মিড ডে মিল ও শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগ|163737|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
মিড ডে মিল ও শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগ
চিররঞ্জন সরকার

মিড ডে মিল ও শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগ

বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশেও শিক্ষার্থীদের, বিশেষত প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘একবেলা খাবার’-এর ব্যবস্থা করা যায় কি না এ ব্যাপারে উদ্যোগ-আয়োজন অনেক দিন ধরেই চলছে। বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাইলট প্রকল্পের ভিত্তিতে ‘মিড ডে মিল’ চালুও করা হয়েছে। এখন সরকার সমন্বিতভাবে সারা দেশে এই প্রকল্প ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৩ সালের মধ্যে সারা দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘মিড ডে মিল’ চালুর লক্ষ্য নিয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে ‘জাতীয় স্কুল মিল নীতি-২০১৯’-এর খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

এই আইনের খসড়া-২-এর (৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় স্কুল মিল কর্মসূচি বাস্তবায়ন কর্র্তৃপক্ষ নামে একটি কর্র্তৃপক্ষ থাকবে। এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে একটি সেল বা ইউনিট কাজ করবে। কার্যক্রমের পরিধি সম্প্রসারণে প্রয়োজনে

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি পৃথক জাতীয় স্কুল মিল কর্মসূচি কর্র্তৃপক্ষ (ন্যাশনাল স্কুল মিল অথরিটি) গঠন করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে, এটি সরকারের বিবেচনায় থাকবে। আইনে এমন প্রস্তাবও করা হয়েছে, সরকার মনোনীত উপযুক্ত ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে ‘স্কুল মিল উপদেষ্টা কমিটি’ থাকবে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সরকার কর্র্তৃক নির্ধারিত কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তির সভাপতিত্বে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য এই কমিটিকে নিয়োগ প্রদান করবে। স্কুল মিল কমিটির প্রধান নির্বাহী এই কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

স্কুল মিল কর্মসূচির কার্যক্রম, ধরন ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কতগুলো বিধিবিধান দেওয়া হয়েছে। যেমনÑ ৩-এর (১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরির ন্যূনতম ৩০ ভাগ স্কুল মিল থেকে আসা নিশ্চিত করা হবে, যা প্রাথমিক এবং প্রাক-প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ৩ থেকে ১২ বছর বয়সী ছেলে ও মেয়ে শিশুদের জন্য প্রযোজ্য হবে। উল্লেখ্য, মিড ডে মিলের আওতায় বর্তমানে সরকার তিনটি উপজেলায় রান্না করে খাবার পরিবেশন করছে। ১০৪টি উপজেলায় বিস্কুট খাওয়ানো হচ্ছে। যার মধ্যে ৯৩টি উপজেলায় সরকার অর্থায়ন করছে। বর্তমানে ১০৪টি উপজেলায় ১৫ হাজার ৩৪৯টি স্কুলের ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে এই মিড ডে মিল কর্মসূটির আওতায় আনা হয়েছে। এ বছরের জন্য এই বাজেট ৪৭৪ কোটি টাকা এবং ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির মেয়াদ রয়েছে। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হবে। সারা দেশে মিড ডে মিল চালু করতে হলে এবং সে ক্ষেত্রে শুধু বিস্কুট সরবরাহ করলে সরকারকে বছরে ২ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা খরচ করতে হবে (৯ টাকা হারে)। পাঁচ দিন রান্না করা খাবার (দৈনিক শিক্ষার্থী প্রতি ১৬ থেকে ১৮ টাকা হারে) এবং এক দিন বিস্কুট দেওয়া হয়, তাহলে খরচ হবে ৫ হাজার ৫৬০ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর বিস্কুট-ডিম-কলা-রুটি দেওয়া হলে খরচ হবে ৭ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা (২৫ টাকা হারে)।

গরিব পুষ্টিহীনতার শিকার-শিক্ষার্থীরা স্কুলে খাবার খাবে, লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে উদরপূর্তি হবেÑ এটা খুবই ভালো কথা। কিন্তু এর সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার। মিড ডে মিলের জন্য বরাদ্দ করা টাকা চাল, ডাল, তেল, সবজি, মসলা, ডিম, মাছ, মাংস আর জ্বালানির পেছনেই খরচ হবে তো? প্রশ্নটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিড ডে মিল যেন সরকারি নীতি বাস্তবায়ন করার নামে দুর্নীতি ও ভণ্ডামির একটা মচ্ছবে পরিণত না হয়, সেটা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, মিড ডে মিল চালু করা এলাকাগুলোতে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি বেড়েছে, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার কমেছে এবং তা শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণেও সহায়ক হয়েছে। সেই বিবেচনায় এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে, শুধু এক শ ভাগ শিক্ষা নিশ্চিত করার সংখ্যাগত প্রয়াসই কি আমাদের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকবে? শিক্ষার মানের বিষয়টি কবে অগ্রাধিকার পাবে?

শিক্ষার মানের দিক থেকে আমাদের অবস্থান কিন্তু এখনো তলানিতে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য বলছে, শিক্ষার মানে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে শিক্ষার মানের দিক থেকে ১৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৭। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে ভারত। তালিকায় বৈশ্বিকভাবে ভারতের অবস্থান ২৭। বাকি দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা ৩৮, পাকিস্তান ৬৬ ও নেপালের অবস্থান ৭০তম। শিক্ষার মান বৃদ্ধির বিষয়টি আমাদের দেশে কবে অগ্রাধিকার পাবে? টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এসডিজির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষা এবং সবার জন্য শেখার সুযোগ নিশ্চিতকরণ (এসডিজি-৪)। কিন্তু শিক্ষার মান অর্জনে বাংলাদেশের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। যে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, আত্মিক উন্নয়নসহ চিন্তন দক্ষতা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা বাড়াবে তাই মানসম্মত শিক্ষা। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রথমেই প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষক। এ জন্য শিক্ষকতা পেশায় যোগ্য ও মেধাবী ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে নীতিগত উপায় উদ্ভাবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে বেতন বাড়ানো হতে পারে প্রাথমিক ধাপ। সেই সঙ্গে শিক্ষকতা পেশায় বিশেষ প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে। যেমনÑ শিক্ষকতা বা প্রশিক্ষণকালীন যেসব শিক্ষক নির্ধারিত সাফল্য দেখাতে পারবেন, তাদের প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য প্রেষণাদান, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার জন্য ভাতা প্রদান ইত্যাদি।

শিক্ষক নিয়োগে বিদ্যমান শিক্ষাগত যোগ্যতা পুনর্মূল্যায়ন করা বিশেষ প্রয়োজন। সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কমপক্ষে স্নাতক পাস এবং প্রধান শিক্ষক পদে কমপক্ষে স্নাতকোত্তর পাস হওয়া জরুরি। একটা সময় আমাদের দেশে শিক্ষার হার কম থাকাতে এবং নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে পুরুষ ও নারীর ক্ষেত্রে যথাক্রমে এইচএসসি ও এসএসসি পাস প্রার্থীকেও প্রাথমিক স্কুলে নিয়োগের জন্য বিবেচনা করা হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা কম থাকাতে এই শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন কাক্সিক্ষত পর্যায়ে উন্নীত করা সম্ভব হয়নি। পেশাগত মানোন্নয়নের জন্য শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচির কোনো বিকল্প নেই। আবার এমনটিও দেখা যায়, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করার পরও তারা প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন না।

বাংলাদেশের সব পর্যায়ে রয়েছে শিক্ষকের অপ্রতুলতা। প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে অনুপাত তা মানসম্মত শিক্ষার জন্য মোটেও অনুকূল নয়। বর্তমানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫০-এরও বেশি। বিশেষ করে গ্রামপর্যায়ে এই অনুপাত আরও ভয়াবহ। এখানে রয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকট। গ্রামপর্যায়ে এমনও স্কুল পাওয়া যায়, যেখানে ২০০-২৫০ জন শিক্ষার্থীর জন্য দু-তিনজন শিক্ষক কর্মরত আছেন। এ সমস্যা সমাধানে জরুরি ভিত্তিতে যেসব স্থানে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেখানে নতুন শিক্ষক নিয়োগ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে ডাবল শিফট স্কুল চালু করে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত স্বল্প মেয়াদে ১:৪০ এবং দীর্ঘ মেয়াদে এই অনুপাত ১:২৫-এ নিয়ে আসা দরকার।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হওয়া বিশেষ প্রয়োজন। এতে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে। বিদ্যমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জেলাপর্যায়ে নিয়োগ পরীক্ষা হয়। যাতে এক শ্রেণির অসৎ লোক প্রশ্ন ফাঁস, কেন্দ্রে নকল সরবরাহ বা প্রভাব বিস্তার এবং মৌখিক পরীক্ষায় অন্যায্য তদবিরসহ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। বর্তমানে মোবাইল ফোন এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করেও প্রশ্নফাঁস ও নকল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে অনেক কম যোগ্য প্রার্থীও নিয়োগ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে চাকরি পেয়ে যান। প্রাথমিক শিক্ষার গুরুত্ব বিবেচনায় শিক্ষক নিয়োগ পিএসসির অধীনে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিদ্যমান শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগের জন্য বিসিএসের পরিবর্তে Bangladesh Education Service (BES) বা অন্য কোনো নাম দিয়ে আলাদা পরীক্ষা গ্রহণ করা যেতে পারে। সরকারি কলেজে ক্যাডার পদে নিয়োগের পর লিখিত পরীক্ষায় যারা পাস করবেন, তাদের নন-ক্যাডার হিসেবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের সুপারিশও করা যেতে পারে।

শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা দরকার। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে সব পর্যায়ের শিক্ষকরা যাতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে সরকার উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের মাধ্যমে অনেকগুলো প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করছে। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকরা যেন তাদের প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান ক্লাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রয়োগ করেন, এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রেষণাদানের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণলব্ধ জ্ঞান শ্রেণিকক্ষে প্রয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন। এ জন্য বর্তমান শিক্ষা অফিসার এবং অন্য কর্মকর্তাদের তদারকি প্রক্রিয়ায়ও উদ্ভাবনী ধারণা ও পদ্ধতি প্রয়োগ করা যেতে পারে। সারা দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার চেয়েও বেশি প্রয়োজন শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা। তা না হলে সাক্ষরতা বাড়বে ঠিক, কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা অধরাই থেকে যাবে।