুষ্টি হবে যৌক্তিক, তার ভিত্তিতে ২৬(১) ধারায় সম্পদ বিবরণীর নোটিস জারি হলে অনুসন্ধান অবশ্যই সার্থক হবে।

সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী ২৬(১) ধারায় সম্পদ বিবরণীর নোটিস জারি ছাড়াই দুদক সরাসরি ২৭ ধারায় সম্পদের মামলা দায়ের করতে পারে, যদি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের আপাত বিশ্বাসযোগ্য উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ থাকে; এ রকম ক্ষেত্রে সরাসরি সম্পদের মামলা দায়ের করে তদন্ত শুরু করা যেতে পারে, দুদক বিধিমালার ১০(১) (চ) বিধিতে অনুসন্ধান ছাড়াই সরাসরি মামলা (এজাহার) দায়েরের বিধান ২০১৯ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে সংযোজিতও হয়েছে, ‘রাঘব-বোয়াল’ আটকাতে এই ‘নখদন্ত’ কাজে দেবে।   

সম্পদের তথ্য, ব্যয়ের তথ্য যেসব জায়গায় পাওয়ার কথা তার সবখান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয় না, সম্পদ যাচাই ঠিকভাবে হয় না; সে কারণে এ ব্যাপারে চেক লিস্টসহ অনুসৃতব্য যথাযথ নীতি ও পদ্ধতি নির্ধারণ করে এসেছিলাম, যা আছে দুদকের ২০১৮-র ৫ ফেব্রুয়ারির পরিপত্রে। সেগুলোর সঠিক অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে;                 

১৫. ২০১৫ সালে মানিলন্ডারিং আইন সংশোধন করে কেবল ঘুষ ও দুর্নীতির সম্পৃক্ত অপরাধের মাধ্যমে সংঘটিত মানিলন্ডারিং অপরাধ রাখা হয়েছে দুদকের ভাগে; মানিলন্ডারিংয়ের ধারণা তৈরি হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমাদের দেশে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন দুর্নীতির অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে ১৯৫৭ সালের দুর্নীতি দমন আইনে, সেখান থেকে এসেছে ২০০৪ সালের দুদক আইনেও; ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়াও অন্য যে কোনো অবৈধভাবে অর্থাৎ, অন্য যে কোনো অপরাধের মাধ্যমেও অবৈধ সম্পদ অর্জন করে থাকলে সেটাও দুদক আইনের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অপরাধ হিসেবে দুর্নীতির অপরাধ; তাই, ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়াও অবৈধ সম্পদ অর্জন সংক্রান্ত সব মানিলন্ডারিং অপরাধই দুদকের এখতিয়ারভুক্ত; হাইকোর্ট বিভাগের রায়েও দুদকের এই এখতিয়ার নিশ্চিত, আর কত চাই! তবু করে শুধু নাই নাই!

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অপরাধ এখন একই সঙ্গে মানিলন্ডারিংয়েরও অপরাধ তাই, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অপরাধের মামলায় দুদক একই সঙ্গে মানিলন্ডারিংয়ের অপরাধের চার্জও আনতে পারে; তেমনি মানিলন্ডারিং মামলায় দুদক একই সঙ্গে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের চার্জও আনতে পারে। তাহলে, বড় বড় দুর্নীতি দমনে দুদক শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে।     

অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন

দুদকের একেবারে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে মাঝে মাঝে, কানা-ঘুষা তো চলেই; কাজে কর্মে অনিয়মের চিহ্ন খালি চোখেই ধরা পড়ে। অনুসন্ধান-তদন্তে ত্রুটি-বিচ্যুতি তো দেখতে পাওয়া যায় তাদের প্রতিবেদনে, আদালতের রায়ে। চেয়ারম্যান, সচিব ও লিগ্যালের মহাপরিচালক সমন্বয়ে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটি নামে উচ্চ পর্যায়ের একটি ব্যবস্থাও আছে দুদক বিধিমালার ১৯ বিধিতে; কিন্তু চেষ্টা করেও সে কমিটিকে কার্যকর করা যায়নি বাকি দুজনের অনীহার কারণে (সে আরেক দুঃখের কাহিনি!)। এক্ষেত্রে তাই, চেয়ারমানের আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা সবচেয়ে জরুরি।

অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন কমিটি প্রতিনিয়ত ঠিকভাবে তার কাজ করলে অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমনের সঙ্গে সঙ্গে অনুসন্ধান-তদন্তের মানও গুণগতভাবে বৃদ্ধি পাবে। বিভাগীয় অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়াও উপযুক্ত ক্ষেত্রে দায়ী কর্মকর্তার অনুসন্ধান-তদন্তের ক্ষমতা সাময়িক প্রত্যাহার/স্থগিতের মতো ব্যবস্থাও নেওয়া যায় এই কমিটির মাধ্যমে।

শেষ কথাটুকু হবে পরবর্তী কিস্তিতে।              

 (চলবে)

লেখক: প্রবন্ধকার ও আইন গ্রন্থাকার

অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ও দুদকের সাবেক মহাপরিচালক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত