ক্ষমতায় ফেরার পরিকল্পনায় ইমরান খান

আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৩, ১২:৪৭ এএম

রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই তাদের ‘ইস্পাতসম দৃঢ়তা’ নিয়ে গর্ব করেন। ইমরান খান দেখাতে পারেন তার ডান পায়ের তিনটি বুলেট-গর্ত। গত নভেম্বরের হামলার ঘটনা স্মরণ করে জানান, ‘একটি বুলেট শিরায় লেগেছে, পা এখনো সারেনি। একটু বেশি হাঁটলেই সমস্যা হয়।’ বুলেট তাকে ধীর করেছে বটে। তবে সেই সহজ হাসি, বাম কব্জিতে মোড়ানো তসবিহ আছে আগের মতোই। পাঁচ বছর পরে মার্চে তার সঙ্গে কথা হলো, ক্ষমতা হারানোর ছাপ পড়েছে চেহারায়। গত এপ্রিলে সংসদীয় অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে তিনি ‘জিহাদে’র ডাক দেন এবং নতুন নির্বাচনের দাবি করেন। বলেন, মার্কিন রচিত অন্যায় প্রহসনের শিকার তিনি। (স্টেট ডিপার্টমেন্ট অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছে।)

‘সর্বশক্তিমান’ সামরিক বাহিনীর সমর্থন হারিয়েছেন প্রথমে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর নেতৃত্বে কে আসবে, সেই দ্বন্দ্বে। বিরোধীরা দুর্বলতা আঁচ করেছে এবং অনাস্থা ভোটে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন রাস্তায়, কয়েক মাস দেশব্যাপী সমাবেশের মাধ্যমে। রাওয়ালপিন্ডির সাহিত্যের অধ্যাপক শাহিনা ভাট্টি বলেন, ‘ইমরান খান সমাজের সব শ্রেণির সঙ্গে মিশতে পারেন তাদের স্তরে নেমে। কিন্তু অন্যরা রাজনীতিতে থাকেন দেশকে নয়, নিজেদের আখের গোছাতে।’ নভেম্বরের হামলা পিটিআই সদস্যদের অনুভূতিতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। রাজপথে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তারা। খানকে গুলি করার দায়ে এক স্বীকৃত ধর্মান্ধকে গ্রেপ্তার করা হয়। যদিও তিনি অভিযুক্ত করে চলেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রানা সানাউল্লাহ ও মেজর জেনারেল ফয়সাল নাসিরকে। (তারা সবাই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।)

বুলেট ছাড়াও দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ, ব্লাসফেমি ও সন্ত্রাসের দায়ে ১১ মাসে খানের বিরুদ্ধে ১৪৩টি অভিযোগ দায়ের করা হয়। খানের মতে, এসব তাকে রাজনীতি থেকে অযোগ্য ঘোষণা করার বানোয়াট প্রয়াস মাত্র। ২০ মার্চ সরকার পিটিআইকে একটি ‘জঙ্গি দল’ বলার পর কয়েকশ সমর্থককে গ্রেপ্তার করা হয়। ২৬ মার্চ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সানাউল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘হয় ইমরান খান থাকবে, নয় আমরা।’ মনে হয় পাকিস্তান কোনো এক গিরিখাতের ঢালে পড়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যেই ধেয়ে এসেছে বিধ্বংসী বন্যা, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি এবং আফগান সীমান্তে সন্ত্রাসী হামলা। ২৩০ মিলিয়নের জাতির অস্তিত্বই হুমকির মুখে। ধর্ষণ ও দুর্নীতি ব্যাপক এবং অর্থনীতি নড়েচড়ে আইএমএফের অঙ্গুলি হেলনে। মার্চে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে ৪৭ %। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে পেঁয়াজ ২২৮%, গম ১২০% এবং রান্নার গ্যাস ১০৮%। রুপির দাম কমেছে ৫৪%।

রাওয়ালপিন্ডির মাটি-কাটা মজুর মুহাম্মদ গাজানফার বলেন, ‘দশ বছর আগে, মাসে ১০,০০০ রুপি [$১০০] আয় হতো, চলে যেত। এখন ২৫,০০০ রুপি [$৯০] কামাই করি, কিন্তু টেনেটুনেও চলে না।’ বিশে^র পঞ্চম জনবহুল দেশটির বৈদেশিক রিজার্ভ $৪.৬ বিলিয়ন জনপ্রতি মাত্র ২০ ডলার। পরিস্থিতি পারমাণবিক ক্ষমতাধর দেশটিকে চীন-বলয়ের আরও গভীরে ঠেলে দিয়েছে। খানের প্রতি পশ্চিমা সহানুভূতি জোড়ালো নয় বিশেষত, তার সময়ে আমেরিকাবিরোধী মিছিল এবং তালেবানের প্রতি কোমল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। তা ছাড়া তিনি তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে ‘আমার ভাই’ বলেছেন এবং ইউক্রেন যুদ্ধের আগমুহূর্তে মস্কো সফরে পুতিনের সাক্ষাৎ করে ‘উত্তেজনাপূর্ণ’ মন্তব্য করেছেন। ওসামা বিন লাদেনকে বলেছেন ‘শহীদ’ এবং উইঘুর মুসলিম সংখ্যালঘুদের আচরণের পরও বেইজিংয়ের প্রশংসা করেছেন। ক্ষমতায় এসে জো বাইডেন তাকে হোয়াইট হাউসে ডাকতে ব্যর্থ হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন। উড্রো উইলসন সেন্টারের ডেপুটি ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান মতে, ‘এমন অবিশ্বাস্য শক্তিশালী অভিযোগ করা কেবল তার পক্ষেই সম্ভব।’

খানের দাবি, গণতন্ত্র তার পক্ষে আছে। ভোটার সংখ্যা দেখলে বোঝা যায়, নির্বাচন হলে ক্ষমতার দুয়ারে তিনি পা দিয়েই রেখেছেন। ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার পরিচালক সামিনা ইয়াসমিন বলেছেন, ‘তার জনপ্রিয়তা এখন আকাশচুম্বী। তিনি যা-ই বলুন এবং যতই অযৌক্তিক মনে হোক, ক্ষুব্ধ মানুষ তার কথা গোগ্রাসে গিলছে।’ ইসলামাবাদের টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার ওসামা রেহমান বলেন, ‘ইমরান খানই আমাদের সেরা বাজি। তাকে গ্রেপ্তার বা অযোগ্য করা হলে জনগণ রাস্তায় নেমে আসবে।’

প্রধানমন্ত্রী শরীফ অবশ্য তড়িঘড়ি নির্বাচনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২২ মার্চ নির্বাচন কমিশন পাঞ্জাবের ভোটগ্রহণ ৩০ এপ্রিলের বদলে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত পিছিয়েছে। খানের মতে, ‘পাকিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসে নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচনই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সূচনাবিন্দু।’ মার্কিনিরা ভাবে, একটি দরিদ্র, বিদ্রোহ-প্রবণ ইসলামি রাষ্ট্র পরিচালনায় তিনি আদর্শ পছন্দ হতে পারেন। কিন্তু দেশকে টিকিয়ে রাখতে তিনিই কি একমাত্র? হ্যাঁ, তিনি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি অধ্যয়ন করেছেন। ব্রিটেনের ভূমি তার রাজনৈতিক জাগরণের পটভূমি। খান বলেন, ‘যখন আমি ইংল্যান্ডে আসি তখন দেশ ১০ বছরের সামরিক স্বৈরশাসনকবলিত। আইনের শাসন যে মানুষকে মুক্ত করে, এটাই আমি আবিষ্কার করেছি।’ ক্রিকেটের মাঠে যেমন ছিলেন পারদের মতো প্রতিভাধারী। বোর্ড, দর্শক, পর্যটক এবং খেলোয়াড়দের একতাবদ্ধ করে সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে ’৯২ সালে যেমন ক্রিকেট বিশ্বকাপ জিতেছেন। তেমনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন, শরীফের রাজনীতি লাইনচ্যুত করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, ইসলামি মতাদর্শী এবং শক্তিশালী সামরিক বাহিনিকে সমান সংযোগে নিয়ে এসেছেন। ১৯৯৪ সালে মায়ের স্মরণে প্রতিষ্ঠিত লাহোরের শওকত খানম ক্যানসার হাসপাতাল, পাকিস্তানের দরিদ্রদের সেবা প্রদানকারী বৃহত্তম ক্যানসার হাসপাতাল, তার প্রশাসনিক পরিচয়পত্র আরও সমৃদ্ধ করেছে।

১৮-এর নির্বাচনে জয়লাভের আগে টানা ২২ বছর রাজনৈতিক প্রান্তরে কাটিয়েছেন। ক্ষমতায় এসে সাফল্যও পেয়েছেন। কোভিডে প্রতিবেশী ভারতের তুলনায় পাকিস্তানে মৃত্যুর হার তিন ভাগের একভাগ। শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার এক দশক পর তার সময়ে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে ফিরে আসে। তবে ২০২১-এর আগস্টে তালেবানদের ক্ষমতায় ফেরা নিয়ে তিনি বলেন, ‘তারা দাসত্বের ‍শৃঙ্খল ভেঙেছে।’ যৌবনে ইংল্যান্ডের সুপার মডেলদের সঙ্গে কাটালেও পাকিস্তানে যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘নারীদের খাটো পোশাক পুরুষদের ওপর প্রভাব ফেলবেই, যদি না সে রোবট হয়।’ কাশ্মীরে ভারতীয় দখলদারিত্বের অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘পররাষ্ট্রনীতিতে নৈতিকতা শক্তিশালী দেশগুলোর জন্য সংরক্ষিত।’

পাকিস্তানের প্রভাবশালী দুটি পরিবার শরীফ ও ভুট্টো পরিবারকে দুর্নীতির জন্য দায়ী করে বলেন, ‘যদি শাসকগোষ্ঠী আপনার দেশ লুণ্ঠন করে, অর্থ পাচার করে, আর আপনি তাদের জবাবদিহি করতে না পারেন, এর মানে এখানে আইনের শাসন নেই।’ সাংবাদিক ও সমর্থকদের সামনে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানের ওপর ‘প্রভু-দাস’ সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়ার এবং ‘টিস্যু পেপারের’ মতো ব্যবহার করার অভিযোগও করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, খানের এসব মন্তব্যই যুক্তরাষ্ট্র ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক নষ্ট করেছে। খান মনে করেন, পাকিস্তানকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনতে হলে সামরিক প্রতিষ্ঠানের বদলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে ক্ষমতাশালী করার মতো একটি ‘সম্পূর্ণ নতুন সামাজিক চুক্তি’ দরকার। ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের আদর্শ বাস্তবায়নে নবী মুহাম্মদের স. অধীনে মদিনা এবং উত্তর ইউরোপীয়দের সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর বিচারব্যবস্থা সম্ভবত যেকোনো মুসলিম দেশের চেয়ে ইসলামিক আদর্শের অনেক কাছাকাছি।’ বেইজিংয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় ওয়াশিংটন এখন বিবেচনা করে, ভারতের সঙ্গে মার্কিন আত্মীয়তা বাড়লে পাকিস্তান চীনের দিকে ঝুঁকবে। আবার পাকিস্তান গোপনে তালেবানের পক্ষে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে, এটাও মানতে পারে না তারা। পাকিস্তানে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ক্যামেরন মুন্টার বলেছেন, ‘অনেক আমেরিকান বলে যে, আমরা আফগানিস্তানে যুদ্ধ হেরেছি পাকিস্তানিরা আমাদের পিঠে ছুরিকাঘাত করেছে বলে।’ এরপর কী হবে? পিটিআই সমর্থকদের সন্দেহ, বর্তমান সরকার দলকে নিষিদ্ধ করতে পারে। বা অর্থনৈতিক অস্থিরতার অজুহাতে অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচন স্থগিত করতে পারে। খানের দাবি, ‘যারা আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে, তারাই এখন ক্ষমতায়। তারা আতঙ্কিত, আমি যদি ফিরি, তবে তাদের জবাবদিহি করা হবে। তাই তারা আরও বিপজ্জনক।’

লেখক : টাইম ম্যাগাজিনের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা

এশিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের সাক্ষাৎকার গ্রহণের জন্য খ্যাত

অনুবাদ : টাইম অনলাইন থেকে মনযূরুল হক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত