কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলে কর্মরত শিক্ষকদের দুর্ভোগ আর ভোগান্তির দুর্বিষহ জীবনযাপনে ব্যাহত হচ্ছে চরের স্কুলগুলোর পাঠদান কার্যক্রম। শুষ্ক মৌসুমে নদী পার হয়ে মাইলের পর মাইল হাঁটা এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বর্ষা মৌসুমে উত্তাল নদী পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর পর শিক্ষক মানসিক বিপর্যয়ে থাকেন বলে মনে করেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে ১৬টি নদ-নদীতে ৪৮০টি ছোট-বড় চর রয়েছে। প্রত্যন্ত এই জনপদে ১ হাজার ২৩৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে চরে ২০৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন সহস্রাধিক শিক্ষক। একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কর্মস্থলে যাতায়াতের জন্য শিক্ষকদের বেতনের সিংহভাগই খরচ করতে হয়। বেশি ভোগান্তি পোহাতে হয় নারী শিক্ষকদের। এতে বাধ্য হয়ে চরে অনেক প্রতিষ্ঠানে ভাড়াটে শিক্ষক দিয়ে চলছে পড়ালেখা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চিলমারী নৌবন্দর থেকে প্রায় এক ঘণ্টার নৌপথ পাড়ি দিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা হেঁটে একটি বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর পর ঘড়িতে বেলা সাড়ে ১১টা বেজে গেছে। আবার ফিরতে হবে বিকেল ৩টার নৌকায়। এই নৌকা ধরতে না পারলে বাড়ি ফেরা হবে না শিক্ষকদের। ফলে বাধ্য হয়েই ১টা বা দেড়টার মধ্যে স্কুল ছুটি দিয়ে দেন শিক্ষকরা। চরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে যাতায়াতে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। চর বলমনদিয়ার খাতার বাসিন্দা সালাম মিয়া, সুরুজ আলী, লাইলী বেগম, বুলবুলি আকতার বলেন, এখানে নামকাওয়াস্তে লেখাপড়া হয়। এ জন্য সন্তানদের নিয়মিত স্কুল পাঠাই না। মাঠে কাজে লাগাই। দুই টাকা বাড়তি আয় হলে সংসারের লাভ। যেদিন কাজের চাপ থাকে না, সেদিন স্কুলে পাঠাই।
কুড়িগ্রামের প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি নারায়ণ চন্দ্র বলেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদ্যালয়ে আসতে হয়। উলিপুর উপজেলা শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, সাত-আট কিলোমিটার হেঁটে কোনো শিক্ষক যখন চরের স্কুলে পৌঁছান, তখন ক্লান্তিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, চরাঞ্চলে মানসম্মত পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের বিশেষ প্রণোদনা চালু করা দরকার। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন শিক্ষকদের মানসিক বিপর্যস্ততা স্বীকার করে বলেন, চরাঞ্চলের শিক্ষক দিয়ে চরের স্কুলগুলো চালানো উচিত।
