মঙ্গলবার, ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কেন স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়ছেন ড্রোন অপারেটররা

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০১৮, ০৪:১১ পিএম

ইয়েমেনে একটা জাহাজের কন্টেইনারের ভেতরে তথ্য-প্রযুক্তি সমৃদ্ধ রুমের মধ্যে বসে আছেন কয়েকজন তরুণ-তরুণী। তাদের হাতে জয়স্টিক মানে ড্রোন নিয়ন্ত্রণকারী যন্ত্র। সামনে বিশাল স্ক্রিন। সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। এই নির্জন রুমে বসে থাকা মানুষদের হাতেই হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের এসব মানুষের মৃত্যু।

এতক্ষণ যেই কন্টেইনারবাসীর কথা বলছি, তারা হলেন ইয়েমেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিতর্কিত ড্রোন হামলা কর্মসূচিতে যুক্ত নির্বাচিত কিছু নারী-পুরুষ। তাদের হাত দিয়েই হচ্ছে ড্রোন হামলাগুলো। লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা ছাড়া তাদের ভুলের কারণেও নিহত হচ্ছে অনেক নিরীহ প্রাণ। রাশিয়ার প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আরটি চ্যানেলের ওয়েবসাইটে আইরিশ ফ্রিল্যান্স লেখিকা ডানিয়েল রায়ানের লেখায় ওঠে এসেছে মার্কিন ড্রোন হামলায় অংশ নেয়া মানুষদের এমন কিছু বাস্তবিক চিত্র।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদ সংস্থা এপির সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরে ইয়েমেনে ড্রোন হামলায় নিহত এক-তৃতীয়াংশ মানুষ কোন ধরনের জঙ্গিবাদী বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। আলকায়েদা বা অন্যান্য সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গেও তাদের কোনো সম্পর্ক নেই।

শুধু ইয়েমেনেই নয়, পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া এমনকি সোমালিয়ায়ও মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হচ্ছে নিরাপরাধ মানুষ। এই হামলার সঙ্গে যুক্ত আছে সরকারগুলোও। স্বপ্রণোদিতভাবে বা বাস্তবতার কারণে চালানো এইসব ড্রোন হামলাকে তারা ‘নির্ভুল’ এবং ‘আকস্মিক সামরিক অভিযান’ হিসেবে উল্লেখ করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেসামরিক লোকই এর শিকার হচ্ছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন ড্রোন হামলা নিয়ে গোপন তথ্য ফাঁস হওয়ায় নির্মম ও নিষ্ঠুর এই হত্যাযজ্ঞের পেছনের কাহিনী বিশ্ববাসীর নজরে আসে। মার্কিন বাহিনীতে একসময় কাজ করা ড্রোন প্রযুক্তিবিদ ও পরিচালনাকারী, ক্যামেরা অপারেটর এবং ইমেজ এনালাইসিস্টরাই এসব তথ্য ফাঁস করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে। এতে দেখা যাচ্ছে- ড্রোনচালনাকারীদের কী পরিমাণ মানসিক বিপর্যস্ততা ও চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। সেইসঙ্গে তাদের মুখোমুখি হতে হয় করুণ বাস্তবিক পরিস্থিতির।

গত ২০১৫ সালে মার্কিন বিমান বাহিনীর আভ্যন্তরীণ এক তথ্য প্রকাশ পায় ডেইলি বিস্টে। এতে দেখা যায়, ড্রোন পাইলটরা এ কর্মসূচির সাথে থাকতে চাইছেন না, দলে দলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। শেষপর্যন্ত ছয় অংকের বেতন প্রস্তাব করেও তাদেরকে রাজি করাতে পারেনি বিমান বাহিনী।

সময় ও শ্রমসাধ্য, দুঃসহ এবং অতিরিক্ত চাপের কারণে এই কাজ থেকে তারা বেরিয়ে যাচ্ছে্ন বলে জানান ‘উই কিল বিকজ উই ক্যান’ বইয়ের লেখিক লাউরি ক্যালহোন। বইটিতে মার্কিন ড্রোন হামলা ও অভিযান নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করেছেন এ নারী বিশ্লেষক।

তিনি বলছেন, ড্রোন হামলা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেয়া এসব কর্মকর্তাদের মধ্যে আসলে মোহমুক্তি ঘটেছে বলা চলে। সেইসঙ্গে নিরাপরাধ মানুষ হত্যায় তাদের মধ্যে অপরাধবোধ ও অনুশোচনা বোধের সৃষ্টি হয়েছে।

ড্রোন প্রযুক্তির এই সময়ে এসে যেখানে অপারেটরদের কোনো ধরনের হতাহত হবার আশঙ্কা নেই, সেখানে তাদের এই জায়গা ছেড়ে দেয়াটা মূলত মানসিক বিপর্যস্ততা (পিটিএসডি) থেকেই। ‘নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি’ থেকেই মানসিকভাবে তারা এই নীরব হত্যাকাণ্ড এ পর্যায়ে মেনে নিতে পারেন না।

এটা খুব সহজে বলা যায় যে, ড্রোন পরিচালনাকারী এসব নারী-পুরুষ পারষ্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন, সেইসঙ্গে অনেকটা উম্মাদগ্রস্ততো বটেই। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এরা সাধারণ মানুষই এবং অধিক বেতনের লোভ দেখিয়ে তাদেরকে এ কাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। তাদেরকে এটাও নিশ্চিত করা হয় যে, তারা নৈতিক ও ন্যায়মূলক কাজের সঙ্গেই যুক্ত আছে।

ভার্জিনিয়ার ল্যাংগলিতে কাউন্টার টেরোরিজম এয়ারবোর্ন অ্যানালাইসিস সেন্টারের ইমেজ এনালাইসিস্ট হিসেবে কাজ করতেন ক্রিস্টোফার অ্যারোন। যিনি ২০০৬ সালে আফগানিস্তানে গোয়েন্দাবৃত্তির কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন।

সফলভাবে হত্যাকাণ্ড শেষে মার্কিন ঘাঁটিতে কীভাবে উদযাপন করা হতো সেটা জানান তিনি। নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছাড়াও সাধারণ অনেক মানুষও মারা যেতেন এসব হামলায়। পরদিন আবার সামনে টিভির বড় পর্দাতেই দেখতেন, নিহত সেসব মানুষদেরকে কবর দেয়ার জন্য মানুষের মিছিল। মনে হতো- নিজের সামনে দিয়ে এই মিছিল চলে গেল যেন।

অ্যারোনের সহকর্মীরা শুরুর দিকে তাদের কাজ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করতে লাগলেন। তারা আসলে কী করছিলেন পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলেন না। কিন্তু উচ্চপদস্থদের কাছে নিজেদের এসব চিন্তা-দুশ্চিন্তা প্রকাশ করতে পারতেন না বা কীভাবে প্রকাশ করবেন সেটা বুঝতেন না। অ্যারোন বলেন, “আমরা নিজেদের ভাবনা নিজেদের মধ্যেই রেখে দিতাম। সামরিক কর্তৃপক্ষ কখনো ভিন্নমত শুনতে চাইতো না। শুধুমাত্র গোয়েন্দাবৃত্তির সঙ্গে জড়িতদের ছাড়া, তাও নির্দিষ্ট অবস্থায়।”

গত ২০০৯ সালে আফগানিস্তানে অ্যারোনের চাকরির দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হয়। এসময় তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন- শারীরিকভাবে এবং মানসিকভাবে। এই পরিস্থিতি থেকে স্বাভাবিক হতে তার সময় লেগেছিল পরবর্তী পাঁচ বছর। এরপর তিনি প্রকাশ্যে তার আফগানিস্তান অভিজ্ঞতার কথা বলা শুরু করেন।

সীমিত নৈতিক জ্ঞান এবং পারষ্পরিক বিচ্ছিন্নতাবোধের মধ্য দিয়ে অফিসে বসে যারা পৃথিবীর অন্য জায়গায় মানুষকে হত্যা করছে, তারা কিন্তু ঠিকই স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। মুদি দোকানে যায়, সদাইপাতি করে, জিমে যায় এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটায়। আর এটা যেন কেবল  নিজেদের এসব কাজকে আড়াল করে রাখার জন্য।

ড্রোন দিয়ে মানুষ মেরে অ্যারোনের মতো অনেকেই যেভাবে মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত হচ্ছেন, সেটা আসলেই সত্য। ক্যালহোন এ ব্যাপারে বলছেন, এই কাজের জন্য আসলে এমন লোককে সামরিক বাহিনীর নির্বাচন করা উচিত, সহকর্মীকেও হত্যা করার পর যার অনুশোচনাবোধ থাকবে না।

সম্ভাব্য প্রার্থীরা হবেন ভিডিও গেমসে পারদর্শী- যেখানে পর্দাতেই তারা মানুষ মারবে কিন্তু দেখানো হবে ড্রোন হামলায় হতাহত লোকদের ফুটেজ। তবে এই ক্ষেত্রে যারা প্রশ্ন তুলে বা ভিন্নমত পোষণ করে তাদেরকে এখান থেকে বাদ দেয়া হবে। এমনকি তিনি এমনও প্রস্তাব করেন যে, যাদের ইতোমধ্যে অপরাধপ্রবণতা আছে এবং সেইসঙ্গে মৃত্যু ও কারাগারে যাওয়ার ঝুঁকির তোয়াক্কা না করে উচ্চ বেতনে এই কাজ করতে রাজি হবে এবং মানুষ হত্যা করবে, তাদেরকেই নেয়া উচিত।

গত ২০১৬ সালে মার্কিন ড্রোন কর্মসূচির প্রভাব নিয়ে ‘ন্যাশনাল বার্ড’ নামে ডকুমেন্টারি করতে গিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিক সোনিয়া কেনেবেক তিনজন ‘গোপন তথ্য ফাঁসকারী’র সঙ্গে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন ড্রোন কর্মসূচির গোপন অধ্যায়।

দানিয়েল নামে গৃহহীন এক কিশোরের সম্পর্কে জানা গেছে,  যার পরিবারের অন্যান্য পুরুষ সদস্যরা লঘু অপরাধে কারাগারে ছিল। আরেকজন হচ্ছেন- হাইস্কুল পাস করা হিটার লাইনবো নামে এক তরুণী, যেভাবেই হোক একটা চাকরি নিয়ে পেনসিলভেনিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন তিনি। সেইসঙ্গে এমন সব কাজের প্রতি তার আগ্রহ ছিল যা মানুষের কল্পনারও বাইরে, অনেকটা ভিডিও গেমসের চরিত্রের মতো।

সোনিয়াকে হিটার বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীকে রক্ষা করে চলেছে। আমরা মার্কিনিরা হচ্ছে তাদের বড়ভাই এবং সকল ধরনের বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে তাদেরকে আমরা সহযোগিতা করছি। এমন অনুভূতি আমাদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হতো।”

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আরো কঠিন কিছু। লাইনবো বলেন, “এটা আসলে আদিম যুগের বর্বরতা, ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা। এটাই আসলে বাস্তবতা, মজার কিছু নয়।”

তিনি বলেন, “আপনি একজনকে হত্যা করছেন কারণ আপনাকে বলা হয়েছে যে তাকে হত্যা করা ন্যায়সঙ্গত। এ কাজ করতে গিয়ে সবসময় আমার ভেতরটা ঝাঁকুনি দিত। অনেক সময় আমি দৌড়ে বাথরুমে চলে যেতাম এবং টয়লেটে বসে কান্না করতাম।”

ড্রোন পরিচালনার কাজ করা আরেক তথ্য ফাঁসকারী ব্রানডন ব্রায়ান্ট বলেন, তিনি যখন প্রথম লাস ভেগাসের বাইরে ক্রিক এয়ার ফোর্স ঘাঁটিতে গেলেন, সেখানে দেখলেন তার মতো নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের জোরে জোরে হেভি মেটাল গান শোনানো হচ্ছিল। এক অফিসার ঘোষণা দিচ্ছিলেন- জেন্টেলম্যান, ওয়েলকাম টু ক্রিক। সবার উদ্দেশ্যে তিনি বলছিলেন- তোমাদের কাজ হচ্ছে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা এবং মানুষ হত্যা করা। এরকম নানাভাবে নতুন আগতদেরকে প্রস্তুত করা হচ্ছিল কাজের জন্য।

ড্রোন হামলার যৌক্তিকতা নিয়ে একটা প্রতিষ্ঠিত ধারণা হচ্ছে, ড্রোন অভিযানে বেসামরিক মানুষের হতাহতের সংখ্যা কম থাকে। কিন্তু ২০১৪ সালে পাকিস্তানে মার্কিন ড্রোন হামলার ভয়ঙ্কর একটা তথ্য হচ্ছে, দেশটিতে ড্রোন হামলায় ১,১৪৭ জন মানুষ মারা গেছে, যার মধ্যে মাত্র ৪১ জনেরই কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ছিল।

তথ্য সংগ্রহকারীদের থেকে তথ্য নিয়ে গোয়েন্দারা হামলার লক্ষ্যবস্তু ঠিক করে থাকে। তবে আঘাত হানার আগে উচিত সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর আচার-আচরণ ও গতিবিধি গভীরভাবে বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ করা। কিন্তু ড্রোন পরিচালনাকারীদের এটা জানার কোন উপায় থাকে না, তারা শুধু নির্দেশ পেয়ে মানুষ হত্যা করে। কোন হামলায় হতাহত কমবেশি হচ্ছে, সেটি জানার কোনো উপায় থাকে না তাদের।

এদিকে এক সময় ড্রোন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত থাকা ও এ সংক্রান্ত গোপন তথ্য ফাঁসকারী ব্যক্তিরা সরকারি চাপের সম্মুখীন হচ্ছেন। কেনেবেকের ডকুমেন্টারিতে তথ্য দেয়া দানিয়েলের বাড়িতে ৫০ জনের মত এফবিআই এজেন্ট অভিযান চালায়। তার বাড়ি থেকে নানা নথিপত্র ও ইলেক্ট্রনিক্স ডিভাইস জব্দ করে। এমনকি আরেকজনের বাসায় গিয়ে দুই সামরিক কর্মকর্তা তার মাকে জানান, তিনি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হিটলিস্টে আছেন।

এই নিষ্ঠুর কর্মসূচির সঙ্গে অ্যারোনের মতো সম্পৃক্ত থাকা সবার মনে একটা ভাবনা উদ্রেক করে, তা হচ্ছে- এই হত্যাকাণ্ড সহিংসতাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে, সেইসঙ্গে চরমপন্থা আরো ছড়িয়ে পড়ছে।

মার্কিন ড্রোন হামলার কারণে ইসলামী যোদ্ধারা এবং উগ্রবাদী প্রচারকরা আরো বেশি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছে এবং তাদেকে নিজেদের দলে টানছে। আর এদিকে ড্রোন হামলায় নিহত সাধারণ মানুষরা পরিণত হচ্ছে নিছক সংখ্যায়।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত