বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪, ১০ বৈশাখ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ইউএনও হোসনে আরাকে স্বপ্রণোদিত হয়েই ওএসডি করেছে জনপ্রশাসন

আপডেট : ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০৭:৩২ পিএম

সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ইউএনও হোসনে আরা বেগম বীনার ওএসডি হওয়া নিয়ে দেশব্যাপী চলছে ব্যাপক আলোচনা। কেন একজন দক্ষ ও কর্মঠ কর্মকর্তাকে হঠাৎ ওএসডি করা হলো তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। বিষয়টি সংসদেও উত্থাপিত হয়েছে। এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে।

হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি করার পর গত ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি তার ফেসবুকে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দেন। স্ট্যাটাসের এক জায়গায় তিনি লিখেছেন আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানি না!

হোসনে আরা বেগম বীনার ভাষ্য মতে তিনি গর্ভবতী হওয়াতে প্রশাসনের একজন কর্তা ব্যক্তি তাকে অযোগ্য হিসেবে প্রমাণ করতেই এ ওএসডি করিয়েছেন। তবে কে সেই কর্তা ব্যক্তি তার নাম তিনি উল্লেখ করেননি।

এ ব্যাপারে জানার জন্য হোসনে আরা বেগম বীনার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে ফোনটি বন্ধ  পাওয়া যায়। এছাড়া তার ফেসবুকে দেওয়া সেই স্ট্যাটাসটিও আর দেখা যাচ্ছে না।

গর্ভবতী হোসনে আরা বেগম বীনাকে ওএসডি করার ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. রেজাউল বারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওনাকে ওএসডি করার জন্য জেলা প্রশাসন থেকে কোন সুপারিশ করা হয়নি। আমাদের জানা মতে তিনি একজন দক্ষ ও কর্মঠ কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ নেই। যে কোন প্রশাসনিক প্রয়োজনে ডাকলেই তিনি ছুটে আসতেন।

তিনি আরও বলেন, জনপ্রশাসন থেকে তাকে ওএসডি করা হয়েছে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন অবগত নয়। তবে ওএসডি করার প্রক্রিয়াটি নিয়ে সংশয় রয়েছে।

মো. রেজাউল বারী জানান, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটির জন্য আবেদন করলে তাকে ওএসডি করা হয়। এটাই নিয়ম। পরে নির্দিষ্ট ছুটি কাটানোর পর আবার নতুন করে পোস্টিং দেওয়া হয়। কিন্তু হোসনে আরা বেগম বীনা মাতৃত্বকালীন ছুটির আবেদন করার আগেই তাকে ওএসডি করা হয়েছে। আমাদের কাছেও মাতৃত্বকালীন ছুটির কোন আবেদন আসেনি। সে ক্ষেত্রে জনপ্রশাসন নিজেরা স্বপ্রণোদিত হয়েই ওএসডি করেছেন বলে আমার মনে হয়।

এদিকে গত ১০ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় জেলা প্রশাসক রাব্বি মিয়া বলেন, মাতৃত্বকালীন ছুটি ভালো ভাবে ব্যবহার করতেই সদর ইউএনওকে ওএসডি করা হয়েছে। ওএসডি সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেগেটিভ। আসলে ওএসডি মানে পরবর্তীতে কোথায় পাঠানো যায় সে সময়ের জন্য স্থগিত রাখা। এ সময় তিনি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হোসনে আরা বেগম বীনার নির্বাচনের সময় করা কাজের প্রশংসা করেন। পাশাপাশি ইউএনও ও তার সন্তানের সুস্থতা কামনায় সকলকে দোয়া করার কথা বলেন।

ইউএনও হোসনে আরা তার নিষ্পাপ সন্তানের বর্তমান অবস্থার জন্য একজনকে দায়ী করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে তার ফেসবুকে একটি আবেগ মাখানো স্ট্যাটাস দেন।

তার ওই স্ট্যাটাসটি হুবহু তুলে ধরা হলো-

‘আমি ব্যক্তিগত বিষয়গুলো সাধারণত ফেসবুকে খুব একটা শেয়ার করি না। তবে আজ মনে হলো এখন চুপ করে থাকাটাও অন্যায়। তাই আজ আর না, আজ আমি বলব আমি হোসনে আরা বেগম, উপজেলা নির্বাহী অফিসার নারায়ণগঞ্জ সদর, মাত্র ৯ মাস পূর্বে আমি এ পদে যোগদান করি।

আমার দীর্ঘ ৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে বহু চেষ্টা চিকিৎসার পরও আমরা কোনো সন্তান লাভ করতে পারিনি। কিন্তু পাঁচ মাস পূর্বে আমি জানতে পারি আমি দুই মাসের সন্তানসম্ভবা। এ ঘটনা আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার অপার রহমত ছাড়া আর কিছুই নয়, এ বিশ্বাস আমি প্রতিনিয়ত বুকে ধারণ করেছি। এ বিশ্বাস ও স্বপ্ন বুকে নিয়ে অনাগত সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় দিন গুনছিলাম।

উল্লেখ্য আমি আমার বাবুকে পেটে নিয়েই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে আমি নারায়ণগঞ্জ-৪ ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের আংশিক নির্বাচন অত্যন্ত সফলভাবে সম্পন্ন করি।

একজন নারী কর্মকর্তা হিসেবে অজুহাত, ফাঁকিবাজি এই বিষয়গুলোকে কখনই পুঁজি করিনি। যখন যে পদে কাজ করেছি চেষ্টা করেছি শতভাগ নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে। সন্তানসম্ভবা হয়েও এর কোনো ব্যতিক্রম আমি করিনি।

অথচ আমি সন্তান সম্ভবা হয়েছি শোনার পর থেকেই একজন বিশেষ কর্মকর্তা, যার নাম বলতেও আমার রুচি হচ্ছে না, বিভিন্ন মহলে আমাকে অযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করে আমাকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে বদলির পাঁয়তারা করেই চলেছিল।

আমার সন্তান সম্ভবা হওয়াটাকেই সে বিভিন্ন মহলে আমার সবচেয়ে বড় অযোগ্যতা হিসেবে উপস্থাপন করেছে। অথচ এই সন্তান পেটে নিয়েই আমি অত্যন্ত সফলভাবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহকারী রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এতে আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক এপ্রিসিয়েশনও পেয়েছি।

আমার সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখ ছিল এপ্রিলের ২০ তারিখ, তেমন মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি ছিলাম। গত ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে রেগুলার চেকআপ করতে আমি হাসব্যান্ডসহ স্কয়ার হাসপাতালে আসি।

চেকআপ শেষে সন্ধ্যায় আমরা হাসপাতালে অপেক্ষা করছি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য, এমন সময় আমার একজন ব্যাচমেট ফোন করে জানায় আমার সদাসয় কর্তৃপক্ষ আমাকে ওএসডি করেছে অর্থাৎ আমাকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ করেছে।

আমার অপরাধ হলো আমি সন্তান সম্ভবা। আর তার চেয়েও বড় কারণ হলো সেই তথাকথিত ক্ষমতাধর কর্মকর্তার ওপরের মহল কর্তৃক তদবির।

খবরটা শোনার পর আমি প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে পারিনি। আমি অ্যাজমার রোগী। প্রচণ্ড মানসিক চাপে আমার ফুসফুসে ব্লাড সার্কুলেশন অস্বাভাবিকভাবে কমে যায়, ফলে আমার পেটের সন্তানের অক্সিজেন সাপ্লাই বন্ধ হয়ে যায় এবং হঠাৎ করেই আমার পেটের বাবু নড়াচড়া পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়।

তাৎক্ষণিক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ডক্টর সেদিন রাতেই সিজার করে বাবু বের করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন। পরে আমার পরিবারের সবার সিদ্ধান্তে পরদিন সকালে আমার মাত্র ৩১ সপ্তাহ বয়সী প্রি-ম্যাচিউর বেবিকে সিজার করে বের করে ফেলা হয়। এখন সে স্কয়ার হাসপাতালের এনআইসিওতে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণপণ যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

আমার এই নিষ্পাপ সন্তানটার কী অপরাধ ছিল? নাকি মা হতে চাওয়াটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল আমি জানি না!

তবে জানি একজন সব দেখেন তিনি আমার নিষ্পাপ মাসুম সন্তানের ওপর এই জুলুমের বিচার করবেন। এই নিষ্ঠুর অমানবিকতার পৃথিবীতে কোনো কর্তা ব্যক্তিদের কাছে আমি এ অন্যায়ের বিচার চাই না, শুধু আমার সৃষ্টিকর্তাকে বলব তুমি এর বিচার করো!

আর যারা আমাকে একটুও ভালোবাসেন আমার নিষ্পাপ সন্তানটার জন্য দোয়া করবেন। ও সুস্থ হয়ে গেলে কোনো কষ্টের কথাই আমার মনে থাকবে না।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত