বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি সেই খবরও নেয়নি বাফুফে: রজনী

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০১:৫০ পিএম

বাংলাদেশের ফুটবলের ইতিহাস লিখতে গেলে চলে আসবে তার নাম। ২০০৩ সাফজয়ী বাংলাদেশ দলের অধিনায়কত্ব করেছেন। সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন। বলছি এ যাবৎকালের অন্যতম সেরা সেন্টারব্যাকদের একজন রজনীকান্ত বর্মণের কথা। সময়ের করাঘাতে রজনী সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব। নিজের দুঃখের গল্পটা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সুদীপ্ত আনন্দকে

অনেকদিন আপনার কোনো খোঁজ নেই। কেমন আছেন?

রজনী: বাড়িতে বসে বসেই সময় কাটছে। গত বছর ভারতের হুগলির চুচুরায় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিলাম। ডান পায়ের হাড় সব গুঁড়ো হয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা বলেছিলেন, পা কেটে ফেলতে হতে পারে। তারপরও ঈশ্বরের কৃপায় পা’টা টিকে গেছে। তবে গত এক বছর ধরেই প্রায় পঙ্গু হয়ে আছি।

ফুটবল থেকে তো তাহলে অনেক দূরে?

রজনী: ২০১৬ সালের পর থেকেই বলতে পারেন ফুটবলের সঙ্গে কোনো সংযোগ নেই। গত ১ নভেম্বর লাঙ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে আমার স্ত্রী মারা যান। সড়ক দুর্ঘটনার পর এই মৃত্যু আমার জীবনটাই তছনছ করে দিয়েছে। ২০১৪ সালে খেলা ছাড়ার পর থেকেই কর্মহীন। এএফসি ‘বি’ লাইসেন্স করেছিলাম কোচিংকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে। তবে এক বছর আগের দুর্ঘটনায় কিছুই করতে পারছি না। প্রায় এক দশক ধরে যা কিছু জমিয়েছিলাম, তা শেষ। জমি-জমা, এমনকি বসতবাড়িটাও বিক্রি করে দিতে হয়েছে করোনার সময়। সব হারিয়ে এখন আমি নিঃস্ব।

আপনাদের অসামান্য কীর্তিতেই দেশ এ যাবৎকালের সেরা সাফল্য পেয়েছিল (২০০৩ সালে সাফ শিরোপা)। অথচ আপনার এমন দুরবস্থা!

রজনী: আসলে ছোটবেলা থেকে একটা জিনিসই শিখেছি- ফুটবল খেলা। এর বাইরে তো কিছু করিনি। নানা কারণে যখন ফুটবল থেকে দূরে থাকতে হয়, তখন তো আর আয়ের কোনো উপায় থাকে না। চিকিৎসা ও সংসার চালাতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সব অর্জন একে একে শেষ হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন আমার কথা মনে রাখেনি।

তাহলে এখন কী করে চলছেন?

রজনী: চলার মতো কোনো উপায়ই তো দেখছি না। দুটি মেয়ে রেখে ওর মা চিকিৎসার কোনো সুযোগ না দিয়েই চলে গেল। মেয়ে দুটি ভারতে অনার্সে পড়ছে। ওদের লেখাপড়া, নানাবাড়িতে থাকতে যা প্রয়োজন তার সবই আমার দিতে হয়। এখন গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ মাকে নিয়ে কোনোরকমে টিকে আছি। সড়ক দুর্ঘটনার পর চিকিৎসায় অনেক টাকা চলে গেছে। এখনো ডান পা স্বাভাবিকভাবে ভাঁজ করতে পারি না। এর মধ্যেই প্রিয় স্ত্রীকে হারানোর আঘাত। জানি না বিধাতা আর কত পরীক্ষা নেবেন।

সবসময়ই আপনাকে প্রচার এড়িয়ে চলতে দেখেছি। এরকম দুঃসময়েও আত্মসম্মানের কথা ভেবে চুপ করে থাকছেন!

রজনী: আসলে আমি স্বভাবগতভাবেই অন্তর্মুখী। কাউকে বিরক্ত করতে চাই না। তবে এবার আর পারলাম না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয়। কিছু ফুটবলার বন্ধু আমার দুর্দশার কথাটা গাফফার ভাইকে (সাবেক ফুটবলার আবদুল গাফফার) জানায়। এরপর গাফফার ভাই আমাকে ডেকে পাঠিয়ে সব শুনে দ্রুত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে সহায়তার আবেদন করতে বলেন। অথচ জানেন, বেঁচে আছি, নাকি মরে গেছি- একটা বার সেই খবরও নেয়নি বাফুফে। আমাদের নির্ভরতার জায়গা হওয়ার কথা ছিল বাফুফে, বিশেষ করে সভাপতি সালাউদ্দিন ভাই (কাজী সালাউদ্দিন)। অথচ তার কাছে যাওয়ার সুযোগ আমাদের নেই। বাফুফেতে গেলে কেউ আমাকে চিনবে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে। আমাদের নির্ভরতার জায়গা এখন শুধুই ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী রাসেল ভাইও (জাহিদ আহসান রাসেল) সবার বিপদে এগিয়ে আসেন। তার মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা সহায়তার প্রত্যাশা করছি।

এখন কী মনে হয় ফুটবলার হয়ে ভুলই করেছেন?

রজনী: নাহ। এটা কখনই মনে হয়নি। যারা আমার খেলা দেখেছেন, সেই সাধারণ দর্শকই এটা মনে হতে দেন না। যাদের ডাক-খোঁজ করার দায়িত্ব, সেই বাফুফে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, মানুষ ঠিকই মনে রেখেছে। পাশ দিয়ে হেঁটে গেলে, এখনো আমাকে দেখিয়ে বলে, ওই দেখো আমাদের রজনী যায়। আমি বলছি না বাফুফে আমাদের সব দায়িত্ব নেবে। অন্তত ডেকে নিয়ে আমাদের একটু অভয় তো দিতে পারতেন সালাউদ্দিন ভাই। তিনিও তো একজন ফুটবলার ছিলেন। ফুটবলের জন্যই তো তার এত নামডাক। উল্টো আমাদের অবদান অস্বীকার করে তিনি এই সময়ের ফুটবলারদের ৫০ বছরের সেরা ঘোষণা দিয়ে দেন।

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বড় সব ক্লাবেই খেলেছেন। অনেক অনেক সাফল্যও এনে দিয়েছেন। তারা কি মনে রেখেছে আপনাকে?

রজনী: কোনো ক্লাবই আমার কথা মনে রাখেনি। অথচ যখন ফর্মের তুঙ্গে ছিলাম, তখন আমাকে নিয়ে তাদের কতই না কাড়াকাড়ি ছিল। অন্যদের দোষ দেব কী? আমার বন্ধু জয়ই (সাবেক ক্রীড়া উপ-মন্ত্রী আরিফ খান জয়) তো আমাকে মনে রাখেনি। অথচ একসঙ্গে কত ম্যাচ খেলেছি, কত সময় কাটিয়েছি!

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত