প্রাইমারি বৃত্তি পরীক্ষায় পুরো জেলার সেরা, গণিতে এত ভালো যে সবাই চেনে। সেই সাবরিনা রশীদ সেঁওতি ‘এশিয়ান ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডিবেট চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছেন। ডিবেটিং ক্লাবের প্রেসিডেন্ট, ছিলেন ক্যারিয়ার ক্লাবের পরিচালক। এমআইএসটির এই শিক্ষককে নিয়ে লিখেছেন শাওন আবদুল্লাহ। ছবি তুলেছেন নূর
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) সেঁওতিকে সবাই ডাকেন ‘ওয়ান্ডার গার্ল (বিস্ময় বালিকা)’। ভালো নাম সাবরিনা রশীদ। ডাকনাম সেঁওতি; অর্থ ‘সাদা গোলাপ’। বাবা হারুন-অর-রশীদ, মা সুরাইয়া সুলতানার তিন ছেলেমেয়ের দ্বিতীয়। বাবা ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দন্ত বিভাগের সাবেক প্রধান। এখন ময়মনসিংহের কমিউনিটি বেইজড মেডিকেল কলেজের দন্ত বিভাগের প্রধান অধ্যাপক। মা গৃহিণী। বড় ছেলে সাইফ-অর রশীদ চিকিৎসক। ছোট সামি-অর রশীদ ময়মনিসিংহের কমিউনিটি বেইজড মেডিকেলে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।
সেঁওতি ছোটবেলা থেকেই খুব মেধাবী। ময়মনসিংহের নতুন কুঁড়ি নার্সারি স্কুল থেকে পুরো জেলায় প্রথম হয়ে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছেন। ২০০৬ সালে ষষ্ঠ শ্রেণিতে নামকরা বিদ্যাময়ী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত টানা ছয় বছর প্রথম আলো-ডাচ্্-বাংলা ব্যাংক গণিত অলিম্পিয়াডে পুরষ্কার পেয়েছেন। স্কুলে সব সময় গণিতসহ সব বিষয়ে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে প্রথম হতেন। গণিত সব সময় বুঝে করেছেন বলে কোনো দিন তার কোনো নম্বর মিস হতো না। ক্লাসে শিক্ষক যে নিয়মে অঙ্ক করাতেন, বাসায় এসে সেটি ভিন্ন নিয়মে করার চেষ্টা করতে এটিই তার অঙ্কে ভালো করার সাফল্য। স্কুলে সরকারি-বেসরকারি অনেক বৃত্তিও পেয়েছেন। ফলে পুরো ময়মনসিংহেই তিনি মেধাবী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত। এই অসাধারণ সাফল্যের রহস্য? সেঁওতি বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমি সব সময় নিজেকে বলি, যত কিছুই হোক, কখনো হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।’ বিজ্ঞান বিভাগে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ নিয়ে তিনি এসএসসি পাস করেন। এরপর পড়ালেখা করেছেন শহরের মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজে। তবে কলেজে লেখাপড়ার চাপে অন্যদিকে সময় দিতে পারেননি। এইচএসসিতেও ‘গোল্ডেন এ প্লাস’।
২০১৩ সালে বুয়েটে ভর্তি পরীক্ষা দিলেন। উত্তীর্ণ হয়ে বেছে নিলেন পানিসম্পদ কৌশল (ডিপার্টমেন্ট অব ওয়াটার রিসোর্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগ। নদীমাতৃক বাংলাদেশের পানিসম্পদের সুষ্ঠু ও সঠিক ব্যবহার নেই, এখনো লাখ লাখ মানুষ সুপেয় পানি পায় না, অনেকগুলো নদী নিয়ে পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে আমাদের ভালো ব্যবস্থাপনার চুক্তি হয়নিÑ এসব ভেবে পানি নিয়ে কাজ করার জন্য এই বিভাগে ভর্তি হলেন। যে মেয়েটি কোনো দিন বাড়ির বাইরে একা থাকেননি, কোনো কাজ করেননি, তার একাকী জীবন শুরু হলো। ‘ছাত্রী’ হলে উঠলেন। একা থাকতে খুব খারাপ লাগতে শুরু করল। মফস্বলের সেরা ছাত্রীটি বুয়েটে এসে দেশসেরাদের কাতারে শামিল হয়ে দেখলেন, লেখাপড়া থেকে শুরু করে সহশিক্ষাক্রমিক সব কার্যক্রমেই বিশ্ববিদ্যালয়টির ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকরা দারুণ। ফলে সবকিছুতেই অংশ নেওয়ার পুরোনো ইচ্ছেটি তার ভেতরে জেগে উঠল। আগে বিতর্ক করতে চেয়েছিলেন, সুযোগ মেলেনি। প্রথমেই বুয়েট ডিবেটিং ক্লাবে যোগ দিলেন। তাতে নতুন অভিজ্ঞতা হলো।
অংশগ্রহণকারীরা সবাই খুব অগ্রসর, তাল মেলাতে না পেরে খুব হতাশ হতেন। সেখান থেকে শিখলেন এই বিদ্যাপীঠে টিকে থাকার মন্ত্রটি হলোÑ ‘হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না। ব্যর্থতা থেকে জয়ের মন্ত্র শিখতে হবে।’ না পারলেও অংশগ্রহণ থেকেই ইতিবাচক সাফল্য খুঁজতে লাগলেন। যেকোনো কিছুতেই প্রেরণা লাভ করতে লাগলেন। এটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। অন্যদের সঙ্গে বিতর্ক করতে পারতেন না। তথ্য কম ছিল, যুক্তি উপস্থাপনেও কাঁচা ছিলেন। ফলে ভালো করতে আরো সময় দিলেন। এভাবেই ধাপে ধাপে ভালো করে ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃহল বিতর্ক প্রতিযোগিতায় সেরা হয়েছেন।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত ন্যাশনাল নভিশ ইংলিশ ডিবেট টুর্নামেন্টে (জাতীয় শিক্ষানবিস ইংরেজি বিতর্ক প্রতিযোগিতা) রানারআপ হয়েছেন। বুয়েটের বাংলা বিতর্কে সেরা তিনটি দল নান্দনিক, দ্বান্দ্বিক ও প্রান্তিক। দ্বান্দ্বিকের হয়ে বিতর্ক করেছেন।
বাংলার মতো ইংরেজি বিতর্কেও সাফল্য পেয়েছেন। এশিয়ার সবচেয়ে বড় ব্রিটিশ পদ্ধতির পার্লামেন্টারি ধারার সবচেয়ে বড় বিতর্ক প্রতিযোগিতা ‘এশিয়ান ব্রিটিশ পার্লামেন্টারি ডিবেট চ্যাম্পিয়নশিপ ২০১৬’-এ সালে অংশ নিয়েছেন, তখন জাকার্তায় দেশের প্রতিনিধি ছিলেন। ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত টানা এক বছর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবেটিং ক্লাবের ডিরেক্টর ছিলেন! বিতর্কে এই সাফল্যগুলো তাকে ক্যারিয়ারে এগিয়ে দেবে বলে বিশ্বাস করেন।
২০১৪ সালে সেঁওতির পা পড়ল বুয়েট ক্যারিয়ার ক্লাবে। বুয়েটের অন্যতম প্রধান দুই ক্লাবে কাজ করার বিশাল অভিজ্ঞতাই তার দুয়ার খুলে দিল। বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার (বিওয়াইএলসি) নামের তরুণদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থার বুয়েটের ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসাডর হিসেবে ২০১৭ সালের মার্চ মাস থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত কাজ করেছেন। বিওয়াইএলসির ইয়ুথ লিডারশিপ সামিট ২০১৬ সালে ৫০০ জনের অন্যতম অংশগ্রহণকারী ছিলেন। এই সংস্থা তাকে শিখিয়েছে সমাজের জন্য কাজ করতে গিয়ে কীভাবে নেতৃত্বে দিতে হয়। সেই ক্ষমতাকে ছড়িয়ে দিতে নানা ক্ষেত্রে তিনি কাজ করেছেন।
২০১৬ সালে সরকারের জ্বালানি মন্ত্রণালয় আয়োজিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রতিযোগিতা ‘এক আইডিয়াতে বাজিমাত’-এ শৈবাল থেকে খনিজ তেল তৈরির আইডিয়া দিয়ে তারা তৃতীয় হন ও ২৫ হাজার টাকা পুরস্কার লাভ করেন।
সারা বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া ছাত্রছাত্রীদের ‘নোবেল’ ‘হান্ট প্রাইজ’-এ গেছেন সেঁওতি। ২০১৮ সালে তাদের জন্য এই প্রতিযোগিতার সামাজিক সমস্যাটি ছিল ‘ট্রান্সফর্ম হার্নেসিং দ্য পাওয়ার অব এনার্জি।’
বুয়েটের তরফ থেকে তাদের দল পানির লবণাক্ততা কমাতে নবায়নযোগ্য জ¦ালানি ব্যবহারের ধারণা উপস্থাপন করল। তারা বলেছেন, দেশের প্রায় দুই কোটি গরিব মানুষ লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে। তাতে অনেক শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন। তাদের জন্য তারা কম খরচে নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস ব্যবহার করে বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করতে ধারণা দিয়েছেন। ধারণাটি তাদের বুয়েটের চ্যাম্পিয়ন বানাল। নিয়ে গেল কুয়ালালামপুরের আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায়। সেখানে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হয়ে ফিরে এলেন। এরপর ইউএনডিপি (ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রগ্রাম) ও ইউনিলিভারের সেফ ওয়াটার চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতায়ও তারা এই ধারণাপত্র নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলেন। এখন এ প্রজেক্ট নিয়েই কাজ করছেন। তাতে এই দুই প্রতিষ্ঠান অর্থায়ন করছে। তারা ‘টেটরা’ নামের একটি সামাজিক ব্যবসা চালু করতে চেষ্টা করছেন। সেই প্রতিষ্ঠানের তিনি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তারা উপকূলীয় এলাকায় তাদের কোম্পানির মাধ্যমে তিনটি সুপেয় পানির ডিভাইস চালু করেছেন। এখানে তাদের সঙ্গে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ আছে। একটিই লক্ষ্য, উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা। তিনি অন্যদের সঙ্গে নিয়ে একটি দল গড়ে ২০১৬ সালের ব্র্যাকাথনে (ব্র্যাক বিশ^বিদ্যালয় আয়োজিত প্রতিযোগিতা) অগ্নিনিরাপত্তা প্রকল্প উপস্থাপন করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন ও পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার পেয়েছেন। এখন তিনি তার বিভাগে অনার্সে অসাধারণ ফলের জন্য ডিনস লিস্ট অ্যাওয়ার্ড, মেরিট লিস্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। এখন বিভাগে মাস্টার্স করছেন। এমআইএসটিতে (মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। তার জীবনের লক্ষ্য, শিক্ষকতা ও দেশের মানুষের উপকারে কাজ করবেন।
