সরকারি চাকুরেদের স্যার সম্বোধন করা হোক বা না-ই হোক, তাদের পদের বিপরীতে কী কাজ করতে হয় তা সুনির্দিষ্টভাবে লিখিতই থাকে; এ লিখিত তালিকার বাইরেও আকস্মিক পরিস্থিতির কারণে একটি দুটি বিষয়ের উদ্ভব হতে পারে যা মাঠের চাকরিতে ইউএনওকে সামাল দিতে হয়।
আমি ১৯৮০’র দশকে দু’বছর ইউএনও হিসেবে চাকরি করেছি, সময় অনেকটা এগিয়ে গেলে কাজের ধরন সম্পর্কে আমার একটা ধারণা যেমন আছে তেমনি চাকরিরত ঐক্যের কারণে ইউএনওদের প্রতি আমি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল। ইউএনওদের ইগো সমস্যা থেকে শুরু কিছু কিছু বেআইনি পদক্ষেপের সংবাদ হামেশাই খবরের কাগজে আসে। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত কাহিনিটি অনেককেই বিচলিত করেছে, দুটো প্রশ্নের উদ্ভবও ঘটিয়েছে।
১. অন্যের নেওয়া ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব কি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের?
২. কোনো ভিকটিমের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করতে দর কষাকষি করার দায়িত্বও কি উপজেলা নির্বাহী অফিসারের?
রাষ্ট্রীয়ভাবে এ দুটো বিষয় ইউএনওর কার্যতালিকাভুক্ত না হওয়া পর্যন্ত এ ধরনের কাজ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবেই চিহ্নিত হবে। আর এটাও অনুমেয় অন্যায় কাজ ইউএনওর জন্য ডেসক্রিপশনে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। মাঠ প্রশাসন ও রাজনীতি এবং সামাজিক গতিময়তা ও রূপান্তর নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের জন্য উত্তরবঙ্গের একটি উপজেলার ঘুষ ফেরত দেওয়ার কাহিনিটি একটি কৌতূহলোদ্দীপক কেইস স্টাডি হতে পারে।
দেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজরে থাকা একটি অগ্রাধিবার প্রকল্প হচ্ছে ‘আশ্রয়ণ’। ছিন্নমূল মানুষকে একটি স্থায়ী ঠিকানা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্যোগ এই প্রকল্প। এর পূর্বসূরি প্রকল্প গুচ্ছগ্রাম ১৯৮০’র দশকের শেষার্ধে শুরু হয়েছিল। আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘর পেলে ছিন্নমূল পরিবারের এক দফায় প্রায় পাঁচ লাখ টাকার সম্পদ হাতে এসে যায়। আর পাঁচ লাখ পেতে মাত্র এক-দশমাংশ পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ এমন বড় কিছু নয়।
কয়েকটি পত্রিকায় প্রকাশিত ঘুষ ফেরতের কাহিনির সারসংক্ষেপ: আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর পেতে উত্তরবঙ্গের সেই উপজেলার রাজনৈতিক নেতা ঘুষ হিসেবে ঘরপ্রতি ৫০ হাজার টাকা দাবি করেন। সে দাবি মেনে অনেকেই তাকে দাবিকৃত টাকা প্রদান করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিশ্রুত ঘর যারা পেয়েছেন তাদের বেলায় ব্যাপারটা খেল খতম টাকা হজম এ নিয়ে মাতামাতি হওয়ার কোনো কারণ নেই। কিন্তু টাকা দিয়েও যারা পাননি তাদের কেউ কেউ বিব্রতকর সমস্যার সৃষ্টি করেছেন, দুজন আবার আদালতে মামলা করে দিয়েছেন।
ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য ইউএনও সাতজন নারীকে তার বাসভবনে আমন্ত্রণ জানান। তারা যথারীতি আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন। ইউএনও তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন এবং ঘুষের টাকা ফেরত দেওয়ার কথা গোপন রাখার শর্তে ঘুষ হিসেবে গৃহীত অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশই ফেরত দেন। আমন্ত্রিত সাত নারীর চারজন মাথাপিছু পঞ্চাশ হাজার টাকা করে ফেরত পান এবং একজন ফেরত পান চল্লিশ হাজার।
আবার দুই নারীকে ইউএনও আশ্বাস দিয়েছেন তাদের দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার করে এলেই কেবল তারা টাকা পাবেন। অন্যথায় নয়। সংবাদে উল্লেখ করা হয় দুই নারীর মামলার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জেলা প্রশাসনের নজরে আসায় এটি আলোচনায় আসে, জেলা থেকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এসে অভিযোগকারী ভিকটিমদের শুনানি গ্রহণ করেন, তিনি যথার্থ কাজটিই করেছেন। শুনানি শেষে তিনি নিশ্চয়ই সুরাহার আশ্বাসও দিয়েছেন। শুনানি একপক্ষীয়, অভিযুক্ত নেতা উপস্থিত ছিলেন না। ইউএনও যখন টাকা হস্তান্তর করছিলেন সাংবাদিক জড়ো হওয়ায় সম্ভবত তার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টির আশঙ্কায় তার আমন্ত্রিতদের মই বেয়ে দেয়াল টপকে চলে যাওয়ার আয়োজন করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য তারা ঠিকই সাংবাদিকদের মোকাবিলা করেন এবং ইউএনওর কাছ থেকে গ্রহণ করা টাকার বান্ডিলও প্রদর্শন করেন। বিষয়টি গোপন রাখার জন্য ইউএনও তাদের যত অনুরোধই করে থাকুন না তারা প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করেছেন এবং প্রায় সব কথাই বলে দিয়েছেন।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসা সংবাদটি দুটি মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দিলেও অনেকগুলো অনুপেক্ষণীয় পাশর্^ প্রশ্নের উদগম ঘটিয়েছে যা কেবল প্রশ্ন নয় সব ইউএনও তথা পাবলিক অফিসে কর্মরত সবার জন্য একটি সতর্কবার্তাও রেখে গেছে। ঘুষের অর্থ ফেরত দেওয়ার এই বিষয়টি সম্পর্কে আমার মন্তব্য জানতে চেয়ে একজন কৌতূহলী আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি নেতা ও ইউএনওর যৌথভাবে গৃহীত ঘুষ নয়?
সংবাদটি তখনো আমার পাঠ করা হয়নি বলে তাৎক্ষণিক জবাব দিতে পারিনি। কিন্তু পাঠ করার পর মনে হয়েছে এটি অত্যন্ত যৌক্তিক প্রশ্ন। নিজের ভাগের অর্থ হোক কি পুরোটাই নেতার নেওয়া ঘুষ হোক, ঘুষের টাকা হাতে নিয়ে তিনি অন্যায় করেছেন। চুরির অর্থ জেনেশুনে যিনি পরিবহন করেন তিনি চোরের সমপর্যায়েরই অপরাধী, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনের প্রয়োগই কাম্য। ঘুষের ব্যাপারটাও এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয়। যদি ধরেই নেওয়া হয় ইউএনওর ‘ঘুষের টাকা’ ফেরত দেওয়ার মধ্যে কোনো ভাগাভাগির ব্যাপার নেই, পুরোটাই নেতার দায় তাহলে কয়েকটি অবধারিত প্রশ্নের জবাব দিতেই হয়:
ক. আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউএনও কি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ নন?
খ. যে নেতা ঘুষ নিয়েছেন প্রকারান্তরে নিজ হাতে ঘুষের টাকা ফেরত দিয়ে নেতার ঘুষ গ্রহণের স্বীকারোক্তি কি তিনি দিলেন না?
গ. কোনো প্রশাসনিক বা নৈতিক দুর্বলতার কারণে এই স্বীকারোক্তি কি অপরাধীকে না দিয়ে ইউএনওকে দিতে হচ্ছে?
ঘ. ইউএনও যখন ঘুষ গ্রহীতাকে শনাক্তই করেছেন অন্তত নিজেকে পরিচ্ছন্ন রাখতে তার বিরুদ্ধে কি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন?
ঙ. তার প্রশাসনিক অধিক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণকারী কিন্তু পরবর্তী সময় ধরা পড়ে যাওয়া অন্যান্য অপরাধীর দায়ও কি একইভাবে গ্রহণ করবেন?
এবার তহবিলের প্রশ্ন। আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে অতি সামান্য পরিমাণ অর্থ ও ত্রাণ থাকতে পারে, এর বেশি নয়। এ অর্থ দিয়ে অন্যের গ্রহণ করা ঘুষের সমন্বয় করার সুযোগ নেই। তাহলে অর্থ পরিশোধের তহবিল সেই ঘুষ গ্রহীতাই সরবরাহ করেছেন বলে মনে করা সমীচীন। সেই ঘুষ গ্রহীতার কাছ থেকে যে উদ্দেশ্যেই হোক অর্থগ্রহণ কি ইউএনওর ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়নি?
এটা অনুধাবন করাই যুক্তিসম্মত যে ঘুষ দিয়েও আশ্রয়ণের ঘর না পেয়ে প্রতারিত হওয়ার ঘটনাটি যদি ওপর মহলের নজরে পড়ত, যদি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শুনানি গ্রহণ করতে না আসতেন হয়তো প্রতারিত সাত নারীর ঘুষের অর্থও ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতো না। তারা চিরপ্রতারিতই থেকে যেতেন।
যে দুজন নারী মামলা দায়ের করেছেন সে মামলা সম্পর্কে কোনো পত্রিকাতেই বিস্তারিত কিছু পাইনি। তারা কি কেবল ঘুষ গ্রহণকারী নেতার বিরুদ্ধেই মামলা করেছেন নাকি মামলায় অভিযুক্ত আরও কেউ আছেন? সরকার কি বিবাদী? জানা দরকার।
নতুবা ঘুষ গ্রহণকারী নেতার পক্ষে মামলা প্রত্যাহারের চাপ ইউএনও কেন দিতে যাবেন?
ইউএনও কোনো শিক্ষানবিশ চাকুরে নন। আইনকানুন শিখে, নির্বাহী হাকিমি করে তাকে এ পদে আসীন হতে হয়। খুব সহজ একটি প্রশ্ন রাখছি। এক চোর ইউএনওর বাড়িতে ঢুকে ১০ হাজার টাকা চুরি করে পালিয়ে যায়। (কিছুকাল আগে এক ইউএনওর বাড়ি থেকে ৩০ বা ৩৫ লাখ টাকা চুরির খবর ছাপা হয়েছিল এত টাকা নির্ধারিত বেতনের একজন সরকারি চাকুরের বাড়িতে কেমন করে এলো এ প্রশ্নটাই বড় হওয়ার কথা ছিল, হয়নি)। কদিন পর এই চোর ধরা পড়ে এবং ইউএনওর বাড়ি থেকে নেওয়া সেই দশ হাজার টাকার বান্ডিলটিই তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। রিমান্ডে নিতে হয়নি, এমনিতেই চোর স্বীকার করে নেয় যে এ টাকাটা ইউএনওর বাসা থেকেই চুরি করেছিল এবং তা ইউএনওকে এখন ফেরত দিয়ে দেবে।
ইউএনও দশ হাজার টাকা নিয়ে চোরের সঙ্গে শেকহ্যান্ড করে তাকে ছেড়ে দেবেন? এখানে প্রাপ্ত টাকাটা হচ্ছে আলামত। এটা ফেরত দিয়ে দিলেই কি চুরির অপরাধ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল? ইউএনও এই চোরকে স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জেল খাটাবেন। কিন্তু ঘুষ গ্রহীতার বেলায় তিনি এত নমনীয় হলেন কেন? অন্যের ঘুষ গ্রহণের অপরাধ মার্জনা করার কোনো আইনি ক্ষমতা কি ইউএনওর আছে? এ ধরনের কার্যক্রম প্রশাসন সম্পর্কে, রাষ্ট্রের নির্বাহী কার্যক্রম সম্পর্কে জাতিকে ভুয়া বার্তা দেয়।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই ঘুষের অংশীদারত্বে ইউএনও নেই; ইউএনও প্রতারিত নারীদের কেবল সহায়তা করতে চেয়েছেন। প্রতারককে যতক্ষণ তার ছত্রছায়ায় রাখছেন, যতক্ষণ তাকে আইনের কাছে সোপর্দ না করছেন আমাদের বিশ^াস দৃঢ় হবে না, প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের বাস্তবায়নে বাস্তবায়নকারীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন থেকে যাবে।
* * *
আর একটি খবর। এটাও ইউএনও নিয়ে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের জমি নির্বাচন করতে গিয়েছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এটা যথাযর্থই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাজ। প্রাথমিকভাবে শনাক্তকৃত ভূ-খন্ডের অধিকাংশ খাস জমি। তবে এর মধ্যে কিছু জমি ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হয়ে আছে। হতে পারে এগুলো বাস্তবিকই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি, কিংবা ভূমি রেকর্ডের সময় ঘুষ পেয়ে সরকারি কর্মচারীরাই ব্যক্তি মালিকের নামে রেকর্ড করে দিয়ে এসেছেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসেছিলেন যাতে ওই অংশটুকু চিহ্নিত করে তাতে আশ্রয়ণের কাজ শুরু করতে। ঘটনাস্থলে ইউএনও সহিংস বাধার সম্মুখীন হন, তাকে বহনকারী সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। আহত হন আরও কেউ কেউ।
মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে যাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে তারা জানেন এ ধরনের প্রতিরোধের পেছনে কাজ করেন প্রভাবশালী, ক্ষমতাকাঠামোর কাছাকাছি থাকা কিছু ভূমি মাফিয়া। এরা নিজেদের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেন এমপির লোক, মন্ত্রীর লোক হিসেবে।
এই ইউএনওর বেলায় তার সদিচ্ছার প্রশংসা করলেও তার ঝুঁকির হিসাব (রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট) যে যথার্থ হয়নি তা বলাই যাবে। মাঠ প্রশাসনের ইউএনওর কাজ আশির দশকে আমি যেমন পেয়েছি, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। আর এই ঝুঁকির সৃষ্টি হয়েছে আমলাদের আগ-বাড়ানো রাজনীতিবান্ধব হওয়ার কারণে। আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকরণ করতে রাজনৈতিক দল যতটা না এগিয়ে আসে তার চেয়ে বেশি এগিয়ে যান আমলারাই রাজনীতিকীকৃত হতে।
* * *
১৯৮০-র দশকের শেষার্ধে একজন রাজনৈতিক নেতা বর্ষীয়ান ইউএনওকে লাঞ্ছিত করেছেন, মা-বাপ তুলে গালও দিয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক নেতার প্রতি নিন্দা জ্ঞাপন করা বিসিএস প্রশাসন অ্যাসোসিয়েশনের জন্য অপরিহার্য ছিল। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায় ইউএনওর তত্ত্বাবধানে অপর একটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থীর পোস্টার লাগানো হচ্ছিল। তিনিও তাতে হাত লাগিয়েছেন। ইউএনওর এই অনাকাক্সিক্ষত অংশগ্রহণের কারণেই শেষ পর্যন্ত আর নিন্দা জ্ঞাপন করা হয়নি। কেউ কেউ এমনও মন্তব্য করেছেন- এটা তার প্রাপ্যই ছিল।
লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট