ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নেপালকে গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ (জিএসআই) এবং গ্লোবাল সিভিলাইজেশনাল ইনিশিয়েটিভকে (জিসিআই) স্বাগত জানাতে চাপ দিচ্ছে চীন। একইসঙ্গে এই দুটি উদ্যোগে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
গতকাল সোমবার (২৫ সেপ্টেম্বর) বেইজিংয়ে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি কিয়াং ও নেপালের প্রধানমন্ত্রী পুষ্পকমল দাহালের মধ্যে প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ‘নতুন অবস্থান’কে আনুষ্ঠানিক করার লক্ষ্য ঠিক করেছে চীন। এর ফলে বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে নেপাল।
চীনের হাংঝো শহরে যাওয়ার আগে নিউইয়র্কে কাঠমাণ্ডু পোস্টের সহযোগী প্রকাশনা কান্তিপুরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী দাহাল স্পষ্টভাবে নিরাপত্তা-সম্পর্কিত জোটে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করেন। তবে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চীন জিএসআই, জিসিআই এবং গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) শুরু করছে। এর মধ্যে জিডিআইতে অংশ নিতে নেপালের কোনও দ্বিধা নেই।
প্রধানমন্ত্রী দাহাল বলেন, আমরা নিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতে যেতে পারি না। কোনও পক্ষের ছত্রছায়ায় না থাকা আমাদের ঘোষিত নীতি। আমরা জোটনিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি মেনে চলি। অন্যদিকে আমরা বলছি মার্কিন ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি (আইপিএস) এবং স্টেট পার্টনারশিপ প্রোগ্রাম (এসপিপি) নিরাপত্তা উদ্যোগের অংশ। আমরা যদি একটি উদ্যোগে অংশ না নিই, তবে আমরা অন্যদের সঙ্গেও যোগ দিতে পারি না।
কিন্তু এর ঠিক একদিন পর গত শনিবার (২৩ সেপ্টেম্বর) হাংঝো শহরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকের সময় কিছুটা পরস্পরবিরোধী মন্তব্য করেন দাহাল। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দাহাল বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রস্তাবিত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও উদ্যোগকে সমর্থন করে নেপাল।

২০১৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), জিএসআই, জিডিআই এবং জিসিআই-এর মতো বেশ কয়েকটি উদ্যোগ নিয়েছেন। একইসঙ্গে নেপালকে এসব উদ্যোগ দৃঢ়ভাবে সমর্থন করার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী দাহালকে উদ্ধৃত করে বলেছে, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উত্থাপিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা এবং উদ্যোগকে সমর্থন করে নেপাল। পাশাপাশি আরও ন্যায্য এবং যুক্তিসঙ্গত ভাবে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন উৎসাহিত করতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাধারণ স্বার্থ রক্ষায় এবং মানবজাতির জন্য একটি অভিন্ন ভবিষ্যত সম্প্রদায় গঠনে চীনের সঙ্গে কাজ করতে চায় নেপাল।
বেইজিংয়ে চীনের সঙ্গে আলোচনায় জড়িত নেপালের এক কর্মকর্তা টেলিফোনে বলেছেন, চীন যৌথ বিবৃতিতে জিএসআই এবং জিসিআই সম্পর্কিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত করতে চায়, তাই আমাদের কিছু আপত্তি রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা নিরাপত্তা ও কৌশলগত ধারণা সম্বলিত যে কোনো ধারা অপসারণের জন্য চীনের সঙ্গে আলোচনা করছি। আমরা জিএসআই-এর অংশ হতে চাচ্ছি না এবং এ বিষয়ে কোনও প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছি না।
প্রধানমন্ত্রী দাহালের প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা হরিবল গাজুরেল বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত আছেন। আমাদের চীনকে বোঝাতে হবে। কারণ তারা আমাদের কিছু অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। তবে আমরা এমন কিছুতে সই করব না যা আমাদের দেশের ঘোষিত নীতির বিরুদ্ধে যাবে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিডি ভট্ট বলেন, কান্তিপুরকে দেওয়া দাহালের সাক্ষাৎকার এবং চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকের সময় তার বক্তব্য একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটা আমাদের বাস্তবতা যে আমরা জিএসআই-তে যোগ দিতে পারি না। ঠিক যেভাবে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের এসপিপিতে যোগ দিতে অস্বীকার করেছি, সেভাবেই আমরা জিএসআই-এর অংশ হতে পারি না, যা চীনের নিরাপত্তা কাঠামো। তবে চীন এখনও আশা করছে নেপাল তার নিরাপত্তা উদ্যোগে যোগ দিতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী দাহাল এর আগে বলেছিলেন, আমরা ভারতে বিমসটেক (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) আয়োজিত যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিইনি। শুধু উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি। কারণ আমরা কোনো দেশের নিরাপত্তা ছাতার নিচে থাকতে পারি না। নেপালের ভূ-রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে এটি গ্রহণযোগ্য নয়।
অনিল গিরির করা এই প্রতিবেদনটি কাঠমাণ্ডু পোস্ট থেকে নেওয়া এবং সংক্ষেপিত রূপ