তবুও শান্তি তবু আনন্দ

আপডেট : ২৪ মে ২০২৩, ১০:২৩ পিএম

মনুসংহিতায় চতুরাশ্রমের তৃতীয় আশ্রম ‘বানপ্রস্থ’ কি কেবলই একটা ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক এষণা, নাকি নীরবে ও শান্তিপূর্ণভাবে সামাজিক ক্ষমতা হস্তান্তর। অন্যভাবে বললে সংসারের বোঝা নামিয়ে বা দায়িত্ব শেষ করে নিজেকে সময় দেওয়ার, ফেলে আসা জীবনকে অবসরে উদযাপনের সুযোগ।

পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী বলেছেন, ‘শাস্ত্রকারেরা যখন বানপ্রস্থের বিধান দিচ্ছেন, তখন তার পেছনে একটা সামাজিক কারণ ছিল। তার থেকেও বড় ব্যাপার, ব্যক্তিত্বের সংঘাত এড়ানোর জন্য বদলে যাওয়া পৃথিবীকে নতুন প্রজন্মের হাতে সমর্পণ করে বনবাসী হওয়ার ওই বিধান দেওয়া হয়েছিল।’ আজকের ভাষায় বলতে গেলে, ছেলেমেয়েকে তাদের সময় ও সংসার যাপনে অন্তরায় বা বোঝা যেন হতে না হয়, তার জন্যই ওই বানপ্রস্থের বিধান।

এ কালের ‘বানপ্রস্থ’দের দেখা মেলে বৃদ্ধাশ্রমে। বৃদ্ধাশ্রম, ওল্ডহোম, প্রবীণনিবাস শব্দগুলো শুনলেই আমার ‘অ্যাপল ট্রি’-এর কথা মনে পড়ে। এক বড় ভাই একদিন ফোনে ডেকে নিয়ে তাদের এই প্রতিষ্ঠানটির গল্প শোনান। এটা একটি নেক্সট জেনারেশন ওল্ডহোম কনসেপ্ট। ঢাকা শহরেই বেড়ে ওঠা ও বসবাসরত ৬/৭ জন বন্ধু মিলে এই প্রতিষ্ঠানটি গড়ার কথা ভাবছিলেন। তারা সবাই কর্মক্ষেত্রে সফল অর্থেই প্রতিষ্ঠিত। তারা চান না, বৃদ্ধ বয়সে তাদের কথা চিন্তা করে সন্তানরা যেন নিজেদের মবিলিটিকে সংকুচিত করে। তারা মনে করেন, সন্তানরা যে যার মতো প্রতিষ্ঠা পাক, পেশা বেছে নিক, পৃথিবীর যে কোনো স্থানে প্রয়োজন, সুবিধা ও পছন্দমতো আবাস গড়ে নিক। তাদের এই বেছে নেওয়ার পেছনে পিছুটান হয়ে থাকতে চান না তারা। আইডিয়া হিসেবে খুবই চমৎকার। জানতে চাইলাম, তার মানে আপনারা কি অবসর নিলে সবাই পরিবার ছেড়ে আপনাদের আপেল গাছের তলে আশ্রয় নেবেন, ছেলেমেয়েরা মানবে। তিনি বললেন, ব্যাপারটা তেমন না। প্রতিষ্ঠানটি করে সন্তানদের এই বার্তাই দিতে চান যে- তোমাদের জন্য আমরা বোঝা নই। তাদের যেন কখনই মনে না হয় বা শুনতে না হয় যে, দেখো বাবা-মাকে একা ফেলে রেখে তারা নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়ে আছে। সেই বড় ভাই সব শেষে যা বললেন, দিন-দুনিয়ার সব কাজ, দায়িত্ব, সাফল্য, ব্যর্থতা তো দিন শেষে বন্ধুদের সঙ্গেই শেয়ার করে, খোশগল্প করে বেশি সুখ আমাদের, বুড়ো-বুড়িদেরও তাই।

কিছুদিন আগে আমরা মা দিবস পালন করলাম। সামনে আছে বাবা দিবস। আছে প্রবীণ দিবসও। এসব দিবসে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘বৃদ্ধাশ্রম’ আলোচনায় আসে। নানারকম প্রতিবেদন হয়, পোস্ট দেওয়া হয়। এসবে মূল সুর থাকে অবহেলার, করুণার। সম্প্রতি অকৃতদার কবি হেলাল হাফিজের অসুস্থতাও এমন আলাপের সূত্র হয়েছিল। আমাদের সমাজে কোনো এক অজ্ঞাত কারণে প্রবীণদের, বৃদ্ধদের অত্যন্ত করুণার চোখে দেখা হয়। সরকারি অফিসে কোনো কাজ নিয়ে গেলে শুনতে হয়, আপনি একা কেন এসেছেন, আপনার ছেলেমেয়ে কোথায়। যেন তারা বয়স্ক হয়েছেন মানেই যাবতীয় কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। সেই মানসিকতারই প্রকাশ ঘটে বৃদ্ধাশ্রম সম্পর্কে চিন্তাভাবনায়। বৃদ্ধাশ্রম মানেই যেন এক চিলতে চৌকিতে শুয়ে অবহেলা আর অনাদরে মৃত্যুর প্রতীক্ষা করা। অথচ আদপেই ব্যাপারটা তেমন নয়। কিছু ঘটনা হয়তো আছে যা অমানবিক, কিন্তু সব গল্প এক নয়। যেমন যে কোনো যুদ্ধে ব্যক্তি, সমাজ, নৈতিকতার চূড়ান্ত ক্ষতি হলেও; যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মাণ করা প্রায় সব সিনেমায় একটি প্রেমের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়Ñ তেমনি বৃদ্ধাশ্রম-কেন্দ্রিক আমাদের প্রচারণা ও আলাপ-আলোচনায় একটি অবহেলার, করুণার গল্পই খোঁজা হয়। ফলে অনেকে যে বৃদ্ধাশ্রমে নতুন করে বাঁচতে আসেন, সেই গল্পটা অজানা থেকে যায়।

‘জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বলছে, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯। মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। জনশুমারি বলছে, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কম। অন্যদিকে প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি। জাতিসংঘের জনসংখ্যা উন্নয়ন তহবিলের প্রাক্কলন বলছে, ২০২৫-২৬ সালে প্রবীণের সংখ্যা হবে ২ কোটি। ২০৫০ সালে ওই সংখ্যা হবে সাড়ে ৪ কোটি, যা তখনকার জনসংখ্যার ২১ শতাংশ হবে। ফলে আমাদের সেভাবে প্রস্তুতিও নিতে হবে। আমাদের দেশের যৌথ পরিবারের হই-হুল্লোড়ের মধ্যে আগে যখন শুনতাম বিদেশে নাকি বুড়ো হলে মা-বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে আসে, তখন ওসব দেশের লোকদের প্রতি ঘৃণা ও করুণা হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। এখন বৃদ্ধাশ্রম বা প্রবীণনিবাস সময়ের দাবি। আমাদের লক্ষ্য রাখা উচিত বৃদ্ধাশ্রমগুলো যেন বয়স্কদের অবহেলা না করে। ধরলাম, স্বজনদের অবহেলায় কেউ বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে এসেছেন টাকার বিনিময়ে। এখানে ওই বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার স্বজনদের অবহেলার সামাজিক বিচার করার চেয়ে শেষ বয়সে তিনি যেন টাকা দিয়ে যে সেবা কিনছেন তার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাই গুরুত্বপূর্ণ। আবার তার স্বজনদের অবহেলার কথা তুলে ধরে তাকে ভালনারেবল করে তোলার দরকারটা কী? এতে কি ওইসব বৃদ্ধাশ্রম, যারা টাকা নিয়েছে কিন্তু সেবা দিচ্ছে না তাদের অপরাধ আড়াল করে সেই বৃদ্ধ লোকটিকেই ঠকানোর সামাজিক পরিসর তৈরি হয় না?

আশার কথা আমাদের দেশেও বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে আতঙ্ক বা ছুঁতমার্গের দিন শেষ হয়ে আসছে। কিছুদিন পর প্রবীণনিবাস প্রবীণদের কাছে ঈপ্সিত হয়ে উঠবে বলেও অনেকে বিশ্বাস করেন। কারণ, নিবাসগুলো যত দিন যাচ্ছে, ততই চাহিদাভিত্তিক সুযোগ-সুবিধা নিয়ে হাজির হচ্ছে। উন্নত বিশ্বের আদলে নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বইপড়া, বিনোদন, ঘুরে বেড়ানো সবই থাকছে এখানে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় দেশের ছয়টি বিভাগীয় সদরে প্রবীণনিবাস আছে বলে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি জানান। প্রতিটিতে ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে। যাদের টাকা আছে, তারা হয়তো বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমের সেবা নিতে পারবেন কিন্তু আর্থিকভাবে অসচ্ছলদের ক্ষেত্রে? তাই প্রতিটি উপজেলায় প্রবীণদের সরকারি আবাস গড়ে তোলা দরকার। প্রবীণদের জন্য সর্বজনীন পেনশন ভাতায়ও সীমাবদ্ধতা আছে। প্রবীণদের সম্পদ হিসেবে ভাবতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, জনসংখ্যার যে জনমিতির সুবিধা এখন বাংলাদেশে আছে, তা ৩০ থেকে ৩৫ বছর পর আর থাকবে না। এই প্রবীণদের কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা এখন থেকেই ভাবতে হবে। ভাতা দেওয়ার পরিবর্তে কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ ফাউন্ডেশন গঠনের পরামর্শ দেন তারা। জন্মহার কমাতে কমাতে চীন-জাপানকে এখন বৃদ্ধদের দেশ বলে বিবেচনা করা হয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর ২৬ শতাংশ অপুষ্টিতে ভুগছেন, এবং ৬২ শতাংশ রয়েছেন অপুষ্টির ঝুঁকিতে। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রবীণদের মধ্যে যারা সঙ্গী ছাড়া জীবন কাটাচ্ছেন তাদের মধ্যে অপুষ্টি এবং অপুষ্টির ঝুঁকির মাত্রা ছিল যথাক্রমে ২৮.৬ এবং ৬৫.৩ শতাংশ। যাদের মানসিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক (১২.৫ শতাংশ) তাদের তুলনায় যারা হতাশাগ্রস্ত (৩৯.৩ শতাংশ) তাদের মধ্যে অপুষ্টির মাত্রা বেশি দেখা গেছে। ভারতের মুম্বাইয়ে প্রবীণদের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে বৃদ্ধাশ্রম বা ওল্ডহোমে যেসব বয়স্ক ব্যক্তি থাকেন, তাদের চেয়ে ছেলেমেয়ে বা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে থাকা বৃদ্ধরা বেশি বিষন্নতা ও হতাশায় ভোগেন। ওই একই গবেষণায় বলা হয়েছে, ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে হয়তো বয়স্করা থাকতে চান কিন্তু প্রবীণরা তাদের বয়সীদের সঙ্গেই বেশি কোয়ালিটি টাইম কাটান। এক্ষেত্রে, গৃহবাসী কিন্তু একাকিত্বের শিকার হওয়ার চেয়ে বয়স্করা প্রবীণনিবাসেই ভালো থাকেন। কারণ সেখানে নিজের সময়ের মানুষের সঙ্গে সামাজিক গল্প থাকে।

এ কথা ঠিক যে টিভি, গিজার, ইন্টারনেট কানেকশন ইত্যাদি অত্যাধুনিক ব্যবস্থাসহ এইসব বৃদ্ধাবাসগুলোতে থাকার জন্য একটা ন্যূনতম আর্থিক সামর্থ্য জরুরি। জীবনের সঞ্চয়ের একটা বড় অংশ (অথবা সরকারি কর্মচারী হলে রিটায়ারমেন্ট বেনিফিট থেকে পাওয়া টাকার বেশ খানিকটা) ঢালতে না পারলে ওখানে প্রবেশাধিকার মেলে না।

কিন্তু আসল প্রশ্নটা আর্থিক সামর্থ্যরে নয়, মানসিকতার। টাকার জোর অনেকেরই থাকে, কিন্তু সময় থাকতে আত্মসম্মানের সঙ্গে রাজ্যপাট ছেড়ে আসার মতো মানসিক জোর সবার থাকে না। সবাই চায় ছেলেমেয়ের সংসারে কর্র্তৃত্ব করতে, নাতি-নাতনি পরিবৃত হয়ে, ছেলে-বউমার আদরে-সোহাগে জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে। সে চাওয়ায় কোনো দোষ নেই, কিন্তু একটা নির্ভরশীলতার নিবিড় গল্প আছে। আজকাল অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই সেই নির্ভরশীলতা বা শেষ জীবনের ওই পরমুখাপেক্ষী হয়ে থাকার চিরন্তন ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে নিজের মতো বাঁচতে চাইছেন।

হয়তো স্বজন-সংসার ফেলে আসা দিনের দীর্ঘশ্বাসের পরও প্রবীণনিবাসের জানালায় মুখ রেখে কোনো বৃদ্ধা গেয়ে উঠতে পারেন ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে। তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ আমাদের বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা মাথা উঁচু করে জাগুক তা সে গৃহে হোক বা বৃদ্ধাশ্রমে। অবহেলার গল্পে না, যাপনের আর অধিকারের গল্প দিয়ে তাদের আমরা শান্তি আর নিরাপত্তায় রাখি।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত