উত্তপ্ত রাজনীতিতে সংলাপের হাওয়া

আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০১:৫৮ এএম

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়তা নিয়ে বিদেশিদের চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। সম্প্রতি বিদেশি কূটনীতিকদের সফর কিংবা দেশে থাকা বিভিন্ন দেশের দূতদের বক্তব্যে সেটা স্পষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া মানবাধিকারের বিষয়েও তারা সোচ্চার। এ অবস্থায় বিএনপিকে রাজনীতির মাঠে সুযোগ দেওয়া, দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা প্রত্যাহার করা ও সংলাপে বসে সমস্যার সমাধানএসব কিছুতেই রাজি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, বিএনপি নির্বাচনে আসুক তা সরকার চায়। তাই যতটুকু ছাড় সরকারের পক্ষ থেকে সম্ভব সবকিছুই দেওয়া হবে বলে বিদেশিদের জানিয়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার ঘোষণা দিয়েছেন। বিদেশিদের কাছে এ বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বোঝাতে চান, তার এ বক্তব্য কথার কথা নয়, অর্থবোধক।

এদিকে বিএনপিকে সংবিধানসম্মতভাবে সব সুযোগ দেওয়ার মনোভাব প্রদর্শন করা আওয়ামী লীগের মধ্যে অন্য এক পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন দলটির শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা। ‘তৃণমূল বিএনপি’কে নিবন্ধন দিয়ে সরকার বিএনপির ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করেও রাখতে চায়। গতকাল দলটিকে নিবন্ধন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে নির্বাচন কমিশন।

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে গত বছরের আগস্ট থেকে বিএনপি সারা দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে আন্দোলন করে আসছে। ডিসেম্বরে ঢাকায় বিএনপির সমাবেশ নিয়ে ব্যাপক উত্তাপ ছড়ায়। একপর্যায়ে সংসদ থেকে পদত্যাগ করে দলটির সদস্যরা। এখন পর্যন্ত হামলা, সংঘর্ষে বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগও শান্তি সমাবেশের কর্মসূচি নিয়ে মাঠে আছে। কার্যত দুই দলই এখনো নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে।

সম্প্রতি বিদেশি প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের কয়েক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএনপিকে রাজপথে স্পেস দেওয়া, বিরোধী মতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা-মামলা না করা, পুরনো মামলা নিষ্পত্তি ও সংলাপের মধ্য দিয়ে সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজে বের করতে ক্ষমতাসীনদের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও সফরে আসা প্রতিনিধিরা।

তারা বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে পুরনো মামলাগুলো কীভাবে মীমাংসা করা যায় সে ব্যাপারে কয়েকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যেসব নেতার যোগাযোগ রয়েছে সেসব নেতাকে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শুরুর জন্য বলা হয়েছে। এর মধ্যে অফলাইন, অনলাইন অথবা সাইডলাইনে আলোচনা করে বিএনপির মনোভাব জানার চেষ্টা করছে সরকার।

গুরুত্বপূর্ণ ওই সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, সাবেক আমলা রাশিদুল আলম, গওহর রিজভী ও কবির বিন আনোয়ার, আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এ কাজগুলো করবেন। তাদের সঙ্গে সমন্বয়ে থাকবেন দলের প্রচার সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ।

অন্য একটি সূত্র জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে ইতিমধ্যেই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বিএনপি নেতাদের নামে যেসব মামলা আছে সেগুলোর ব্যাপারে জেনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাছে জমা দেওয়ার।

আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এপ্রিলে নতুন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। রাজনীতিতে যে অস্থিরতা আছে সে বিষয়ে তিনিও উদ্যোগ নিতে পারেন। সে উদ্যোগে বিএনপি সাড়া দেবে বলে তারা মনে করছেন। তারা বলছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়িত্ব পালনের সময় নতুন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বিএনপি শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি হয়। তাই তার উদ্যোগে সংলাপের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে বলে ওই নেতারা মনে করছেন।

আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হবেএটা আওয়ামী লীগও চায়। তবে সংবিধান ও আইনের বাইরে গিয়ে কারও কোনো আবদার রক্ষা করার ঘোর বিপক্ষে দলের শীর্ষ নেতারা। ঢাকা সফরে আসা বিদেশি প্রতিনিধিরা সরকার ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সংলাপের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। এর জবাবে আওয়ামী লীগ বলেছে, সংলাপের ব্যাপারে দলটি ইতিবাচক। এটাও জানিয়েছে যে, বিএনপি সংলাপে বসতে অনাগ্রহী।

অবশ্য, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে আনতে দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ গ্রহণের জন্য সরকারকে আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউভুক্ত বিভিন্ন দেশ।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াটলির বাসভবনে এক বৈঠকে বিএনপিকে ছাড় দেওয়ার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা সায় দিয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ইইউভুক্ত সাতটি দেশের দূতদের সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে মত জানিয়েছে। সেখানে জার্মানি, ফ্রান্স, স্পেন, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, সুইডেনের রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন। হঠাৎ অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে ইইউ বেশ কিছু লিখিত প্রস্তাব তুলে ধরলে আওয়ামী লীগ নেতারা দলের অবস্থান জানান। কিন্তু সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ সরকারের বা আওয়ামী লীগের হাতে নেই বলেও পরিষ্কার জানিয়ে দেয় ক্ষমতাসীন দলের প্রতিনিধিদল।

ইইউর সঙ্গে বৈঠকে আগামী জাতীয় নির্বাচন, দেশের ব্যবসাবাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে অর্থপূর্ণ আলোচনা হয়েছে বলে দাবি করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। বৈঠক শেষে প্রসঙ্গহীনভাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘যে দল (বিএনপি) রাষ্ট্রপতির সংলাপকে উপেক্ষা করে। নতুন নির্বাচন কমিশন বিএনপিকে দুবার সংলাপে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তারা আসেনি। সংলাপের বিষয়ে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, বিএনপি অনাগ্রহী।’

এর আগে গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ সফরে আসেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের বিশেষ উপদেষ্টা ডেরেক শোলে এবং ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় খাতরা। বুধবার তারা দুজন আলাদাভাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে তাদের। ওই বৈঠকে ডেরেক শোলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন এবং মানবাধিকারের বিষয়ে কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও ডেরেক শোলে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব দেন। বিনয় খাতরা শেখ হাসিনা সরকারের প্রতি পূর্ণ আস্থার কথা জানান। এর আগে গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু বাংলাদেশ সফরে এসে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা জানান। টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আস্থাশীল দাবি করলেও বিএনপিকে নির্বাচনমুখী করতে আরও সহনশীল হওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। এ ব্যাপারে দ্বিমত করেননি ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা।

গতকাল ইইউর রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইইউ তাদের কোনো প্রস্তাব দেয়নি। তারা চায় আগামী নির্বাচন যাতে সবার অংশগ্রহণে হয়। দেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকে। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাবে না এমন কথাও তারা বলেছে।’

সংলাপ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ ওই নেতা আরও বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে সংলাপে বসতে আওয়ামী লীগকে অনুরোধ করেনি ইইউ। রাজনীতিতে সবসময় সংলাপের সম্ভাবনা আছে। তারা আমাদের সঙ্গে সংলাপ নিয়ে কোনো আলোচনা করেনি। তারা স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, তারা আমাদের বন্ধু দেশ। তাদের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।’

আওয়ামী লীগের আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইইউর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে আমিও ছিলাম, আমি নোট নেওয়ার কাজে ব্যস্ত ছিলাম বলে সংলাপের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে কি না খেয়াল করিনি।’

একটি সূত্রে জানা গেছে, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতার আভাস দেখতে পেয়ে উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলো বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে তৎপর হয়েছে। স্থিতিশীলতা নষ্ট হলে ব্যবসাবাণিজ্যেরও ক্ষতি হবে। এ ধারণা থেকে বিদেশি রাষ্ট্রগুলো ক্ষমতাসীনদের অবহিত করতে দফায় দফায় বৈঠক করছে। আগামী জুনের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে দেশে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ নেতা কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে জানান, ইইউ রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণেই তারা প্রাতরাশে অংশ নিয়েছেন। তিনি বলেন, তারা (ইইউ) আলোচনা করতে চায়। এ জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তাতে সাড়া দিয়ে তারা আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো সবকিছুতে সবসময় আলোচনার জন্য প্রস্তুত থাকি।’

এর আগে গত নভেম্বর মাসে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস এবং ডিসেম্বরের শুরুতে ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটার্টন ডিকসন আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের বাসভবনে নৈশভোজে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে দলটির কেন্দ্রীয় কয়েক নেতাও ছিলেন। এসব বৈঠকে দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানা গেছে।

ইইউ অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায় : কাদের

বাসস জানায়, গতকাল ইইউ দূতদের সঙ্গে বৈঠকের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ইইউর সাতটি দেশের সঙ্গে কথা বলেছি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আজকে বৈঠক করা। তারা চায় আগামী নির্বাচনে বিএনপিসহ সব দল অংশগ্রহণ করবে।’

‘ইইউ আগামী নির্বাচন নিয়ে যা বলছে, এ বিষয়ে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আপনাদের মতামত কী’এমন প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আমরা একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলেছি যেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বুধবার তার বক্তব্যে বলেছেন; আগামী নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য, সুষ্ঠু, অবাধ হবে। পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে এবং নির্বাচন কমিশনকে সরকার সবধরনের সহযোগিতা করবে। একই সঙ্গে আমরা আগামী নির্বাচন সামনে রেখে প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত