পঙ্কজ ভট্টাচার্য চলে গেলেন চিরতরে। তাকে শেষ বিদায় জানাতে বা শেষবারের মতো প্রাণহীন মুখটাকে দেখতে শহীদ মিনারে উপস্থিত হয়েছিলেন শত শত মানুষ। কারা আসেননি? রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, পরিবেশ আন্দোলনের নেতাকর্মীরা, সমতল ও পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিসত্তার প্রতিনিধিবৃন্দ, প্রবীণ-নবীন সব বয়সী নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকেই এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে। একজন স্বপ্নবান মানুষের প্রস্থানে ব্যথিত শহীদ মিনারে সমবেত সবাই যখন গাইতে শুরু করলেন ‘ধন ধান্য পুষ্প ভরা, আমাদের এই বসুন্ধরা’ তখন কি চোখের কোণে অশ্রু আর বুকের মধ্যে দীর্ঘশ্বাস জমে ওঠেনি? স্বপ্ন দিয়ে তৈরি সে যে স্মৃতি দিয়ে ঘেরা অংশটুকু গাইবার সময় দুঃখময় স্মৃতির কথা যেমন মনের মধ্যে জেগে উঠেছিল, স্বপ্ন হারিয়ে যাওয়ার বেদনাও বেজে উঠেছিল তেমনি করে। সব ছাপিয়ে মনে হয়েছে একটি কথাই যে, পঙ্কজ দা আর ফিরে আসবেন না।
৮৩ বছরের এক গতিময় জীবন ছিল তার। জীবনের প্রথম ৯ বছর ব্রিটিশ শাসনামলে, ২৩ বছর পাকিস্তানি শাসনামলে আর ৫২ বছর বাংলাদেশে কেটেছে তার। পঙ্কজ ভট্টাচার্যের জন্ম চট্টগ্রামের রাউজান থানার নোয়াপাড়া গ্রামে। যেখানে ক্ষণজন্মা পুরুষ অগ্নিযুগের বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনেরও জন্ম। তিনি শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেছেন চট্টগ্রাম ও ঢাকায়। সেই কৈশোরে ’৫৭ সালে ছাত্র আন্দোলনের কারণে চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন তিনি। ১৯৬২-এর ছাত্র আন্দোলন এবং পরবর্তী সময় ৬ ও ১১ দফা গণআন্দোলনের সংগঠক ছিলেন তিনি। ১৯৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধেরও অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাধীনতার পর দুই যুগ তিনি ছিলেন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপের সাধারণ সম্পাদক। ছিলেন গণফোরামেরও অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। পরে ঐক্য ন্যাপ গঠন করে আমৃত্যু তার দায়িত্বে ছিলেন।
নিজের জীবনের নানা বিষয় নিয়ে তার লেখা ‘আমার সেই সব দিন’ বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘আমার বাবার নাম প্রফুল্ল ভট্টাচার্য, তিনি কলকাতার পেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্বর্ণপদকসহ এমএসসিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েছিলেন। তার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। পিতার আদেশ প্রফুল্ল ভট্টাচার্য তার শিক্ষক প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের পায়ের কাছে নিজের কৃতিত্বের স্বর্ণপদকটি রেখে আশীর্বাদ কামনা করেন। প্রফুল্লচন্দ্র তখন জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কী হতে চাও?’ উত্তরে তার বাবা বলেছিলেন, বন্ধুরা বলেছিলেন, আমাকে আইসিএস পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। প্রিয় শিক্ষক প্রফুল্লচন্দ্র নিজের পায়ের খড়ম তুলে তিরস্কার করে বলেছিলেন, ‘ব্রিটিশের পা-চাটা ও গোলাম হওয়ার জন্য তো আমি তোমাকে শিক্ষা দিইনি। শিক্ষকতা করে তুমি হাজার হাজার ছাত্রকে শিক্ষিত দেশপ্রেমিক হিসেবে গড়ে তোল।... বাবা তার কথা শুনে সরকারের আরাম ও সম্মান-মর্যাদার চাকরির সুযোগ ছেড়ে শিক্ষকের আর্থিক কষ্টের জীবনই বেছে নিয়েছিলেন।’ কর্তব্য আর কষ্ট যে হাত ধরাধরি করেই চলে এই শিক্ষা তিনি বাবার জীবন-সংগ্রাম দেখে শিখেছিলেন আর মায়ের জীবন থেকে শিখে নিয়েছিলেন নীরব দায়িত্ব পালনের দায়।
বাবার জীবন তাকে নিজের জীবন ও মানুষের জীবনযাত্রা দেখতে নতুন দৃষ্টি দিয়েছিল। তাই দীক্ষা নিয়েছিলেন দেশের মুক্তি আর মানুষের মুক্তির সংগ্রামে যুক্ত হওয়ার। কৈশোরে প্রতিবাদের যে সূচনা করেছিলেন আজীবন সেই পথেই তিনি ছিলেন। রাজনৈতিক কারণে জীবনে চারবার কারাবরণ করেছেন। তার বিরুদ্ধে ‘স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলা’ দায়ের করা হয়েছিল। এক জেল থেকে আরেক জেলে পাঠানো হতো তাকে। তিনি তার নিজের কথায় বলেছেন, ‘আমার যাপিত জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার কাজে। নিজের বাড়ি আর শ^শুরবাড়ি যাতায়াতের মতো বারবার কারাগারে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। এই রুটিনের বাইরে আত্মগোপনেও থাকতে হয়েছে। এই বিপদসংকুল দিনযাপনের মধ্যেও অব্যাহত রাখতে হয়েছে দলীয় কর্মকা- চালিয়ে যাওয়ার অভ্যাস।’ ব্রিটিশ গেল, পাকিস্তান গেল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো কিন্তু পঙ্কজ ভট্টাচার্যের জীবন থেকে বিপদের ছায়া গেল না। সে ছায়া কখনো হালকা হয়েছে, কখনো ঘন আঁধারে পরিণত হয়েছে পুরোপুরি সরে যায়নি কখনো। এর কারণ তার সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক দর্শন।
রাজনৈতিক কারণে ব্যক্তিগত নানা বেদনাময় অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। কিন্তু একটি ঘটনা তো একেবারে অভূতপূর্ব। সেই মর্মস্পর্শী ঘটনার বর্ণনা তিনি করেছেন তার ‘আমার সেই সব দিন’ বইটিতে ‘চট্টগ্রাম কারাগার থেকে আমাকে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়ার দিন যথারীতি পুলিশ পরিবেষ্টিত হয়ে চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে পৌঁছালাম। ঢাকাগামী গ্রিনঅ্যারো ট্রেনটি তখন সেখানে অপেক্ষারত। দ্বিতীয় শ্রেণির কম্পার্টমেন্টে ওঠার আগে প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দিচ্ছি। হঠাৎ বিপরীত দিকের চাঁদপুরগামী ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে এক অভাবিত দৃশ্যে চোখ আটকে গেল। দেখলাম বাবা-মা-বোনেরা চাঁদপুরগামী ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ওই ট্রেনে ওঠার অপেক্ষায়। অনুমান করতে পারি, তারা চাঁদপুর থেকে লঞ্চে যাবেন প্রথমে গোয়ালন্দে। সেখান থেকে ট্রেনে দর্শনা হয়ে ভারতের গেদে সীমান্ত দিয়ে ভারতে ঢুকে পরে ট্রেনযোগে যাবেন আসানসোলের কাল্লায়, বড় ভাই পরিতোষ ভট্টাচার্যের বাড়িতে। চট্টগ্রাম রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে পুলিশ পরিবেষ্টিত অবস্থায় এই মর্মস্পর্শী দৃশ্য আমি দেখলাম। অদূরে আমার পাশে দাঁড়ানো নজরুলসংগীতশিল্পী সোহরাব হোসেন। তার জিজ্ঞাসার জবাবে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল একটি বাক্য, ‘বাবা-মা-বোনেরা দেশ ছেড়ে দেশান্তরে যাচ্ছেন, আমি যাচ্ছি জেল থেকে জেলান্তরে।’
এই সংগ্রাম করে যে দেশ তিনি পেলেন সেই স্বাধীন দেশে ৫১ বছরে তিনি যা দেখেছেন তা তাকে স্বস্তি দেয়নি মোটেই। সাংবাদিক গোলাম মোর্তুজার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, জনকল্যাণের রাজনীতি, মানুষের জীবন সংশ্লিষ্ট রাজনীতি, মানুষের স্বার্থে, মানুষের জন্য, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের রাজনীতি, শোষণহীন সমাজ-ব্যবস্থার রাজনীতির ধারা আকস্মিকভাবে অনুপস্থিত হয়ে গেল। তার বক্তব্য ছিল, মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক। সেই বাংলাদেশ কেন হোঁচট খাচ্ছে বারবার? বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করে বলেছিলেন, এই জায়গাতেই আমার দুশ্চিন্তা যে, মানুষ-নির্ভর যে রাজনীতিটা আমরা করেছিলাম, জনমুখী যে রাজনীতি চলছিল, সেই রাজনীতিটায় আজ আকস্মিক ছন্দপতন ঘটেছে। আমি পাকিস্তান আমলে নির্বাচন দেখেছি, এখনো নির্বাচন দেখছি। বর্তমান নির্বাচন জনতার সংশ্লিষ্টতাহীন নির্বাচন। এটা গণহীন গণতন্ত্রের নামান্তর। কেউ যদি ঠাট্টা করে বলে এটা রাষ্ট্রায়ত্ত নির্বাচন, সেটা যুক্তি দিয়ে খণ্ডন করা খুব কঠিন। গণহীন গণতন্ত্রের ধারায় কেন দেশ চলবে, সেটা আমার বিস্ময়ের বিষয়। তিনি মনে করতেন এখানেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারার ছন্দপতন ঘটেছে। তাকে ‘গণতন্ত্র না উন্নয়ন’ এই বিতর্ক সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, উন্নয়ন ও গণতন্ত্র মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটা হয় না। এই দুটো জিনিস পরস্পরবিরোধী না। এই দুটো মিলিয়েই হয় উন্নয়ন। গণতন্ত্রহীন উন্নয়ন সাময়িক উন্নয়ন, এর ভিত্তি দুর্বল। তার এই কথা প্রমাণিত হয়, দেশে যে বৈষম্য আর নিপীড়ন বাড়ছে তা দেখলে।
গণতন্ত্র চর্চায় নির্বাচনের ভূমিকার কথা সবাই বলেন। কিন্তু সুষ্ঠু নির্বাচনের আশা কেন দুরাশায় পরিণত হচ্ছে দিনের পর দিন তা নিয়েও জনগণের মাঝে প্রশ্ন আছে। নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা প্রসঙ্গে তার মত ছিল, পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালেও নির্বাচন দেখেছি, এখনো দেখছি। এখন নির্বাচন কমিশনের চেহারাও দেখতে পাচ্ছি। মেরুদণ্ডহীন, আজ্ঞাবহ। পাকিস্তান আমলেও নির্বাচন কমিশনকে এত মেরুদণ্ডহীন মনে হয়নি। ফলে আগামী নির্বাচন নিয়েও অনাস্থা ও আশঙ্কা ছিল তার।
জীবনের শেষ দিনগুলোতে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। নাকে নল লাগিয়েই কথা বলেছেন, বাসাতেই বৈঠক করেছেন। দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিয়ে তার সমালোচনা ছিল যতটা তার চেয়েও বেশি সমালোচনা ছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের বাগাড়ম্বরের ব্যাপারে। তারা তো সবসময়ই বলতে থাকেন আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানের। এই বক্তব্যকে ব্যঙ্গ করে তিনি বলেছিলেন, দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এত ভালো যে, আমার এমপি, মন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি বা বিত্তশালীদের চিকিৎসার জন্য যেতে হয় অন্য দেশে। তিনি কিন্তু সমালোচনা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ভরসা করেছিলেন দেশের হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের ওপরই। অসুস্থতাকে মনের জোর আর ডাক্তারদের পরামর্শে অতিক্রম করতে চেয়েছেন। মৃত্যুর দুদিন আগেও বলেছেন, ও কিছু না, সব ঠিক হয়ে যাবে।
নিজের অসুস্থতা নয়, রাজনৈতিক অসুস্থতা তাকে পীড়িত করেছে বেশি। আওয়ামী লীগের অতীত রাজনীতির ওপর তার আবেগ মিশ্রিত নির্ভরতা ছিল, কিন্তু বর্তমান ভূমিকায় ছিলেন হতাশ ও বিক্ষুব্ধ। অন্যদিকে রাজনৈতিক এই সংকটে বামপন্থিদের ভূমিকা এবং দুর্বলতা নিয়ে তার কষ্ট ছিল, কিছুটা হতাশাও ছিল, সমালোচনাও ছিল যথেষ্ট। তারপরও তিনি ভরসা করতে চেয়েছেন বামপন্থার ওপর। এ ক্ষেত্রে তার ভাবনা ছিল বামদের শক্তিহীনতার কারণ অনুসন্ধান করা এবং দূর করার প্রতি। তিনি মনে করতেন বামপন্থিরা যদি মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে কাছে টেনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিকল্প তৈরি করতে পারে, তাহলে তাদের সফলতা আসবে, দেশের মানুষের ভরসাস্থল তৈরি হবে। তার এই ভাবনা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ভাবনার কেন্দ্রে যে ছিল শ্রমিক,কৃষক, আদিবাসী প্রান্তিক মানুষের জন্য বৈষম্যহীন নিরাপদ বাংলাদেশ সৃষ্টি তাকে তো কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না।
তার শেষযাত্রায় যে গান গেয়েছেন সবাই মিলে সে গানে একটা চরণ ছিল, আমার এই দেশেতে জন্ম যেন, এই দেশেতে মরি। পঙ্কজ ভট্টাচার্য শুধু এই দেশেতে জন্মেছিলেন তাই নয়, দেশের স্বাধীনতার সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। দেশের প্রতিটি সংকটকালেই মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন আর এই দেশেতেই তার মৃত্যু হলো। স্বপ্ন দেখেছেন স্বাধীন দেশের, লড়াই করেছেন মানুষের স্বাধীনতার জন্য কিন্তু স্বপ্নের পরিপূর্ণতা আসেনি। তিনি যে বেদনা নিয়ে গেলেন তা মহৎ, কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অপূর্ণ স্বপ্ন বাস্তবায়নের দায়িত্ব।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
[email protected]