এখনো মনে পড়ে সেই দিনের সকালের কথা। ভয়াল সেই ১৫ আগস্টের আগের দিন শেখ কামাল আমাকে ডেকেছিল তাদের ৩২ নম্বরের বাসায়। ১৪ আগস্টের রাত। কামাল খুব ব্যস্ত পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে বঙ্গবন্ধুর অনুষ্ঠান নিয়ে। সেদিন স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা। সমাবর্তন উপলক্ষে বিশাল আয়োজন। অফিস থেকে আমাকে সেই অ্যাসাইনমেন্ট কাভার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আগেই। ১৫ আগস্ট ভোরে বাসা থেকে বেরুবার জন্য রেডি হচ্ছি। তখনই পাড়ার এক ছেলে এসে খবর দিল ‘লিডার নেই!’ সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল। অদ্ভুত এক অনুভূতি নিয়ে হেঁটে হেঁটে প্রেস ক্লাব গেলাম। শুনশান নীরবতা চারদিকে। ফটোগ্রাফার হওয়ায় সাহস করে বঙ্গবন্ধুর বাসার দিকে যেতে চাইলে পরিচিত সার্জেন্ট না করে দিল। ফিরে এলাম। ভয়াবহ হতাশায় কাটতে থাকল। যে দেশ তার জাতির পিতাকে মেরে ফেলে সেই দেশে থাকব না, এমন সিদ্ধান্তও নিয়েছিলাম। কিন্তু সেই শোক নিয়েই পার করে দিলাম এতটা বছর।
মুজিব ভাই আমাকে ‘রহমান’ বলেই ডাকতেন। দূর থেকে তাকে প্রথম দেখেছিলাম যখন বন্ধুদের সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক জনসভায় যাওয়া হতো তখন। এত আকর্ষণীয় শারীরিক গড়ন দেখে তাকে কোনোভাবেই গড়পড়তা বাঙালি মনে হয়নি। তারপর দেখেছিলাম খুব কাছ থেকে। আমার বয়স তখন ২১ বা ২২ বছর হবে।
১৯৬৯ সালে ফটোগ্রাফিতে যুক্ত হই। কাজ করছিলাম একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায়। তারপর একটি দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য পিপলস’-এর সঙ্গে যুক্ত হই পরের বছরই। ভয়াবহ সাইক্লোনও হয় সেই বছর। অফিস থেকে সেই সাইক্লোন কাভার করার জন্য আমাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। সাইক্লোন উপদ্রুত এলাকায় বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন। খুব কাছ থেকে দেখা হয়েছিল তখন। সেই সময়টায় নির্বাচনের আমেজ চারদিকে। আওয়ামী লীগের অফিস ছিল পল্টনে। প্রায়ই যাওয়া হতো সেখানে। সেখানেই প্রথম তার মুখোমুখি হই। আওয়ামী লীগ অফিসে তাজউদ্দীন আহমদ খন্দকার মোশতাকসহ কয়েকজন অপেক্ষা করছিলেন বঙ্গবন্ধুর জন্য। বঙ্গবন্ধু এলেন। আমিও প্রস্তুত তার একটা পারফেক্ট পোর্ট্রটে তোলার জন্য। টেবিলের কোনায় ক্যামেরা রেডি করে বসে আছি। বেশ খানিকক্ষণ হলো তিনি কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার মনঃপূত হচ্ছিল না। কারণ তিনি খুবই স্টাইলিস্ট ছিলেন। চমৎকার বাচনভঙ্গির সঙ্গে তার বডি মুভমেন্ট, হাত ও আঙুলের অ্যাকশন দারুণ পছন্দ আমার। হঠাৎ দেখলাম তিনি ব্যাপারটা খেয়াল করছেন। তারপর জানতে চাইলেন আমি কোন পত্রিকায় কাজ করি। জানানোর পর আবারও কথায় মনোযোগ দিলেন। ওই মুহূর্তটিতে বেশ কিছু দারুণ অ্যাকশন পেলাম। সেগুলো দ্রুতই ক্যামেরাবন্দি করে নিলাম। তারপর মনে হলো এত বড় একজন নেতার সামনে এভাবে বসে থাকা ঠিক হবে না। তাই সেদিনের মতো ফিরে এলাম। এভাবেই দূর ও কাছ থেকে তাকে দেখা এবং কথা বলা।
৭ই মার্চের ভাষণ চলছে। ৬ থকে ৮ ফুট দূরত্বে দাঁড়িয়ে তার ছবি তুলে যাচ্ছি। আমরা যেহেতু ফটোগ্রাফার তাই নেতাদের অ্যাকশন খুঁজতে থাকি। যাকে বলি ম্যাচিং পিকচার। অর্থাৎ বাচনভঙ্গির সঙ্গে বডির মুভমেন্ট। তখন এ নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত ছিলাম যে, তিনি যে এক ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে ফেলেছেন বুঝতেই পারিনি। এর তিন দিন পরেই আমার ফকিরাপুলের বাসার গলির চা দোকানের গ্রামোফোনে ভেসে এলো সেই ভাষণ। আগ্রহ আর উত্তেজনা নিয়ে শুনছে সবাই। এত চমৎকার একটা ভাষণ আমার এত কাছে থেকে দিয়েছিলেন। সেটা তখন পরিপূর্ণ মনোযোগ দিয়ে না শুনতে পারায় বেশ আফসোস হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শোনার জন্য আমিও যোগ দিলাম জনতার সঙ্গে।
৭ই মার্চের ভাষণের পর ৮ই মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তাকে ফলো করা ছিল আমার অ্যাসাইনমেন্ট। প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠেই তার বাসার লনে গিয়ে পৌঁছাতাম। প্রথম যেদিন তার বাসার লনে বসেছিলাম সেদিন ঘুম ভেঙে রেলিংয়ে দাঁড়াতেই আমাকে দেখতে পান বঙ্গবন্ধু। তারপর জিজ্ঞেস করেন এই ‘রহমান’ কী করিস? উত্তর দেওয়ার পর বললেন নিশ্চয়ই নাস্তা করে আসিসনি। নাস্তা করে এসেছি শোনার পর তিনি বললেন তাহলে তো নিশ্চয়ই চা খেয়ে আসিসনি। ছোট মেয়ে রেহানাকে ডেকে এক কাপ চা পাঠাতে বললেন। এরপর ২৫শে মার্চের আগ পর্যন্ত প্রতিদিনই চা পৌঁছে যেত আমার কাছে। প্রতিদিনই হাজার হাজার মানুষ আসত তার সঙ্গে দেখা করতে। একটি উঁচু বেঞ্চিতে দাঁড়িয়ে তিনি সবাইকে অভিবাদন জানাতেন। আর সারা দিনই তার সঙ্গে থাকতাম আমি।
বঙ্গবন্ধু ফটোগ্রাফারদের বেশ পছন্দ করতেন। তখন ৬ থেকে ৭টা পত্রিকার ১৬/১৭ জন ফটোগ্রাফার ছিল। ফটোগ্রাফারদের তিনি এত কাছের মনে করতেন যে সবার নাম মুখস্থ ছিল। পাশাপাশি সম্মোধন করতেন ‘তুই’ বলেই। আমরাও তাকে ‘মুজিব ভাই’ বলেই ডাকতাম। তিনি আমাদের আদর করতেন আর বলতেন তোরাই তো আমাকে হিরো বানিয়েছিস। ফটোগ্রাফার গোলাম মাওলা তখন দৈনিক বাংলায় কাজ করতেন। বঙ্গবন্ধুর সেরা পোর্ট্রটেগুলো তার হাত দিয়ে তোলা। এত দারুণ ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু হাস্যরসের মাধ্যমে বলতেন, ‘আমার ওপরে এক মওলা আর নিচে এক মওলা হলি তুই।’ তিনি সাংবাদিকদের বেশ মূল্যায়ন করতেন। আমার মনে হয় তার একটা বিষয় বেশ ভালোভাবে জানা ছিল যে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন পূর্বপাকিস্তানের সাংবাদিকরা তার পক্ষে যত নিউজ করেছেন, তিনি সেসবের কিছুই ভোলেননি।
শেখ কামাল ছিল আমার বন্ধু। স্পন্দন শিল্পগোষ্ঠী এবং ‘আবাহনী ক্লাব’-এর সূত্রে এই বন্ধুত্ব ছিল। প্রেস ফটোগ্রাফারদের মধ্যে একমাত্র আমিই ছিলাম তার বন্ধু। সেই সূত্রেই যাওয়া হতো তার কাছে। একদিন বঙ্গবন্ধু দেখলেন এবং বললেন এই রহমান এদিকে আয়। রুমে ঢুকতেই দেখলাম শেখ সাহেব গায়ে একটা গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে টেবিলের দিকে মুখ করে বসে আছেন। টেবিলে ৮/১০টা পাইপ। একটা ছেলে সেগুলোতে টোব্যাকো ভরে থরে থরে সাজিয়ে রাখছে। গভীর কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম এগুলো দিয়ে কী হবে! তিনি বললেন চুপ করে দেখ কী করি। তারপর সেই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। একটা দিয়াশলাই নিয়ে একেকটা পাইপে আগুন ধরিয়ে দীর্ঘ এক সুখটান দেন আর বলতে লাগলেন এই পাইপ উপহার করেছেন ইন্দিরা গান্ধী...এভাবে আট/দশজন রাষ্ট্রপ্রধানের নাম নিলেন। তার পাইপ ধরার এত দারুণ ভঙ্গিটি ক্যামেরাবন্দি করার মতো পরিণত হইনি আমি। ফিল্মের দামও অনেক টাকা ছিল। কী চমৎকার মুহূর্ত ছিল। অথচ আমি বুঝতেই পারিনি। পাইপে সুখটান শেষে তিনি বললেন, আমি তো শুধু আমার পাইপ ব্যবহার করি। কিন্তু এই যে তারা ভালোবেসে আমাকে এই উপহারগুলো দিল সেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করারও দরকার। তাই আজ আয়োজন করে ধন্যবাদ স্বরূপ একসঙ্গে সুখটান দিলাম। কথা বলার ফাঁকেই হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘জানিস আমার সম্পত্তি কী?’ এরপরই ছোট দুটো ব্যাগ বের করলেন। ভেতরে টোব্যাকো। প্রতি বছর ফিদেল কাস্ত্রো টোব্যাকোপূর্ণ দুটো ব্যাগ উপহার দিতেন। আর এগুলোই তার সম্পদ! সেদিন আমার নিজেকে খুবই ভাগ্যবান মনে হচ্ছিল। এই মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে ১৫ মিনিটের এই দুর্লভ সময় কাটানোর সুযোগ তিনি আমাকে দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধুহীন এই স্বাধীন দেশ অনেকটা সময় পার করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও হয়েছে। একটা মানুষের এত বড় একটা স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন। একটা স্বাধীন দেশের জন্ম দিতে পেরেছিলেন। কী মহান ব্যক্তিত্ব হলে সেটা সম্ভব। দেশটাকে শূন্য থেকে গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু ঘাতকরা সেই সুযোগ দেয়নি। তবুও সেই শোককে শক্তি করে দেশটা এগিয়েছে। তিনি শুরু করেছিলেন। স্বপ্ন বাস্তবায়নের কাজটা অন্য কেউ করবে, এটাই হোক।
লেখক : আলোকচিত্রী
শ্রুতিলিখন : তানিয়া আক্তার
