অতিথি যখন খুনি ও লুটেরা

আপডেট : ২৭ অক্টোবর ২০২২, ১০:১৪ পিএম

ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে চেনে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ছোটবেলায় তার সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে পাঠ্যবইয়ে। সেখানে তিনি বীর, ধৈর্যশীল, দুঃসাহসী এমন নানা বিশেষণে বিশেষায়িত। ইতিহাস কাকে বীর আর কাকে অপরাধী বলে, তা নির্ভর করে ইতিহাস রচয়িতার ওপর। সেই হিসেবে কলম্বাসকে ভিন্নভাবে পাঠ করা যেতেই পারে। লিখেছেন তৃষা বড়ুয়া         

ইতিহাসের নায়ক

ক্রিস্টোফার কলম্বাস কী ছিলেন? বীর নাকি খুনি? প্রশ্নটি কাকে করা হচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করছে এর উত্তর। উপনিবেশ স্থাপনকারীদের কাছে কলম্বাস একজন বীর। অন্যদিকে শোষিত-নিপীড়িতরা কলম্বাসকে কুখ্যাত লুটেরা ও গণহত্যাকারী ভিন্ন অন্য কিছু ভাবে না। শোষক শ্রেণির কাছে কলম্বাস একজন মহান অভিযাত্রী, দক্ষ নাবিক, নাছোড়বান্দা ও উৎসাহী উদ্যোক্তা। এভাবেই তাকে ছোটদের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে ইতিহাসের বইয়ে স্মরণ করা হয়। সমুদ্র অভিযানে যাওয়ার অর্থ কলম্বাসের কাছে ছিল না, এজন্য টানা পাঁচ বছর তিনি ইউরোপের রাজা-মহারাজাদের দরবারে দরবারে ধরনা দেন, কেউই তার ওপর আস্থা রাখেননি, অবশেষে স্পেনের রাজা তাকে একটা সুযোগ দিতে রাজি হনবিশ্বজুড়ে ইতিহাসের বেশির ভাগ টেক্সট বইয়ে কলম্বাসের অধ্যবসায় ও সাধনার গল্প এমনই। পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে পুরনো বিশ্বের (ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়া) সঙ্গে নতুন বিশ্বের (উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা) সংযোগ স্থাপনের কৃতিত্ব ইতালীয় এই নাগরিককে দেওয়া হয়। কলম্বাসকে কি আসলেই বীর হিসেবে স্মরণ করা উচিত? তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে দশকের পর দশক ধরে উদ্যাপন করে আসা তার নামে দিবস যা কলম্বাস দিবস হিসেবে পরিচিত, তার নাম পরিবর্তন করে কেন আদিবাসী দিবস রাখে দেশটিরই কয়েকটি রাজ্য?

কলম্বাসের যাত্রা

স্পেনের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ও রানী প্রথম ইসাবেলাকে কলম্বাস বোঝাতে সক্ষম হন যে, চীন, ভারত ও জাপানে (সে সময় ইন্ডিজ নামে পরিচিত) পৌঁছানোর পশ্চিমমুখী পথ তিনি খুঁজে বের করতে পারবেন। ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা ভাবলেন, কলম্বাস যদি ইন্ডিজে পৌঁছার সহজ পথের সন্ধান পান, তাহলে ওই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটাতে পারবেন তারা। চীন, ভারত ও জাপান যে সম্পদশালী দেশ, এ তথ্য অজানা ছিল না তাদের। এ ছাড়া ক্যাথলিক ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা আশা করেছিলেন, কলম্বাসের অভিযান সফল হলে প্রাচ্যের ওই দেশগুলোতে খ্রিস্টধর্ম বিস্তার লাভ করবে। ১৪৯২ সালের আগস্টে নিনা, পিন্তা ও সান্তা মারিয়া নামে তিনটি জাহাজ নিয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে যাত্রা শুরু করেন কলম্বাস। দুই মাস পর ১৪৯২ সালের ১২ অক্টোবর জাহাজগুলো বাহামা দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছায়। আধুনিক দ্বীপরাষ্ট্র কিউবা, হাইতিসহ ক্যারিবীয় অঞ্চলের অন্যান্য দ্বীপে নৌবহর পৌঁছালে কলম্বাসের ধারণা হয়, তিনি ইন্ডিজে পৌঁছে গেছেন। কলম্বাস উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা আবিষ্কার করেছিলেন, এটি বহুল প্রচারিত হলেও আসলে তা সত্য নয়। স্পেন থেকে তার যাত্রা শুরুর কয়েক শতাব্দী আগে থেকে ওইসব দ্বীপে হাজার হাজার মানুষ বসবাস করে আসছিল। তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, ১৪৯২ সালে বাহামা, কিউবা, হাইতিসহ অন্যান্য দ্বীপে কলাম্বাসের পদার্পণের পরপরই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়। মহাদেশ দুটিতে সে সময় ইউরোপীয়দের উপনিবেশ স্থাপনের পেছনে কলাম্বাসের অভিযানের ভূমিকা অপরিসীম। ইউরোপীয় শাসকরা কলম্বাসের অভিযানে বেশ উপকৃত হন, বলাই বাহুল্য। তাদের সামনে নতুন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যায়।

কলম্বাসের সমুদ্র অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল সোনার সন্ধান করা। স্পেনের রাজা ফার্দিনান্দ ওই অভিযাত্রীকে কথা দিয়েছিলেন, ধন-সম্পদে পূর্ণ ইন্ডিজ থেকে সোনা দেশটিতে আনতে পারলে সেসব সোনার ১০ শতাংশ তাকে দেওয়া হবে। আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সময় তিনটি জাহাজের মধ্যে সবার সামনে ছিল সান্তা মারিয়া। কলম্বাস-চালিত জাহাজটি যখন বাহামা দ্বীপপুঞ্জ উপকূলে পৌঁছায়, তখন তাকে ও তার সাথীদের অতিথি ভেবে সাদরে বরণ করে নেয় স্থানীয় আরাওয়াক আদিবাসী। স্পেনীয়দের তারা উপহারও দেন। আরাওয়াকরা গ্রামে যৌথ জীবনচর্চা করত। যুদ্ধ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। এ কারণে তাদের অস্ত্রও ছিল না। কলম্বাস ও তার সাথীদের আরাওয়াকরা ব্যাপক খাতির-যতেœর মধ্যে রাখে। কলম্বাস তার ডায়েরিতে লিখেছিলেন, ‘বাহামা দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের কাছে যা কিছু ছিল, তাই তারা আমাদের কাছে বিক্রি করতে রাজি হয়। তাদের শারীরিক গঠন বেশ মজবুত, দেখতে সুদর্শন। তারা অস্ত্র বহন করত না। এটি কী বস্তু, তাই তারা জানত না। কয়েকজন আরাওয়াককে একবার আমি একটি তলোয়ার দেখাই। তারা সেটির হাতল না ধরে ধারালো অংশ ধরে। এতে কয়েকজনের হাত কেটে যায়। তাদের কারও কাছে লোহাজাতীয় বস্তুই ছিল না। আমার মনে হয়েছে, তারা ভালো চাকর হতে পারে। আমরা সে সময় সব মিলে ৫০ জন ছিলাম। আমরা চাইলে খুব সহজে সব আরাওয়াককে আমাদের দাস বানাতে পারি। আমরা যা চাই, তাই তাদের দিয়ে করাতে পারি।’

‘বর্বর’ আদিবাসী

স্পেনের রাজা ফার্দিনান্দ কলম্বাসকে সোনার ভাগ দেওয়ার কথা দিয়েছিলেন। সোনা পেতে তাই কলম্বাস আদিবাসীদের নির্যাতন এমনকি হত্যা করতেও রাজি ছিলেন। তিনি কয়েকজন আরাওয়াককে অপহরণ করে তাদের জাহাজে বন্দি করে রাখেন। দ্বীপটিতে কোথায় সোনা আছে, এই প্রশ্ন দিনরাত ওই বন্দিদের করতেন তিনি। আরাওয়াকরা আসলেই ‘অসভ্য’, ‘বর্বর’ ছিল। তারা যুদ্ধ কী জানে না, লোহা কখনো চোখে দেখেনি। তার ওপর তাদের সোনার কথা জিজ্ঞেস করা হলে তারা আরও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। যাই হোক, সভ্য ও ইউরোপীয় শিক্ষায় শিক্ষিত কলম্বাস ওই বন্দিদের উত্তর আমেরিকার হিস্প্যানিওলা দ্বীপে নিয়ে যান। সেখানে তিনি বহু কাক্সিক্ষত সোনার সন্ধান পান। অবশ্য সোনার জন্য হিস্প্যানিওলার কয়েকজন আদিবাসীকে হত্যা করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি কলম্বাস। ওই দ্বীপ থেকেও কয়েকজন আদিবাসীকে বন্দি করে স্পেনের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।

আরও সোনা চাই

স্পেনে ফিরে রাজা-রানীর কাছে আমেরিকার দ্বীপগুলো নিয়ে অনেক গালগল্প করেন কলম্বাস। তাদের কাছে আর্জি জানান, তিনি আবার দ্বীপগুলোতে যেতে চান এবং আগের মতোই যেন রাজা-রানী তার অভিযানের খরচ বহন করেন। কলম্বাসের গালগল্পে মুগ্ধ ও ব্যাপক উৎসাহিত ফার্দিনান্দ ও ইসাবেলা ফের তাকে অভিযানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এবার তাকে তিনটি নয়, ১৭টি জাহাজ ও ৫০ জনের জায়গায় ১ হাজার দুইশোর বেশি ক্রু দেওয়া হয়। অবশ্য কলম্বাসকে এই যাত্রায় এক ঢিলে দুই পাখি মারতে হবে। কেবল সোনা নয়, যত বেশি সম্ভব, দাস নিয়েই তাকে দেশে ফিরতে হবে। দ্বিতীয় অভিযানে বাহামা দ্বীপপুঞ্জ থেকে দেড় হাজার পুরুষ, নারী ও শিশু আরাওয়াক বন্দি করেন কলম্বাস। এদের মধ্যে স্বাস্থ্যবান পাঁচশো-জনকে বাছাই করে জাহাজে তোলা হয়। হাইতির আরাওয়াক আদিবাসীরা একপর্যায়ে স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইউরোপীয়দের কাছে বন্দুক ও ঘোড়া ছিল। অন্যদিকে আদিবাসীদের বেতের তলোয়ার ছাড়া অস্ত্র বলতে আর কিছুই ছিল না। বন্দুকের সামনে এই তলোয়ার যে টিকবে না, এটাই স্বাভাবিক।

নৃশংসতা

কলম্বাস যখন কিউবা যান, সে সময় তার সঙ্গী ছিলেন বার্তোলোমে দে লাস কাসাস নামে তরুণ এক যাজক। ওই দ্বীপে এই মহান অনুসন্ধানকারী ও তার দল কী ভয়াবহ অপরাধ করে, তা নিজের চোখে দেখেন ওই যাজক। সেখানে সব আদিবাসীকে দাস হিসেবে দেখতেন কলম্বাসরা। মাঝেমধ্যে তাদের হাঁটতে ইচ্ছে করত না। তাতে কোনো সমস্যা নেই, আদিবাসীরা আছে কী করতে? আদিবাসীদের ডেকে তারা তাদের পিঠে চেপে বসতেন। যাজক কাসাস দেশে ফিরে বলেছিলেন, ‘ছুরির ধার পরখ করতে কখনো কখনো অধিবাসীদের গায়ে ছুরি চালাতেন স্পেনীয়রা। একবার রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় আদিবাসী দুই ছেলেকে দুটি টিয়া পাখি নিয়ে যেতে দেখে কয়েকজন স্পেনীয়। তারা ছেলে দুটির কাছ থেকে টিয়া পাখিগুলো কেড়ে নেয় এবং পরে তাদের মুন্ডু কেটে নেয়। এই কাজ করে বেশ মজা পায় ওই স্পেনীয়রা।’ হাইতির সোনার খনিতে আদিবাসীরা দাস শ্রমিক হিসেবে কাজ করত। তাদের অনেকেই অতিরিক্ত কাজের চাপে মারা যান। এসব দাস শ্রমিকের স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন তাদের মতোই করুণ ছিল। মাঠে আদিবাসী নারীরা গাধার খাটুনি খাটতেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করাত ইউরোপীয়রা। অতিরিক্ত পরিশ্রম ও পর্যাপ্ত খাদ্যের অভাবে এই নারীরা শারীরিকভাবে এতটাই দুর্বল ছিলেন যে, তাদের সদ্যভূমিষ্ঠ বাচ্চারা মায়ের দুধ পেত না। যাজক কাসাস বলেন, ‘তিন মাসে সাত হাজার আদিবাসী শিশুকে নিজের চোখে মারা যেতে দেখেছি।’

কলম্বাসের মৃত্যুর পাঁচশো বছর পর আজও তাকে পশ্চিমারা বীরের সম্মান দেয়। কলম্বাসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ১২ অক্টোবরকে ১৯৩৪ সালে কলম্বাস দিবস হিসেবে ঘোষণা দেন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এই ঘোষণা আদিবাসীদের গালে চড় ছিল। গত শতাব্দীর আশি ও নব্বইয়ের দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আদিবাসীরা কলম্বাস দিবসের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের চাপে একপর্যায়ে সাউথ ডাকোটা, আলাস্কা, আলাবামা, হাওয়াই, নেব্রাস্কা, নিউ মেক্সিকো, অকলাহোমাসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গরাজ্য অক্টোবরের দ্বিতীয় সোমবার আদিবাসী দিবস হিসেবে উদ্যাপনের ঘোষণা দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত