রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

দুদকের মামলায় নির্দোষ প্রমাণ করতে সর্বস্ব খুইয়েছেন জাহালম

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ১২:৪৫ এএম

‘পাহা হাড্ডিতে এহন আর সয়না। আর কতদিন মাইনসের বাইত্তে কাম করমু। বাপছিলাম পোলাটা কামাই করে, আমি রেহাই পাইলাম। আমার পোলাডারে ওরা জেলখানায় নিছে বাবা ওরে ছারাইয়া দেও।’- কান্না জড়িত কণ্ঠে শনিবার জাহালমের মা তার ভাষায় এসব কথাগুলো বলেন।

টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবড়িয়া গ্রামে জাহালমের (৩২) বাড়ি। বাবার ইউসুফ আলী, মা মনোয়ারা বেগম। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিকের কাজ করতেন। বেশ ছোট বেলাতেই বাবা অন্য একজনকে বিয়ে করে আলাদা সংসার গড়েছে। পরের বাড়ি ঝিয়ের কাজ করে ছয় ভাই বোন কে অনেক কষ্টে বাঁচিয়ে রেখেছেন মনোয়ারা বেগম। পড়াশোনা বেশি করতে পারেননি জাহালম অসহায় মায়ের মুখ ও ছোট ছোট ভাই বোনের দিকে তাকিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমে পরেছেন অনেক আগেই। সংগ্রাম করে ভালোই চলছিল তার পারিবারিক জীবন।

হঠাৎ দুদকের একটি সর্বনাশা চিঠিতেই সব উলোট-পালোট হয়ে গেল তার জীবনের সব সমীকরণ। ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে নয়টায় জাহালমকে হাজির হতে বলা হয় দুদক অফিসে। চিঠিতে বলা হয়, সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা আত্মসাতের জালিয়াতির সঙ্গে সে জড়িত। নির্ধারিত দিনে তার বড় ভাই শাহানূর মিয়াকে নিয়ে দুদকের ঢাকা কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপস্থিত হন। দুদক কর্মকর্তারা জাহালমের কাছে জানতে চান, আবু সালেক নাম দিয়ে তিনি সোনালী ব্যাংকে কোন হিসাব খুলেছেন কিনা? জাহালম দুদক কর্মকর্তাদের জানান- আমি  শ্রমিক ,অল্প আয়ের মানুষ। আমার সোনালী ব্যাংকে কোন হিসাব বা লেনদেন নাই। অথচ দুদকে উপস্থিত ব্যাংক কর্মকর্তারা সবাই জাহালমকেই আবু সালেক বলে শনাক্ত করেন। কারণ দুজন দেখতে প্রায় একই রকম । এর দু’ বছর পর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে জাহালমের খোঁজ-খবর করতে থাকে থানা-পুলিশ। পরে গ্রামের বাড়িতে তাকে না পেয়ে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তার কর্মস্থল নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিল থেকে তাকে আটক করা হয়। জাহালম তখন জানতে পারে তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ এনে ৩৩ টি মামলায় অভিযোগ পত্র জমা দিয়েছে দুদক। এভাবেই কারাগারে কেটে যায় আরও দুটি বছর। এ দু বছরে অনেকবারই আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জাহালম বলেছে, স্যার, আমি জাহালম, আবু সালেক নই। ২০১৯ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জাহালমের কারাগারের তিন বছর পূর্ণ হবে।

বিগত দিন গুলোতে তার ভাই শাহানূর আদালতের বারান্দায় ন্যায় বিচার পাওয়ার আশায় পাগলের মতো ঘুরেছেন। উপায়ান্ত না পেয়ে তিনি দ্বারস্থ হয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে । নিজেদের ১০ শতাংশ বসতবাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই। নিজেরদের জমানো টাকা শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এরপর বিভিন্ন ধারদেনা করে চলছে ভাইকে নির্দোষ প্রমাণ করার প্রচেষ্টা। একদিকে সংসার চালানো অপরদিকে ভাইয়ের জন্য ছুটোছুটি । হাঁপিয়ে উঠেছেন শাহানূর। নিজের চোখের সামনে মা বৃদ্ধ বয়সে পরের বাড়িতে কাজ করে কোন ভাবে সংসারটাকে টিকিয়ে রেখেছেন।

মা মনোয়ারা বেগম বলেন, বাবা,আমি আর কানতেও পারি না। এই ভিটে টুকু ছাড়া আর যে কিছু নেই। মামলা চালাতে চালাতে আমরা ফকির হয়ে গেছি।

অসহায় চোখে তাকিয়ে বললেন, শেখের বেটিরে (মাননীয় প্রধানমন্ত্রী) বলো আমার বেটা দোষ করে নাই। তারে যেন ছাইড়া দেওনের ব্যবস্থা করে। ৩৫ বছর পরের বাড়ি কাম করি চালাইলাম এহন বয়স অইছে আর যে পারি না।

ধুবড়িয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শফিকুর রহমান শাকিল জানান, আমি দুদকে এ বিষয়ে সাক্ষী দিয়েছি। দুদকের কর্মকর্তাদের বলেছি সে জাহালম, আবু সালেক না।এরা অসহায় পরিবার। এদের আমি ছোট বেলা থেকেই চিনি । এরা গরিব কিন্তু জালিয়াত না। জাহালম অযথা কারাগারে পচে মরছে। তার মা বৃদ্ধ বয়সেও পরের বাড়ি কাজ করে সংসার টিকিয়ে রাখছে। সর্বস্ব হারানো এ পরিবারের প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি কামনা করছি।

 

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত