কিমের দেশে পত্রিকা ভাঁজ করাও অপরাধ

আপডেট : ০২ মে ২০২০, ০৩:৪৪ পিএম

উত্তর কোরিয়া সেই আদিকাল থেকে রহস্যময় এক দেশ। কঠোর নিয়মের বেড়াজালে সেখানকার নাগরিকদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা যায়, যার অনেক কিছুই বিশ্ববাসীর এখনো অজানা।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ২৫ মিলিয়ন মানুষ নিয়ে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী’ হওয়ার চেষ্টা করে। এখানকার মানুষ নিজেদের পছন্দমতো যেমন চুল কাটতে পারেন না, তেমনি পছন্দমতো চাকরি করতে পারেন না। পত্রিকা কিনে কেউ ভাঁজও করতে পারেন না। করে ধরা পড়লে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়!

১৯৪৮ সাল থেকে একই পরিবারের তিনজন শাসকের অধীনে থাকা এই দেশটির এমন আরও কিছু নিয়মের কথা জানা গেছে মিরর অনলাইনের প্রতিবেদন থেকে।

তিন প্রজন্মের শাস্তি: উত্তর কোরিয়ায় ‘তিন প্রজন্মের শাস্তি’ বেশ আলোচিত। এর অর্থ কেউ একজন অপরাধ করলে তার পরবর্তী তিন প্রজন্মের যেকোনো সদস্যকে সরকার জেলে রাখতে পারবে।

 ‘অপরাধীর বীজ’ নির্মূলের লক্ষ্যে ১৯৮০ সালের দিকে এই নিয়ম চালু হয় দেশটিতে।

ইন্টারনেটে কড়াকড়ি: উত্তর কোরিয়ায় ইন্টারনেট থাকলেও এক শতাংশ মানুষ সেটি ব্যবহার করতে পারেন। এই অধিকার আছে রাজনৈতিক নেতা, নামকরা ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের।

তাদের দেশে স্থানীয় একটি ইন্টারনেট সেবা সরবরাহ করা হয়। তা দিয়ে দেশীয় ১০০০-৫৫০০ সাইট চলে। আন্তর্জাতিক কোনো ওয়েবসাইটে ঢোকা যায় না।

ইন্টারনেটে ঢোকা ফ্রি হলেও একটি কম্পিউটার কিনতে প্রায় তিন মাসের বেতন চলে যায়!

অনুমতি ছাড়া দেশত্যাগ নয়: উত্তর কোরিয়ায় বসবাসকরীরা সরকারের অনুমতি ছাড়া একা কিংবা পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে যেতে পারেন না।

অনুমতি ছাড়া দেশ ত্যাগ সেখানে এক প্রকার অসাধ্য ব্যাপার। ধরা পড়লে শ্রমিক ক্যাম্পে পাঠানো হয়। এমনকি মেরেও ফেলা হয়।

ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা: উত্তর কোরিয়ায় কেউ বাইবেল ঘরে রাখতে পারেন না। খ্রিষ্টান ধর্ম পালন করলে শ্রমিক ক্যাম্পে পাঠানো হয়। দেশটির দাপ্তরিক ভাবাদর্শ গড়ে উঠেছে মার্কসবাদ এবং কোরিয়ান জাতীয়তাবাদ থেকে।

আন্তর্জাতিক ফোনকল অপরাধ: উত্তর কোরিয়ার ৩০ লাখ মানুষ ফোন ব্যবহার করেন। কিন্তু কেউ দেশের বাইরে কল করতে পারেন না।

২০০৭ সালে এক ব্যক্তি বাইরের দেশে কয়েকবার ফোন করলে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পান।

ড্রাইভিং: উত্তর কোরিয়ার কোনো রাস্তার ছবি নেটে দেখে দেখলে নিশ্চয়ই সুনসান পরিবেশ খেয়াল করে থাকবেন। সেখানে সরকারি পুরুষ কর্মকর্তারা শুধু গাড়ি চালাতে পারেন।

৮ জুলাই হাসতে মানা: ৮ জুলাই উত্তর কোরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট কিম ইল-সাংয়ের মৃত্যুদিবস। এদিন অ্যালকোহল পান এবং হাসাহাসি নিষিদ্ধ। সাবেক প্রেসিডেন্টের প্রতি এটি অবমাননাকর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

মিটিংয়ে ঘুমানো নিষেধ: উত্তর কোরিয়ায় কোনো আলোচনা সভায় আপনি ঘুমিয়ে পড়লে বড় সমস্যায় পড়তে হবে। কিউ জং-উনের একটি ইভেন্টে ২০১৫ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী একটু ঘুমিয়ে পড়ায় প্রকাশ্যে তাকে হত্যা করা হয়!

ভোট দিতেই হবে: উত্তর কোরিয়ায় নির্বাচনের দিন মানে ১৭ বছর কিংবা তার বেশি বয়সীদের ভোট দিতে যেতেই হবে।

কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হল ব্যালটে নাম থাকবে একটি। সেখানে কোনো টিক চিহ্ন দেয়া যাবে না। পেপার হাতে নিতে হবে আর ব্যালটবক্সে ভরতে হবে।

মাদক বৈধ:  পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে মাদক নিষিদ্ধ হলেও উত্তর কোরিয়ায় এটি কোনো অপরাধ নয়। প্রকাশ্যে যে কেউ ড্রাগ কেনা-বেচা করতে পারেন।

আলাদা নিয়মে বাস্কেটবল: দেশটিতে বাস্কেটবল খুব জনপ্রিয়। কিন্তু ব্যাপার হল সারা পৃথিবী যে নিয়মে খেলে উত্তর কোরিয়া খেলে তার উল্টো নিয়মে। ধারণা করা হয় এই খেলা যুক্তরাষ্ট্র প্রথম শুরু করায় এই নিয়ম।‌

জিনস চলবে না: উত্তর কোরিয়ায় জিনস পরা অপরাধ। ‘পশ্চিমা ফ্যাশন’ তাড়াতে ২০১৬ সালে কিম জং-উন এই নিয়ম চালু করেন।

ভিনদেশির ভ্রমণে বাধা নেই: বাইরের দেশ থেকে কেউ উত্তর কোরিয়ায় ঘুরতে যেতে চাইলে খুব একটা বাধা দেয়া হয় না। তবে মেনে চলতে হয় কঠোর সব নিয়ম। গাইড ছাড়া কোথাও যাওয়া যায় না। অনুমতি ছাড়া ছবিও তোলা যায় না। যাওয়া যায় না নির্দিষ্ট কিছু দোকানে।

মনমতো চাকরিতে বাধা: উত্তর কোরিয়াবাসী নিজেদের পছন্দমতো চাকরি করতে পারেন না। দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী সরকার থেকে কর্মচারী বাছাই করা হয়।

হেয়ারকাট: দেশটির পুরুষদের জন্য ২০১৩ সালে ১০ ধরনের হেয়ারকাট নির্দিষ্ট করে দেন কিম। নারীদের জন্য ১৮টি। এর বাইরে কেউ কিমের মতো চুল কাটতে পারেন না।

পছন্দমতো স্থানে বাস করা যায় না: আপনি কোথায় বাস করবেন, সেটি নিজে ঠিক করতে পারবেন না। সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী সরকার ঠিক করে দেবে। সরকারের অনুমতি ছাড়া রাজধানীতেও যেতে পারবেন না!

ছবি সংরক্ষণ: কোথাও আগুন লাগলে উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের ছবি আপনাকে ‘রক্ষা’ করতে হবে। প্রত্যেক বাড়িতে তিন শাসক কিম জং-ইল, কিম ইল-সাং এবং কিম জং-উনের পেইন্টিং রাখা বাধ্যতামূলক। বাড়িতে আগুন লাগলে পরিবারের কাউকে বাঁচানোর আগে ওই পেইন্টিং ‘বাঁচাতে’ হয়।

রাজার নামে নাম নয়: উত্তর কোরিয়ায় কেউ কিমের নামে নাম রাখতে পারেন না।

পত্রিকা ভাঁজ অপরাধ: উত্তর কোরিয়ায় পত্রিকা বিক্রি হয়। তবে সেই পত্রিকা ভাঁজ করা যায় না। তাতে শাসকের ছবি নাকি নষ্ট হতে পারে!

রাজাকে কুর্নিশ: রাজধানীতে ঢুকলেই সবার চোখে পড়বে সাবেক দুই শাসকের ‍মূর্তি। দেশ-বিদেশের পর্যটকদের সেখানে ফুল দিতে হয়। একই সঙ্গে কুর্নিশ করতে হয়।

কোকা-কোলা নিষিদ্ধ: কিউবার মতো এই দেশটিতেও কোকা-কোলা চলে না। কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যবসা করে না।

অধিকাংশের কাছে কনডম অচেনা: উত্তর কোরিয়ায় জন্মনিরোধক ব্যবস্থা গ্রহণ নিষিদ্ধ। কিমের ধারণা, জনসংখ্যা বাড়লে তাদের দেশের শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা বাড়বে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত