ভোর থেকেই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২২, ০২:০২ এএম

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৭৫-এর ১৪ আগস্ট। আমার বাসা ছিল ধানমন্ডিতে এখন যেখানে আওয়ামী লীগ সভাপতির কার্যালয়, তার পাশেই বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানের বাসভবন সেটিই তখন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের বাসভবন। প্রতিদিনের মতো সকাল বেলা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে যাই। সেখান থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে গণভবনে গিয়েছিলাম। দিনের কাজ শেষে দুপুরবেলা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একই টেবিলে বসে একসঙ্গে খেয়েছি। খাবার শেষে বঙ্গবন্ধু বিশ্রাম নিলেন।

এদিন প্রথম সাক্ষাৎ ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট পার্ক চুং হি’র বিশেষ দূতের সঙ্গে। তারপর পুরনো গণভবনের মাঠে হাঁটলেন অনেকক্ষণ। এবিএম মূসা কিছুদিন আগে যিনি মৃত্যুবরণ করেছেন তার সঙ্গে অনেকক্ষণ গল্প করলেন। এরপর এসে গণভবনে নিজ কক্ষে বসলেন।

সেদিন বঙ্গবন্ধুর যুগ্ম সচিব জনাব মনোয়ারুল ইসলাম এবং ব্যক্তিগত সচিব জনাব ফরাসউদ্দীন এই দুজন পিএইচডি করতে বিদেশ যাবেন এ উপলক্ষে কর্মকর্তাদের নৈশভোজ। নৈশভোজ শেষে তাদের বিদায় করে আমি আবার ৩২ নম্বরে এলাম। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তখন খাবার টেবিলে। আমাকে কাছে ডেকে বললেন, ‘কাল সকালে আমার বাসায় আসবি। তুই তো ডাকসু’র ভিপি ছিলি। তুই আমার সঙ্গে তোর প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাবি।’ এই কথা বলে আমি এবং বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার মহিউদ্দীন যিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তিনি প্রথমে আমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে তার বাসায় চলে গেলেন।

পরদিন ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনককে পরিবারের ১৭ জন সদস্যসহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। দেশের নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানকে পরিবারের সদস্যসহ এরূপ ভয়াবহভাবে হত্যার ঘটনা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। বর্বর হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ঘাতক খুনি-চক্র স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অগ্রগতিকে।

সেদিন ভোর থেকেই দিনটি ছিল বিভীষিকাময়। হত্যাকান্ডের পরপরই সকালে আমাকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দি করা হয়। ধানমন্ডির যে বাসায় আমি থাকতাম সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত সেই বাসাটি সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। বাসায় কাউকে ঢুকতে বা বেরুতে দেওয়া হয়নি। আমার বাসভবনে তখন অবস্থান করছিলেন ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জনাব শামসুদ্দীন আহমেদ মিয়া। তিনি ভোলা জেলা বাকশালের সেক্রেটারি ছিলেন। দুদিন পর ১৭ তারিখ খুনি-চক্রের অন্যতম ক্যাপ্টেন মাজেদের (ইতিমধ্যে তার ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে) নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীর একদল উচ্ছৃঙ্খল সদস্য আমার বাসভবন তছনছ করে। ঘরের দেয়ালে সংরক্ষিত বঙ্গবন্ধুর ছবিগুলো ভেঙে ফেলে। মায়ের সামনেই হাত-চোখ বেঁধে আমাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে যায়। সেখানে খুনি-চক্রের সমর্থনে সম্মতি আদায়ে উপর্যুপরি নির্যাতন চালায়। তখনো জেনারেল শফিউল্লাহ সেনাপ্রধান এবং কর্নেল শাফায়াত জামিল ব্রিগেড কমান্ডার। তাদের হস্তক্ষেপে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা প্রয়াত আমিন আহমেদ চৌধুরী (পরে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) আমাকে মায়ের কাছে পৌঁছে দেন।

এরপর ২৩ আগস্ট ই. এ. চৌধুরী একদল পুলিশসহ এসে আমার বাসভবন থেকে আমাকে এবং জনাব জিল্লুর রহমানের (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি) বাসভবন থেকে তাকে বঙ্গভবনে নিয়ে যান। বঙ্গভবনে খুনি মোশতাক তার অবৈধ সরকারকে সমর্থন করার জন্য আমাদের দুজনকে প্রস্তাব দেয়। আমরা খুনি মোশতাকের প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করি।

সেপ্টেম্বরের ৬ তারিখ জিল্লুর রহমান, আমাকে ও আবদুর রাজ্জাককে একই দিনে গ্রেপ্তার করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কোণে অবস্থিত পুলিশ কন্ট্রোলরুমে ৬ দিন বন্দি রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। আমাদের সঙ্গে আর একজন বন্দি ছিলেন। তিনি ‘দি পিপল’ পত্রিকার সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক জনাব আবিদুর রহমান। পুলিশ কন্ট্রোল রুমের একটি ছোট্ট ঘরের মধ্যে পাশাপাশি দুটি চৌকির একটিতে ঘুমাতাম আমি ও রাজ্জাক ভাই এবং অপরটিতে জিল্লুর ভাই ও আবিদুর রহমান। এমনি একদিন রমজান মাসের তিন তারিখ রোজা রেখে নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। শেষ রাতের দিকে সেনাবাহিনীর একদল লোক কক্ষে প্রবেশ করে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলতে থাকে ‘হু ইজ তোফায়েল’ ‘হু ইজ তোফায়েল!’ রাজ্জাক ভাই জেগে উঠে আমাকে ডেকে তোলেন। চোখ মেলে দেখি আমার বুকের ওপরে স্টেনগান তাক করা। আমি ওজু করতে চাইলে অনুমতি দেওয়া হয়। কক্ষের সঙ্গেই সংযুক্ত বাথরুম। ওজু করে আসার সঙ্গে সঙ্গেই জিল্লুর ভাই, রাজ্জাক ভাই এবং আবিদুর রহমানের সামনেই আমার চোখ বেঁধে বারান্দায় নিয়ে হাত বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়।

আমি অনুভব করি আমাকে রেডিও স্টেশনে আনা হয়েছে। এরপর হাত-চোখ বাঁধা অবস্থায়ই চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। নির্যাতনের এক পর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে অনেকগুলো প্রশ্ন করা হয়। বঙ্গবন্ধু কী করেছেন, তার কোথায় কী আছে এরকম বহু প্রশ্ন। এসব প্রশ্নের উত্তর না দেওয়াতে ভীতি প্রদর্শন করে খুনিরা বলে, ইতিমধ্যে আমার এপিএস শফিকুল আলম মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সে আমার বিরুদ্ধে ৬০ পৃষ্ঠার এক বিবৃতি দিয়েছে। সেই বিবৃতিতে আমার বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ রয়েছে। তথাপি আমি নিরুত্তর থাকি। শুধু একটি কথাই বলেছিলাম, ‘বঙ্গবন্ধু যা ভালো করেছেন আমি তার সঙ্গে ছিলাম, যদি কোনো ভুল করে থাকেন তার সঙ্গেও ছিলাম। এর বেশি কিছুই আমি বলতে পারব না।’

শেষ পর্যন্ত ঘাতকরা এসে বলল, ‘আমরা যে প্রশ্নগুলো করেছি তার উত্তর দিতে হবে; উত্তর না দিলে আপনাকে আমরা রাখব না।’ নিরুত্তর থাকায় পুনরায় তারা আমাকে নির্যাতন করতে থাকে এবং একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। 

এরপর সিটি এসপি সালাম সাহেব ডাক্তার নিয়ে আসেন। এ অবস্থার মধ্যেই রাতে মেজর শাহরিয়ার আমার কাছ থেকে বিবৃতি নিতে আসেন। তিনি আমাকে বলেন, ‘যে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে তার লিখিত উত্তর দিতে হবে।’ আমি মেজর শাহরিয়ারকে বললাম, ‘আপনারা আমাকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন দিতে পারেন; আমি কোনো কিছু লিখতেও পারব না, বলতেও পারব না।’ ওরা যখন দেখল আমার কাছ থেকে কোনো বিবৃতি আদায় করা সম্ভবপর নয়; তখন তারা উপায়ান্তর না দেখে চলে যায়।

পরদিন ১২ সেপ্টেম্বর আমাকে ও আবিদুর রহমানকে ময়মনসিংহ কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জিল্লুর রহমান ও আবদুর রাজ্জাককে কুমিল্লা কারাগারে পাঠায়। ফাঁসির আসামিকে অন্ধকার নির্জন প্রকোষ্ঠে (কনডেম সেলে) যেভাবে রাখা হয় ময়মনসিংহ কারাগারে আমাকেও সেইভাবে বন্দি করে রাখা হয়। এরপর ২০ মাস ময়মনসিংহ কারাগারে অবস্থানের পর ’৭৭-এর ২৬ এপ্রিল আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। বিচারপতি জনাব কে এম সোবহান এবং বিচারপতি জনাব আবদুল মুমিত চৌধুরী’র সমন্বয়ে গঠিত বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনের একটি ডিভিশন বেঞ্চ ’৭৮-এর ৯ জানুয়ারি এক রুল জারি করে। রুলে বলা হয়, ‘কারাগারে আটক জনাব তোফায়েল আহমেদকে কেন আদালতের সামনে হাজির করা হবে না এবং কেন তাকে মুক্তি দেওয়া হবে না’ সে বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার ও অন্যদের কারণ দর্শাতে বলা হচ্ছে।

কুষ্টিয়া কারাগারে যখন আমি বন্দি তখন আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। রাজ্জাক ভাই এবং আমার একসঙ্গে রিট হয়। রাজ্জাক ভাই হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পেলেও আমি মুক্তি পাইনি। অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের রায়ে আমি মুক্তি পেলাম ৪ মাস পর অর্থাৎ ১৯৭৮-এর ১২ এপ্রিল। ইতিমধ্যে কারাগারে আটকাবস্থায় আমি আওয়ামী লীগের সম্মেলনে সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হই। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর কুষ্টিয়া কারাগারে ১৩ মাসসহ সর্বমোট ৩৩ মাস বন্দি থাকার পর আমি মুক্তি লাভ করি।

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত