‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাস’ বইয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি না থাকা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদন হাইকোর্টে জমা দেওয়া হয়েছে। বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে সোমবার এ প্রতিবেদন জমা দেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আল আমিন সরকার।
আদালত শুনানি নিয়ে আদেশের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেন।
বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি না ছাপিয়ে তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান ও পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি থাকায় উষ্মা প্রকাশের পাশাপাশি এতে ইতিহাস বিকৃত হয়েছে বলে মতামত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
এ ছাড়া একাত্তরে ৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাসহ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ আনে তদন্ত কমিটি।
এ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ছবি ব্যবহার না করা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ এনে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে গত বছরের ২ অক্টোবর বিচারপতি আশফাকুল ইসলামের হাইকোর্ট বেঞ্চ রুল জারির পাশাপাশি বিষয়টি তদন্ত করতে অর্থ সচিবকে একটি কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন।
৩০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে বলা হয় আদালতের আদেশে।
এরপর অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. জাফর উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় সময় বাড়ান আদালত। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার এ প্রতিবেদন দাখিল হয়। আদালতে রিটকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন।
তদন্ত কমিটি বলেছে, বইটিতে স্বাধীনতার ইতিহাস বর্ণিত হলেও তা যথাযথ লিপিবদ্ধ হয়নি। তদন্ত কমিটি আরো বলেছে, বইয়ে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের কথা উল্লেখ থাকলেও ভাষণ প্রদানের স্থান রেসকোর্স ময়দানের (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কথা উল্লেখ নেই। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা বইয়ে উল্লেখ থাকলেও স্বাধীনতার ঘোষণার তারিখ (২৬ মার্চ ১৯৭১) উল্লেখ নেই। পাশাপাশি ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার ইশতেহার ঘোষণা বিষয়েও বইয়ে উল্লেখ নেই।
তদন্ত প্রতিবেদনের মতামতে বলা হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের নামকরণ করেন। এ কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ছবি এই বইয়ে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যাবশ্যক ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বঙ্গবন্ধুর ছবি খুঁজে পাওয়া যায়নি- এ যুক্তিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত।
মতামতে আরো বলা হয়েছে, গ্রন্থটিতে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের দমন পীড়নের কথা উল্লেখ করা হলেও তার একাধিক ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যা পরস্পরবিরোধী। এ ছাড়া ড. সনৎ কুমার সাহা (এই পাণ্ডুলিপির মতামতকারী) এ বিষয়ে যে মতামত প্রদান করেছিলেন সেটি অনুসরণ করলে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খানের ছবি অন্তর্ভুক্ত করার মতো অনভিপ্রেত ঘটনার সৃষ্টি হতো না এবং অনাবশ্যকভাবে এ দুজনের ছবি অন্তর্ভুক্ত করায় সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি রয়েছে বলে তদন্ত কমিটি মনে করে। বইটিতে এ দুজনের ছবি না ছাপানোই শ্রেয় ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
রিটকারীর আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তাদের বইয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর কোনো ছবি নেই অথচ তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খানের ছবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং জাতির জন্য লজ্জাকর। শুধু তাই নয়, এই বইতে নানা ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেও বিকৃত করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে আদালতকে অবহিত করা হয়েছে। আদালতও প্রতিবেদন দেখেছেন। আদেশের জন্য মঙ্গলবার দিন ধার্য করেছেন হাইকোর্ট’।
