পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট সকাল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই সকালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আসার কথা। আমার আব্বা মরহুম মুস্তাফিজুর রহমান খান তখন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য। সেদিনের অনুষ্ঠানে আমার আব্বারও থাকার কথা। তিনি আগেই বের হয়ে গেছেন। সকাল বেলা আমিও বাসা থেকে বেরুবার জন্য তৈরি হচ্ছি। এমন সময় ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল। আমি নিজেই ফোনটা ধরলাম। ওপাশ থেকে আব্বা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম আব্বা কী হইছে। আব্বা বললেন ‘বাংলাদেশের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল’। আব্বা কাঁদতে কাঁদতেই শেখ সাহেবকে মেরে ফেলার সেই ভয়াবহ খবরটি দিলেন। আমরা সবাই স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার আব্বার সঙ্গে আমাদের পরিবারের সঙ্গে শেখ সাহেবের একটা গভীর আত্মিক সম্পর্ক ছিল। আমরা এতটাই হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম যে কী করণীয় সেটাও বুঝতে পারছিলাম না।
আমি তখন ইডেন গার্লস কলেজের শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছি। আর আমার প্রথম সন্তান, আমার বড় ছেলেটার বয়সও তখন মনে হয় আট-নয় মাস হয়ে গেছে। আমার স্বামী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদও তখন বাসায় নেই। কোর্টে বা কোথাও গিয়েছেন। আমি তখন কী করব না করব বুঝতে পারছিলাম না। বাচ্চাকে খাওয়াব না কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখন রেডিও অন করলাম।
আমাদের বাসায় তখন একটা ‘মারফি’ রেডিও ছিল। আমরা রেডিও খুলে শুনতে শুরু করলাম। শুনলাম রেডিওতে মেজর ডালিম না আরও কে কে যেন আর্মির অফিসাররা বারবার বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার খবর জানাচ্ছে। মনে হচ্ছিল এটা কি হতে পারে? এটাও কি সম্ভব? মনে হচ্ছিল এটা ভুল খবর। আমাদের বঙ্গবন্ধুকে কেউ হত্যা করতে পারে এটা যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। তখন কী করব, কোথায় যাব, কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এই খবর কি সত্যি না মিথ্যা সেটাও যেন বুঝতে পারছিলাম না।
টেলিফোনে আব্বার সেই চিৎকার করে কান্নার শব্দ আমি যেন এখনো শুনতে পাই। আব্বার সেই হাহাকার এখনো কানে বাজে। শেখ সাহেবকে আমার আব্বা খুবই স্নেহ করতেন। আব্বা তাকে সবসময় ‘ও মিঞা’ বলে সম্বোধন করতেন, আর শেখ সাহেব আমার আব্বাকে ‘বড় ভাই’ বলে ডাকতেন। শেখ সাহেব ছিলেন আমার আব্বার খুবই ঘনিষ্ঠ, খুবই স্নেহের। আমি অনেক ছোটবেলা থেকেই শেখ সাহেবকে আমাদের বাড়িতে নিয়মিতই আসা-যাওয়া করতে দেখেছি। আমার আব্বা মুস্তাফিজুর রহমান খান সক্রিয়ভাবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সাতচল্লিশে পাকিস্তান সৃষ্টির পর তিনি পেশাগতভাবে ইন্সিওরেন্স কোম্পানিতে ছিলেন। তাকে পূর্বপাকিস্তান তথা বাংলাদেশের ইন্সিওরেন্স কোম্পানির জনক বলেই অভিহিত করা হয়। আমাদের বাড়িটা ছিল রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটা কেন্দ্র। আমি ছোটবেলা থেকেই ওই রাজনৈতিক আবহে বড় হয়েছি।
পঞ্চাশের দশকের ঢাকা শহর তখনো খুব ছোট্ট একটা শহর। এখানে সবাই সবাইকে চেনে-জানে এমন একটা অবস্থা। স্বামীবাগে আমাদের বাড়িটা ছিল এক বিঘা পাঁচ কাঠার ওপরে জায়গা নিয়ে। বড় একটা বাড়ি। সামনে খোলা উঠান। সেখানে মঞ্চ বানিয়ে নাটকও হতো। আমাদের বাড়িতে বিরাট একটা লাইব্রেরি ছিল। এই বাড়িতেই আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবকে আসতে দেখেছি। বঙ্গবন্ধুকে একটা সাদা পায়জামা আর সাদা একটা ফুল শার্ট পরে সাইকেলে চেপে আসতে দেখেছি সেই ছোটবেলাতেই। মওলানা ভাসানীকে আসতে দেখেছি। কংগ্রেস নেতা খগেন মিত্র, আব্দুল জব্বার খদ্দর আসতেন। একইভাবে লেখক-কবি-সাহিত্যিক-শিল্পীরাও আসতেন। কবি গোলাম মোস্তফা সাহেবকে দেখতাম। আহসান হাবীব আসতেন। বেনজীর আহমদ, খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীন আসতেন। এমন অনেককেই তখন দেখতাম।
এখানে একটা কথা বলা দরকার। সেই পঞ্চাশের দশকে তরুণ বয়সেই কিন্তু শেখ সাহেব ধীরে ধীরে খুবই গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছিলেন। মানুষ মুখে মুখে তাকে ‘শেখ সাহেব’ বলেই ডাকতেন। আব্বাকে দেখতাম শেখ সাহেবকে বিশেষভাবে স্নেহ করতেন। শেখ সাহেব বন্দি হয়ে কারাগারে চলে গেলে আব্বা তার পরিবারের খোঁজ খবর রাখতেন। মনে আছে, একসময় আব্বাই জোর করে শেখ সাহেবকে আলফা ইন্সিওরেন্সে একটা চাকরি দিয়ে দিলেন। আব্বা বললেন, ‘ও মিঞা, তুমি তো আন্দোলন কইরা জেলে চইলা যাইবা। তোমার বউ-পোলাপানের চলতে হইব না! এই চাকরিটা করো।’ যতদূর মনে পড়ে ধানমন্ডিতে বত্রিশ নম্বরের বাড়ি বানানোর সময়ও সেখানে আব্বার একটা কনট্রিবিউশন ছিল।
এরকম একটা রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়ার কারণেই আমি ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে গেছিলাম। ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। বাষট্টির হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলন, আটান্নোর আইয়ুববিরোধী আন্দোলন এসবের মধ্য দিয়েই আমরা বড় হয়েছি। একসময় আমি নিজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। শেখ সাহেব যখন ছেষট্টিতে ছয় দফা ঘোষণা করছেন আমি সেই শিক্ষাবর্ষেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হই। ছয় দফার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে ছাত্রসমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার কাজটা তখন আমাদেরই করতে হয়েছিল। তখন আক্ষরিক অর্থেই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত আমাদের সারা দেশে ছুটে বেড়াতে হয়েছে। যার ফলে তখন থেকেই স্বাধীনতার যে স্বপ্ন, বাংলাদেশের যে স্বপ্ন সেটা আমাদের মনে গেঁথে গিয়েছিল। এরপর তো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা। শেখ সাহেব আবারও কারাগারে। এদিকে বিশাল ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান। ছাত্র সমাজের পক্ষ থেকে শেখ সাহেবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া, তাকে জেল থেকে মুক্ত করে আনা। এসব কিছুর মধ্য দিয়ে আমাদের কাছে স্বাধীনতা সংগ্রাম আর বঙ্গবন্ধু একাকার হয়ে গিয়েছিলেন।
পনেরোই আগস্টের সকালে আব্বা যে চিৎকার করে কেঁদে উঠে বলেছিলেন ‘বাংলাদেশের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল’। এই কথাটা ভীষণভাবেই সত্য। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ঘটনা কেবল একটা রাজনৈতিক হত্যাকান্ড না। এটা তারচেয়েও অনেক বেশি। পুরো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে নস্যাৎ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র ছিল এটা। আমি একটা কথা তখন থেকে বলি। পৃথিবীর বহু দেশে বহু রাজনৈতিক হত্যাকান্ড হয়েছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে এমন দৃষ্টান্ত আর একটিও নেই। আমি বলি এটা হলো ‘সবংশে নির্বংশ করা’। পেটের বাচ্চাসহ অন্তঃসত্ত্বা নারী আর শেখ রাসেলের মতো শিশুকেই তারা রেহাই দেয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী খুনি মুশতাক-জিয়া চক্র এভাবেই বঙ্গবন্ধুকে সবংশে নির্বংশ করতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর শেখ রেহানা দেশে না থাকার কারণেই তারা বেঁচে গিয়েছিলেন। খুনিরা এই বাংলাদেশ চায়নি বলেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিতে চেয়েছিল।
লেখক : ডাকসুর সাবেক ভিপি। অধ্যাপক ও বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাবেক প্রেসিডেন্ট
