রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কারু গৌরব

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০১:২৯ এএম

দুর্ঘটনায় পা কাটা পড়ে স্বামী চাকরি হারালেন, তিনটি মেয়েকে নিয়ে ভীষণ অভাবে পড়লেন হোসনে আরা বেগম। মায়ের কাছে শেখা নকশিকাঁথাই এরপর তার বাঁচার অবলম্বন হলো। ২০১০ সালে ‘শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী পদক’ পেয়েছেন, হয়েছেন ‘কারু গৌরব’। শ্রীলঙ্কাতে হয়েছেন সম্মানিত। হাজারো নারীকে দিয়েছেন প্রশিক্ষণ। বিরল হস্তশিল্পের এই শিল্পীর সঙ্গে সোনারগাঁ গিয়ে কথা বলেছেন রানা মিত্র

image

অভাব আর দুঃখ তাকে করেছে পেশাদার নকশিকাঁথা শিল্পী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে হোসনে আরা বেগমের বিয়ে হয়ে গেল। স্বামী পাশের গোয়ালদী গ্রামের কাহার উদ্দিন। তারা দুইজনেই সোনারগাঁ উপজেলার মানুষ। হোসনে আরার বাড়ি কৃষ্ণপুরে, কাহার উদ্দিনের গোয়ালদীতে। স্বামী সরকারি আদমজী জুটমিলের পাট শ্রমিক। সপ্তাহে ১শ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। গরিবের সংসার খেয়ে না খেয়ে ভালোই চলছিল। একে একে সংসার আলো করে জন্ম নিল ইয়াসমিন, আসমা ও নার্গিস আক্তার। কাহার-হোসনে আরার সংসারের বয়স হয়ে গেছে সাতটি বছর। এরপরই নেমে এলো দুর্যোগ। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় চিরকালের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলেন স্বামী। বাম পাটি হারালেন কাহার। চাকরি চলে গেল, বাড়িতে অভাব দেখা দিল। কী করবেন ভেবে পান না তিনটি মেয়ের মা। মেয়ে ও তাদের বাবার মুখে খাবার জোটাবেন কী করে? ততদিনে ভয়াবহ ১৯৮৮ সালের বন্যা তাদের গ্রামে হানা দিয়েছে। ঘরের ভেতরে পানি গলগল করে ঢুকে পড়েছে। অল্প কটি জামা-কাপড়, সামান্য চাল-ডাল কোনোকিছুই বাঁচানো গেল না। একটি জুতোর কারখানায় কটি টাকার বিনিময়ে শ্রম দিতে লাগলেন তিনি। তাতেও কূল হলো না। ততদিনে আবার নকশিকাঁথার কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

নকশিকাঁথা তাদের এই পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, তাদেরও ইতিহাসের অংশ করে তুলেছে। কোনোদিন দেখেননি, তবে মা-খালারা বলেছেন, পল্লীকবি জসীম উদ্দীন তার অমর আখ্যানকাব্য ‘নকশীকাঁথার মাঠ’ রচনার সময় নকশিকাঁথা শিল্পীদের জীবন ঘুরে দেখেছিলেন। তখন তিনি সোনারগাঁয়ের কৃষ্ণপুরেও এসেছিলেন। হোসনে আরার মা-খালার সঙ্গে কবির দেখা হয়েছিল। তারা তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলেন। এই পরিবারের নারীরা অনেক আগে থেকে নকশিকাঁথা বুনেন। সেগুলো তাদের শখের কাজ হলেও তাতে সংসারেও ভালো আয় হয়। সেই ভুবনটিই আচানক তার সামনে খুলে গেল।

বন্যা থেমে গেল, বানের পানি নেমে গেল।

হোসনে আরার কাছে খবর এলো, তাদের সোনারগাঁয়ে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন প্রতিষ্ঠিত সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘরে নকশিকাঁথা বোনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। সঙ্গে সঙ্গে মন ঠিক করে ফেললেন এই শিল্পীÑ তিনিও প্রশিক্ষণ নেবেন। যোগাযোগ করলেন সেই প্রশিক্ষণের পরিচালক সাংবাদিক বাবুল মোশাররফের সঙ্গে। এরপর আর বাধা রইল না। হাতে-কলমে আরও অনেক ডিজাইন তৈরি ও সেগুলো কাপড়ে বাস্তবায়নের কাজ শেখানো হলো তাকে। তবে শখের, ভালোবাসার এই কাজ তাকে কী অভাবের হাত থেকে মুক্তি দেবে? ভেবে আকুল হলেন তিনটি মেয়ের মা। নকশিকাঁথা তো কেউ কেনে না! তারপরও বাড়িতে বসে না থেকে একটি ওয়ালম্যাট বুনে ফেললেন তিনি। ফ্রেমের মধ্যে কাপড়ে শিল্পকর্মটি করলেন। সেটি বাঁধাই করে দেওয়ালে ঝোলানো হয়। সাতদিন সারাটি ক্ষণ ধরে বোনা সেই ওয়ালম্যাটটি তিনি বিক্রি করলেন না। প্রথম কাজের স্মৃতি হিসেবে হাজার কষ্টের মধ্যে সেটি বাঁধাই করে তাদের গরিবের ঘরে টাঙিয়ে রাখলেন। মায়ের নকশিকাঁথার প্রতি এই ভালোবাসা মেয়েদের চমকে দিল। তারাও এই বাঙালি শিল্পচর্চার দিকে ঝুঁকে পড়লেন। তবে তাতে লাভ হচ্ছিল না। আয় তো একেবারেই হচ্ছে না। বাবুল মোশাররফের সঙ্গে আবার যোগাযোগ করলেন। তিনি একটি কাঁথা বানানোর আইডিয়া দিলেন। তিনটি মাস ধরে তৈরি সেই কাঁথাটিই ছিল হোসনে আরা বেগমের প্রথম পূর্ণাঙ্গ নকশিকাঁথা। তাতে মন্দির, মসজিদ, গির্জা তিন ধর্মের তিন পবিত্রতম স্থান কারুকার্য ও শিল্পীর কল্পনার মিশেলে তৈরি হলো। ১৯৮৯ সালে সেই নকশিকাঁথাটি সাত হাজার টাকায় বিক্রি করে দিলেন বাবুল। এই ভাগ্য বদলে গেল, নকশিকাঁথা তৈরি করেও যে সংসার চালানো সম্ভব বুঝতে পারলেন শিল্পী। ফলে কাজের খোঁজে নানা জায়গায় নকশিকাঁথার শিল্পকর্মের নমুনা নিয়ে ছুটে বেড়াতে লাগলেন তিনি। পরিবারের অনেকেও তার প্রতিভা ও দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রামের বিষয়টি জানতে পারলেন। তাকে সাহায্য করতে তারা এগিয়ে এলেন। বাবার ফুফাতো ভাই সোলায়মান বললেন, ‘আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য একদিন ঢাকায় আসুন। আমার স্ত্রীর ডিজাইনের প্রতিষ্ঠান আছে, আমরা কাজ শেখাব এবং কাজও দেব।’ ফলে অনাহারে তিনটি মেয়েকে রেখে, স্বামীকে দেখাশোনার ভার তাদের ওপর দিয়ে একদিন একাই ঢাকার বাসে চড়ে বসলেন মা। চলে এলেন ‘ঢাকার বারিধারার ডিজাইনার লাইন’-এ। এই প্রতিষ্ঠানের কর্তাই সোলায়মানের স্ত্রী, তার নামও হোসনে আরার নামে। পুরো নাম মিসেস হোসনে আরা সোলাইমান।

সাতদিনের একটি সংক্ষিপ্ত কোর্স করে নকশিকাঁথা শিল্প বুননের ওপর আরও দক্ষ হয়ে উঠলেন এক গ্রামের গৃহবধূ। তবে কাজ শিখতে শিখতেও তার অভাবের দিনগুলোর কথা মনে পড়তে লাগল। একা একা নিরালায় বসে কাঁদেন, আঁচলে চোখ মোছেন। তবে সবকিছুরই শেষ আছে। তারও প্রশিক্ষণকাল শেষ হলো। প্রতিষ্ঠানটি অনেকগুলো কাজের অর্ডার শিল্পীকে দিল। সেই কাজগুলোর চাহিদা নিয়ে তিনি তার গ্রামে ফিরে গেলেন। এতগুলো কাজ কীভাবে একা করব? এই ভাবনাটিই প্রথমে মনে হলো। ফলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলেন। শ্বশুড়বাড়ি গোয়ালদীতে চলে গেলেন। গ্রামের ঘরে ঘরে গিয়ে নারীদের ডেকে বললেন, ‘আপনারা আমার সঙ্গে কাজ করুন, নকশিকাঁথা বোনা শিখুন। আয়ও হবে, নিজের চিন্তার বিকাশ ঘটবে।’ টানা তিনমাস কাজ করার বিনিময়ে প্রশিক্ষণ ও মজুরি পেলেন কয়েকজন নারী। তাদের মুক্তি ঘটল, আর্থিক অনটন কাটল, হোসনে আরার সংসারও ঘুরে দাঁড়াল।        

একের পর এক নকশিকাঁথা মেয়েদের ও নারীদের নিয়ে বুনতে শুরু করলেন তিনি। সেগুলো দেশে-বিদেশে বিক্রি হতে লাগল। তার নামটিও দেশের গ  ছড়িয়ে বিদেশে চলে গেল। সৃজনশীল নকশিকাঁথা বোনার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১০ সালে তিনি বাংলাদেশ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন থেকে ‘শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পী পদক ২০১০’ লাভ করেছেন। এক ভরি ওজনের স্বর্ণের মেডেল ও নগদ ৩০ হাজার টাকা পেয়েছেন। ২০১৬ সালে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি তার শিল্পকর্ম নিয়ে শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। সেখানে সার্ক সেন্টার ‘সার্ক এক্সিবিশন অন হ্যান্ডিক্রাফটস’ নামে হাতের কাজের একটি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। তাতে তার হস্ত শিল্পকর্মগুলো দর্শনার্থী ও অতিথিদের খুব প্রশংসা পেয়েছে। সেখানেও তাকে নগদ ৩০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। তিনি শ্রীলঙ্কার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে প্রশংসাবচনও পেয়েছেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন তাকে ২০১৭ সালের ১৪ এপ্রিল ‘কারু গৌরব’ সম্মাননায় ভূষিত করেছে।

নকশিকাঁথা পেশায় এই নারীর ৩৫টি বছর কেটে গেছে। ফলে এই শিল্পের সবকিছুই তার নখদর্পণে। সেই গল্পই করলেন, ‘সাধারণ কাঁথার ওপর বিশেষ ধরনের নকশা তৈরিই হলো নকশিকাঁথা। প্রতিটি সুঁই, সুতোর বুননে আমরা গ্রামের মানুষের জীবনের গল্পই তুলে আনি। তাদের সুখ, দুঃখ, আশা-হতাশা, ভালোবাসার গল্প বলি। সুতি, মসলিন, সিল্ক ইত্যাদি কাপড়ে নকশিকাঁথা বোনা হয়। তবে সেই কাপড়টি একরঙা হতে হবে। তাতে হস্তশিল্প ভালো ফোটে। সুতি কাপড়ে কাঁথার কাজ খুব ভালো হয়, ব্যবহার করে আরামও লাগে।’ কীভাবে কাজ করেন? সামান্য উদাস হয়ে উত্তর করলেন, ‘প্রথমে সাদা কাগজে নকশা করি। নকশাগুলোর সবই আমার নিজের তৈরি, আমার ভাবনার ফসল। আমার কাজে গ্রামের নারীদের নানা দৃশ্যকল্প থাকে। কোনো নারী বঁটি দিয়ে মাছ কাটছেন, কেউ বিল থেকে শাপলা তুলছেন, কোনো মাঠে গ্রামের ছোট ছোট মেয়েরা খেলছে, কেউ পানি আনতে কলসি কাঁখে নিয়ে রওনা হয়েছে। অর্ডার দিলে ক্রেতার পছন্দের বা পঞ্জিকার কোনো শিল্পকর্মও আমরা সুঁই, সুতোয় বুনি। কারুকাজগুলোকে প্রিন্ট করি। তবে বেশিরভাগ ক্রেতাই এখনো গ্রামের দৃশ্য করা নকশিকাঁথার অর্ডার দেন। এরপর কাপড় পেলে কাজ শুরু করি। আমার মেয়েরাও এখন আমার সঙ্গে কাজ করে। অনেককে বিনা পয়সায়, কাউকে কাউকে সামান্য টাকার বিনিময়ে কাজ শেখাই। এমন অনেক নারী, গ্রামের তরুণী আমার সঙ্গে কাজ করে। এই পর্যন্ত আশপাশের হাজার খানেকের বেশি মেয়েকে কাজ শিখিয়েছি। লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের কর্মশালাগুলোতেও বিভিন্ন মানুষকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিই। আমরা কাজগুলোকে ফোঁড় বলি। কোনো ফোঁড়ের নাম রান, কোনোটার ডাবল রান, কোনোটি ক্রস, কোনোটি চেইন, কোনোটি আবার ভরাট, স্যাটিক, লিক, জালি বা চাটাই ফোঁড়। এই নামগুলোর সঙ্গে আমরা শিল্পীরা খুব পরিচিত।’

তিনি নানা ধরনের নকশিকাঁথার এক বিরল সংগ্রহ গড়ে তুলেছেন। হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকা দামের নকশিকাঁথাও তার কাছে আছে। তৈরিতে খুব বেশি খরচ নেই, তবে শিল্পীর শিল্পকর্ম ও সময়ের অনেক দাম আছে। কোনোটি মাসখানেক আবার কোনোটি বছর দুয়েক ধরে বোনা। নকশিকাঁথা ছাড়াও নকশা করা ওয়ালম্যাট, রুমালের নকশা তার তৈরি করা আছে।

ওয়ালম্যাটের এক একটির দাম এক থেকে ১০ হাজার টাকা। রুমালগুলো কেনা যাবে পাঁচশ থেকে পাঁচ হাজারের মধ্যে। কুশন কভার বিক্রি করেন পাঁচশ টাকা সেট হিসেবে। নকশা করা বিছানার চাদরের সেট কেনা যাবে ১২শ টাকা করে। সোফার কভার বিক্রি করেন ১৫শ টাকা হিসেবে। বেচা-কেনার কোনো হিসাব রাখেন না তিনি। মনে চায় বলে বোনেন, বিক্রি করে সংসার ভালো চলে এতেই তিনি খুশি। কিন্তু সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাঙালি নারীর এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পকর্মটি বিশে^ সাড়া ফেলছে না এই দুঃখ তার।

তবে কর্তৃপক্ষ শিল্পটিকে না হলেও তাকে সহযোগিতা করেছেন। লোক ও কারুশিল্প জাদুঘরের পরিচালক কবি রবীন্দ্র গোপ তাকে জাদুঘর প্রাঙ্গণে বিনা খরচে একটি স্থায়ী দোকান তৈরি করে দান করেছেন। সেখানেই তার নকশিকাঁথাগুলো বিক্রি হয়। প্রতি বছর পহেলা বৈশাখে বাংলা একাডেমি, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষ্ঠানের নানা আয়োজনে, জাতীয় জাদুঘর ও শিল্পকলা একাডেমির মেলাতে তিনি তার শিল্পকর্মের স্টল নিয়ে বসেন। ব্যক্তিগতভাবেও অনেকে অর্ডার করেন। বিদেশ থেকেও ক্রেতারা যোগাযোগ করে অর্ডার দেন।

যে নকশিকাঁথা তার জীবন বদলে দিয়েছে সেটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য একটি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান তৈরি করার খুব বাসনা হোসনে আরার। সেখানে হাজারও মেয়েকে তিনি এই কাঁথা সেলাই শেখাবেন, নিজে যা জেনেছেন সবটুকু ভবিষ্যতের কাছে দিয়ে যাবেন।     

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত