‘তোমরা তোমাদের পিতাকে হত্যা করেছ’

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ০২:০০ এএম

আমার বড় বুক ভেঙে খানখান হয়েছিল ৭৫-এর ১৬ আগস্ট। তখন আমি এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। সেদিন এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগের আমার প্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক কীয়েরনান আমাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবরটি দিয়েছিলেন। তিনি প্রথমেই আবেগী কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘ইউ হ্যাভ কিল্ড ইওর ফাদার (তোমরা তোমাদের পিতাকে হত্যা করেছ)।’ আমি একটু হতভম্ব হয়েছিলাম। সুতরাং পরের বাক্যে খোলাসা করে বলেছিলেন, ‘মুজিব হ্যাজ বিন কিল্ড বাই দ্য মিলিটারি (মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে সামরিক বাহিনী দ্বারা)।’ কীয়েরনান বলেননি ‘মিলিটারি কিল্ড’; বলেছিলেন “কিল্ড বাই দ্য মিলিটারি (‘সামরিক বাহিনী হত্যা করেছে’ তা না বলে বলেছিলেন ‘সামরিক বাহিনী দ্বারা হত্যা করা হয়েছে’)।” অনেক পরে অনুভব করেছি কীয়েরনানের ইতিহাসবিদসুলভ বাক্যবিন্যাসের তাৎপর্য। বাংলাদেশ সম্পর্কে তিনি ভালো খোঁজখবর রাখতেন। কারণ তিনি ৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিলেন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যেকোনো স্মৃতিচারণ করতে হলে হৃদয়ের গভীরে শুনতে হয়, স্মৃতি তুমি বেদনা। কিন্তু এ তো শুধু বেদনা নয়, বুকের ভেতর এক গভীর ক্ষত থেকে নিয়ত রক্তক্ষরণও বটে। বেদনা দৃশ্যমান কিছু নয়, তা অনুভবের ব্যাপার। তেমনিভাবে এ রক্তক্ষরণও দেখা যায় না; যার এমন রক্তক্ষরণ হয়, অনুভূতি শুধু তার বা তাদের। কাজেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মানেই বেদনা আর রক্তক্ষরণ।

বঙ্গবন্ধু তো বাঙালির ইতিহাসে এক বিয়োগান্ত মহানায়কের নাম। কিছু মানুষ নামধারী হায়েনা বঙ্গবন্ধুর জীবন বিয়োগ করে তাদের জীবনে অনেক কিছু যোগ করতে চেয়েছিল। হ্যাঁ, একুশ বছর তারা তাদের হিসাব অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ বিয়োগ করেছিল। তবে বাস্তবে কোনোটিই বিয়োগ করা সম্ভব হয়নি। বঙ্গবন্ধু আছেন ও থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল-প্রোজ্জ্বল; আর বাংলাদেশ তো আজ দীপ্তি ছড়ানো অংশুমান।

দুর্ভাগ্য আমার, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যের কোনো স্মৃতি নেই; আছে দূরদর্শনের অতৃপ্ত অভিজ্ঞতা। এখানে-সেখানে দূর থেকে তার দেখা পাওয়া বা মাইকে তার ভাষণ শোনার অভিজ্ঞতা আছে এন্তার। তবে বোধহয় সবচেয়ে স্মরণীয় অভিজ্ঞতার স্থানে দাঁড়িয়ে আছে ৭ মার্চের অবিস্মরণীয় ভাষণ শোনা। বিলম্বিত উপস্থিতির কারণে রেসকোর্সের জনসমুদ্রে কোথাও ঠাঁই হয়নি আমার; ঠাঁই হয়েছিল টিএসসির দেয়ালের ওপর। তবে অসুবিধা হয়নি বঙ্গবন্ধুকে দেখতে; বা অসুবিধা হয়নি শুনতে, কারণ, মাইকের ব্যবস্থা ভালো ছিল। মনে ছিল দারুণ উত্তেজনা। কদিন থেকে ইথারের তরঙ্গে ভাসছিল একটি কথা যে, ৭ তারিখে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। গুজব হলেও তা ভিত্তিহীন মনে হয়নি। অন্তত দুটো ঘটনা গুজবে কান দিতে প্ররোচিত করেছিল। এক, ২ মার্চ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন প্রাঙ্গণে আ স ম আবদুর রবের বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো। দেশ স্বাধীন না হলেও স্বাধীন দেশের পতাকা উড়তে দেখছি সে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি। দুই, ৩ মার্চ পল্টনে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের র‌্যালিতে শাহজাহান সিরাজ স্বাধীনতার ইশতেহার পড়লেন। স্বাধীন বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসীমা নির্দেশিত হলো। ঘোষিত হলো বঙ্গবন্ধু জাতির পিতা। স্বাধীনতার আর বাকি রইল কী? হ্যাঁ, বাকি ছিল আনুষ্ঠানিক ঘোষণার, যা শুনতে চেয়েছিলাম ৭ মার্চ। কিন্তু সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা হলো না। পরিবর্তে যা শুনলাম তা তো স্বাধীনতা ঘোষণার চেয়ে কম ছিল না; শুনলাম, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ কথা শোনার পর স্বাধীনতা শব্দটি সেদিন আমার চেতনায় আলোড়ন তুলেছিল। বুঝলাম, যা শুনতে সেদিন রেসকোর্সে গিয়েছিলাম তা শোনা হয়েছে। স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর হয়ে সেদিন ঘরে ফিরেছিলাম।

আমি শুনেছিলাম বঙ্গবন্ধুর ৭২-এর ১০ জানুয়ারির ভাষণ। একে তো বঙ্গবন্ধুকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে আত্মহারা, উপরন্তু আবার বজ্রকণ্ঠের ভাষণ। সেদিনও রেসকোর্স ৭ মার্চের মতো জনসমুদ্র ছিল। সেদিন ভাষণ শুনে মনে হয়নি, এ মানুষটি ন-মাসের ওপর তার দেশ ও জনগণ থেকে দূরে নির্জন কারাবন্দি হিসেবে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন। এ ভাষণে সেদিন অনেক কথাই শুনেছিলাম। কিন্তু আজও কানে বাজে চারটি কথা। এক, ‘আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’ দুই, ‘কবিগুরু দেখে যাও, তোমার বাঙালি আজ মানুষ হয়েছে।’ তিন, ‘বাংলাদেশ একটি আদর্শ রাষ্ট্র হবে। যার ভিত্তি কোনো ধর্মভিত্তিক হবে না।’ চার, ‘বাংলার মানুষ মুক্ত হাওয়ায় বসবাস করবে; খেয়ে-পরে সুখে থাকবে।’ সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি গড়ার দিকনির্দেশনা সেদিন নিজ কানে এভাবেই শুনেছিলাম।

তবে আমার পেশাগত জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বঙ্গবন্ধুর একটি সিদ্ধান্ত, সে কথা বলি এখন। ৭২-এর মার্চ মাসে কমনওয়েলথ বৃত্তির জন্য বিশেষ বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। বিশেষ এ কারণে যে, ৭১-এ বিজ্ঞাপন দেওয়া সম্ভব হয়নি। আমি যথারীতি আবেদন করলাম, কিন্তু ব্যর্থ হলাম; এবং তা সব রকম যোগ্যতা থাকলেও বা পূর্বশর্ত পূরণ করলেও। সে বছরই সেপ্টেম্বর মাসে আবার নিয়মিত বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো। আবারও আবেদন করলাম। তবে কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বঙ্গবন্ধুর সিদ্ধান্ত আমার ভাগ্য খুলে দিয়েছিল। যেকোনোভাবে বঙ্গবন্ধু জেনেছিলেন যে, আমি মার্চ মাসে কমনওয়েলথ বৃত্তি পাইনি। তারপর যা ঘটেছিল তা শুনেছি বঙ্গবন্ধুর স্বজন প্রত্যক্ষদর্শীর মুখ থেকে, যা শুনেছি তা-ই এখন বলছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপসচিব ওয়াজিউল্লাহকে (যিনি বিদেশি বৃত্তির বিষয় দেখভাল করতেন) মার্চ মাসের কমনওয়েলথ বৃত্তির ফাইলপত্র নিয়ে বঙ্গবন্ধু তার সঙ্গে দেখা করতে নির্দেশ দিলেন। তো উপসচিব মশায় পড়ি কী মরি নথিপত্র বগলদাবা করে হাজির হলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে। যারা মার্চ মাসে বৃত্তি পেয়েছিল তাদের সম্পর্কে তথ্য আছে এমন ফাইলগুলো আগে পড়লেন বঙ্গবন্ধু; পরে পড়লেন আমার ফাইল। বেশ উষ্মার সঙ্গে তিনি মন্তব্য করলেন, ‘এই ছেলেটির তো দেখছি সব যোগ্যতা আছে। আর যারা বৃত্তি পেয়েছে তাদের সবার তুলনায় ছেলেটি ভালো। ও বৃত্তি পেল না কেন?’ বলা বাহুল্য, সেদিন অপ্রস্তুত হওয়া ছাড়া উপসচিব মশায়ের আর কিছু করার বা বলার ছিল না। যাহোক, তারপর ছিল বঙ্গবন্ধুর ভর্ৎসনা ও নির্দেশ : ‘তোমরা দেশটারে ডুবাবা। খেয়াল রাখবা এ ছেলে যেন এবার বৃত্তি পায়।’ কমনওয়েলথ বৃত্তি আমি পেয়েছিলাম; তবে একটি নয়, দুটি। ব্রিটিশ কমনওয়েলথ বৃত্তির জন্য আবেদন করেছিলাম, সাক্ষাৎকারও দিয়েছিলাম ব্রিটিশ কাউন্সিলে; এবং পেলাম। কিন্তু কানাডিয়ান কমনওয়েলথ বৃত্তির জন্য কোনো আবেদন করিনি; সেটাও আমাকে দেওয়া হলো। অর্থাৎ আমি একই সঙ্গে দুটো কমনওয়েলথ বৃত্তি পেলাম। এমন দৃষ্টান্ত বোধহয় বাংলাদেশে দ্বিতীয়টি নেই। শেষমেশ আমার পছন্দ অনুযায়ী ব্রিটিশ কমনওয়েলথ বৃত্তি বেছে নিতে হয়েছিল। এমন বিস্ময়কর ব্যাপারটি ঘটেছিল বঙ্গবন্ধুর কারণে। বঙ্গবন্ধুর নজরে পড়া প্রার্থী আমি; কাজেই আমাকে তো আমলাতন্ত্র বিশেষ সুবিধা দেবে। বলা বাহুল্য, বঙ্গবন্ধু আমাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন না; কিন্তু আমার সম্পর্কে খোঁজখবর করেছেন আমার কাগজপত্র পড়ে। নেতাকে এমনি হতে হয়; দেশ গড়তে হলে যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করতে হয়।

৭৩-এ কমনওয়েলথ বৃত্তি নিয়ে স্কটল্যান্ডের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি নিয়ে আমার এক আত্মগর্বী অভিজ্ঞতা হয়েছিল। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন শাখার প্রধান মিসেস মরিসন বিভিন্ন ঠিকানায় ফোন করছিলেন খালি অ্যাপার্টমেন্টের জন্য। একপর্যায়ে পাওয়া গেল; এবং ল্যান্ডলেডিকে বলা হলো, আমরা বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি। তো ল্যান্ডলেডি ফোনেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘হোয়াট ইজ বাংলাদেশ?’ (তিনি বলেননি, ‘হোয়্যার ইজ বাংলাদেশ?’)। অর্থাৎ বাংলাদেশ যে একটি দেশের নাম তা তিনি জানতেন না। মিসেস মরিসন আমার কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কী উত্তর দেবেন। আমি বললাম, ‘টেল হার দিস ইজ শেখ মুজিব’স বাংলাদেশ (তুমি তাকে বলো এটা শেখ মুজিবের বাংলাদেশ)।’ মিসেস মরিসন তা-ই বললেন; বাড়িও পেলাম। দেশ চেনে না, কিন্তু নেতাকে চেনে-জানে বিদেশের সাধারণ মানুষ। সেদিন আমার বুকটা যেন অনেক বড় হয়েছিল।

বঙ্গবন্ধুকে দেখেছি, তার কথা শুনেছি। আলোড়িত-আন্দোলিত হয়ে স্বাধীনতার স্বপ্নে উন্মাতাল হয়েছি। কিন্তু তার সঙ্গে কথা হয়নি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার স্মৃতির এটুকু অপূর্ণতা। এ অপূর্ণতা আমার যাপিত জীবনকেই যেন অপূর্ণ করে দিয়েছে।

লেখক : বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত