বৃহস্পতিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

‘এই গাছেরাই আমার সন্তান’

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০২:১৬ এএম

একটি গাছও জন্মে না, উড়িষ্যার সেই ধুধু মরুভূমি থেকে বৈবাহিক সূত্রে সবুজের সমারোহে চলে এলেন যমুনা টুডু। ঝাড়খ-ের ৫০ হেক্টরের বিশাল এক বনের প্রেমে পড়ে গেলেন। গ্রামের নারীদের নিয়ে গড়লেন ‘বন সুরক্ষা সমিতি’। দা, বঁটি, তীর-ধনুক, লাঠি হাতে তারা বনদস্যুদের খুঁজে বেড়ান। সমিতির ৩০০ কমিটি, প্রতিটিতে ৩০ জন নারী। সরকার তাদের গ্রামে স্কুল, পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ৩৭ বছর বয়সের এই নারী পেয়েছেন ভারতের চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘পদ্মশ্রী’। লিখেছেন ওমর শাহেদ

বিয়ে হলো ১৯৯৮ সালে। স্বামীর হাত ধরে উড়িষ্যা থেকে চলে এলাম ঝাড়খন্ডে। পূরবী সিংভূম নামের একটি জেলা, সেটির একটি গ্রাম মাধুরখাম। এই শ্বশুড়বাড়িতে এসেই ভালো লেগে গেল। চারপাশে বিরাট বন, ৫০ হেক্টরেরও বেশি আয়তন। বনটি শাল গাছে ছাওয়া, অনেক দুর্লভ গাছ, বিরল বন্যপ্রাণীও আছে। বিরাট এই বনভূমিকে আমি ভালোবেসে ফেললাম। সারা জীবন তো মরুভূমিতেই কাটিয়েছি; আমাদের এলাকায় কোনো গাছ বা উদ্ভিদ জন্মায় না। সেগুলোর দেখা পাওয়া বিরল ঘটনা। তবে আমার বাবা ছিলেন খুব অন্যরকম একজন মানুষ। তিনি গাছ লাগাতে ভালোবাসতেন। যে জমিটুকু তার ছিল, সেটির যেকোনো কোণে বীজ বুনতেন। আমাকে ও আমার ভাইকে জমিতে নিয়ে যেতেন। আমরা বীজের যত্ন করতাম, প্রাণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতাম। পানি ঢালতাম গাছের গোড়ায়, আগাছা পরিষ্কার করতাম। তরুণী না হওয়া পর্যন্ত বাবা সবসময় আমাকে জমিতে নিয়ে গিয়ে কাজ করিয়েছেন। ফলে গাছের কী মূল্য সেটি হৃদয় দিয়ে বুুঝি। বিরান মরুভূমি থেকে সবুজের রাজ্যে এসে এই স্বর্গভূমিটিকে খুব ভালো লেগে গেল। আমার মতো গ্রামের নারীরাই আমাকে বন চেনালেন। তারা ভাত-তরকারি-রুটি তৈরির জন্য কাঠ আনতে বনে যেতেন। আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যাওয়া শুরু করলেন তারা। ফলে বনে পা পড়তে লাগল আমার। বাড়িতেও বনটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়, নানা কথা ওঠে। কখনো সখনো নিজেরাও বনে গিয়ে টের পেয়েছি, বনটিতে বনদস্যু ও কাঠ চোরেরা খুঁটি গেঁড়েছে। তারা বনের বিরল প্রাণীদের মেরে ফেলছে, সেগুলোর দেহ বিক্রি করছে; বনের গাছগুলোকে সাবাড় করছে। ঝাড়খন্ড তো আবার নকশালবাদীদের ঠিকানা। ফলে বনে তাদেরও আনাগোনা আছে। ওরা লুকিয়ে থাকে সেখানে। পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধ করে। আবার এই বনই আমাদের খাবারের কাঠের জোগান দেয়। ফলে বনের গুরুত্ব অসীম।

কাঠ কাটতে একেবারেই ভালো লাগত না আমার। এই গাছগুলোকে কেটে না ফেলে রক্ষা করতে পারলে তো এগুলো আমাদের সম্পদ হয়ে থাকবে। আমরা আদিবাসী মানুষ। আস্তে আস্তে এই বন সম্পর্কে আরও জানলাম। সরকার এখান থেকে কাঠ কাটা নিষিদ্ধ করেছেন, শালবনকে তারা প্রাকৃতিক সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আদিবাসী ঐতিহ্য অনুসারেও বন থেকে কাঠ কাটা নিষেধ। কিন্তু কোনোকিছুই তো বন চোরেরা মানছে না। সবকিছু ভেবে আমি মাঠে নামলাম। কতই বা বয়স হবে? বড়জোর ১৭! বাড়ির লোকের কাছে বলতেই তারা রেগে গেল। গ্রামের লোকেরাও আমার ওপর রেগে অস্থিরÑ রান্নার কাঠ আর বন থেকে কাটা যাবে না, বলে কি এই নতুন বউ! তাহলে আমরা খাব কীভাবে? বললাম, ছোট ছোট গাছগুলো কাটব প্রয়োজনে, পড়ে থাকা ডালপালা কুড়াব; কিন্তু বড় বড় শালগাছগুলোকে কোনোভাবেই কাটা চলবে না। গ্রামের নারীদের সঙ্গে অনেক কথা বলেছি, জানিয়েছি আমাদের বন আমাদেরই রক্ষা করতে হবে। এই বন আমাদের ভবিষ্যতের জোগানদাতা। তবে কেউই আমার সঙ্গে চলতে আগ্রহী নন। তাদেরই দোষ দিই কীভাবে? বিরাট ও ভয়ংকর শক্তিশালী বনচোর, ডাকাতদের সঙ্গে গ্রামের নারীরা লড়বে? এই ভাবনাই তো অসম্ভব। একের পর এক উঠান বৈঠক করলাম, তাতে কোনো লাভ হলো না। হতাশ হয়ে বাড়ি ফিরে আসতাম। আবার বাবার চেহারাটি ভেসে উঠত, তার সরল মুখে গাছের জন্য ভালোবাসা দেখতাম, পরদিন ফের বেরিয়ে পড়তাম। তবে বাড়ির লোকেরা এমনকি আমার কর্তাও বললেন, শুধু শুধু ঘুরছ যমুনা, কেউ তোমার সঙ্গী হবে না। তবে বন বাঁচানোর যে চেষ্টা করতে হবে সেই বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিল না, এখনো নেই। ফলে সবসময়ই অন্যদের বলি এই বনকে রক্ষার চেষ্টা করতে হবে। ধীরে ধীরে আমার এই ভালো কাজের কথা আরও কয়েকজন নারী উপলব্ধি করলেন। সেই পাঁচ নারীকে নিয়েই ১৯৯৮ সালে আমরা প্রতিষ্ঠা করলাম, ‘বন সুরক্ষা সমিতি’। হাতে দা, বঁটি, কুড়াল, তীর-ধনুক, বনে পাওয়া ছোট ডাল নিয়ে আমরা বনের যতটা পারি ভেতরে চক্কর দিতে শুরু করলাম। আমরা গাছগুলোর যতœ করি আর বনদস্যুদের খুঁজে বেড়াই। আস্তে আস্তে আমাদের সদস্য বেড়ে দাঁড়াল ২৫ জনে। মনে বল পেলাম, আমরাও পারব। তবে বনচোররা থেমে ছিল না। তারা আমাদের নানাভাবে ভয় দেখাতে শুরু করল। বন সুরক্ষা সমিতি পিছু হটল না। দল ভারী হতে লাগল আমাদের, পাশাপাশি ওদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শক্তিশালী হতে লাগলাম। আমরা এলাকার রেলওয়ের টিকিট মাস্টারের সঙ্গে দেখা করলাম। এই রেলপথটি পশ্চিম বাংলা পর্যন্ত চলে গিয়েছে। রেলে করেই দস্যুরা শাল কাঠ কেটে সেখানে পাচার করে। তাকে বললাম, আপনি কাঠ রপ্তানি বন্ধ করার ব্যবস্থা করুন, তাহলে আর চুরি যাওয়া কাঠ ওখানে যেতে পারবে না। কিন্তু লোভী, দুর্নীতিবাজ মানুষটি আমাদের কোনো সহযোগিতা করতেই রাজি হলেন না। দমে না গিয়ে কাঠ রপ্তানিকারকদের কাছেও গেলাম। বললাম, অনেক বছরের পুরনো গাছগুলোকে কাটবেন না। ওরা আমাদের জাতীয় সম্পদ। তারা রাজি তো হলেনই না, উল্টো বলে দিলেন এটি তোমার চিন্তার বিষয় নয় যমুনা টুডু। শক্তিশালী ও ক্ষমতাবান এই মানুষগুলোর সঙ্গে আমার আলাপের ফলাফল কী হয় দেখতে সেদিন অনেক মানুষ হাজির ছিলেন। তারা তো আমাকে চেনেন, আমার কাজ সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল। ফেরার পথে তারা আমাকে পাথর ছুড়ে অত্যন্ত অপমান ও কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করল। কুৎসিত গালাগালির বন্যা বইয়ে দিল। খুব ব্যথা পেয়ে আহত হয়ে ফিরলেও আমি পুরনো অবস্থান থেকে একচুলও সরিনি।

বনচোরদের বিরুদ্ধে আমাদের সমিতি লড়াইয়ে লেগে থাকল। অনেকগুলো এফআইআর (ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট) থানায় দাখিলের মাধ্যমে বনদস্যুদের সম্ভাব্য বন কাটা পুলিশকে দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। পাঁচ থেকে ছয়জন বনদস্যুকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি। এর ফলে অবশ্য আমাকে তিন-তিনবার মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কোনোবারই ওরা সফল হয়নি। আমাদের বনে আগুন লাগিয়ে সেটিকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছে, তাও আমাদের জন্য পারেনি। বন সুরক্ষা সমিতির সদস্যরাই এই বন ও আমাকে বাঁচিয়েছেন। বন নিয়ে আমাদের ভালোবাসাটিই অন্যরকম। আমরা প্রতিটি রাখিবন্ধনে বনের প্রতিটি গাছে রাখি বাঁধি। বনে ঢোকার সময় আমরা নিজেদের প্রতিশ্রুতি দিই, গাছগুলোকে বাঁচানোর জন্য আমরা বনে যাচ্ছি। সকালে, বিকেলে ও সন্ধ্যায় বনচোরদের খুঁজে বেড়াই। আগে থেকে বিপদের গন্ধ পেলে বাড়ির পোষা কুকুরগুলো আমাদের জানিয়ে দেয়। ফলে ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা কমতে লাগল আর আমাদের সংখ্যা বাড়তে লাগল। এখন বন সুরক্ষা সমিতির ৩শ’র বেশি দল আছে, প্রতিটি দলে ৩০ জন নারী আছেন। সর্বমোট ছয় হাজার মানুষ এই বনরক্ষার আন্দোলনে জড়িয়েছেন। আমরা পুরো জেলায় ১৫০টি কমিটি করেছি, প্রচারাভিযান চালিয়েছি। তাতে বনদস্যুরা দুর্বল হয়ে গেছে। আর যখন এই গ্রামে প্রথম বধূ হয়ে এসেছিলাম, তারা মহামারির মতো ছড়িয়ে গিয়েছিল। তাদের ভয়ে মানুষের মুখে রা ফুটত না। সরকারও আমাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। এখন ঝাড়খন্ড আর্মড ফোর্সেস পুরো বনাঞ্চল রক্ষার দায়িত্ব নিয়েছে। আমরা তাদের শুরু থেকে সাহায্য করে চলেছি। রাজ্য বন বিভাগ আমাদের গ্রামকে দেখভালের দায়িত্ব নিয়েছে। তারা আমাদের গ্রামে একটি স্কুল গড়ে দিয়েছে, সুপেয় জলের সরবরাহ তৈরি করে দিয়েছে। তারপরও আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। এখনো আমরা আগের মতো বনে অপরাধীদের খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরি। আর প্রিয় গাছগুলোকে বারবার দেখি, ওদের যতœ করি। এখন আর বন সুরক্ষা কমিটির কোনো ভয় নেই, কখনো ছিলও না। বনে প্রবেশের আগে প্রতিবারের মতো আমরা এখনো শপথ নিই, ‘শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই গাছগুলোকে আমরা সুরক্ষা দেব।’ বনের মধ্যেই সভা করে আমরা উপস্থিত সমস্যাগুলোর সমাধান করি। এই বন আমাদের সম্মান, স্বীকৃতি ও ভালোবাসা উপহার দিয়েছে। ফলে গ্রামের নারীরা তাদের মেয়েসন্তান ভূমিষ্ঠ হলে বনে গিয়ে ১৮টি গাছের চারা রোপণ করে আসেন, মেয়ের বিয়ে হলে আরও ১০টি বোনেন।

৩৭ বছর হয়ে গেল, আমার কোনো সন্তান নেই, এই গাছেরাই আমার সন্তান।

(ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, হিফর শি ওয়েবসাইট থেকে অনুবাদ)

image

অনেকগুলো এফআইআর থানায় দাখিলের মাধ্যমে বনদস্যুদের সম্ভাব্য বন কাটা পুলিশকে দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছি। পাঁচ থেকে ছয়জন বনদস্যুকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি। এর ফলে অবশ্য আমাকে তিন-তিনবার মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু কোনোবারই ওরা সফল হয়নি

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত