২০০৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা শহর ছেয়ে গিয়েছিল বড় বড় ব্যানার-ফেস্টুনে। অনেকটা লাফিয়ে বলে হেড করার ভঙ্গিতে বাংলাদেশ অধিনায়ক রজনীকান্ত বর্মণ। তার পাশেই কারিকুরিতে ব্যস্ত ভারত কাপ্তান বাইচুং ভুটিয়া।
সাফ কাপের আগাম বার্তা দিতে দুদেশের দুই তারকার ছবি সেঁটে দেওয়া হয় দেয়ালে দেয়ালে। ঘরের মাঠের টুর্নামেন্ট সফল করতে মানুষের ঢল নামে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। নিরাশ হতে হয়নি। রজনীরা ঠিকই উপহার দেন কাঙ্ক্ষিত শিরোপা। সেই সোনালি সাফল্যের অগ্রনায়ক রজনী হয়েছিলেন আসর-সেরা। অথচ এই দেশ রজনীকে মনে রাখেনি। ভুলে গেছে তার কীর্তি। তাই তো সব খুইয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে সাফজয়ী অধিনায়ককে।
রজনী ছিলেন ১৯৯৯ কাঠমান্ডু সাফ গেমসে স্বর্ণপদক জয়ী দলের সদস্য। এরপর আসে ২০০৩ সালের সেই স্মরণীয় সাফল্য। দেখতে ছোটখাটো গড়নের দেশসেরা সেন্টারব্যাকের হাতে অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ড পরিয়ে দেন সাফজয়ী দলের অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটান। এই আস্থার প্রতিদান দিতে নিজেকে সেরা রূপে প্রকাশ করেন রজনী।
এরপর দাপটের সঙ্গে ফুটবল খেলেছেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। পরে ২০১৬ সালে শেখ রাসেলের সহকারী কোচের দায়িত্বও পালন করেন। সে ক্লাবেই খেলোয়াড় হিসেবে ফুটবলকে ইতি জানান। এরপর থেকে খোঁজ নেই তার। হঠাৎ খোঁজ মেলে সাবেক ফুটবল তারকা আবদুল গাফফারের মাধ্যমে। জানা যায়, রজনী ভালো নেই। জীবনে নেমে এসেছে অমানিশার আঁধার।
এক বছর আগে ভারতের হুগলিতে এক মারাত্মক সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রায় পঙ্গুত্বের পথে রজনী। ব্যয়বহুল চিকিৎসার পরও স্বাভাবিক হাঁটাচলা করতে পারছেন না। গত নভেম্বরে হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রী মৌসুমী বর্মণকে। হাজারো সুখ-স্মৃতির সঙ্গে রেখে যান ১৯ ও ১৮ বছরের দুটি মেয়ে ঋত্তিকা বর্মণ ও মহিমা বর্মণকে।
ভারতে নানাবাড়িতে থেকে দুই বোন বর্ধমান কলেজে অনার্সে পড়ছেন। তাদের পড়ালেখা ও ভরণপোষণ, গাজীপুরে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে টিকে থাকতে একে একে বিক্রি করতে হয়েছে সব জমিজমা। করোনার সময় ভিটেবাড়িটাও হাতছাড়া হয়েছে অভাবের তাড়নায়। তাই তার মনোজগতে এখন ফুটবলের ঠাঁই নেই। সেটা গ্রাস করেছে স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকার দুশ্চিন্তা।
১৯৯৩ সালে পাইওনিয়র লিগে লালবাগ কে আর বয়েজের হয়ে শুরু ক্যারিয়ার। পরের বছর সরাসরি প্রথম বিভাগের দল অগ্রণী ব্যাংকে সুযোগ পান। এরপর মোহামেডানে, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, আবাহনী ও শেখ রাসেলে খেলেছেন।
২০১৬ সালে শেখ রাসেল তাকে সুযোগ দেয় মাঠ থেকে অবসর নেওয়ার। অবসরের পর বাফুফে কখনোই তাকে ডেকে দেয়নি যোগ্য সম্মান। জানতে চায়নি কেমন আছে!
অথচ দেশকে সেরা সাফল্য এনে দেওয়া রজনীর জীবনটা হতে পারত অন্যরকম। তারকাখ্যাতি বেঁচে হননি প্রতিষ্ঠিত। বরং মাত্র ৪৭ বছর বয়সেই তার মনে ঠাঁই নিয়েছে রাজ্যের দুর্ভাবনা। এ থেকে মুক্তি পেতে রজনী তাকিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে। তার সহায়তার আবেদন নিয়ে কাজ করা সাবেক ফুটবল তারকা আবদুল গাফফার বলেন, ‘আমরা রজনীদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি। এই দায় কেউ এড়াতে পারবে না।’
এত দুঃখের মাঝেও ফুটবলার হয়ে জন্ম নেওয়ার গর্বটা টিকে আছে সবুজ গালিচার এই নির্ভীক যোদ্ধার। তবে তার এখনকার যুদ্ধটা শুধুই বেঁচে থাকার।