বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নায়িকা সুচিত্রা সেনের পঞ্চম প্রয়াণ দিবস আজ। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে চিরদিনের মত পৃথিবী ছেড়ে যান তিনি। তবু বাঙালি হৃদয়ে আজও অম্লান সুচিত্রা সেন। বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ এই নায়িকার স্মৃতির পরশ পেতে প্রতিদিনই তার পাবনার পৈতৃক ভিটায় ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। দেশ-বিদেশের হাজারো ভক্তের প্রত্যাশা পূরণে সংগ্রহশালার পরিসর বৃদ্ধি করে পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতি কেন্দ্রে রূপ দেওয়ার দাবি করেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীরা।
চিরকালীন বাঙালি রূপে, অনন্য সুন্দর চোখের দৃষ্টি আর ঠোঁট বাঁকানো হাসিতে কোটি ভক্তের হৃদয় কাড়া নায়িকা সুচিত্রা সেনের ছিল আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা।
বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিকতার আদর্শ হয়ে পাবনার হেমসাগর লেনে জন্ম নেওয়া রমা দাশগুপ্তের নাম তাই হারিয়ে গেছে, সুচিত্রা সেন নামের আবডালে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সপরিবারে কলকাতা চলে গেলেও, প্রতিদিনই ভক্তদের সমাগম ঘটে সুচিত্রার জন্মভিটায়।
সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র সংসদ পাবনার সভাপতি কমরেড জাকির হোসেন জানান, সুচিত্রা সেনের বাড়ি যে পাবনায় স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তা জানা ছিল না অনেকেরই। এ অজ্ঞতার সুযোগে সুকৌশলে সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়িটি নিজ দখলে নিয়ে নেয় জামায়াত নেতা যুদ্ধাপরাধী আব্দুস সুবহান। গণমাধ্যমের সংবাদে বিষয়টি জানাজানি হলে জেলার সর্বস্তরের মানুষের আন্দোলনে বাড়িটি উদ্ধারে উদ্যোগ নেয় সরকার। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর বাড়িটি দখলমুক্ত করে স্বল্প পরিসরে সেখানে স্মৃতি সংগ্রহশালা গড়েছে জেলা প্রশাসন। তবে, এতে স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি।
পাবনা জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৪ সালের ১৬ জুলাই হাইকোর্টের নির্দেশে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের পাবনার পৈতৃক বাড়িটি দখলে নেয় জেলা প্রশাসন। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা পেরিয়ে কিছুটা সংস্কার করে, স্বল্প পরিসরের সংগ্রহশালা হিসেবে ২০১৬ সালের ১০ এপ্রিল সর্বস্তরের দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় নায়িকার শৈশব কৈশোরের স্মৃতিধন্য এ বাড়িটি।
সম্প্রতি, সুচিত্রা সেনের পৈতৃক ভিটায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, নায়িকার বিভিন্ন ছবি দিয়ে তৈরি ফেস্টুন ছাড়া তেমন কিছুই নেই এ সংগ্রহশালায়। সম্প্রতি বাড়ির উঠোনে সংযুক্ত হয়েছে সুচিত্রা সেনের আবক্ষ ভাস্কর্য। সুচিত্রা সেনকে জানার খুব বেশি সুযোগ না থাকায় দূর দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে অনেকটা হতাশ হয়েই ফিরে যান।
পাবনার ঐতিহ্যবাহী নাট্য সংগঠন পাবনা ড্রামা সার্কেলের সাধারণ সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমান রাসেল বলেন, মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বাড়ি উদ্ধার আন্দোলনের সময় আমাদের দাবি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলার। যেখানে, সুচিত্রা সেনকে নিয়ে গবেষণার সুযোগ থাকবে। প্রামাণ্য চিত্র ও মহানায়িকার অভিনীত চলচ্চিত্র প্রদর্শন হবে, থাকবে সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগও। তবে, প্রায় পাঁচ বছর পার হলেও সে উদ্যোগের অগ্রগতি বলতে কেবল আশ্বাসের বাণীই শোনা গেছে।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি আওয়াল কবির জয় বলেন, সুচিত্রা সেন বিশ্ব চলচ্চিত্র জগতের বিস্ময়, সীমিত পরিসরে সংগ্রহশালায় তাকে আবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। তার অভিনয় নিয়ে গবেষণা, আলোচনা ও শিক্ষণীয় অনেক বিষয় রয়েছে। যার জন্য সেখানে একটি পূর্ণাঙ্গ একটি ফিল্ম ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা প্রয়োজন।
সংস্কৃতিকর্মীদের এসব দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে পাবনা জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন জানান, সুচিত্রা সেনের পৈতৃক বাড়ি নিয়ে স্থানীয়দের দাবির বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে জানানো হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে খুবই আন্তরিক। এরই মাঝে বেশ কিছু বৃহৎ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আশা করছি স্বল্প সময়ের মধ্যেই সুচিত্রা সেনের বাড়িতে পূর্ণাঙ্গ সংস্কৃতিকেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
এদিকে, সুচিত্রা সেনের পঞ্চম প্রয়াণ দিবসে পাবনায় জেলা প্রশাসন, সুচিত্রা সেন স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, সুচিত্রা সেন চলচ্চিত্র সংসদ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
