রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন কত তা জানে না কেউ। ভবনের ফিটনেস যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেসব চিহ্নিত করা হয়নি। তবে বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এবং এলাকাবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকৌশলগত পরীক্ষা করে কিছু ভবন, মার্কেট ও স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেসব ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো অপসারণও করা হচ্ছে না। কোনোটির ক্ষেত্রে আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। আর সিটি করপোরেশন ও রাজউকের ঠেলাঠেলিতেও আটকা পড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ। দুই সিটি অপসারণের কথা বললেও কার্যত কেউ করে না।
গত মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বঙ্গবাজারে আগুনে সাতটি মার্কেট পুড়েছে। মাটির সঙ্গে মিশে গেছে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্সের চারটি মার্কেট। ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী, আট হাজার দোকান পুড়ে ক্ষতি হয়েছে হাজার কোটি টাকা। এ ঘটনার পর জানা যায়, ২০১৯ সালে ফায়ার সার্ভিস মার্কেটটিকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করে। এরপর ১০ বার তারা নোটিস দিয়েছিল। সিটি করপোরেশন মার্কেট অপসারণ করে বহুতল মার্কেট করতে চেয়েছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা হাইকোর্টে রিট করলে সেটা স্থগিত হয়ে যায়।
এর আগে সাদেক হোসেন খোকা মেয়র থাকাকালে রাজধানীর আরেকটি বহুতল মার্কেট রায়েরবাজার পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু সেটিও অপসারণ করা যায়নি আদালতে মামলা করার কারণে।
আদালতে মামলা করা ছাড়াও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণে যেসব বাধা রয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চিহ্নিত করা নিয়ে ঠেলাঠেলি। রাজউক যেহেতু ভূমি ব্যবহার, নকশা ও ভবন ব্যবহারের অনুমতি দেয় সে কারণে তাদের চিহ্নিত করার কথা। অন্যদিকে চিহ্নিত হলেও অপসারণ নিয়ে একে অন্যের দিকে দায়িত্ব ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। চিহ্নিত করা কিছু স্থাপনা ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন অপসারণ করবে করবে বলেও করছে না।
এ প্রসঙ্গে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের দায়িত্ব হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করা। এরপর সে তথ্য ভবনমালিক ও সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনকে জানিয়ে দেওয়া। রাজউক সে কাজ ইতিমধ্যে শুরু করেছে। পর্যায়ক্রমে সব ভবনকে এ প্রক্রিয়ায় আনা হবে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম রেজা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজউকের দায়িত্ব হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করে সিটি করপোরেশনকে জানানো। সে লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ চলছে। তবে ডিএনসিসির নিজস্ব কিছু ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট রয়েছে, সেগুলোর ভেঙে ফেলতে সংস্থার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দ্রুততম সময়ে ঝুঁকিপূর্ণ সব মার্কেট ভাঙার কাজ শুরু হবে।’
জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিজস্ব এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করবে নিজ নিজ সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে যেসব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সিটি করপোরেশনের নিজস্ব, সেগুলো সেই সিটি করপোরেশন অপসারণ করবে। আর অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ করা রাজউকের দায়িত্ব।’ এ সময় ডিএসসিসির ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো নিজস্ব তত্ত্বাবধানে অপসারণ করা হবে বলে জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) আওতাধীন ১ হাজার ৫৮২ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ২১ লাখ ভবন ও স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে সাড়ে পাঁচ লাখ ভবন তিনতলা থেকে শুরু করে তার বেশি। এসব ভবনের মধ্যে ৩ হাজার ২৫২টি ভবনে জরিপ করেছে রাজউক। আর সেখান থেকে ঝুঁকি বিবেচনায় ২২৯টি ভবনের প্রাথমিক প্রকৌশলগত মূল্যায়ন (পিইএ) করা হয়েছে। ওই মূল্যায়নে ৪২টি ভবনকে অতিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যেগুলো ভেঙে ফেলার সুপারিশ করা হয়েছে। আর বাকি ১৮৭টি ভবনকে রেট্রোফিটিং (মজবুত করা) করতে বলা হয়েছে। চিহ্নিত অন্য ভবনগুলোর পিইএ করতে হবে। তাহলে সেগুলোর অবস্থা বোঝা যাবে। এ প্রক্রিয়ায় তিনতলা থেকে বহুতলবিশিষ্ট ভবন, মার্কেট ও স্থাপনাগুলোর আলাদা আলাদা পরীক্ষার মাধ্যমে সেসব ভবনের ফিটনেস যাচাই করতে হবে।
আরও জানা যায়, ঢাকা ও আশপাশের এলাকার ৬৫ শতাংশ ভরাট করে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। রাজউকের মাটি পরীক্ষায় ওসব এলাকার ভবনগুলো ভূমিকম্পে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। রাজউকের আরবান রেজিলেন্স প্রকল্পের আওতায় এসব জরিপ ও মাটির গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়েছে। ২০১৫ সালে শুরু হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ ২০১৫ সালে। ৫৩৭ কোটি টাকার এ প্রকল্পে সরকার দিয়েছে ৩৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা। বাকি অর্থ ঋণ সহায়তা দিয়েছে বিশ^ ব্যাংক।
২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত রাজউকের এক জরিপের তথ্যমতে, রাজধানীর মিরপুর, মোহাম্মদপুর ও পল্লবীর ৯৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ ভবন। রামপুরা, মতিঝিল ও খিলগাঁওয়ের প্রায় ৯৭ শতাংশ ভবন। ধানম-ির প্রায় ৮৯ শতাংশ ভবন রাজউকের নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে তৈরি করা হয়েছে।
রাজউকের আরবান রেজিলেন্স প্রকল্পের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, প্রাথমিকভাবে জরিপ করা ৩ হাজার ২৫২টি পরীক্ষা করা ভবনের মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৭০৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ২০৭টি হাসপাতাল, ৩৬টি থানা ও ৩০৪টি অন্যান্য ভবন। যে ৪২টি ভবন ভেঙে ফেলতে বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি, মাদ্রাসা বোর্ডের তিনটি, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের একটি এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ৩০টি ভবন। এ ছাড়া রাজউক ও সিটি করপোরেশনের আগের হিসাবের ১৯টি ঝুঁকিপূর্ণ বাজার রয়েছে এ তালিকায়।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকারি জরিপের তথ্যে জানতে পেরেছি দেশে ১৩ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেট ও বাণিজ্যিক ভবন রয়েছে। কিন্তু কোনটার কীভাবে সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। সব তো ভেঙে সমাধান করা যাবে না। আমরা চাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকল্প করে ঝুঁকিপূর্ণ মার্কেটগুলোর মজবুত করা বা অপসারণ করা হোক।’
ঢাকায় দুর্যোগ সমন্বয় কমিটি নেই : অগ্নিকা-, ভবনধস, বিস্ফোরণ, নর্দমায় মানুষ পড়ে মৃত্যুসহ যেকোনো দুর্যোগে প্রথমে ছুটে যান ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা। কিন্তু নগরে এসব কাজের সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত। কিন্তু তাদের তেমন দেখা মেলে না। সিটি করপোরেশন আইনে দুর্যোগ মোকাবিলার সমন্বয়ের দায়িত্ব সিটি মেয়রকে দেওয়া থাকলেও কাজগুলো সেভাবে হচ্ছে না। বাস্তবে এ ধরনের কোনো কার্যকর কাঠামোই নেই ঢাকায়।
নগর পরিকল্পনাবিদ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর অঞ্চল ও পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সিটি করপোরেশন আইন অনুযায়ী নগর এলাকায় দুর্যোগ মোকাবিলার লক্ষ্যে একটি কমিটি থাকা দরকার। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ ধরনের কমিটি ঢাকায় নেই। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ ধরনের একটি কমিটি গঠন করা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘ঢাকার দুর্যোগ সমন্বয় কমিটি ঢাকার দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস এবং দুর্যোগে সমন্বিতভাবে কাজ করে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে ভূমিকা রাখতে পারবে। শহরের এলাকাভিত্তিক দুর্যোগের বিষয়গুলো চিহ্নিত করে, সেসব নিরসনে কাজ করতে পারবে।’
নগর বিশেষজ্ঞ এবং স্থপতি ইকবাল হাবিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কয়েক বছর আগে ঢাকার দুর্যোগ সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠনের চিন্তা করেছিল সরকার। এ ব্যাপারে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের সভায় সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আইন অনুযায়ী ঢাকায় বা দেশের যেকোনো নগর এলাকায় দুর্যোগ সমন্বয় কমিটি গঠন করা যায়। এ কমিটি যদি কার্যকরভাবে কাজ করে তাহলে তারা দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস করে নগরকে নিরাপদ করতে ভূমিকা রাখতে পারবে। ঢাকায় কিছুদিন পরপর বিস্ফোরণ, অগ্নিকা-সহ নানা দুর্যোগের ঘটনা ঘটছে, এ জন্য ঢাকায় কার্যকর একটি দুর্যোগ সমন্বয় কমিটি গঠন করা দরকার।’
জানতে চাইলে রাজউক চেয়ারম্যান মো. আনিছুর রহমান মিঞা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার যেকোনো দুর্যোগে আন্তঃসংস্থাগুলো যার যার অবস্থান থেকে আন্তরিকভাবে কাজ করে। ঢাকায় দুর্যোগ সমন্বয় কমিটি না থাকায় কাজের ক্ষেত্রে তেমন কোনো অসুবিধা হয় না। তবে এ ধরনের একটি কমিটি থাকলে আরও ভালোভাবে দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করা সম্ভব হবে।’