সেই ভয়াবহ দিনের দুঃসহ স্মৃতি

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ০২:০১ এএম

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সকালে ওই ভয়াবহ দুঃসংবাদ আমি প্রথম শুনি আমার আব্বার কাছে। আব্বা আমাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে এই দুঃসংবাদটা দেন। এবং বলেন যে রেডিওতে বলা হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। আমরা আসলে, শুধু আমি কেন, সমস্ত জাতির কেউ আসলে এত বড় দুঃসংবাদের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। খুব স্বাভাবিকভাবেই প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিলাম। বিশ্বাস হচ্ছিল না যে এই বাংলাদেশে, যার নেতৃত্বে, যার দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের এবং যার স্বপ্নের ফসল এই বাংলাদেশ, সেই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হবে।

তরিঘড়ি উঠে রেডিওর কাছে গেলাম এবং শুনতে পেলাম এই ঘাতকদের অন্যতম, খুনি মেজর ডালিমের কণ্ঠ শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। রেডিওতে শুনলাম। এটা আসলে... তখনো বিশ্বাস হচ্ছিল না। রেডিওতে এর কিছুক্ষণ পরেই বারবার সেই ঘোষণা দেওয়া হচ্ছিল এবং একই ভাবে ঘাতকদের পক্ষে কিছু গান আমরা শুনছিলাম। মনে হচ্ছিল মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত কিছু বদলে গেছে। কালকেও আমরা যেভাবে রেডিও শুনেছি, সেটি বদলে গেছে, এবং বাংলাদেশ উল্টো দিকে যাত্রা শুরু করেছে।

এই যে দুঃসংবাদ, দুঃসংবাদটা আসলে, স্বাভাবিকভাবেই একজন সচেতন বা সাধারণ মানুষ কেউই মেনে নিতে পারছিল না। এবং আমার আব্বা আহমদ হোসেন চৌধুরী তখন আদমজী জুট মিলে, তিনি ছিলেন প্রধান শ্রম ও কল্যাণ কর্মকর্তা। আমরা থাকতাম আদমজী জুট মিলে। আব্বা ছিলেন ভাষাসৈনিক। এক সময়ে মতিঝিল এলাকার বেসিক ডেমোক্রেসির নির্বাচিত সদস্য। সব মিলিয়ে তার পরিচিতি ছিল যে তিনি মুক্তিযুদ্ধপন্থি।

আব্বা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একজন ঘনিষ্ঠ অনুরাগী ছিলেন। আমরা আব্বার কাছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেক কিছু শুনেছি। আমার একটা স্মৃতিকথায়ও আছে যে, আদমজীতে যখন বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন ১৯৬৯ সালে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে মুক্ত হয়ে, তিনি ঢাকার বাইরে প্রথম যে জনসভাটা করেন, সেই সভাটা ছিল আদমজী জুট মিলে। এই মিলের বাইরে, মুনলাইট সিনেমা হলের পেছনে একটা বড় জায়গা ছিল, সেখানে এই সভাটা তিনি করেছিলেন এবং লাখ লাখ লোক সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। এমনকি আমি নিজে, আমি তখন স্কুলের ছাত্র এবং আমি পড়তাম গোদনাইল হাইস্কুলে, তখন ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আমার মনে আছে যে, আমি নিজে আব্বার সঙ্গে ওই মঞ্চে উঠে গিয়েছিলাম এবং সেদিনই প্রথম আমি বঙ্গবন্ধুকে সামনাসামনি দেখেছি। এটা নিঃসন্দেহে বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার, তার সংস্পর্শ পাওয়ার আমার জীবনের এক অসাধারণ স্মৃতি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড গোটা জাতির জন্য তো অবশ্যই, আমাদের পরিবারের জন্য একটা আঘাতস্বরূপ ছিল। আমি কিছুক্ষণ পরে যখন বের হলাম সকালের দিকে, তখনো সবাই যে সঙ্গে সঙ্গে খবর পেয়েছে এমন না।

আমি তখন ঢাকা কলেজে পড়ি। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আমি। কবিতা লিখি। এবং আদমজী থেকেই আসা-যাওয়া করি। তো বাসা থেকে বের হয়ে দেখলাম, চতুর্দিকে একটা থমথমে অবস্থা। মানে কোনো কোনো স্থানে হয়তো দুই/চারজন একটু নীরবে কথা বলছে, কোথাও একটু জটলার মতো। কারণ সমগ্র জাতির জন্য এটা একটা যাকে বলা যায় অকল্পনীয় ঘটনা। এবং যারা শুনছে, তাদের অনেকেই প্রথমবার ঘটনাটা বিশ্বাস করতে পারেনি। মনে হচ্ছে পুরো আদমজী জুট মিল, ত্রিশ হাজার শ্রমিক চাকরি করতেন এবং আদমজীর ভেতরে কিন্তু লক্ষাধিক লোকের বসবাস। কোলাহলপূর্ণ একটা লোকালয়। কিন্তু সেদিন সব জায়গায় একটা স্তব্ধতা। পুরো আদমজী যেন মৃত্যুপুরী হয়ে গিয়েছিল। কেউ আসলে বুঝে উঠতে পারছেন না কী ঘটেছে এবং এক ধরনের আতঙ্ক, ভয় সবকিছু মিলিয়ে সবাই স্তব্ধ। 

আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম বঙ্গবন্ধু হত্যার বিরুদ্ধে একটা প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। কিন্তু যাদের নেতৃত্বে সেটা হওয়ার কথা তাদেরও কিন্তু দেখেছি যে আস্তে আস্তে রেডিও স্টেশনে গিয়ে তারা হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। সবকিছু মিলিয়ে একটা...... সিচুয়েশন, যেটা আসলে ধারণারও অতীত।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। আমি তখন ঢাকা কলেজের ছাত্র। ১৯৭৬ সালে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। এর আগের একটা কথা যেটা বলি। সেই সময় সারা বাংলাদেশে আসলে কেউ প্রতিবাদ করতে পারছিল না। চতুর্দিকে এমন একটা ভয়াবহ পরিস্থিতি, যেটা আসলে যারা দেখেনি, তারা কল্পনা করতে পারবে না। কারণ ঢাকা শহরে ট্যাংক নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি শাহবাগে একটা ট্যাংক রেখে দেওয়া হয়েছিল, যাতে কেউ যদি প্রতিবাদ করতে যায় তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এবং বহু মানুষ নির্যাতিত হয়েছে সেসময় এবং আমরা জানি নভেম্বরের ঘটনা, আমাদের চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হলো। এবং সেই সময়ে ৪ নভেম্বর একটা মিছিল বেরিয়েছিল এবং তারা বঙ্গবন্ধুর ভবনে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়েছিল। তারপর ৭ নভেম্বর আবার প্রতিক্রিয়াশীলতার উত্থানে সবকিছুই আবার বদলে যায়। সবকিছু মিলিয়ে প্রতিকূল একটা স্রোত। যারা প্রতিরোধ করতে গেছে, কেউ কেউ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ করেছে কিন্তু সেই প্রতিবাদগুলো তো এখনকার মতো মোবাইলে করে সারা দেশে বা বিশ্বে ছড়িয়ে যায় তেমন ছিল না, এটার জন্য সময় লাগত। পুরো দৃশ্যপটই পাল্টে গিয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আসলে বুকের ভেতর একরকম চাপা ক্ষোভ। কারণ বঙ্গবন্ধুকে কিশোর বয়সে যেভাবে দেখেছি সেটা তো হৃদয়ে অক্ষয় আসন করে নিয়েছে। বঙ্গবন্ধুর যে মৃত্যু মেনে নিতে পারছিলাম না। স্বাভাবিকভাবেই আমরা চিন্তা করছিলাম যে কীভাবে প্রতিবাদ করা যায়। আমি তখন ২০ বছরের তরুণ, কবিতা লিখি। ১৯৭৭ সালে আমি খুব সাহস করে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি কবিতা লিখে ফেলি। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখে প্রকাশ করে ফেললাম। এটা প্রকাশিত হলো বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ‘জয়ধ্বনি’ নামের পত্রিকায়। এই পত্রিকাটাতে ‘জাতীয়তাময় জন্ম-মৃত্যু’ শিরোনামে। এই কবিতাটা প্রকাশের সময়ের কথা আমার মনে আছে।  আমি কলাভবনে ঢুকেই দেখলাম কলা ভবনের চারপাশে পোস্টারে লেখা আমার কবিতা!

‘‘রক্ত দেখে পালিয়ে গেলে / বক্ষপুরে ভয়

ভাবলে না কার রক্ত এটা / স্মৃতিগন্ধময়

দেখলে না কার জন্ম-মৃত্যু জাতীয়তাময়!’’

আমার কবিতার লাইন দিয়ে পোস্টার করা হয়েছে। এখন ভাবলে অন্যরকম লাগে। কখনো ভাবিনি যে ওটার ছবিটবি তুলে রাখা দরকার। তো এটি নিয়ে পরে অনেকে লেখালেখি হয়েছে। কবি সিকান্দার আবু জাফর, তিনি ‘সমকাল’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি তখন প্রয়াত, কিছুদিন পত্রিকাটা হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদনা করেছেন, পরে ইসমাইল মোহাম্মদ। তিনি একসময় চলচ্চিত্র নির্মাণও করতেন উদয়ন চৌধুরী নামে। ইসমাইল মোহাম্মদ এই সমকাল পত্রিকাটা সম্পাদনা করতেন। আমি তো আসলে এক তরুণ কবি, ২০ বছর বয়স মাত্র। সমকাল পত্রিকাতেই আমার ‘রক্তাক্ত পঙ্ক্তিমালা’ ছাপা হয়েছিল। সমকাল পত্রিকায় তখন বেশ আড্ডা হতো। তখনকার লেখকরা সেখানে সমবেত হতেন। সেই সময় লেখকরাও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন। কিন্তু তারপরও কমবেশি যারা প্রতিবাদী লেখক তারা সমকালে যেতেন। যেমন আমি বলব যে, হাসান হাফিজুর রহমান, মহাদেব সাহা, নির্মলেন্দু গুণ, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, শিহাব সরকার, মোহাম্মদ রফিক, মুহম্মদ নূরুল হুদা এরকম লেখকরা সমকালে যেতেন। এই সমকাল পত্রিকার একটি সংখ্যায় প্রথম বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে লেখা গল্প ছাপা হয়েছিল। সেটা ১৯৭৭ সালে, পৌষ মাসে। সেই হিসেবে আসলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রথম কবিতা, যা আমার লেখা, সেটা  প্রকাশের কিছু আগে গল্প প্রকাশিত হয়, আবুল ফজলের গল্প ‘মৃতের আত্মহত্যা’।

সমকাল পত্রিকা আমার ওই কবিতাটাকে ‘জাতীয়তাময় জন্ম-মৃত্যু’, তারা লিখল পঁচাত্তর-উত্তর বাংলা কবিতার, মানে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রকাশিত প্রথম প্রতিবাদী কবিতা। এবং সেখানে লেখা হলো কামাল চৌধুরী হচ্ছে ‘পঁচাত্তর উত্তর বাংলা কবিতার সাহসী সত্য উচ্চারণের ভোরের পাখি’। হুবহু মনে নেই তবে এমনই বলা হয়েছিল। সে হিসেবে ধরা যায় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে এটিই প্রথম কবিতা। বিভিন্ন স্থানে কাছাকাছি সময়ে আরও প্রতিবাদী লেখা হয়েছে। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশের তারিখ হিসেবে যেহেতু ১৯৭৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকেই এটা ছাপা হয়েছে, সেই অর্থে এটাকে প্রথম প্রকাশিত কবিতা হিসেবে ধরা হয়। আর নির্মলেন্দু গুণ ১৯৭৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ্যে প্রথম কবিতা পাঠ করেছিলেন। বাংলা একাডেমিতে তিনি প্রকাশ্যে কবিতা পাঠ করেছিলেন।

এরপরে আরেকটি সাহসের কাজ যেটা আমি করেছিলাম, সেটা হলো ২৬ মার্চ ১৯৭৭ আদমজী জুট মিলে একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। সেখানে আমাকে কবিতা পড়তে ডাকা হয়েছিল, আমি সেদিন সেই অনুষ্ঠানে খুবই আবেগভরে এবং সাহস করে বঙ্গবন্ধুর কথা বলেছিলাম। তার স্মরণে কবিতা পাঠ করেছিলাম। সেইসময় আসলে সারা বাংলাদেশে যে পরিস্থিতি, সামরিক শাসন, ঘাতকদের আস্ফালন, একাত্তরের পরাজিত শক্তির উত্থান। সেই সময় যেই দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিল সেটা আসলে এখন ভাষায় প্রকাশ করাটা খুব কঠিন। আমি দেখলাম আমি যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা পড়ছি সবাই তখন ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। আদমজীর অনেক অফিসার বা ওখানকার যারা ছিলেন, আমি যখন কবিতা পড়া শুরু করেছি অনেকে সেখান থেকে উঠে পালানো শুরু করলেন। মানে সবাই ভাবছে এখনই আর্মি এসে পড়বে। তো এরকম একটা পরিস্থিতিতে আমি যে সেদিন কবিতা পাঠ করতে পেরেছিলাম এটাও আমাকে খুব আবেগে আপ্লুত করে এখন। এর পরে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আরও লিখেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গফুর মিয়ার চায়ের দোকানে বসে লিখেছিলাম ‘‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে’’, যা পরে  দেয়াললিখন হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে উঠে এসেছিল। মিছিলে মিছিলে স্লোগান হয়ে উঠেছিল এই লাইন। এভাবেই ওইসময়ের একজন তরুণ লেখক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রতি যে ভালোবাসা, সেটা এভাবে নিবেদন করার চেষ্টা করেছিলাম।

লেখক : কবি। প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত