সিন্ডিকেটে আটকা বাসের শৃঙ্খলা

আপডেট : ২০ মে ২০২৩, ০১:৪৬ এএম

ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য যে কমিটি করা হয়েছে তারা এখন পর্যন্ত ২৭টি সভা করেছে। কিন্তু রুট মেনে বাস পরিচালনা ও কোম্পানি গঠনের কোনো কাজ সামান্যই এগিয়েছে। যাত্রী ছাউনি, বাস টার্মিনাল, বাস ডিপো নির্মাণ এবং নতুন বাস নামানোর কাজেও কাক্সিক্ষত অগ্রগতি নেই। তিনটি রুটে বাস চলাচল শুরু করলেও অবৈধ বাসের দৌরাত্ম্য থামছে না।

এ অবস্থার জন্য একটি অসাধু চক্রকে দায়ী করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। তারা বলছেন, বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ ও মালিকপক্ষকে এ চক্রটিই ভুল বোঝাচ্ছে। তা না হলে ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরানোর যে উদ্যোগ সেটা বাস্তবায়ন কঠিন কিছুই না। তারা আরও বলছেন, এ অচলাবস্থা ভাঙতে হলে দুপক্ষকেই সমঝোতার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বাসমালিকরা পুরাতন বাসের ব্যাপারে বর্তমান কমিটির সিদ্ধান্তে খুশি হতে পারছেন না। এজন্য কমিটির সিদ্ধান্ত এড়িয়ে যাচ্ছেন তারা। যে তিন রুটে ‘বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির’ উদ্যোগে ঢাকা নগর পরিবহন চালু করা হয়েছে, তাতেও সমঝোতা না হওয়ায় মালিকরা নিয়ম ভেঙে বাস চালাচ্ছেন। এর মধ্যে ২৩টি বাস জব্দ করা হয়েছে। মামলা হয়েছে ৮৩টি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাসমালিকরা অত্যন্ত প্রভাবশালী। নামে-বেনামে এ ব্যবসার সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তি ও পুলিশের অসাধু কর্মকর্তারা জড়িত। অন্যদিকে বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তরা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাদের মনোবল শক্ত। পাশাপাশি পরিবহন ব্যবসার নেপথ্য নায়করাও একই দলের লোক। তাদের চাপ প্রয়োগ করে কোনো কিছু বাস্তবায়ন করা কঠিন। চাপ দিয়ে গণপরিবহনের বড় সংস্কারের চিন্তা থেকে সরে এসে তাদের সঙ্গে নিয়ে বাস্তবায়ন করার পরামর্শ সংশ্লিষ্ট অনেকের। বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাসে বাসে প্রতিযোগিতা থাকবে না। এতে দুর্ঘটনা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা কমিটির সদস্য ড. এসএম সালাহউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকার গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা নিরসনে যেসব কাজ করতে হবে সেসব সমীক্ষার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় গিয়ে হোঁচট খেতে হচ্ছে। এর নেপথ্যে অসাধু চক্র রয়েছে, তারা নীতিনির্ধারক ও বাসমালিকদের ভুল পরামর্শ দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘মেয়র আনিসুল হকের নেতৃত্বে বাস রুট রেশনালাইজেশনের কাজ শুরু হয়। তখন বাসমালিকদের পুরাতন বাসগুলো কিনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ৪ বা সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এখন সেসব থেকে সরে এসেছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা। এটা সঠিক সিদ্ধান্ত বলে আমার মনে হয় না। বৈঠকে আমি বিষয়গুলো উত্থাপন করি। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হচ্ছে না।’

ড. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘নতুন কেনার পর একটি বাস ২০ বছর চলাচল করতে পারবে। এটা আইনেই রয়েছে। চাইলেও সেসব বাস বাদ দেওয়া সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম কাজ রুটসংখ্যা কমিয়ে এনে সে অনুযায়ী বাস পরিচালনা করা। এরপর রুটভিত্তিক অনেকগুলো কোম্পানিকে একটি কোম্পানিতে পরিণত করা। বাস চলাচল ও যাত্রীদের ওঠানামার সুবিধার জন্য বাস টার্মিনাল, বাস ডিপো ও যাত্রী ছাউনিসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা। এর সঙ্গে বাসের মান ভালো হওয়া। এর মানে এটা নয় যে, সব বাস নতুন হতে হবে। কিন্তু আমাদের কমিটির নেতারা বলছেন সব বাস নতুন হতে হবে। এখান থেকে বের আসতে হবে। না হলে ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনা কঠিন হবে।’

ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে ও যানজট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৫ সালের শেষের দিকে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বিশেষ উদ্যোগ নেন। এরপর ২০১৮ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সরকার সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেয়। ওই কমিটির সর্বশেষ সভা হয়েছে গত ৯ মে।

এর আগে ২০১৭ সালে ৩১ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত এক সভার কার্যবিবরণীতে দেখা গেছে, তৎকালীন মেয়র আনিসুল হক ওই সভাকে অবহিত করেন যে, ঢাকার গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আনতে রুট ও কোম্পানির সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। এ কাজ করতে ১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা খরচ হবে। এর মধ্যে ৬৫০ কোটি টাকা নতুন বাস কেনা বাবদ ভর্তুকি এবং বাকি টাকা অবকাঠামো উন্নয়নে খরচ হবে। পাশাপাশি বাসমালিকদের সাড়ে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়ার দাবি ওই সভায় তুলে ধরেন। এ ক্ষেত্রে বিদেশি ঋণ পাওয়া সম্ভব বলে সভাকে জানান মেয়র। আনিসুল হকের এসব দাবির সঙ্গে ব্যবসায়ীদের ভিন্নমত ছিল না। ব্যবসায়ী ও মেয়র একত্রে গণপরিবহনের শৃঙ্খলা ফেরানোর কাজে মনোযোগী হয়েছিলেন।

বাংলাদেশ বাসমালিক সমিতির মহাসচিব এবং কমিটির সদস্য খন্দকার এনায়েতউল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাস রুট রেশনালাইজেশনের বিষয়ে মেয়র আনিসুল হকের সময়ে যে সিদ্ধান্ত ছিল সেখান থেকে সরে এসেছেন বর্তমান কমিটির নেতারা। এরপরও কমিটির নেতারা যেভাবে বলছেন, সেভাবে মালিকদের নির্দেশনা দিচ্ছি। কিন্তু নির্দেশনা দিলেই তো হবে না, মালিকদের তো নতুন বাস কেনার টাকা থাকতে হবে। তাছাড়া ঢাকায় নতুন বাসে বিনিয়োগ করে লাভ বের করে আনাও কঠিন ব্যাপার।’

তিনি বলেন, ‘মেয়র আনিসুল হকের সময়ের সিদ্ধান্ত ছিল পুরাতন বাসগুলোর একটা দাম ধরে সরকার কিনে দেবে। ওই টাকা নির্দিষ্ট হিসাব নম্বরে থাকবে। পাশাপাশি ব্যাংক থেকে ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে দেবে। দুই অর্থে নতুন বাস কেনা হবে। এখনকার কমিটির নেতারা বলছেন, “তোমাদের পুরাতন বাস তোমরা কী করবা আমরা জানি না। নতুন রুটে নতুন বাস লাগবে। পুরাতন কোনো বাস চলতে দেওয়া হবে না”।’

বাস রুট রেশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাসমালিকরা বলছেন তাদের পুরাতন বাসগুলো সরকারকে কিনে নিতে হবে। সেটা না হলে নির্ধারিত রুটগুলোতে পুরাতন বাস চালানোর সুযোগ দিতে। দুটির কোনোটিই আমরা মানতে পারছি না। সরকারের পক্ষে এত টাকা ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে পুরাতন বাস দিয়ে এ কার্যক্রম চালু করলে তো সেবার মান বাড়বে না। এজন্য আমরা নতুন বাস দিয়ে রুটগুলো পরিচালনা করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।’

চালু করা তিনটি রুটে অবৈধ বাস চালানোর বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা অভিযান পরিচালনা করছি। মামলা ও বাস ডাম্পিং করছি। তারপও অসাধু মালিকচক্র সেসব রুটে বাস চালাচ্ছে।’

মেয়র তাপস আরও বলেন, ‘যেহেতু এ উদ্যোগ আমাদের দেশে নতুন, এজন্য বেশি কঠোরও হওয়া যাচ্ছে না। তাদের বুঝিয়ে ও আইন প্রয়োগ করে উদ্দেশ্য সফল করার চেষ্টা চলছে।’

খোঁজ জানা যায়, ঢাকা মহানগরীতে বাস ও মিনিবাস চলাচল করছে প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে নিবন্ধন রয়েছে ৪ হাজার ৬৯৯টি বাসের। নিবন্ধন নবায়ন ছাড়াই চলাচল করছে ৩ হাজার ৪৭০টি বাস। আর নিবন্ধিত মিনিবাস চলাচল করছে ১০ হাজার ৭৩টি। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক অবৈধ বাস ও মিনিবাস চলাচল করছে। এসব গণপরিবহন ৩৮৬টি রুটে বিশৃঙ্খলাভাবে চলাচল করছে। শৃঙ্খলা আনতে ২০০ বাস কোম্পানিকে ২২টিতে এবং রুট কমিয়ে ৪২টিতে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূল লক্ষ্য অবৈধ ও পুরাতন বাস সরিয়ে চার হাজার নতুন বাস নামানো।

ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) বাস রুট রেশনালাইজেশন উদ্যোগের বাস্তবায়নকারী সংস্থা। এ সংস্থার তথ্যমতে, বাস রুট রেশনালাইজেশন বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে ভিন্ন ভিন্ন রঙের ৯টি ক্লাস্টার করা হয়েছে। এর মধ্যে আরবান ক্লাস্টার (নগর পরিবহন) ৬টি; রুট ৩৪টি। সাব-আরবান (শহরতলি পরিবহন) ক্লাস্টার ৩টি; রুট ৮টি। এটি সবুজ ক্লাস্টার। এখানে চলমান ৫৪টি রুটকে ৮টি রুটে পরিণত করা হয়েছে। রুটগুলো হলো ২১ থেকে ২৮ পর্যন্ত। এর মধ্যে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ২১ নম্বর রুটে বাস চালু করা হয়। এ রুটে ৩০টি দ্বিতল ও ২০টি সাধারণ বাস চলছে। কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুর-আসাদগেট-জিগাতলা-প্রেস ক্লাব-মতিঝিল-যাত্রাবাড়ী-কাঁচপুর পর্যন্ত এই রুট। গত বছর ২২ ও ২৬ নম্বর রুটে বাস চালু করা হয়। এর মধ্যে ২২ নম্বর রুটে ২২টি সাধারণ ও ২৬ নম্বর রুটে ৫০টি দ্বিতল বাস নামনো হয়। ২২ নম্বর রুট হলো ঘাটারচর থেকে মোহাম্মদপুর-আসাদগেট-ফার্মগেট-শাহবাগ-কাকরাইল-মতিঝিল-টিকাটুলী-কাজলা-ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার। আর ২৬ নম্বর রুট মোহাম্মদপুর হয়ে আসাদগেট-কলাবাগান-সায়েন্স ল্যাব-নিউমার্কেট-আজিমপুর-চানখাঁরপুল-পোস্তগোলা ও কদমতলী। চলতি বছরে ২৩, ২৪, ২৫, ২৭ ও ২৮ নম্বর রুটে বাস চালু করা হবে।

বাস রুট রেশনালাইজেশন হয়ে গেলে আন্তঃজেলা বাসগুলো ঢাকায় ঢুকবে না। সেজন্য ট্রান্সফার স্টেশনের ব্যবস্থা রাখা হবে। ইতিমধ্যে সমীক্ষা করে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণের জন্য ১০টি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব স্থান হচ্ছে রাজউকের ঝিলমিল প্রকল্পসংলগ্ন বাঘাইর, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উত্তরে কাঁচপুর-১, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণে কাঁচপুর-২, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাছাকাছি ভুলতা, ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে হেমায়েতপুর, নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পাশে বাইপাইল, ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের পাশে গাজীপুর, তুরাগ থানা এলাকায় এমআরটি-৬-এর ডিপোর পাশে ভাটুলিয়া, আঁটিবাজার ও ঢাকা বাইপাসের দক্ষিণে কাঞ্চন।

এর মধ্যে কাঁচপুর, বাঘাইর, হেমায়েতপুর ও ভাটুলিয়ায় চারটি টার্মিনাল ও ডিপো নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। টার্মিনালগুলো হলে সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী টার্মিনাল সিটি টার্মিনালে পরিণত হবে। পাশাপাশি ঘাটারচরে আরেকটি সিটি টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত