৪০ গডফাদারের নিয়ন্ত্রণে চুয়াডাঙ্গার মাদক সিন্ডিকেট

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১১:৪৪ পিএম

চুয়াডাঙ্গার চারটি উপজেলার ছোট-বড় প্রায় অর্ধশত স্পটে চলছে ইয়াবা-ফেনসিডিলের রমরমা ব্যবসা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রায় ৫০০ জন কারবারি নিয়ন্ত্রণ করছে জেলার মাদকের সাম্রাজ্য। গডফাদার হিসেবে কাজ করছেন প্রায় ৪০ জন; যাদের অধিকাংশই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।  গত ৫-৬ মাস আগেও জেলায় ইয়াবার জোগান দিত কক্সবাজার ও ঢাকার দুটি বড় সিন্ডিকেট।  আর ফেনসিডিল আসত প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে। এরই মধ্যে সীমান্তের বিপরীতে ভারতের অভ্যন্তরে প্রায় ১৫/২০টি ইয়াবা কারখানা গড়ে তুলেছে দেশটির মাদক কারবারিরা। এতে সীমান্ত পেরিয়ে অনায়াসে চুয়াডাঙ্গায় ফেনসিডিলের পাশাপাশি ঢুকছে মারণনেশা ইয়াবা।

গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্টরা জানায়, মূলত জেলার ইয়াবা সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৪০ জন গডফাদার; তারা সবাই বিত্তবান ও প্রভাবশালী। তারাই প্রাণঘাতী মাদকদ্রব্যটি বাজারজাতের বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।  রাজনৈতিক দাপট, প্রশাসনিক ক্ষমতা আর মাদকের অর্থে পরিচালিত এই ইয়াবা-ফেনসিডিল চক্রের প্রতাপ যেন আকাশছোঁয়া। এ কারণে তারা সব সময়ই থাকেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়া ভারত সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে আসছে ফেনসিডিল। এক্ষেত্রে দু’দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কয়েকজন অসাধু সদস্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মাদক কারবারিদের সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইয়াবা সিন্ডিকেটের আদ্যোপান্ত অনুসন্ধানে নেমে ‘র’ আদ্যক্ষরের এক কারবারির সঙ্গে কথা হয়।  তিনি জানান, মূলত এই ব্যবসায় একবার ঢুকলে বের হওয়া কঠিন।  একে তো কাঁচা টাকা, তাছাড়া সিন্ডিকেটটি এতটাই শক্তিশালী যে বের হতে চাইলেও নিজেদের ক্ষতির আশঙ্কায় শীর্ষ গডফাদাররা আটকে দেয় নানা বেড়াজালে।  তিনি আরও জানান, চুয়াডাঙ্গায় ছোট-বড় মিলে মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা পাঁচ শতাধিকের ওপরে। আবার তাদের নিযুক্ত ফেরিওয়ালা আছে আরও প্রায় তিন শতাধিক; যাদের প্রধান টার্গেট উঠতি বয়সের ছেলেরা।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে, গত বছরের প্রথম দিকে চুয়াডাঙ্গার মাদক সিন্ডিকেট নিয়ে তৈরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় ১১৯ জনের নাম উঠে আসে। এতে গডফাদার ও হোয়াইট কলার ক্রিমিনাল হিসেবে স্থান পায় চারজন। চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের (দামুড়হুদা, জীবননগর ও সদরের একাংশ) সংসদ সদস্য হাজি আলী আজগর টগরের ছোটভাই আলী মুনসুর বাবু, তার ঘনিষ্ঠ সহচর জীবননগরের মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সোহরাব হোসেন সুরোদ্দিন, যুবলীগ নেতা দর্শনা পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর জয়নাল আবেদীন ওরফে নফর এবং সদ্যবিজয়ী স্থানীয় সরকারের এক জনপ্রতিনিধিসহ তালিকাটিতে পুলিশ ও বিজিবির ১৬ সদস্যসহ পাঁচ ভারতীয় নাগরিকের নাম রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম আসার বিষয়টিকে ষড়যন্ত্র বলছেন সাংসদ ও তার সমর্থকরা।  সাংসদ আলী আজগর টগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে হেয় করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে দলের ভেতরে-বাইরে ষড়যন্ত্র চলছে।  যারা তালিকা প্রণয়ন করেছেন, তারা প্রতিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে দেখিয়েছেন।’সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর জেলা সভাপতি চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘চুয়াডাঙ্গাতে এখনো বড় কোনো মাদক ব্যবসায়ী আটক হয়নি।  যারা আটক হচ্ছে তারা ছিঁচকে পর্যায়ের।’ গডফাদাররা আইনের আওতায় না এলে কোনো অভিযানই কাজে আসবে না বলেও মনে করেন তিনি।

চুয়াডাঙ্গার পুলিশ সুপার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোনো আপস নেই; তারা যত শক্তিশালীই হোক আমাদের কাছে তাদের একটাই পরিচয়, তারা ক্রিমিনাল।’ মাদকের বিরুদ্ধে জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করে জেলা পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘এরমধ্যে আমরা বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছি।  বাকিদের গ্রেপ্তারেও প্রতিনিয়ত অভিযান পরিচালনা করছি। জেলায় মাদকের শেকড় নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এই অভিযান চলবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত