‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ নায়িকার ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০১৯, ০৩:৩০ পিএম

‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ সিনেমার অভিনয় করে রাতারাতি আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত হন ফ্রিদা পিন্টো। এর এক দশক পর ২০১৮ সালে মুক্তি পায় ‘লাভ সোনিয়া’। এ সিনেমা দেখলে যে কেউ চমকে যাবেন। যেখানে রেশমী নামের এক যৌনদাসীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি। কেউ হয়তো ফ্রিদার কাছে এমন জটিল, খিটখিটে ও স্বার্থপর চরিত্র আশা করেননি।

ঋণগ্রস্ত এক বাবা মেয়ে প্রীতিকে বিক্রি করে দেন, পরে যার ঠাঁই হয় মুম্বাইয়ের পতিতালয়ে। এক সময় প্রীতিকে খুঁজতে গিয়ে ছোট বোন সোনিয়া নারী পাচারকারীদের জালে আটকে যায়, ধর্ষিত হয়। বয়স্ক যৌনদাসী রেশমীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় সোনিয়ার। কিন্তু বিশ্বাস ভঙ্গের শিকার হন তিনি। এটি এমন জগত যেখানে ভালোবাসা বা বিশ্বাসের কোনো মূল্য নেই।

সম্প্রতি গার্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপচারিতায় ফ্রিদা জানান, ‘লাভ সোনিয়া’ নির্মাণে ১০ বছর সময় লেগেছে। ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’-এর লাইন প্রডিউসার তাবরিজ নুরানী এ সিনেমার পরিচালক। স্মরণীয় ছবিটির দৃশ্যায়ন শেষে তিনি ‘লাভ সোনিয়া’র প্রথম চিত্রনাট্য দেখান ফ্রিদাকে। এর পর ধাপে ধাপে চলে সংশোধন, নির্মাতাও খুঁজে পান লগ্নিকারক।

image

‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’ সিনেমায় লতিকা চরিত্রে অভিনয় করেন ফ্রিদা। তখন তাকে অভিহিত করা হয় ‘বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে’। এর পর তিনি আরও তীব্র চরিত্র খুঁজছিলেন, কিন্তু ‘লাভ সোনিয়া’র জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। প্রথম পাঠের পর মনে হয়েছিল, এ চিত্রনাট্য তার জন্য ক্ষতিকর। যা পড়েছেন বিশ্বাসই হয়নি। শেষে পাচার হওয়া যৌনদাসীদের সঙ্গে কথা বলার পর ধারণা পাল্টে যায়। তিনি একজনকে প্রশ্ন করেন, যদি প্রেমে পড়েন ও এমন কাউকে খুঁজে পান যিনি আপনার সঙ্গে ঠিকভাবে আচরণ করবে, আপনি কি পালিয়ে যাবেন? উত্তরে ওই যৌনদাসী বলেন, ‘ম্যাডাম, ভালোবাসা শুধুমাত্র আপনার জগতে অস্তিত্বশীল। আমার জগতে শুধু বিশ্বাঘাতকতা রয়েছে।’

‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’-এর পর ফ্রিদা অনেক ছবিতে অভিনয় করেছে। সে সব চরিত্র ছিল একরৈখিক। অভিনয় করেন উডি অ্যালেনের ‘ইউ উইল মিট আ টল ডার্ক স্ট্রেঞ্জার’ সিনেমায়। যেখানে তাকে মিউজিকোলিস্ট চরিত্রে দেখা যায়। টেরেন্স মালিকের ‘নাইট অব কাপস’-এ ভিন্ন ধরনের যৌন রুচির নারী, জুলিয়ান স্নেবেলে ‘মিরাল’ সিনেমায় ফিলিস্তিনি নারী চরিত্রে অভিনয় করেন। কিন্ত ফ্রিাদার মতে, বিশ্ব চলচ্চিত্রের সেরা নির্মাতারা তার লুক নিয়ে যতটা মনোযোগ দিয়েছেন ততটা দেননি চরিত্র নির্মাণে। একে নিজের সমস্যা আকারে দেখেন না। কারণ তিনি নিজের মেধা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।

ফ্রিদাকে প্রশ্ন করা হয়- তার নারীবাদী ভূমিকা ও অভিনীত সিনেমার মধ্যে কোনো বিরোধ দেখেন কিনা? তিনি বলেন, ‘পুরোপুরি! ক্যারিয়ারের শুরুতে যেমন চরিত্রে অভিনয় করেছি- তা থেকে এ কথার সঙ্গে একমত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।’

উডি অ্যালেনের সিনেমায় রয় ব্রলিনের সঙ্গে অভিনয় করে আনন্দ পেয়েছে ফ্রিদা। কিন্তু এ নির্মাতার সঙ্গে আর কাজে আগ্রহী নন। কারণ উডির বিরুদ্ধে যৌন নিগ্রহের অভিযোগ এনেছিলেন তার দত্তক মেয়ে ডিলান ফ্যারো। পরিচালক অভিযোগ অস্বীকার করলেও ফ্রিদার মত হলো- যে নারী নিজেদের গল্প শেয়ার করেছেন তাদের সঙ্গে একাত্মবোধ করেন। সেটা তারা প্রমাণ করতে পারেন বা না-ই পারেন। তিনি ১১ বছর ধরে অভিনয় করছেন। কখনোই কাজ পেতে মরিয়া নন।

২০১১ সালে ‘রাইজ অব দ্য প্লানেট অব দ্য এপস’ সিনেমার অভিজ্ঞতাও তার জন্য আনন্দদায়ক হয়নি। স্বাধীনচেতা শিম্পাঞ্জিবিজ্ঞানীর চরিত্র দেওয়া হলেও তাকে প্রথাগত সিনেমার নারীদের মতো হাই হিল পরতে হয়েছে। যেটা ফ্রিদার কাছে ছিল অবিশ্বাস্য। কারণ প্রাণিদের সঙ্গে কাজ করতে গেলে চরিত্রটি ভিন্নরকম হতে হবে। এ বিষয়ে প্রযোজকের সঙ্গে কথা বলেও লাভ হয়নি। তবে অ্যান্ডি সারকিস ও জন লিথগোর মতো পছন্দের অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করতে পেরে খুশি।

image

ফ্রিদা পিন্টো মুম্বাইয়ে জন্মগ্রহণ করেন এক ম্যাঙ্গালরিয়ান ক্যাথলিক পরিবারে। তার মা ছিলেন স্কুল প্রিন্সিপাল, বাবা ব্যাংক ম্যানেজার। পড়াশোনার শুরু এক কনভেন্ট স্কুলে। তখন থেকেই স্পষ্টবাদী। ১৩ বা ১৪ বছর বয়সে গির্জার এক যাজক তার বয়ানে বলছিলেন, সমকামিতা হলো অসুস্থতা। আশা করেন যিশু তাদের পথ দেখাবেন। ওই যাজককে ফ্রিদা প্রশ্ন করেন, কেন ভাবছেন সমকামিতা অসুস্থতা? এ ধরনের অনেক ঘটনা আছে তার। আর এমন স্বভাবের কারণে বাবা-মা বরাবরই চিন্তিত ছিলেন।

ইংরেজি সাহিত্যের স্নাতক শেষে ফ্রিদা পিন্টো ২০০৫ সালে মডেলিংয়ে নাম লেখান। এর দুই বছর পর ‘স্লামডগ মিলিয়নিয়ার’-এর জন্য ডাক পান। যদিও তার অভিনয়ের কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ওই ছবি জিতে নেয় আটটি অস্কার। যার মধ্যে ছিল সেরা ছবি ও পরিচালকের পুরস্কার। এ সিনেমার বদৌলতে ফ্রিদা ও সহশিল্পী দেব প্যাটেল হঠাৎই বিশ্ববিখ্যাত হয়ে যান। এর পর তারা বাস্তব জীবনেও জুটি হয়ে যান। এক সঙ্গে ছিলেন ৬ বছর।

সিনেমার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন জগতেও সাড়া জাগান ফ্রিদা। ২০০৯ সালে তিনি প্রসাধনী ব্র্যান্ড লরিয়েলের সঙ্গে আকর্ষণীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। যা তাকে একদম বদলে দেয়। সব ফ্যাশন উইকের সামনের সারিতে দেখা যেতো ফ্রিদাকে। ভ্রমণ করতেন প্রথম শ্রেণিতে, ছুটি কাটাতে যেতেন নিয়মিত। যে সব পরিচালকের সাক্ষাৎ চাইতেন তারাও তার সঙ্গে দেখা করতে চাইতেন। তারা ফ্রিদাকে সিনেমার প্রস্তাব দেন। কিন্তু বারবার তাকে হতাশ হতে হয়।

এ সব কারণে জীবনে প্রথমবার ফ্রিদা পিন্টো আত্মবিশ্বাস হারান। আড়াই বছর কোনো কাজই করেননি। একে তিনি অস্তিত্ববাদী সংকট হিসেবে উল্লেখ করেন। নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, এসবই কি তিনি করতে চেয়েছেন? তিনি অনেক চরিত্র পেয়েও করেননি, কারণ তার সময়ের সদ্ব্যবহার হতো না। ওই সব সিনেমা না করায় তার কোনো দুঃখ নেই। কারণ এ সিনেমাগুলো বড় বাজেটের হতে পারে কিন্তু চরিত্রগুলো হাতছাড়া হওয়া দুঃখ পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

টাকা-পয়সা নিয়ে কোনো সমস্যা হয়নি? ফ্রিদা জানান, লরিয়েলের সঙ্গে সাত বছরের চুক্তি তাকে স্বাচ্ছন্দ্য দিয়েছে। এ জন্য সবসময় তিনি কৃতজ্ঞ। ২০১১ সালে লরিয়েলের চুক্তিটির বিষয়ে সতর্ক হন ফ্রিদা। কারণ প্রচারণার জন্য তার ত্বককে স্বাভাবিকের চেয়ে উজ্জ্বল দেখানো হয়। ফ্রিদা প্রশ্ন তোলেন, এসব কি ফটোশপের ফল? কিন্তু ত্বকের রঙ পরিবর্তনের অভিযোগ অস্বীকার করে লরিয়েল।

ফ্রিদা বলেন, ‘এটা করা হয়েছে আমি নিশ্চিত। কারণ কিছু প্রচারণায় যেমন দেখেছিলাম আমার ত্বকের রঙ তেমন নয়।’ প্রথমবার বিতর্ক উঠার পর ফ্রিদা তার এজেন্টকে বলে দেন, এর পর থেকে প্রকাশের আগে সব ছবি যেন তাকে দেখিয়ে নেওয়া হয়। তিনি চুক্তিতে নতুন একটি ধারা যোগ করেন। ত্বক কতটা উজ্জ্বল দেখাবে তার সীমা ঠিক করে দেন। এর পর এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি।

image

নয় বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে বাস করছেন ফ্রিদা পিন্টো। এ শহরকে তার নিজের মনে হয়। সঙ্গে থাকেন প্রেমিক লস অ্যাঞ্জেলস-ভিত্তিক অ্যাডভেঞ্চার ফটোগ্রাফার কোরি ট্রান। মাঝে মাঝে মুম্বাই বেড়াতে যান, সময় কাটান মা ও বোনের সঙ্গে।

২০১৭ সালে ‘গেরিলা’ মিনি সিরিজের মাধ্যমে ছোট পর্দায় অভিনয় করেন ফ্রিদা পিন্টো। যার কাহিনী আবর্তিত হয়েছে ব্রিটেনের ব্ল্যাক পাওয়ার মুভমেন্ট নিয়ে। ফ্রিদার চরিত্র আন্ডারগ্রাউন্ড অ্যাক্টিভিস্ট জাস মিত্রের। যাকে তিনি ‘দুর্দান্ত চরিত্র’ বলে উল্লেখ করেন। এটাও বলেন যে, অভিনয়শিল্পী হিসেবে পুনঃআবিষ্কার হয়েছে তার।

পিন্টোর ‘লাভ সোনিয়া’র চরিত্র নিয়ে তেমন একটা আলোচনা হয়নি। ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ভারতে, কিন্তু ভালোভাবে গ্রহণ করেনি দর্শক। ফ্রিদার মতে, বক্স অফিস ফলাফল দিয়ে তিনি ছবি সাফল্য বিচার করেন না। বরং নারী পাচারের মতো বিষয়কে তুলে এনেছে- এটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

নানা দিক থেকে বলা যায়, অভিনেত্রী ফ্রিদা পিন্টোর অনেক কিছু দেখানোর আছে। যদিও শুরুর দিকে তিনি বৈচিত্রহীন চরিত্রে অভিনয় করছেন। কিন্তু ফ্রিদা এর গুরুত্ব বোঝেন। কারণ ওই সব চরিত্রে অভিনয় না করলে আজকের অবস্থানে তিনি আসতে পারতেন না। অস্তিত্ববাদী সংকটও দরকার ছিল। নইলে নিজেকে আবিষ্কার করতেন কীভাবে?

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত