যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তির পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। উপসাগরীয় অঞ্চলে সাম্প্রতিক যুদ্ধের আগে ওয়াশিংটন ও তেহরান যখন পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিল, তখনো ইসরায়েল তাতে যথাসাধ্য বাগড়া দিয়েছে। এমনকি সেই আলোচনার মাঝেই ইরানে হামলার বিষয়ে ট্রাম্পকে রাজি করাতে নেতানিয়াহু যে কলকাঠি নেড়েছেন তা আগেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ৪০ দিনের যুদ্ধ শেষে গত ৮ এপ্রিল থেকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি থাকলেও, সংঘাত অবসানে কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তিতে পৌঁছতে পারেনি দুই পক্ষ। প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেবাননে ইসরাইলের সামরিক অভিযান এখন হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আলোচনায় গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেযা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যকার অস্থির মিত্রতাকে আবারও পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।
এবার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর ওপর এক নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে। হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে তার অভিযানগুলো যে সফল হয়েছে, তা প্রমাণের ওপরই তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। ইসরায়েলে আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় নিজের গদি বাঁচাতে মরিয়া নেতানিয়াহু, গত সোমবার বৈরুতের দক্ষিণ শহরতলীতে বোমা হামলার হুমকি দিলে ইরান জানিয়ে দেয় যে লেবানন সংঘাত বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব আলোচনা বন্ধ রাখবে। চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন বলে দাবি করা ট্রাম্প এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘোষণার পর ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর মধ্যকার ফোনালাপ ছিল বেশ উত্তপ্ত এবং ট্রাম্প ছিলেন আক্রমণাতœক। এমনকি ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে মনে করিয়ে দেন যে, ট্রাম্পের সমর্থন না থাকলে তাকে কারাগারে থাকতে হতো। যদিও ইসরায়েলি গণমাধ্যম দাবি করেছে, এটি ছিল দুই নেতার মধ্যকার একটি ভুল বোঝাবুঝি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নীতিনির্ধারক ইলান গোল্ডেনবার্গ বলেন, নেতানিয়াহুর সামনে নির্বাচনের জন্য কোনো সফল গল্প নেই। তাই তাকে হয় লেবাননে জয়ী হতে হবে, নতুবা এটি দেখাতে হবে যে তিনি এখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। এটি তার জন্য ব্যর্থতা স্বীকার করার চেয়ে অনেক ভালো একটি গল্প। এ ছাড়া দুর্নীতির মামলায় আদালতে বিচার শুরু হওয়ায় ক্ষমতায় থাকাটাই এখন তার আইনি রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেতানিয়াহু অতীতে বিল ক্লিনটনসহ যুক্তরাষ্ট্রের পাঁচজন প্রেসিডেন্টের সময়কাল দেখলেও, প্রত্যেকের সঙ্গেই তার সম্পর্কের টানাপড়েন ছিল। ট্রাম্পকে ইরানে একসঙ্গে হামলা চালানোর জন্য রাজি করাতে পারলেও, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের কাছে এখন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমীকরণই বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। জনসমক্ষে ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে দুশ্চিন্তা নেই বলে দাবি করলেও, নিজের সাফল্যের প্রমাণ হিসেবে তিনি নিয়মিত অর্থনীতির তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে আসছিলেন। বিশেষ করে মেমোরিয়াল ডের ছুটিতে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের গড় দাম করোনা মহামারীর পর সর্বোচ্চ হওয়ায় ট্রাম্প তেলের দাম নিয়ে চিন্তিত। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মূলত ‘নেতানিয়াহুর ইশারাতেই ট্রাম্প চলছেন’এমন অপবাদ ঘোচাতে এবং ইসরায়েলের ওপর নিয়ন্ত্রণ দেখাতে ট্রাম্প প্রশাসন এই ফোনালাপের তথ্য ফাঁস করে থাকতে পারে।
যুদ্ধবিরতিতে সম্মত ইসরায়েল লেবানন : ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনার পর গত বুধবার ইসরায়েল ও লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে সম্মত হয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, এই সমঝোতা বাস্তবায়নে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে অবশ্যই হামলা ‘সম্পূর্ণভাবে বন্ধ’ করতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশ দুটির মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও তারা নির্দিষ্ট কিছু পাইলট জোন বা পরীক্ষামূলক অঞ্চল তৈরির বিষয়ে একমত হয়েছে। এসব এলাকায় লেবাননের সশস্ত্র বাহিনী একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং হিজবুল্লাহর মতো কোনো গোষ্ঠীর উপস্থিতি সেখানে থাকবে না। উভয় পক্ষের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত হামলা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও এই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত এসেছে। বুধবার দিনের শুরুতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর দাবি করে, অন্যদিকে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৯ জন নিহত হন।
যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার বিষয়টি হিজবুল্লাহর হামলা বন্ধ এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার ওপর নির্ভর করছে। গত ২ মার্চ ইরানের সমর্থনে ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর নতুন করে হামলা শুরুর পর, এটি ছিল দুই দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে চতুর্থ দফার সরাসরি বৈঠক। বিবৃতি অনুযায়ী, ২২ জুন বা তার পরবর্তী কয়েক দিনের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির লক্ষ্যে উভয় পক্ষ পরবর্তী দফার আলোচনায় বসবে।
