বছরজুড়ে মনে রাখা রোজার কথা

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৩, ১০:২৭ পিএম

পবিত্র রমজান মাস শেষ হয়ে গেল। এটাই স্বাভাবিক যে, রমজান আসবে; যাবে। কিন্তু রমজানের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, সেগুলোর কিছুটা যদি রোজা পরবর্তী সময়ে আমরা জীবনে ধারণ করতে পারি, তাহলেই সার্থকতা।

রমজানের কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো মানুষ অন্যসময় না করতে পারলেও রমজানে অর্জন করেন। এর কিছু বিষয় মুসলমানদের জন্য সব সময়ই করণীয়। রমজানে সেগুলো আরও গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। ওই গুণাবলির কিছু যদি সামনের এগারো মাস ধারণ করা যায়, তাহলে রমজানের স্মৃতি বাকি থাকবে এবং জীবন ফলপ্রসূ হবে।

তেমনই একটি বৈশিষ্ট্য হলো- ধৈর্য। ধৈর্য রোজাদারের অন্যতম গুণ। চাই সে উঁচু মানের রোজাদার হোক বা সাধারণ মানের, অধিক তাকওয়াবান হোক আর কম তাকওয়াওবান। ধৈর্যের গুণ তার মধ্যে পরিপূর্ণভাবেই থাকে। ইসলামি স্কলাররা ধৈর্যের ব্যাখ্যায় কিছু প্রকারভেদ উল্লেখ করেছেন।

এক. ইবাদতের ওপর ধৈর্যধারণ করা। আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হয়। মসজিদে আসতে হয়। রোজা রাখতে হয়। জাকাত দিতে হয়। এই ধরনের ইবাদত করতে গিয়ে মানুষের শারীরিক প্রস্তুতিসহ অনেক প্রস্তুতি লাগে। ইবাদতের জন্য একটা ধৈর্য লাগে।

দুই. শরিয়ত অনেক কিছু থেকে মুসলমানদের নিষেধ করেছে। এসব থেকে বাঁচতে হলে কষ্ট হয়। তো কষ্ট হলেও ওই নিষিদ্ধ কাজগুলো থেকে বিরত থাকা। এটা ধৈর্য ও সবরের পরিচয়।

তিন. মানুষের জীবনে কষ্ট-ক্লেশ আসে। কত রকমের আপদ-বিপদ আসে। জুলুম-নির্যাতন আসে। পরাধীনতার কষ্ট আসে। তখন তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এ কঠিন সময়েও শরিয়তের আওতাধীন থেকে ধৈর্য ও সবরের পরিচয় দেওয়া।

সবরের এ তিনটা গুণ একসঙ্গে রোজাদারের মধ্যে পাওয়া যায়। রোজাদার আল্লাহর বিধান পালন করে রোজা রাখছে। এক্ষেত্রে সে ইবাদতের ওপর সবর করল। রোজা রাখতে গিয়ে তাকে অনেক ধরনের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকতে হয়। এজন্য সবরের দ্বিতীয় প্রকারও তার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। রোজা রাখতে গিয়ে দিনের মধ্যভাগ ও শেষভাগের দিকে তার অনেক কষ্ট-ক্লেশ হয়। তাহলে সবরের তৃতীয় প্রকারও তার কাছে পাওয়া গেল।

মোটকথা, সবরের গুণটি রোজাদারের মধ্যে উপস্থিত থাকে। এটা যে কোনো রোজাদারের মধ্যেই থাকে। যদি সে নিয়ত করে রোজা রাখে, তাহলে এসব গুণ তার মধ্যে একসঙ্গে পাওয়া যাবে। ধৈর্য মানব জীবনের জন্য, বিশেষত একজন মুসলমানের জন্য অপরিহার্য বিষয়, যা তাকে তার জীবনে অনেক গোনাহ ও সমস্যা থেকে রক্ষা করে। সে অযাচিত ক্রোধান্বিত হয়ে নিজের ক্ষতি টেনে আনা থেকে রক্ষা পায়। সেই সবরের পুরো শিক্ষাই রয়েছে রোজার মধ্যে।

সবরের গুণটি যদি আমরা রোজার বাইরের এগারো মাস ধারণ করতে পারি তাহলে একজন সত্যিকারের মুসলিম হিসেবে আমাদের পথচলা আরও সহজ এবং সফল হবে- ইনশাআল্লাহ।

রোজাদারের আরেকটি গুণ সত্যবাদিতা। সত্যবাদিতার অর্থ হলো- ভেতর ও বাহির এক হওয়া। এটা আমরা বরাবরই শুনি এবং পড়ি, রোজাদারকে আল্লাহতায়ালা বিশেষ সওয়াব দেবেন। আলাদাভাবে নিজে রোজাদারের প্রতিদান দেওয়ার ঘোষণা করেছেন। এটি কেন? এটি ওই সত্যবাদিতার কারণে।

অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে লৌকিকতা কিংবা মুনাফেকি সম্ভব। কিন্তু রোজার মধ্যে লৌকিকতা-মুনাফেকি সম্ভব নয়। কারণ রোজাদার মানুষের সামনে উপবাস থেকে গোপন জায়গায় গিয়ে কিছু খেতে পারে। কে দেখবে? কিন্তু সেটা রোজাদার করে না। তার মানে হলো- রোজাদার ভেতর ও বাহিরকে এক রাখে। সে নেফাকমুক্ত থাকে। বলতে গেলে সারা দিন ইবাদতে থেকেও সে রিয়ামুক্ত (লোক দেখানো মনোভাব থেকে মুক্ত) থাকে। যদিও ওপরে ওপরে মানুষও দেখে সে রোজাদার, কিন্তু আসলেই সে রিয়ামুক্ত। কারণ সে তো গোপন স্থানে গিয়ে খাচ্ছে না। সত্যবাদিতা মুমিনের অন্যতম গুণ। আর তা একজন রোজাদারের মধ্যে শতভাগ উপস্থিত। এই সত্যবাদিতার গুণ ধারণ করা একজন মুমিনের অবশ্য কর্তব্য।

মুমিন রোজার পরেও যখন তার অন্যান্য আমল ও কার্যক্রমে বা জীবন চলায় সত্যবাদিতাকে ধারণ করবে, নেফাক তথা কপটতা এড়িয়ে চলবে তখন মনে হবে সে যেন রোজার স্মৃতিই ধারণ করছে।

মুমিন বান্দা মানুষের সঙ্গে কথাবার্তায় সুভাষী হবে। কাউকে গালমন্দ করবে না। নির্দেশটি রোজাদারের জন্য বেশি করে প্রযোজ্য। রোজাদারের রোজা পরিপূর্ণতা পাওয়ার জন্য এবং তার সওয়াব পরিপূর্ণ হওয়ার জন্য তাকে অনেক কিছু থেকে বেঁচে থাকতে হয়। যেমন সে কাউকে বকা দিতে পারে না, গালমন্দ করতে পারে না। পরনিন্দা করতে পারে না। রোজাদারের প্রতি নিদের্শ হলো- কেউ তাকে বকা দিলে, গালমন্দ করলে সে বলবে, আমি রোজাদার।

মুমিন তার জীবন চলায় এ গুণ ধারণ করবে। রোজার পরেও সে কাউকে গালমন্দ করবে না, কেউ তাকে গালমন্দ করলে সে তা এড়িয়ে যাবে। এটা রোজাদারের জন্য কঠিন কিছু নয়।

কারণ রোজাদারের গুণাবলির মধ্যে আছে প্রবল ইচ্ছাশক্তি। রোজাদার রোজা রাখতে পারত না, যদি তার ইচ্ছাশক্তি মজবুত না হতো। আমরা তো কিছুটা সহজ রোজাই রাখি। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ফোন করে। অনেক দেশেই আঠারো থেকে বাইশ ঘণ্টার রোজা হয়। আল্লাহর বান্দারা তা পালনে কুণ্ঠাবোধ করে না। এটি কীভাবে সম্ভব? রাত-দিনের দু-তিনটি ঘণ্টা ছাড়া পুরো সময় পানাহার ইত্যাদি থেকে বিরত থাকা যেনতেন কথা নয়! তা মূলত সম্ভব হয় মুমিনের ইচ্ছাশক্তি ও আল্লাহর ওপর ভরসা এবং আস্থার ওপর ভর করে।

আশ্চর্যের কথা হলো, এই ইচ্ছাশক্তি শিশুদের মধ্যেও দেখা যায়। ঘরে ঘরে ৬ থেকে ৭ বছরের বাচ্চারা রোজা রাখে। তাদের অনেকে তো মা-বাবার অমতেও রোজা রাখে। অন্য কিছু করুক আর না করুক রোজা রাখবেই। এই ইচ্ছাশক্তি মুমিনের জীবন চলার জন্য অতি জরুরি। সামনের দিনগুলোতে মুমিনকে তার ইমানের ওপর, তার ওই ইচ্ছাশক্তির ওপর টিকে থাকতে হবে এবং মুমিনের অন্যান্য কার্যক্রম সহিহভাবে পরিচালনার জন্য এই ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন অনেক বেশি।

এমন বৈশিষ্ট্য রোজা ও রোজাদারের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। যদি সে এগুলোকে রোজা পরবর্তী সময়ে সক্রিয় রাখে তাহলে জীবনটা সুন্দর হবে।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত