মহামারীর অভিঘাত এবং পূর্ব ইউরোপীয় যুদ্ধের প্রভাব মোকাবিলায় একটি উদীয়মান উন্নয়নশীল অর্থনীতির জন্য যেসব চ্যালেঞ্জ ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে তা কী ধরনের কৌশল অবলম্বনের মাধ্যমে উতরানো যাবে, তার একটা পথনকশা, পদক্ষেপের পদাবলি বাজেটে প্রত্যাশিত থেকেই যাচ্ছে, যাবে। গত বছর যে বাজেটটি পাস হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পরিসংখ্যানের প্রতি প্রশ্ন-আগ্রহ ইদানীং বড় একটা দেখা যায় না। সবাই দেখতে চায় নতুন বাজেট। বাজেট বাস্তবায়ন পরিস্থিতির প্রতি নজর থেকেও যেন নেই। অথচ বাস্তবায়নের মধ্যেই বাজেটীয় সাফল্য বা প্রভাব, প্রত্যাশার প্রকৃত প্রাপ্তি নির্ভর করে এবং এই অভিজ্ঞতার আলোকে নতুন বাজেটে কৌশল পুনর্নির্ধারণের তাগিদ ওঠে আসে। বলা বাহুল্য, এটিই বাজেট নামক বস্তুটির প্রতি গণআকর্ষণ-আগ্রহ তথা প্রত্যাশা-প্রাপ্তি শুমারের বশংবদ সীমাবদ্ধতা- যদ্দরুণ বাজেটের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা মাঠে তো মারা যায়ই, শুধু মিডিয়া যেন সেই আগ্রহ-আকাক্সক্ষাকে কোরামিন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখে। বাজেট নিয়ে যে ‘মিথ’ বাংলাদেশে তৈরি হয়ে এর তাৎপর্য দিন দিন দীন-হীন হয়ে পড়ছে তার কার্যকরণ বিশ্লেষণে গেলেও তা দেখা যায়।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম ভাগে, আইনসভা অধ্যায়ে, ২য় পরিচ্ছেদে ‘আইন প্রণয়ন ও অর্থসংক্রান্ত পদ্ধতি’ অনুযায়ী ৮১ অনুচ্ছেদে সংজ্ঞায়িত ‘অর্থবিল’ই ব্যবহারিক অর্থে বাজেট। সংবিধানের কোথাও বাজেট শব্দের নাম-নিশানা নেই, অথচ লোকসমাজে বাজেট একটি বহুল ব্যবহৃত ও পরিচিত শব্দ। সংসদে সম্পূরক এবং নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশকালে ট্রেজারি বেঞ্চ থেকে যে ‘বাজেট বক্তৃতা’ দেওয়া হয় তা আইনত বাজেট নয়, সেটি পারতপক্ষে অর্থবিলের নির্বাহী সারাংশ, এবং এটিকে বড়জোর সরকারের ‘ভাবাবেগ মিশ্রিত রাজনৈতিক অর্থনীতির বার্ষিক বিবৃতি’, কখনো-সখনো নির্বাচনী ইশতেহারও বলা যায়। ‘অর্থবিল’-এর দর্শন, ফাঁকফোকরসহ সচরাচর লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়, রাষ্ট্রপতির অনুমতিক্রমে সংসদে উপস্থানীয় নথিতে অর্থবিলের অবস্থান ‘সংযোজনী’ হিসেবে। বাজেট প্রস্তাব পেশের পর ‘বাজেট আলোচনা’য় অর্থবিলের পর্যালোচনা ও প্রাসঙ্গিকতা খুব একটা দেখা যায় না।
অর্থবিলের বিধান, বরাদ্দ, করারোপ সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না এ ধরনের অনুশাসন বাজেটীয় সিদ্ধান্তের অয়োময় প্রয়োগকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা যেমন প্রদান করে একই সঙ্গে সরকারের করনীতি, বণ্টন ব্যবস্থায় সংসদেও ছত্রছায়ায় নির্বাহী বিভাগের স্বেচ্ছা আচরণকেও প্রটেকশন দেয়। এ কারণে অর্থবিল পাসের পর কেউ আদালতে যেতে না পারলেও করনীতি বাস্তবায়ন পর্যায়ে গিয়ে উচ্চ আদালতে গিয়ে এনবিআরের বিরুদ্ধে মামলা ঠুঁকে দিয়ে নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতায় রাজস্ব আহরণ কার্যক্রমে বাদ সাধার সুযোগ পেয়ে থাকে। সংসদীয় কমিটিগুলোর মাধ্যমে অর্থবিলের বিধিবিধান বরাদ্দগুলো যাচাই-বাছাই-উত্তর সুপারিশ গ্রহণের ব্যবস্থা বাস্তবায়িত হলে বাস্তবায়ন পর্যায়ে আমলাতান্ত্রিক লুকোচুরিসহ মামলা মোকাদ্দমা এড়ানো সম্ভব হতো। সমস্যা হচ্ছে, আইন প্রণয়নের সময় ঔপনিবেশিক নিবর্তনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বিরাজ করলে সেই আইন ‘গণপ্রজাতন্ত্রী’ দেশে ও পরিবেশে বাস্তবায়নের সময় সমস্যার ডালপালা ছড়াতেই থাকে। বায়ান্ন বছর বয়সী বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট সংসদে পেশ ও পাসের পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় পরিলক্ষিত সীমাবদ্ধতা সংস্কারের কথা ভাবনার পর্যায়েই থেকে যাচ্ছে।
সংবিধানের ‘প্রস্তাবনায়’ সর্বপ্রথমে উচ্চারিত তিন শব্দ ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ’। সঙ্গতকারণে জাতীয় বাজেটে প্রতিফলিত হওয়া উচিত সেই ‘সকল’ জনগণের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির বিধিবিধান, খতিয়ান। এই বাজেট বিশাল টাওয়ার কিংবা বড় গ্রুপ কোম্পানির কর্ণধারের যেমন, এই বাজেট নীলফামারীর ডোমার উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামের দরিদ্র কৃষকের, শরৎচন্দ্রের গফুর ও মহেশের, চাষাদের, কামার, কুমার মজুরের। ‘জাতীয়’ বাজেট হবে রাষ্ট্রের, শুধু সরকারের নয়, শুধু পক্ষের নয় বিপক্ষেরও, সকলের। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি খাতে অগ্রাধিকার এবং বরাদ্দ বাড়ালেই বাজেট জনগণের বাজেট বা ইতিবাচক হয় না, স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ বাড়ালেই মহামারী মোকাবিলা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অটোমেটিক্যালি বাড়ে না, এই খাতের ব্যয়ের সক্ষমতা ও সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন যদি বহাল থাকে, দুর্নীতি অব্যবস্থাপনা-অপারগতায় আকীর্ণ থাকে এবং তা নিরসন নিয়ন্ত্রণে তথা জবাবদিহি করণে ‘কথায় নয় কাজে’ অগ্রগতি না থাকে। বাজেটে বরাদ্দ বড় কথা নয়, অর্থনীতিতে সেই বরাদ্দের কতটা সম্পদ ও সেবা সৃষ্টি হলো, প্রভাব ফেলতে পারল সেটিই বড় কথা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নিম্ন থেকে নিম্ন মধ্যবিত্তের তকমা পেতে হলে সব খাত ও ক্ষেত্রে একযোগে উন্নয়নশীল হতে হবে। বাংলাদেশ অর্থনীতির প্রাণবায়ু কৃষি খাতে কৃষির উৎপাদন কৃষি তথা সামগ্রিকভাবে কৃষি খাতের উন্নতি একটি সম্মিলিত প্রয়াস। যেখানে কৃষিবিদ, কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষক ও কৃষি উপকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রাইভেট সেক্টর, আমিষ, শর্করা সরবরাহকারীরাও সরাসরি জড়িত। কৃষি ক্ষেত্রে ভর্তুকি বা প্রণোদনা যেন যথাযথভাবে এবং যথাসময়ে সত্যিকার প্রান্তিক চাষি, খামারিরা পায়। নতুন নতুন উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণে বাংলাদেশে প্রাইভেট সেক্টরের অবদান কম নয়। সে জন্য পাবলিক সেক্টরের পাশাপাশি প্রাইভেট সেক্টরেও বাজেট বরাদ্দ থাকা উচিত। রাসায়নিক সারের তুলনায় জৈবসারে মাটির স্বাস্থ্য ভালো করে বিধায় রাসায়নিক সারের মতো বাজেটে জৈবসার উৎপাদনে ভর্তুকির ব্যবস্থা রাখা যেতে পারে। দেশের প্রান্তিক চাষিরা যাতে তাদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পায় তার সুস্পষ্ট কৌশল, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রতিরোধ, প্রতারক, সিন্ডিকেটের সন্ত্রাসরূপী প্রবণতা, পথে পথে চাঁদাবাজের দৌরাত্ম্য, প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত দুর্নীতি কমানোর কমিটমেন্ট বাজেটে থাকা দরকার। বাংলাদেশের প্রায় সব সেক্টরেই বীমার ব্যবস্থা থাকলেও গত বাজেটে কৃষি ও কৃষকের বীমার প্রস্তাবনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। প্রান্তিক চাষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তা, খামারি, মাছ চাষির কাছে স্টিমুলাস প্যাকেজের টাকা পৌঁছায়নি। ব্যাংক বা আর্থিক খাতে বিশাল ব্যাধির সুচিকিৎসার ব্যবস্থা হয়নি। ধনী আরও ধনী হওয়ার সহজ সুযোগে আয়বৈষম্য বেড়েই চলেছে। অন্তর্ভুক্তির নামে বিচ্ছিন্নতাই বাড়তে থাকলে ‘কাউকে পেছনে ফেলা যাবে না’ এসডিজি গোল অর্জনের এ মর্মবাণী সকরুণ ব্যর্থতার বিবরে উন্নয়নশীল অর্থনীতির কপালে কালো তিলক আঁকতেই থাকবে।
বাজেটে একদিকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ও সুশাসনের কথা থাকলেও যেভাবে অপ্রদর্শিত কালোটাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয় তা স্ববিরোধিতায় আকীর্ণ। সংবিধানের ২০(২) ধারায় বর্ণিত বিধান (‘রাষ্ট্র এমন অবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসেবে কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না’)-এর পরিপন্থি অবস্থান গ্রহণ।
বাংলাদেশের বাজেটের আকার বাড়ছে, বাড়বে। ঘাটতি বাড়বে। সে কারণে বাজেট সামলানো ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানোর চাপও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাজেট বরাদ্দে দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
বাজেট বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জগুলো : ব্যয়ের বাজেটে অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ (রাজস্ব আয়) সম্পদের অপ্রতুলতা; বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে দৃশ্যত স্থবিরতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অনুপস্থিতির আড়ালে, দুর্নীতিগ্রস্ততায় অর্থনীতিতে ক্ষরণ, কস্ট অব ড্রয়িং বিজিনেসের ঊর্ধ্বগামিতা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা এবং এমনকি সম্পূরক বাজেট অনুমোদনকালে তা যথাবিবেচনায় না আসা; মেগা প্রকল্পে ব্যয় সাশ্রয়ী হওয়ার পরিবর্তে ব্যয় বৃদ্ধি, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ঐকমত্যের ওজস্বিতা অনৈক্যের মাশুল দিতে দিতে হ্রাস পাওয়া, অন্তর্ভুক্তির দর্শন বিচ্ছিন্নতার বাস্তবতায় ধোঁয়াসে হওয়া, বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া, প্রবাসীদের দেশে ফেরা, রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তনহেতু বন্যা, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়ে কৃষি উৎপাদন ও জানমালের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের বহির্মুখীন খাত ও ক্ষেত্রগুলো সংকুচিত হওয়া।
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাজেটে করণীয় ও কৌশল সন্ধ্যান-রাজস্ব আহরণ খাতে চলমান সংস্কার ও অনলাইনিকরণ বাস্তবায়নে দৃঢ়চিত্ত ও সময়সূচিভিত্তিক কার্যক্রম গ্রহণ করা। রাজস্ব আহরণ ও প্রদান ব্যবস্থাপনাকে গতিশীল ও আস্থায় আনতে সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির তত্ত্বাধানে সরকারি-বেসরকারি খাত সমন্বয়ে উপদেষ্টা প্যানেল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, প্যানেল থেকেই করনীতি ও রাজস্ব আহরণ পদ্ধতি প্রক্রিয়ার সংস্কার প্রস্তাব আসতে পারে। বাংলাদেশে বর্তমানে অর্থবছর শুরু ও শেষ হয় পূর্ণ বর্ষা মৌসুমে (আষাঢ় মাসে)। বর্ষায় অর্থবছর শুরু হওয়ায় উন্নয়ন কর্মকা- শুরু হতে দেরি হয়, একইভাবে শেষের দিকেও বর্ষা থাকায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাওয়া/শেষ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। ফলে এডিপি বাস্তবায়নে অসুবিধার সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে বর্ষাকাল, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইত্যাকার কারণে অর্থবছর শেষের তিন মাসের মধ্যে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর মাসে আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা অর্থবছর শেষ হওয়ার ৫ মাস পর অর্থাৎ নভেম্বর মাসে। সামষ্টিক অর্থনীতি পরিচালনার স্বার্থে আয়কর এত দেরিতে পাওয়া বিধেয় নয়। এসব কারণে ভারত, জাপানের মতো জানুয়ারি অথবা এপ্রিল (্বৈশাখ) হতে অর্থবছর শুরু করা হলে এডিপি বাস্তবায়ন, রাজস্ব আহরণ ও কাজের মান নিশ্চিত করা সহজ হবে। Tax-GDP অনুপাত বৃদ্ধি করার জন্য কর নেট বাড়ানো প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা সঠিকভাবে কর পরিশোধ করছে কিনা তাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশি-বিদেশি ও বহুজাতিক সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের কপোরেট ও ব্যক্তিগত কর আদায় নিশ্চিত করতে পারলে শুধু করপ্রাপ্তিই বাড়বে না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার হিসাবেও অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আওতায় আসবে। Policy prediction-এর সুবিধার্থে আর্থিক নীতিমালা ঘন ঘন পরিবর্তন না করা এবং আইন, বিধি, পদ্ধতি জারিতে কনসিসট্যান্সি থাকা বা রাখা উচিত।
লেখক: সরকারের সাবেক সচিব এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান